|
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা
মিলন কর্মকার রাজু |
|
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগর কন্যা কুয়াকটা। একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করার মনোমুগ্ধকর পর্যটন স্পট। বঙ্গোপসাগরের ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বিশাল সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর বিরল। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাসহ সকল ঋতুতেই মৌসুমী পাখিদের কলরবে মুখোরিত থাকে সমুদ্রতট। একমাত্র কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রে এসেই প্রকৃতির সৃষ্ট সাগরের নানা রূপ বিভিন্ন ঋতুতে উপভোগ করা সম্ভব। তাইতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটন পিপাসুরা বছরের বিভিন্ন ঋতুতে বার বার ছুটে আসে কুয়াকাটায়। কৃত্রিমতার কোন ছাপ নেই এখানে। সে কারণেই পর্যটকরা কুয়াকাটায় এসে প্রকৃতির নিয়মের সাথে নিজের মনকে একাকার করে প্রকৃতির স্বাদ নিজ উপলব্ধিতে আত্মস্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠে। বিজড়িত দৃশ্য, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করা ছাড়াও রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রায় দুইশত বছরের পুরানো ঐতিহ্য শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে প্রতিষ্ঠিত অপতার "গৌতম বুদ্ধের" বিশাল আকৃতির মূর্তিসহ শ্বেত পাথরের নির্মিত ছোট-বড় অসংখ্য মূর্তি রয়েছে। আরাকান রাজ্য থেকে বিতারিত হয়ে আসা রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা তাদের রাজা মং এর নেতৃত্বে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রথমে চট্রগ্রাম এবং পরে পটুয়াখালীর এ জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় তাদের বসতি স্থাপন করে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টে গড়ে তোলে নিজেদের আবাসস্থল। তৎকালীন সরকার রাখাইন সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওই সময় ৩ একর এবং তাদের নিজস্ব পল্লীব জন্যে ১২ একর করে সম্পত্তি প্রদান করেন। এখনও তাদের ঐতিহ্যবাহী কলাপাড়ায় বিদ্যমান আছে।


কুয়াকাটার নামকরণঃ তৎকালীন রাজা মং রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকদের সাগরের লবনাক্ত পানি যাতে ব্যবহার করতে না হয় সে লক্ষ্যে তিনি সমুদ্র সৈকতের কাছেই মিষ্টি পানি ব্যবহারের জন্য ২ টি "কুয়া" খনন করে। এ কুয়ার জন্যেই ওই এলাকার নাম হয় 'কুয়াকাটা'। পরে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকেরা কুয়াকাটাসহ খেপুপাড়া, কলাপাড়া, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী ও তালতলি এলাকার ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার করে নিজেদের পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও বসতি শুরু করে। পরবর্তীতে বৃটিশ সরকার এ সম্প্রদায়ের জায়গা-জমির উপর কর ধার্য্য করতে চাইলে তারা ওই কর দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এর দীর্ঘ সময় পর কালাউ মাদবার এবং খেপাউ মাদবার নামে দুই ভাই, দুই পাড়া প্রধান ছিল। তারা বৃটিশ সরকারকে কর দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। এদের নাম অনুসারেই নামকরণ হয় কলাপাড়া ও খেপুপাড়া। কেমন আছে রাখাইন সম্প্রদায়ঃ ওই সময় এ এলাকায় কোন বাঙ্গালীর পদচারণা ছিল না। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন "কেরানীপাড়া" হচ্ছে কুয়াকাটা এলাকা। বর্তমানে বিভিন্ন সময়, বিভিন্নভাবে তাদের চাষযোগ্য জমি- জমা বেহাত হয়ে গেছে। নিজেদের সংস্কৃতি ও কৃষ্টিতে হস্ত চালিত তাত শিল্পে কারুকার্য খচিত বিভিন্ন ধরনের পোষাক তৈরী করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে কোন মতে জীবন ধারণ করেছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাগর কন্যা কুয়াকাটার কোরানীপাড়া সংলগ্ন এলাকায় স্থাপন করা হয়, "কুয়াকাটা রাখাইন মহিলা মার্কেট" যাতে ওই রাখাইন সম্প্রদায়ের মহিলারা নিজেদের তৈরী পোষাক ও অন্যান্য দ্রব্যাদি বিক্রি করে সাবলম্বী হতে পারে। এছাড়া বসবাসের জন্য সরকারী উদ্দ্যেগে একাধিক টং ঘর তৈরী করে দেয়। কিভাবে আসবেন কুয়াকাটাঃ ঢাকা কিংবা যশোর থেকে সরাসরি বিআরটিসি, দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহনসহ একাধিক পরিবহনের গাড়ীতে গাবতলী কিংবা সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে কুয়াকাটায় আসতে পারবেন। এছাড়া যে কোন স্থান থেকে রেন্ট-এ-কার যোগেও আসতে পারেন। তবে বরিশালের পর সড়ক যোগে কুয়াকাটায় পৌঁছাতে আপনাকে দপদপিয়া, লেবুখালী, কলাপাড়া, হাজীপুর ও মহিপুরসহ ৫টি ফেরী পারাপার হতে হবে। তবে যে সকল পর্যটকরা ঢাকা থেকে নৌ পথে কুয়াকাটায় আসতে চান, তারা ২ টি ফেরীর দূর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন। ঢাকা সদরঘাট থেকে বিলাস বহুল ডাবল ডেকার এম.ভি পারাবত, এম.ভি সৈকত, এম.ভি সুন্দরবন, এম.ভি সম্পদ, এম.ভি প্রিন্স অব বরিশাল, এম.ভি পাতারহাট, এম.ভি উপকূল লঞ্চের কেবীনে উঠে সকালের মধ্যে পটুয়াখালী কিংবা কলাপাড়া নেমে রেন্ট-এ-কার যোগে এবং পটুয়াখালী-কুয়াকাটা রুটের বাসে চড়ে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা পৌঁছাতে পারেন। ঢাকা থেকে উল্লেখিত রুট সমূহের লঞ্চ গুলো বিকাল ৫ থেকে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে লঞ্চ ঘাট ত্যাগ করে থাকেন। কুয়াকাটায় আসার পরঃ কুয়াকাটা বেরী বাঁধ পেরিয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেই বাম দিকে ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। এরপরই কয়েক গজ দক্ষিণে "ফার্মস এন্ড ফার্মস" এর রয়েছে বিশাল নারিকেল বাগানসহ ফল ও ফুলের বাগান। এ বাগানের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট, এ পিকনিক স্পট পরিদর্শনের পরেই রয়েছে কাংখিত ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বিশাল সমুদ্র সৈকত। এ সৈকতের পূর্ব দিকে এগুলোই প্রথমে দেখা যাবে নারিকেল বাগান, সুন্দর আকৃতির ঝাউ বাগান। বন বিভাগের উদ্দ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ঝাউগাছ লাগিয়ে সমুদ্র সৈকতের শোভা বর্ধন করা হয়েছে। এ নারিকেল ও ঝাউবাগানের মধ্যেও রয়েছে পিকনিক স্পট যেখানে পর্যটকরা দল বেঁধে বনভোজনের অনাবিল আনন্দে নিজেদের একাকার করে তোলে। তার থেকে একটুই পূর্ব দিকে আগালেই চর-গঙ্গামতির লেক, সেখান থেকে একটু ভিতরে দিকে এগুলেই সৎসঙ্গের শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম ও মিশ্রীপাড়া বিশাল বৌদ্ধ বিহার। সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুপাড়ায় প্রতি বছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত জেলেরা প্রাকৃতির উপায়ে গড়ে তুলে শুটকী পল্লী। এ শুটকী পল্লীতে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে শুটকীতে রূপান্তরিত করে সারা দেশে সরবরাহ করে। কুয়াকাটায় থাকার ব্যবস্থাঃ কুয়াকাটায় আবাসন সংকট অবশ্য একটি অন্যতম সমস্যা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কুয়াকাটায় অবস্থিত দুই ডাক বাংলোর কক্ষ সংখ্যা বাড়িয়ে আধুনিক আবাসনে রূপান্তরিত করা এবং একই সময় স্থাপন করা হয় কুয়াকাটা সাগর কন্যা পর্যটন হলিডে হোমস। এলজিইডির রয়েছে দুটি, সড়ক ও জনপথের একটি, জেলা পরিষদের দুটি রাখাইন কালচার একাডেমীর একটি রেস্ট হাউস। এসকল স্থান জায়গা করে নিতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্ব অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে এ পর্যটন নগরীতে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় প্রায় অর্ধশতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল। এর মধ্যে আধুনিক মান সম্মত হোটেল গুলোর মধ্যে রয়েছে- হোটেল নীলঞ্জনা, হোটেল বি-ভিউ, হোটেল গোল্ডেন প্যারেজ, হোটেল বীচ-ভেলী, হোটেল ফ্যামিলী হোমস, কুয়াকাটা গেষ্ট হাউজ, হোটেল সাগর কন্যা, হোটেল আল হেরা, হোটেল আকন, হোটেল সি-গার্ডেন, হোটেল স্মৃতি সহ আরো একাধিক হোটেল ও মোটেল। কোথায় খাবেনঃ ঘরোয়া পরিবেশে মান সম্মত খাবারের জন্য হোটেল সেফার্ড, খাবার ঘর-১, খাবার ঘর-২, এসব খাবারের হোটেল গুলো আপনার আবাসিক হোটেলে খাবার সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া পর্যটন এলাকায় ছোট ছোট অনেক খাবারের হোটেল রয়েছে- কলাপাড়া হোটেল, হোটেল মান্নান, হোটেল বরিশাল ইত্যাদি। এসব হোটেলে কম খরচে মান সম্মত খাবার পাওয়া যায় ও সরবরাহ করা হয়। কিভাবে ঘুরবেনঃ সমুদ্র সৈকতে রয়েছে নানা রং-বেরং-এর কাপড় দিয়ে পরিপাটি করা কাঠের বেঞ্চি, যার উপরে রয়েছে নানা রঙের ছাতা পর্যটকরা এখানে এসে বিশ্রাম নিয়ে থাকেন। সমুদ্র উপকূলে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য রয়েছে- নববধু সাজে সজ্জিত সমুদ্র ভ্রমণকারী জাহাজ ও অসংখ্যা ট্রলার। এসব জাহাজ ও ট্রলারে উঠে পর্যটকরা সুন্দরবনের অংশ বিশেষ ফাতরার চর, সোনার চর, কটকা, হাঁসার চর, গঙ্গামতির লেক ও সুন্দরবন সহ গভীর সমুদ্রে বিচরণ করে অফুরস্ত আত্মতৃপ্তিতে নিজেদের ভরে তোলে। এজন্য নির্দিষ্ট হারে পরিবহন খরচ বহন করতে হয় পর্যটকদের। সমুদ্র ভ্রমণকারী এই জাহাজটিতে থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা রয়েছে। সমুদ্র সৈকতে রয়েছে অসংখ্য মটর বাইক ও ভ্যান, এই বাইকে চড়ে পর্যটকরা নিজেদের খেয়াল খুশি মাফিক সমুদ্র সৈকতসহ গোটা পর্যটন ভ্রমণ করতে পারবেন।
কুয়াকাটায় এত কিছু থাকার পরেও পর্যটকরা একবার এসে আর দ্বিতীয় আসতে চান না এবং তাদের বন্ধু-বান্ধবদের না আসার জন্য অনুপ্রাণীত করেন। কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটার ২২ কি.মি. রাস্তার চরম বেহাল দশা আর ৩টি ফেরীর ঝামেলার কারণে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে আনছেন। ঢাকা থেকে পর্যটক আব্দুল হালিম এসেছিলেন স্ত্রী কে সঙ্গে নিয়ে। তার সাথে কথা হলে, তিনি জানান, কুয়াকাটার সব কিছুই ভাল, কিন্তু কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটা যেতে আসতেই জীবন শেষ, এক ঘন্টার রাস্তা যেতে ৪ ঘন্টা সময় লাগে যায়। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MilonkarmakarRaju |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
মিলন কর্মকার রাজু
কলাপাড়া, বাংলাদেশ |
|