বিভিন্ন ভাবে মিডিয়ার সংজ্ঞা দেয়া যায়। তবে এক কথায় বলা যায় যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে মিডিয়া। মিডিয়ার পরিধি ব্যাপক যা সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন ভাবে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও বর্তমানে মিডিয়ার ব্যবহার শিক্ষা, উৎপাদন, ব্যবসা, বিনোদন জগতে ক্রমশই বাড়ছে। উদাহরন স্বরুপ বলাযায় সংবাদপত্র-পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার-ইন্টারনেট, বই, চিঠি-পত্র, পোষ্টার-লিফলেট ইত্যাদি। এসব মিডিয়াকে ২ ভাগে ভাগ করা যায় প্রথমত- প্রিন্টিং মিডিয়া এবং দ্বিতীয়ত ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মিডিয়া। এসব মিডিয়াকে আরও গতিশীল করেছে স্যাটেলাইট মিডিয়া।
একুশ শতকের এই দুর্বোধ্য চ্যালেঞ্জিং সময়কে আমরা উত্তর আধুনিক যুগ, বিজ্ঞানের যুগ, তথ্য প্রযুক্তির যুগ, বিশ্বায়নের যুগ, গণতন্ত্রের যুগ ইত্যাদি নামে ডাকি। আবার কেউ কেউ একে মিডিয়ার যুগ হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ উপরোক্ত সকল যুগের প্রচার প্রসার হয় মিডিয়ার মাধ্যমে। কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নে মিডিয়ার মিডিয়ার চেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দ্বিতীয়টি নেই। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতায় মিডিয়ার উপাদান হিসেবে যুক্ত হয়েছে স্যাটেলাইট এবং অপটিক ফাইবার। যার ফলে পৃথিবীটা ক্রমশ ছোট হতে হতে আমাদের হাতের মুঠোয় এসে গেছে। আমাদের সকল কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে মিডিয়া, আমরা হয়ে উঠছি মিডিয়া নির্ভর। আর তাইতো কোন মতবাদ, দর্শন, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, পন্য ইত্যাদির প্রচার-প্রসার ও বাস্তবায়নে সবাই মিডিয়া ব্যবহার করছে।
মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যা পাই তা হলো তথ্য। তথ্যের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, তাই তথ্যের ধরনের উপর নির্ভর করে মিডিয়ার ধরন। মিডিয়া সমাজের আয়না, এর মাধ্যমে সমাজের চিত্র সঠিক ভাবে ফুটে উঠবে অর্থাৎ আমরা সত্য বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাব এটাই স্বাভাবিক অবস্থা। অন্যদিকে অস্বাভাবিক অবস্থা হচ্ছে মিথ্যা, বিকৃত, উদ্দেশ্য-প্রণোদিত তথ্য পাওয়া। বর্তমানে এই অস্বাভাবিকতাই হচ্ছে বাস্তবতা। মিডিয়ার এই অসত্য, বিকৃত, উদ্দেশ্য-প্রণোদিত, তিলকে তাল বা তালকে তিল হিসেবে উপস্থাপনা করা ইত্যাদি কর্মকান্ডকেই বলা হয় হলুদ সাংবাদিকতা অন্য ভাষায় তথ্য সন্ত্রাস।
বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের বিভিন্ন আদর্শ, দর্শন, মতবাদ, সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য মিডিয়া ব্যবহার করছে। এ ব্যবহার অনেক পুরানো হলেও সু-পরিকল্পিত ভাবে এর ব্যবহার দেখা যায় ১৮শতকে। সে সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকায় বিষেশ করে মুসলিম দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদের সামরিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নীতির সমর্থনে গড়ে ওঠে ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদেও ধারনা। এর মূল কথা হচ্ছে এখানকার শাসিতরা যেহেতু অনুন্নত ও অসভ্য এবং তাদের সাংস্কৃতি ও জীবনাচরন সাম্রাজ্যবাদীদের তুলনায় নিম্নমানের সেহেতু তাদের উন্নত করার নিমিত্তে শাসন করার নৈতিক ও প্রাকৃতিক অধিকার তাদেও রয়েছে। তাদের এ অপনীতির সমর্থনে সে সময়ে পুরো ইউরোপ জুড়ে একদল লেখক, বুদ্ধিজীবি, দার্শনিক, শিল্পী তৈরি হয়। তারা তাদের (এশিয়া-আফ্রিকার) ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ভাষা ও জীবনাচরণ নিয়ে গবেষণা করেন এবং উত্তরণের পথ নির্ণয় করেন। অর্থাৎ তাদের উন্নতির জন্য কি করতে হবে এবং কিভাবে করতে হবে তা নির্ধারণ করে দেন। আর এ কাজে তারা তৎকালীন মিডিয়ার সহায়তা নেন। ইউরোপীয়রা যখন এদেশে আসে তখন এখানকার অবস্থা তাদের তুলনায় শ্রেয় ছিল, কিন্তু বুদ্ধিজীবি-ঐতিহাসিকরা সেময়টাকে সব রকম অবনতি, অগতি আর অন্ধকারের যুগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাদের মতে, তাঁরা এখানে না এলে আমাদের উদ্ধারের আর কেউ ছিলনা। আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবিই আজ মনে করেন নিজেদের বুদ্ধি ও শক্তিতে বিবর্তিত হলে আমাদের সমাজ উন্নত ও যুগোপযোগী হতে পারতো না। তাদের প্রচারণায় আমাদের মধ্যেও আজ এমন ধারনা বদ্ধমূল যে ইংরেজী না জানলে জাতে ওঠা যায় না। বর্তমানে ইংরেজীর দরকার আছে সত্যি, কিন্তু তাদের সাংস্কৃতিও কি আমাদের গ্রহণ করতে হবে? ভাষার সাথে সংস্কৃতি নিবিড় ভাবে জড়িত, ভাষা টান দিলে সংস্কৃতিও চলে আসে। তাই ভাষা গ্রহণের সময় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব ও স্বকীয়তা টিকে থাকবে না।
তারা জানতেন উপনিবেশ চিরস্থায়ী হবে না। তাই উপনিবেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থা চিরস্থায়ী করার জন্য তারা সুকৌশলে একটা শ্রেণী তৈরি করে গেলেন যারা তাদের অগ্রবাহিনী হিসেবে কাজ করে চলছে। আর এ ক্ষেত্রে তাদের যথাযত গাইড লাইন দিয়ে যাচ্ছে মিডিয়া। তাই বর্তমানে তেমন দেখা যায় না পূবের মত সৈন্য দিয়ে কোন দেশ দখল করতে, এক্ষেত্রে তাদের মিডিয়াই যথেষ্ট। মিডিয়া যে অগ্রবাহিনী তৈরি করে দেয় তা যে কোন ধরনের আগ্রাসন চালানোর জন্য পর্যাপ্ত। ফলশ্রুতিতে আমরা আত্মভোলা হয়ে আমাদের পরিচয় দিচ্ছি বাঙালী/বাংলাদেশী হিসেবে, মুসলিম হিসেবে নয়। আমাদের মনে এরকম ধারনা বদ্ধমূল যে ইসলাম লৌকিক ধর্ম, শুধু কিছু আচার অনুষ্ঠান সর্বস্ব, সামগ্রীক ও সার্বজনীন নয়। এভাবে আমাদের জীবন ব্যবস্থায় যাবতীয় অপসংস্কৃতি-শিরক জড়িয়ে যাচ্ছে। আমাদের সংস্কৃতসেবীদের অনেকেই বলছেন- বিপদে, শংকায়, অস্বস্তিতে রবীন্দ্র-সংগীত শ্রবণ ইবাদতের মত। একজন মুসলিমের জন্য এরচেয়ে অজ্ঞতা-পথভ্রষ্টতা আর কি হতে পারে?
পশ্চিমেতো বটেই, আমাদের মুসলিম ভাইয়েরাও ইসলামের বিপক্ষে মিথ-স্টোরিও টাইপ তৈরিতে এতটাই দক্ষতা অর্জন করেছেন যে, শান্তির ধর্ম ইসলামের সভ্য-প্রগতির চেহারা বদলে ভীতিকর করে ফেলেছেন। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে আফগানিস্তানে যখন রাশিয়ার আগ্রাসন চলছিল, আমেরিকা তখন যুদ্ধেও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে মুভি-ডকুমেন্টারী তৈরি করে সারাবিশ্বে প্রচার করে। সেখানে দেখানো হয় যে নির্যাতিত মুসলিমরা রাশিয়ার সামরিক শক্তির তুলনায় খুবই দুর্বল এবং এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধ হিসেবে দেখানো হয় কোন স্বর্ণ হারা যুবক আত্মঘাতি হামলার মাধ্যমে মোকাবেলা করছে। এভাবে তারা তরুণদের আত্মঘাতি হামলায় উদ্বুদ্ধ করে সাথে সাথে পর্যাপ্ত অর্থ ও অস্ত্রের যোগান দেয়। এভাবেই সৃষ্টি হয় ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ। মাদ্রাসা ছাত্রদের নামে পূর্বে বদনাম ছিল যে তারা দুনিয়া ছেড়ে আখিরাত নিয়ে পড়ে আছে, আর বর্তমানে বদনাম হল তারা জঙ্গী-সন্ত্রাসী। প্রকৃত পক্ষে এসকল তণরা শক্তিশালী গোষ্ঠী ও মিডিয়ার স্বীকার।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে কোন দেশ আক্রমণ করার পূর্বে মিডিয়ায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচারণা চালানো হয়, জরিপ, ভিডিও-ডকুমেন্টারী তৈরি করে দেখানো হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর মিডিয়ার এই প্রচারণা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তুরস্ককে ভেঙে ফেলা হয়, ইসলাইলের অবৈধ জন্ম হয়। মিডিয়ায় প্রচর করা হয় তেলের কোন মূল্য নেই- এর মজুদ রেখে লাভ নেই। এভাবে মুসলিম দেশগুলো থেকে প্রায় বিনা পয়সায় তেল নেয়া হয়, আফ্রিকার খনিজ সম্পদ নিয়েও একই ধরনের কাজ করা হয়। কোন মুসলিম দেশের গণতান্ত্রিক সরকারও মিডিয়ার দৃষ্টিতে অবৈধ আর রাজতন্ত্র বা সামরিক সরকারও প্রশংসিত।
মিডিয়া একদিকে নারীর পর্দা বা হিজাবকে কটুক্তি করছে- এর অপকারীতা খুঁজে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি নাটক, মুভি, ফ্যাশন-শো, লাইফ-ষ্টাইল, টকশো, মডেলিং, বিজ্ঞাপন ইত্যাদিতে সংক্ষিপ্ত পোশাক প্রদর্শনের প্রতিযোগীতা চালাচ্ছে। নারী স্বাধীনতা-সমঅধিকারের নামে তাদেরকে অশ্লীল-ধর্ম বিদ্বেষী বানাচ্ছে। মিডিয়া এইডস বিরোধী প্রচারণা-সচেতনতা সৃষ্টি করছে পাশাপাশি অবৈধ-অনৈতিক কাজ করেও কিভাবে এইডস থেকে রক্ষা পাওয়া যায় তা শেখাচ্ছে। পতিতা-বৃত্তি পরিহার নয় বরং একে বৈধ পেশার মর্যাদা দেয়ার প্রচারণা মিডিয়াতেই দেখা যায়। মিডিয়ায় প্রচারিত বিজ্ঞাপনগুলো তরুণ প্রজন্মের নৈতিক অধঃপতন এবং অপসংস্কৃতি গ্রহণের অন্যতম সহায়ক। মিডিয়ায় পারিবারিক অশান্তি, বিশৃঙ্খলা, পরকীয়া ইত্যাদি তুলে ধরা হয়—যেগুলো আমাদেরকে পরিবারবিমুখ করে তোলে। আর এই পরিবারবিমুখ ব্যক্তির হতাশ জীবন নেশার মধ্যে আশার আলো খুঁজে বেড়ায়।
বর্তমানে আমাদের সমাজের দিকে আমরা এর প্রভাব দেখতে পাই। সমাজের প্রত্যেক শ্রেণীর মানুষ মিডিয়া থেকে যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি প্রভাবিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজের অজান্তেই। এই প্রভাব থেকে খুব কমসংখ্যক লোকই মুক্ত থাকতে পেরেছে। মানুষ বিশেষত তরুণরা বোঝে না কোনে আদর্শ-দর্শন, কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মিডিয়া কাজ করছে। তাইতো আপাতদৃষ্টিতে ভালো কোনো অনুষ্ঠানের আড়ালে মন্দ কোনো উদ্দেশ্য নিহিত থাকছে যা অনেকের পক্ষেই শনাক্ত করা অসম্ভব। মা-বাবা বা বর্তমান সমাজ ছেলে-মেয়েদের অবক্ষয়ের কিছু কিছু দিক যেমন অশ্লীলতা, নেশা ইত্যাদি বিষয়ের দায়সারা ধরনের নজরদারি করলেও আদর্শগত অধঃপতন রোধে ভূমিকা নিচ্ছে না। এ ধরনের অধঃপতন তাদের দৃষ্টিতে অধঃপতনের সংজ্ঞায় পড়ে না অথবা তারাও একই দোষে দূষ্ট।
মিডিয়াগুলোর মধ্যে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো খুব জনপ্রিয়। বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান থাকে এগুলোতে। এক্ষেত্রে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান তরুণদের পছন্দ। যেমন : মিউজিক, মুভি, খেলা, ফ্যাশন শো ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও অধিকাংশ সময়ে এসবই দেখে থাকেন। গৃহিণীদের পছন্দের অনুষ্ঠান হিন্দি সিরিয়াল ও হিন্দি মুভি। বাচ্চারা স্বভাবতই কার্টুন-অ্যানিমেশন দেখে আর খুব কমসংখ্যক লোকই সংবাদসহ শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখেন। অধিকাংশ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানই নৈতিকতাবর্জিত, অশ্লীলতায় ভরা। অন্যদিকে সংবাদ, টকশো, ডকুমেন্টারি, নাটকসহ অন্যান্য অনুষ্ঠানও অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এক্ষেত্রে আদর্শিক চ্যানেল ও অনুষ্ঠানের সংখ্যা নগণ্য। বিনোদনমূলক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলো প্রচারিত হয় সন্ধ্যার পর এবং শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয় দিনের বেলায়। অধিকাংশ দর্শক সাধারণত সন্ধ্যার পরে টিভি দেখার সময় পান এবং তখন তারা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখা থেকে বঞ্চিত হন। বেশিরভাগ তরুণই অধিকাংশ সময় বিদেশী চ্যানেলগুলো দেখে।
আরেকটি শক্তিশালী মিডিয়া হলো পত্র-পত্রিকা। পত্রিকার স্টলগুলোতে চোখ রাখলেই বোঝার বাকি থাকে না যে, কোন ধরনের পত্র-পত্রিকার প্রচার বেশি এবং সেগুলোতে কী থাকে। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাধারণ সংবাদের পাশাপাশি একাধিক পৃষ্ঠায় শুধু নাটক, সিনেমা, মিউজিক, লাইফ স্টাইল, স্টার প্রোফাইল, স্ক্যান্ডাল, রাশিফল ইত্যাদি বিনোদনমূলক সংবাদ-ফিচার এবং এক বা একাধিক পৃষ্ঠা খেলার সংবাদের জন্য বরাদ্দ। বিনোদনমূলক ফিচারগুলোর অধিকাংশই আমাদের সংস্কৃতির পরিপন্থী চেতনা সৃষ্টি করে। আর এসবই আমাদের সমাজের তরুণ-তরুণীর প্রধান পাঠ্য। ম্যাগাজিনগুলোর অধিকাংশই বিনোদনমূলক এবং অপসংস্কৃতির ধারক।
বর্তমানে মোবাইল ফোন এবং কম্পিউটার-ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তরুণ-তরুণীরা মোবাইল অপারেটরদের ডিজুস অফারের ডিজুস আলাপন দিনের বড় অংশ কাটায় এবং গড়ে তোলে নানা রকমের সম্পর্ক। ফলশ্রুতিতে অপরিণত বয়সের অপরিণত সম্পর্ক অনেকের জীবনেই কালো অধ্যায় নিয়ে আসে। লেখাপড়ার ক্ষতি ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার কারণ মোবাইলে অধিক কথা বলা। অন্যদিকে কম্পিউটার-ইন্টারনেটের ব্যবহারকারী কম হলেও অপব্যবহারই হয় বেশি।
বই অন্যান্য মিডিয়া থেকে একটু আলাদা এবং বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এটা জ্ঞান অর্জন ও দিকনির্দেশনার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে বিভিন্ন মতাদর্শের ও গোষ্ঠীর লোক। বইয়ের মাধ্যমে মগজ ধোলাই অর্থাৎ বিবলিওথেরাপির কাজটা লেখক-বুদ্ধিজীবীরা চাতুর্যের সাথেই করেন। তাই বিভিন্ন মতবাদের প্রচার-প্রসার বইয়ের মাধ্যমেই হয়। তরুণরাই বইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। আমাদের বইমেলায় দেখা যায় মূল্যবোধহীন উপন্যাস যেখানে এক মেলায় ১২-১৪টা সংস্করণ বিক্রি হয়, অন্যদিকে মানসম্পন্ন বইগুলোর ১টা সংস্করণ বিক্রি হতে ১ যুগ বা শতাব্দী পার হয়ে যায়।
পাশ্চাত্য মিডিয়াগুলো সুকৌশলে বিভিন্ন দেশে একটা শ্রেণী তৈরি করেছে যারা স্থানীয় পর্যায়ে এনজিও সংগঠন ও মিডিয়া তৈরি করে সুমীল-বুদ্ধিজীবী সমাজ নাম ধারণ করে সমাজে পরিবর্তন আনতে চাইছে। এরা সুকৌশলে তরুণ, যুব ও নারীসমাজকে বিভিন্ন দর্শনে দীক্ষা দিচ্ছে। রাষ্ট্রকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বলে বিদেশী হস্তক্ষেপ কামনা করছে। এমনকি বই পড়িয়ে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ নামে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
ডিশ না থাকাকালীন সময়ে আমাদের দেশে বিটিভির মাধ্যমে সিএনএন চ্যানেল দেখানো হতো। আর এখন আমাদের বেসরকারী পর্যায়ে অনেক চ্যানেল থাকা সত্ত্বেও বিটিভির মাধ্যমে বিবিসি সংলাপ দেখানো হয়। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো পাশের দেশে নিষিদ্ধ অথচ আমরা তাদের মিডিয়াগুলো অর্থাৎ টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকা, বই আমাদের দেশে উন্মুক্ত করে তাদের সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছি, যার প্রভাবে হারাচ্ছি আমাদের সংস্কৃতি, গ্রহণ করছি অনাচার, অশ্লীলতা, কুসংস্কার, ভ্যালেন্টাইন ডে, লিভ টুগেদার, ডেটিং, রাখীবন্ধন, মঙ্গল প্রদীপ, নৃত্য, মঙ্গল শোভাযাত্রা, রাত ১২টায় নববর্ষ উদযাপন ইত্যাদি অপসংস্কৃতি। এছাড়াও আমাদের ঈদ, বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে, এগুলোর স্বকীয়তা হারাচ্ছে। নেশা, এইডস, পরিবারবিচ্ছিন্নতা, নাস্তিকতা ইত্যাদিও এদেশে বিদেশী সংস্কৃতির দেয়া উপহার। মিডিয়ার সৃষ্ট স্টার ও হিরো-হিরোইনদের অন্ধ অনুকরণকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।
উপর্যুক্ত মিডিয়ার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হলে, আমাদের তরুণ সমাজ ও আমাদের সংস্কৃতি বাঁচাতে চাইলে আমাদের সর্বপ্রথম যা করণীয় তা হলো আমাদের নিজস্ব ধর্ম ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক শক্তিশালী মিডিয়া গড়ে তোলা। মিডিয়ার প্রভাবে আমাদের মধ্যে বহুজাতিক সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে, আমরা ক্রমশ ভোগবাদী হয়ে উঠছি। আমাদের ভাষা, ধর্ম ও বর্ণ এক হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন সংস্কৃতি গ্রহণের কারণে আমাদের আদর্শ এক নয়। তাই আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার জন্য, একে বিকশিত করার জন্য সরকারের উচিত মিডিয়া নীতিমালা প্রণয়ন ও যথার্থভাবে তা বাস্তবায়ন করা। আমাদের সবাইকে মিডিয়ার সৃদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং পরিচিতজনদেরকে সচেতন করতে হবে।
কুসংস্কৃতিতে আমরা ডুবে আছি। পরের কৃষ্টি আমাদেরকে যেমন পেয়ে বসেছে তেমন পরগাছার মত আগামী দিনের প্রজন্মকে ধব্বংস করে দিচ্ছে।এক সময় মনে হয় আমাদের সংস্কৃতিকে যাদুঘরেও পাওয়া যাবে না। অথচ মুসলমান হিসেবে আমরা পারি গবেষনা করতে ইসলামী সংস্কৃতি কি? এখনে ও আনন্দ আছে। নাই শুধু বেহায়াপনার নামে ঘুনে ধরা চরিত্র ধ্বংসের। ভোগে সাময়িক আনন্দ থাকলেও পরে যন্ত্রনা। ত্যাগে আছে আত্ততৃপ্তি।
59636
৩
ঢাকা থেকে মাহমুদ লিখেছেন,
১৭ জুন ২০১১; রাত ১০:৫৫
আমাদের বর্তমান তরুন তরুণীরা এতোটাই মোহগ্রস্থ যে তারা ভাল কে মন্দ এবং মন্দকে ভাল বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। তাদের মগজ এভাবেই ধোলাই করা হয়েছে। আমরা যে মানুষ এবং মানুষ হিসেবে আমাদের কি কর্তব্য আমরা তা বুঝি না বা বুঝতেও চাই না। বরং, কেও ভাল কিছু বললে তা পাগলের প্রলাপ বলে তাছিল্ল্য করি। এর পরিণতি জাতি হিসেবে অবশ্যই একদিন না একদিন আমাদের ভোগ করতে হবে... যে দিন আমাদের শুধরানোর আর কোন সুযোগই আমরা পাব না...
59806
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
Nice!
Write more article Like this.