|
খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ: আইএসপিআর এবং সরকারের ভুমিকা
মিনহাজ আল হেলাল |
|
গত শনিবার খালেদা জিয়াকে তার ক্যন্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় অবশ্য অবাক হওয়ার তেমন কিছুই আমার চোখে পড়ে নি। দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার এই একই প্রক্রিয়ায় অগনিত মানুষকে নানান জায়গা থেকে খোড়া এবং অগ্রহনযোগ্য অজুহাতে উচ্ছেদ করে থাকে। সেই হিসেবে আমি অন্য ঘটনাগুলোর মতই এটিকে একটি অস্বাভাবিক এবং অমানবিক ঘটনার মতই মনে করি।
খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ থেকে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে তাতে আমি আশ্চর্য হয়েছি। দেশের সংবিধান সকল নাগরিকের জন্যই সমঅধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু আরও অনেক লোককে যখন সকল বৈধ কাগজপত্র থাকার পরেও নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, তখন সরকার একই প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিলেও তাদের জন্য কোন রাজনৈতিক দল হরতাল তো দুরের কথা সামান্যতম দুঃখপ্রকাশ করেছে বলেও শোনা যায় নি। অথচ খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাচিলের উদ্দেশ্যে ঈদের সময়ে হরতাল দিয়ে জনগনকে চরম দুর্ভোগের মধ্য ফেলে দেওয়া হয়েছে। একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত ব্যাপারকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে জাতীয় ইস্যুতে পরিনত করা হয়েছে। এই মামুলি একটা ব্যাপার নিয়ে সরকার যেভাবে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছে, বিরোধীদল তেমনি এটিকে নিয়ে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করেছে।
খালেদা জিয়াকে যেভাবে টেনে হিচঁড়ে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে একজন সাধারন মানুষ হিসেবে আমার মত আরও অনেকেই ব্যথিত হয়েছে। খালেদা জিয়াকে এভাবে নাজেহাল করা অনুচিৎ হয়েছে বলেই মনে করি। এতে সাধারন মানুষের অনেক সহানুভূতিও পেয়েছেন তিনি। তবে আজ থেকে দশ বছর আগে যখন খালেদা জিয়ার বাড়ি নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল, তারপর যেকোন সুবিধাজনক সময়ে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে দিলে উনি সাধারন মানুষের আরও বেশি ভালবাসা পেতে পারতেন। বাড়ি না ছাড়ার কারনে ওনাকে অবশ্য দোষারোপ করার কোন সুযোগ নেই। ভিক্ষা দিয়ে, দান করে অথবা করুনা করে সেটা ফেরৎ চাওয়া কোন মানবিকতার পর্যায়েই পড়ে না। কাউকে কোন টাকা পয়সা বা ধন-সম্পদ দান করা হলে সেটার মালিকানা আর দানকারীর থাকে না। খালেদা জিয়া নিজে জোর করে এই বাড়ি লিখে নেন নি, দেশ গঠনে স্বামীর অপরিসীম অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি এরকম কোন সম্পদ দাবী করেছেন বলেও বিতর্ক ওঠে নি। সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একজন কথিত রাজনীতিবিদ (তৎকালীন স্বৈরশাসক) মানবিক দিক বিবেচনা করেই ওনাকে বাড়িটি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিলেন। বাড়ির মালিকানাসংক্রান্ত সকল বৈধ কাগজপত্রও ওনার মজুদ ছিল।
খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়া করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল দানবের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছিল। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে অসংখ্যবার খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়া করার মজবুত পরিকল্পনা করা হয়। এ উদ্দেশ্যে তারা বারবার নানা রকম অমূলক কথারও সূত্রপাত করেছেন। খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করতে বাড়িটিকে রাষ্ট্রের সম্পদ বলে সরকারের পক্ষ থেকে যেকথার অবতারনা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ বিবেকবর্জিত এবং অগ্রহনযোগ্য। দেশের সকল সম্পদের মালিকানাই রাষ্ট্রের। আর জনগন রাষ্ট্রকে খাজনা দিয়ে এই সম্পদ ভোগ করে থাকে। মাঝে মধ্যে সেনাবাহিনীর জায়গায় বেসামরিক লোকের বসবাস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সরকারের দ্বায়িত্বশীল মহল। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজে একাধিকবার খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করে পিলখানায় নিহত অফিসারদের পরিবারগুলোর পূনর্বাসন করতে একই জায়গায় ফ্লাট নির্মানের ঘোষনা দিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করার পরেও তিনি একই কথা বলেছেন। মৃত সেনা অফিসারদের পরিবারগুলো কি তাহলে সামরিক? অর্থাৎ সরকারের লক্ষ্য রাষ্ট্র, সামরিক বা বেসামরিক নয়, তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল যেকোন উপায়ে খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া।
খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে একাধিক মন্ত্রী এবং এ্যাটর্নি জেনারেল সরকারের সংশলিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। তারা এটাকে সম্পূর্ণ আইনী প্রক্রিয়া এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের নিজস্ব ব্যাপার বলে চালিয়ে দিয়েছেন। অথচ এই হাসিনা সরকারই তাদের পূর্ববর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে সরকারী বাড়ি লিখে দিতে না পেরে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে লেগেছিল বাড়ি ছাড়া করতে। আপীল বিভাগ কর্তৃক ধার্যকৃত শুনানীর দিন ২৯ নভেম্বর পর্যন্তও অপেক্ষা না করে এ্যাটর্নি জেনারেল ১২ তারিখের মধ্যেই খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়তে হবে বলে জোরালো যুক্তি পেশ করলেন। রায়কে প্রভাবিত করতে ২৯ তারিখ পর্যন্ত শুনানীর অপেক্ষা না করে আপীল বিভাগের আগে সরকারই মামলার রায় দিয়ে দিয়েছে। শুনানীর আগেই যদি রায় বাস্তবায়ন হয়ে যায়, তাহলে আর শুনানীর কি প্রয়োজন? সরকারের ইচ্ছা না থাকলে আইএসপিআর এর পক্ষে কখনই খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করার সাহস হত না এটা আমি হলপ করে বলতে পারি। নিজেদের সুপ্ত বাসনা পূরণ সাপেক্ষে খালেদা জিয়ার চরিত্র হনন করতে সরকার আইএসপিআরকে ব্যবহার করেছে। খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করতে যাওয়া এক কর্মকর্তা বলেছিলেন' "ম্যাডাম আমরা অসহায়"। সরকার কর্তৃক আইএসপিআর ব্যাবহৃত হয়েছে সেটা বুঝার জন্য ওই কর্মকর্তার এই কথাটি কি যথেষ্ট নয়?
ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক আইএসপিআর এর উচ্ছেদ পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী ভূমিকা রহস্যজনক। তারা উচ্ছেদের আগে ও পরে ভয়ানক মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। প্রথমে খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে যাবেন বলে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়। পরবর্তীতে বলা হয় তাদের ধারনা হয়েছে খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারেন। খালেদা জিয়া বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে বলা হয় পুরো বাড়িটি ছিলগালা করা হয়েছে। অথচ পরেরদিন কয়েক বোতল মদ আর কয়েকটি পর্নো ম্যাগাজিন খালেদা জিয়ার শোয়ার ঘরে রেখে নাটক সাজিয়ে সাংবাদিকদের দাওয়াত করা হয় সেই নাটক উপভোগ করার জন্য। এতদিন বিভিন্ন সরকার এই ধরনের নাটকের পরিচালক ছিলেন। আইএসপিআরও যে এরকম নাটক পরচালনা করতে পারে সেটা হয়ত আমার মত অবুঝ লোকের কল্পনার বাইরে ছিল। আইএসপিআর এর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল খালেদা জিয়া যাওয়ার সময় কয়েকটি কার্টুন এবং ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন। খালেদা জিয়া কি এতই বোকা সবকিছু ব্যাগ ভরে নিয়ে গেলেন আর মদের বোতল আর পর্নো ম্যাগাজিন রেখে গেলেন? সরকার আর আইএসপিআর এর নব্য বুদ্ধীজীদের বুঝা উচিৎ এরকম ঘটনা ইবলিস শয়তানকে বললেও বিশ্বাস করবে না যে খালেদা জিয়া বাসায় মদের বোতল পাওয়া গেছে। সাধারন মানুষের সাথে ধোকাবাজি করে আর ক্ষমতা ব্যাবহার করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা যায়, কিন্তু এটা সেটা বুঝিয়ে মানুষকে সন্তুষ্ট করা যায় না।
আইএসপিআর এর কর্মকান্ডে প্রশ্ন সৃষ্টি হয় ছিলগালা করার পরেও কোন উদ্দেশ্যে কার নির্দেশে শুধুমাত্র খালেদা জিয়ার শোয়ার ঘরে সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হল? উচ্ছেদ করার সময় কেন সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া হল না? কেন বাড়ি সংক্রান্ত আইনি বিষয় বাদ দিয়ে খালেদার জিয়ার ব্যাক্তিগত জীবন যাপন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা হল? খালেদা জিয়াকে বাড়ি ছাড়া করতে মদের বোতল আর পর্নো ম্যাগাজিনের প্রয়োজনীয়তা কি ছিল? খালেদা জিয়াকে কি মদের বোতল আর পর্নো ম্যাগাজিন রাখার অপরাধে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল? খালেদা জিয়া উচ্ছেদকারীদের হুমকি দিলেন আর কেন তারা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা তো দূরে থাক জিডি পর্যন্ত করলেন না? এই প্রশ্নেগুলোর উত্তর পেতে আরও সাড়ে তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে।
লেখক: হাগা-হেলিয়া ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস, হেলসিংকি
ই-মেইল: minhaj6ukl@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MinhajulIslamUkil |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
চালিয়ে যান। এটাও একপ্রকার জিহাদ।