বুজুর্গ হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধাটি হলো ‘ওনাদের’ কাজকর্ম নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করে না। এমনই এক বুজুর্গ যার কাজকর্ম নিয়ে প্রশ্ন করার হিম্মত আশপাশে কারো নেই। তবে মিছরির ছুরি হুজুরের ছোট বিবি কিছুটা ‘আশকারা’ পেয়ে মাঝে মধ্যে দুয়েকটি প্রশ্ন করে বসেন।
বিবির প্রথম প্রশ্ন, আচ্ছা হুজুর, আমরা আপনার কিতাবগুলোতে হাত রাখলেই লাফিয়ে ওঠেন। অজু-গোসল ঠিক আছে কি না জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু আপনি নিজে দিব্যি আপনার পাছা (শব্দটি শুনে হুজুর চোখ গরম করলে সংশোধনী টানে) গোস্তাকি মাফ করবেন, বলতে চাচ্ছি, ইয়ে মানে, আপনার পাছা-মোবারক কিতাবের ওপর রেখে বসে পড়েন।
হুজুরের উত্তর, বেয়াদব মাইয়া মানুষ। আমি হলাম গিয়ে জ্ঞানের এক কিতাব। কাজেই এক কিতাবের ওপর অন্য কিতাব বসলে অসুবিধা কোথায়?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, আচ্ছা হুজুর, আপনি আমাদের কেবলামুখী হয়ে প্রস্রাব-পায়খানা করতে নিষেধ করেন। কিন্তু ওইদিন সন্ধ্যায় দেখলাম, আপনি নিজেই পশ্চিমমুখী হয়ে প্রস্রাব করতে বসে পড়লেন। গরজে পড়লে দেখি আপনার সব কিছু হালাল হয়ে যায়। আর সব কিছু হারাম থাকে শুধু আমাদের বেলায়।
হুজুরের উত্তর, এই ব্যাপারে পুরুষদের কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে। কম-আক্কেল মাইয়া মানুষ, তা তোমরা বুঝতে পারবে না। কাজেই বেয়াদব ও কম আক্কেল সম্পন্ন জনগণ বুজুর্গদের ব্যাপার-স্যাপার কখনোই ধরতে পারে না। বুজুর্গরা ভেতর থেকে অনেক কিছু ঘুরাইয়া দেয়ার কেরামতি জানেন।
এক বুজুর্গ ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে দস্তখত করেননি। তিনি এখন ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনরুদ্ধার কমিটির মস্ত বড় বুজুর্গ। অর্থাৎ তিনি এখন বুজুর্গানে সংবিধান। ১৯৭২ সালের সংবিধানের নিরিখে এই বুজুর্গের মুখটি ঘুরানো ছিল স্পষ্টভাবে হারামদিকে। এখন কোনো কব্জা নাড়িয়ে হালালমুখী করে ফেললেন সেটাও ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হয়ে গেথে রয়েছে জনগণের মনে।
একই কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে। ১৯৯৪-৯৫ সালে এই সুরঞ্জিত চিবিয়ে চিবিয়ে অনেক কথা বলেছেন। জনগণকে বোঝানো হয়েছিল বৃহত্তর কল্যাণের জন্য লাগাতার হরতালের কিছু যন্ত্রণা সহ্য করা দরকার। তখন তাদের অন্যতম সঙ্গী ছিল জামায়াতে ইসলামী। দেখা গেল, জামায়াত এই বুজুর্গদের সঙ্গে রাজনীতি করলে হালাল হয়ে যায়। কিন্তু অন্যের সঙ্গে একই রাজনীতি করলে তা হারাম হয়ে পড়ে। এভাবে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি আনা হলো। এখন এই বুজুর্গ-দের মুখ পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরানো। তত্ত্বাবধায়ক সরকার এখন পুরো হারাম হয়ে পড়েছে! হায় সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ।
সত্য কথা বলতে কি, সংবিধানের প্রতি সাধারণ মানুষের যে সমীহ ও সম্মান রয়েছে, এই বুজুর্গদের তার কানাকড়িও নেই। এই সংবিধান, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে দেশের মানুষ সামান্য ভুল করলে বা ভুলভাবে কখনো হাতটি রাখলে এই বুজুর্গরা লাফিয়ে ওঠেন। কিন্তু বুজুর্গান সংবিধানের ওপর তাদের ‘পাছা-মোবারক’ রেখে অবলীলায় বসে পড়তে পারেন। সংবিধানকে চূর্ণ-বিচূর্ণ, দলিত-মথিত করতে তাদের কঠিন অন্তরটি একটুও কাপে না। সংবিধানকে নিয়ে এমনভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার ধারাটির শুরু সর্বনাশা ১/১১ থেকে। ডকট্রিন অব নেসেসিটির তত্ত্ব দিয়ে এই সর্বনাশা প্রবণতাটি শুরু। শেষটি কোথায় এখনো জানা নেই।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে দেশের মানুষের মতামত নেওয়ার কৌশলটিও চমকপ্রদ। তারা সাবেক বিচারপতি, আইনজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, পত্রিকা সম্পাদকদের মতামত নিয়ে ফেলেছেন। অর্থাৎ তারা বিয়ের ব্যাপারে কনের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা-মামি, চাচা-চাচিসহ আশপাশের সকলের কবুল আদায় করে ফেলেছেন। তবে এই কবুলের মূল মালিক যে কনে তার অর্থাৎ বৃহত্তর জনগোষ্ঠির প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলের মতামতের তোয়াক্কা করা হয় নাই। সংবিধানের এমন বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য গণভোটের বাধ্যবাধকতাটিও বিশেষ কৌশলে তুলে দেয়া হয়েছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও প্রথমে আদালতের কাঁধে বন্দুকটি রাখা হয়েছে সম্ভবত এই মতলবে। জনগণের জন্যই যে সংবিধান তার সংশোধনী নিয়ে জনগণের কাছে যেতেই এই বুজুর্গদের যতো ভয়।
বিশেষ বিবেচনায় বাছাইকৃত এই কনের চাচা-মামা, দাদা-নানা হিসেবে যাদের ডাকা হয়েছিল তাদের মতামতেরও বিশেষ তোয়াক্কা করা হয়নি। তাদের অধিকাংশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি অটুট রাখার কথা বললেও তা না রাখার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে সরকার।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বর্তমান বিরোধী দলটি এই জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমপক্ষে আরো দুই-দুবার পেয়েছে। ধারনা করতে অসুবিধা নেই, এই ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বর্তমান বিরোধী দলগুলো ভবিষ্যতে আরো অনেকবার পাবে। কাজেই স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সরকার একতরফা ভাবে সংবিধান সংশোধনের নামে বানরের তৈলাক্ত বাশে উঠার যে মারাত্মক খেলা শুরু করতে যাচ্ছে তাতে সামনের ৪০ দুগুণে ৮০ বছর একই চক্রে এ জাতিকে ঘুরপাক খেতে হবে। এই আত্মঘাতী প্রবণতা রোধ করতে জাতির বিবেকদের এগিয়ে আসা উচিত ছিল, দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তা দেখা যায়নি।
আমরা সংবিধান সংশোধনের বিরোধী নই। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তা পরিবর্তন করা যাবে না। অবশ্যি করা যাবে। কিন্তু তা করতে হবে জনগণের চাহিদা ও প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে। বর্তমানের এই সংশোধনীতে জাতির কোনো কল্যাণ নেই। শুধু আওয়ামী লীগকে কিভাবে আজীবন ক্ষমতায় রাখা যায় তার নিমিত্তেই মূলত এই সংশোধনী।
এ জন্য ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বড় অবদানটি রেখেছেন সাবেক বিচারপতি খায়রুল হক। সম্প্রতি বিশ্বে দুটি গায়েবানা আয়োজন আলোচনায় এসেছে। একটি লাদেনের গায়েবানা জানাজা, অন্যটি বার অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক বিচারপতি খায়রুল হকের গায়েবানা সংবর্ধনা। কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিতে পারিয়াছিল যে সে আগে মরে নাই। কিন্তু লাদেন মরিয়াও প্রমাণ করিতে পারিল না যে সে মরেছে। আর বিচারপতি খায়রুল হক শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য ভঙ্গ করে সংবর্ধনা থেকে নিজের জিন্দা লাশটি গায়েব করেও নিজের সকল আমলনামা গায়েব রাখতে পারলেন না।
বিদায়লগ্নে আইনমন্ত্রীর সাথে তার প্রীতি-বাহাসটিও ছিল লক্ষ্য করার মতো। টক দইগুলো জনগণকে গেলানোর অনেক পর আইনের গোয়ালা আইনমন্ত্রীর ওপর এক প্রস্থ গোস্বা ঝাড়লেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ (!) এই বিচারপতি। অন্যান্য সুশীলের মতো কথা দিয়েই চিড়া ভিজিয়ে গিয়েছেন। আইনমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, হাত-পা বেঁধে তাদের সাঁতার কাটার জন্য ছাড়া হয়েছিল। তবে সাঁতার কাটতে এই সাঁতারুর যে খুব বেশি কষ্ট হচ্ছিল এমন কখনোই মনে হয় নাই। শেখ হাসিনা কিংবা তার বোন শেখ রেহানাকে প্রধান বিচারপতির আসনটিতে বসিয়ে দিলে এমনভাবে দুই কান বন্ধ করে আওয়ামী লীগের পক্ষে এসব রায় লিখতে পারতো কি না সন্দেহ রয়েছে।
হাত পা-বাঁধা এই জাদুকরী সাঁতারুর আরামদায়ক সাঁতার জাতিকে মহা সর্বনাশের দিকে টেনে নিয়েছে। তার রায়ে জাতির প্রায় সব কিছু অবৈধ হয়ে পড়েছে। আগে জানা ছিল যে শুধু রাজনৈতিক রজ্জু দিয়ে এই সাঁতারুর হাতপাটি বাঁধা হয়েছিল। এখন জানা গেল, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের দশ লাখ টাকার মতো অর্থনৈতিক রজ্জুও এই বাঁধনের কাজটিতে ব্যবহৃত হয়েছিল। বিচারপতি কেএম হাসান, বিচারপতি এমএ আজিজের পেশাগত জীবনে নিরপেক্ষতা কিংবা নৈতিকতা ভঙ্গের এমন কোনো রেকর্ড ছিল না। তবে তাদের মনের কোণে বিএনপির প্রতি দরদ টের পেয়ে জমের মতো লেগেছিল সুশীল সমাজ। অতীতের কোনো অপরাধের জন্য নয়, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য অপরাধের কারণে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল স্বল্পবাক এই দুজন বিচারপতিকে। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হক আদালতের নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঠেকালেও সেই সুশীল সমাজ আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ মেরে রয়েছেন।
পঞ্চম, সপ্তম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী নিয়ে তিনি অনেক কথা বললেও বাকশাল সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে একটা কথাও বলেননি। দুজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে তাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়। আবার পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে তার নিয়োগ ঠিক রাখতে গিয়ে বিচারপতি শাহ নঈমকে ডিঙিয়ে বেশ জুনিয়র একজন বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কারণ বিচারপতি নঈম আগামী নভেম্বরে স্বাভাবিক নিয়মে অবসরে গেলে তিনিই হতেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান।
জাতি হিসেবে আমরা সত্যি দুর্ভাগা। বিভিন্ন জগতে এ রকম অনেক বুজুর্গ সৃষ্টি করলেও জাতির অভিভাবক বা বিবেক সৃষ্টি করতে পারিনি। নিজের একটি ভুল কথা বা মতামতের জন্যে যদি একটি ক্ষতিকর পদ্ধতি বা ধারা টিকে যায় বা জাতি অশুভ চক্রে ঘুরপাক খেতে থাকে তাহলে তার দায় তো নিজের ওপরও পড়বে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জাতির অভিশাপ নিজের আত্মার ওপর বর্ষিত হতে থাকবে। জাতির বিবেক হিসেবে যাদের হাজির করানো হচ্ছে তাদের বিবেকের এই দংশন নামক ফাংশনটি আদৌ কার্যকর রয়েছে কি না তা নিয়ে সত্যিই সংশয় দেখা দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ আজ আওয়ামী লীগারদের হাতে নেই। যাদের হাতে পড়েছে তাদের নিয়ে জাতির অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। স্বাধীনতার পর পর গণবাহিনী সৃষ্টি করে তখনকার সরকার ও সেনাবাহিনীকে তছনছ করে তুলে এই বামদের এক অংশ। অন্য অংশ সরকারের মাথায় চড়াও হয়ে বাকশাল সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা জোগায় অর্থাৎ একদল সাজে সাপ আর অন্য দল সাজে ওঝা। ফল আমরা সবাই জানি। দেশের দুই-দুজন প্রেসিডেন্টের নির্মম হত্যাকান্ডে মদদ দেয়ার জন্য পেছনের ব্রেইনটি ছিল মূলত এরাই। আওয়ামী লীগ নিজে সমাজতন্ত্রকে ডিভোর্স দিলেও এই বুজুর্গদের চাপে জাতিকে সেই ভ্রষ্টা নারীটিকেই ঘরে তুলতে হচ্ছে। মস্কো ও পিকিংয়ের দিকে ফেরানো বুজুর্গদের মুখটি আজ কি করে ওয়াশিংটনের দিকে ঘুরে গেল সেটাও আজ বড় প্রশ্ন।
এক বৃটিশ মেম বাঙালি সিপাহিকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়া চালানোর প্র্যাকটিসে যায়। আচমকা বাতাসে মেমসাহেবার স্কার্টটি উল্টে যায়। লজ্জা কাটাতে মেমসাহেব তড়িঘড়ি বলে ফেলে, দেখলে তো, কেমন আমার এজিলিটি (ক্ষীপ্রতা)? সিপাহি মাথা চুলকায়, সে তো দেখেছে অন্য কিছু। কিন্তু মেম যে বলছেন এজিলিটি! মেমের এজিলিটি নিয়ে এই সুশীল (ভদ্র) সিপাহি আর বাংলাদেশের সেকুলারিটি নিয়ে সুশীল সমাজ পড়েছে একই চক্করে। দেখে বা বুঝে একটা, বলতে হয় অন্যটা।
বাংলা বুঝতে অক্ষম পশ্চিমা সেকুলারদের বোঝানো হয় তারাই হলো মূল সেকুলার শক্তি। এভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার পুরো অবয়বটিতে প্রতারণা আর স্ববিরোধীতায় পরিপূর্ণ। মুখে বলা হয়, সকল ধর্ম পালনের অবাধ অধিকার নিশ্চিত। কিন্তু বাস্তব চর্চাটি হলো ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে দাড়ি-টুপি-হেজাব দেখলেই ধুমছে পেটানো। ধর্মনিরপেক্ষ এই পিটুনির ন্যায্য শেয়ার কখনোই অন্যরা পায় না। নাটক, সিনেমায় দাড়ি-টুপিওয়ালা ভিলেইনই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যায্য শেয়ার হিসেবে গেরুয়া রঙের ভিলেইন তেমন দেখা যায় না। কার্টুনে রাক্ষসের মাথায় টুপি ও কপালে ক্রিসেন্টই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। কুকুরের মাথায় টুপি দিয়ে ছবি তোলার নামই হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থাৎ এই সিপাহির মতো আমরা দেখি অন্য কিছু। মেমসাহেবের শেখানো কথা মতো বলি এজিলিটি।
দেশের গণতন্ত্র ও আমাদের অস্তিত্বের সকল শেকড়গুলো আবারও সেই বাকশালের কব্জায় পড়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজেই ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠরা কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করে। আর্কিটেকচারাল স্থাপত্যে বা মেকানিকেল ডিজাইনে সুযোগ পেলেই ক্রসটি একে ফেলা হয়। জাহাজের নেভিগেশন লাইট তুলে ধরার স্থাপনাটির নাম দেয়া হয়েছে কৃসমাস ট্রি। সারা পৃথিবী কৃশ্চিয়ান জগতের টেকনোলজিকেল আধিপত্যের এ চিহ্নটিকে সহজভাবে মেনে নিয়েছে। অধর্মের এই সেক্টরে অনেক বড় কমান্ডার অবস্থান করলেও ধর্মের এই চিহ্ন তাদের গায়ে জ্বালা সৃষ্টি করে না। পৃথিবীকে যে বৃটেন বর্তমান সভ্যতা উপহার দিয়েছে সেই দেশের রাজতন্ত্র হলো সেখানকার প্রটেস্ট্যান্ট ধর্মের বড় রক্ষক। ব্লাসফেমি আইনটি করা হয়েছে শুধু জেসাস বা কৃশ্চিয়ান ধর্মকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য। আমেরিকার ডলারে যে গডের ওপর আস্থার কথা বলা হয়েছে তার স্পষ্ট খৃস্টীয় গন্ধ রয়েছে। কৃশ্চিয়ান সেই গড-কে ধর্মনিরপেক্ষ ‘ক্রিয়েটর’ দিয়ে প্রতিস্থাপনের দাবি উঠছে না। এ জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মনের পীড়ায় ভুগছে না। নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করছে না।
পৃথিবীর মধ্যে আমরা হলাম সবচেয়ে হতভাগা সংখ্যাগরিষ্ঠ-এর জাতি। সভ্য দুনিয়ায় ধার্যকৃত সংখ্যা গরিষ্ঠের স্বাচ্ছন্দটুকুও আমাদের জন্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আমাদের এই বোধ ও চাওয়াটিকে বিভিন্ন ভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলে। সেকুলার স্পিরিটে আমাদের বোধ বিশ্বাসের গোড়াটি কাটা হয়। আবার ধর্মনিরপেক্ষতা নাম দিয়ে তার আগায় পানি ঢালা হয়।
আওয়ামী লীগের মধ্যেও এ জাতীয় পীড়নে পীড়িত মানুষের অভাব নেই। সারা জীবন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ করলেও শেষ জীবনে তাবলিগ না করে অনেকেই কবরে পা রাখতে চান না। এরা সবাই শেকড় ছিন্ন হাই ব্রীড এ নেতাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আগের ভুলের জন্য ২১ বছর পর ক্ষমা চেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এখন আবারও সেই একই ভুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা শুধু আওয়ামী লীগকেই নয়, দেশকেও চরম সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
কাজেই আমাদের সজাগ হওয়া দরকার। ইস্পাত সদৃশ্য ঐক্য দরকার। যে যেখানে আছি সেখান থেকেই কাজে লেগে যেতে হবে। বিভিন্ন খুদকুড়া ছিটিয়ে এরা মিডিয়ার ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। বিশেষ মতলবে জাতি নামে কনের মনের কথাগুলি বলার জন্যে দাদা-দাদি, মামা-মামি, নানা-নানিদের সৃষ্টি করেছে। এদের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোর মধ্যে অনৈক্য এবং ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন হতাশা ছড়িয়েছে।
কাজেই সেই একই প্রক্রিয়ায় তাদের মোকাবেলা সম্ভব নয়। বরং নতুন কিছু কৌশলে এগোতে হবে। সত্যের একটা নিজস্ব শক্তি রয়েছে। এখানে ফর্মুলাটি হলো E = mc2. c হলো সত্যের বেগ আর m হলো কতোটুকু ভর নিয়ে প্রকাশ করা হলো তা। প্রপাগান্ডার ভর বেশি, বেগ কম। তাই সত্যকে নিয়ে সামান্য প্রচেষ্টা মিথ্যাকে নিয়ে বড় বড় পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে পারে। মধ্য প্রাচ্যে সেই প্রমাণ আমরা দেখেছি।
পুরো জাতিকে আহ্বান জানানোর নৈতিক অথরিটি বা ক্যাপাসিটি কোনোটিই এই অধমের নেই। তারপরও চুপ থাকা সম্ভব হচ্ছে না। যে কোনো জায়গায় থাকুন না কেন, সকল জড়তা কাটিয়ে মুখ খুলুন। প্রতিটি স্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করুন। যতো পটুই হোক না কেন, নৈতিক ভাবে দুর্বল কোনো বিষয় নিয়ে কেউ বেশি দূর এগোতে পারে না।
একপেশে বক্তব্যের জন্য কিংবা যেখানে সরব হওয়া দরকার সেখানে নীরবতার জন্যে সাংবাদিক, টক শো সঞ্চালক, কলামিস্ট, সম্পাদকদের ফোন করুন, চিঠি লিখুন, এসএমএস পাঠান, ইমেইল পাঠান। কোনো একটি লেখা বা বক্তব্য পছন্দ হলে তা বিভিন্ন ব্লগে ছড়িয়ে দিন। ফেসবুক, টুইটার, এসএমএস প্রভৃতি মাধ্যমগুলো যথাসম্ভব কাজে লাগান। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের তা দেখতে ও পড়তে উৎসাহিত করুন। পকেটের কিছু টাকা খরচ করে গুরুত্বপূর্ণ লেখা কপি করে ছড়িয়ে দিন। এই খাতে খরচ হওয়া আপনার ৫০টি টাকা অশুভ শক্তির ৫০০ কোটি টাকার পরিকল্পনাকে ভন্ডুল করে দিতে পারে।
কারন কোনো দলের পক্ষে নয়। আপনি দাড়াচ্ছেন আপনার প্রিয় দেশটির গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পক্ষে। আপনি দাঁড়াচ্ছেন, আপনার বাপ-দাদার বোধ ও বিশ্বাসের পক্ষে। আপনি দাঁড়াচ্ছেন ১৬ কোটি মানুষ এবং আগত সকল প্রজন্মের জীবন, মান ও সম্পদ রক্ষার জন্য। কাজেই আপনার বেগ অগণনীয়, অপ্রতিরোধ্য। এর সামনে অন্য কিছু টিকতে পারবে না।
এখন দরকার শুধু নিজের এই শক্তিটুকুর সম্যক উপলব্ধি।
minarrashid@yahoo.com
[সূত্র: মাসিক ধানের শীষ, মে ২০১১ সংখ্যা] |
চুপ থাকবে না কেন? খায়রুল হক যেমন জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাগ্রহন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়ার কিছুদিন পরই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল হতে ১০লাখ টাকা বখশিস পেয়েছে, এই তথাকথিত সুশীল সমাজের সদস্যরাও তেমনি দেশের ভিতর-বাহির দুদিক হতেই এরকম বখশিস পেয়ে বেঁচে বর্তে আছে। এদের আয়ের উৎস কি যে এত হাঁক-ডাক করে গোলটেবিল (করে চারকোনা টেবিল বৈঠক, নাম দেয় গোল টেবিল বৈঠক) বৈঠক করে?