|
ভূতাবিষ্ট সৌজন্য, বিদ্যুৎ ও পানি
মোহাম্মদ আসাফ উদ্দৌলাহ |
|
মানুষের ইতিহাসে অসভ্যতা সভ্যতার চেয়ে অনেক বেশি প্রাচীন। একে অতিক্রম করে আসতে সভ্যতাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক পরাক্রান্ত স্বেচ্ছাচার, অন্যকে অপমান করার অদম্য বাসনা, অবন্ধুর আত্মম্ভরিতার পর্বতমালা আর ক্ষমতার দুরন্ত ব্যাধি। সত্যিকার অর্থে, সভ্যতা এখনো বর্বরতার সাথে লিপ্ত রয়েছে নিয়ত সংগ্রামে এবং সেখানে এই একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দশকেও সভ্যতা বারবার আত্মসমর্পণ করে চলেছে অসভ্যতার বুটের তলায়।
অসভ্যতার উৎস ক্ষমতায়। যে শক্তিধর অসভ্য হওয়ার অধিকার তারই। ক্ষমতাটুকু কেড়ে নিলেই অসভ্যরা হয়ে যায় ভীষণ বিনয়ী ও ভদ্র। কেননা তখন সে উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন। অসভ্যতার সব থেকে বড় অর্জন অন্যকে আঘাত দিতে পারা, কষ্ট দিতে পারা। অথচ সভ্য আচরণের অর্থ কখনোই দুর্বলতা প্রকাশ হতে পারে না। সভ্য থেকেও কঠিন হওয়া যায়।
বিদ্যুতের অসহনীয় বিভ্রাট সম্বন্ধে লোকে কথা বলতেও ভয় পায়। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘বিদ্যুৎ নিয়ে যারা সমালোচনা করবে তাদের বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে।’ তারপর তিনি আবার ধমক দিলেন এই বলে যে, দশ দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখলে সব মুখ বন্ধ হবে। তিনি আরো বললেন, ‘যারা বিদ্যুতের উৎপাদন দেখে না তাদের সমালোচনার কারণে মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমরা যে তিন হাজার তিন শ’ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছি তা বন্ধ করে দিই। তারপর দেখি কী হয়?’ এ যেন মানুষকে কষ্ট দিয়ে পরিতৃপ্তি পাওয়া। এ ধরনের বক্তব্যকে নিষ্ঠুরাচরণের প্রবৃত্তিদায়ক এক প্রকারের বিকৃতি বলে অভিহিত করলে খুব একটা ভুল হবে না। অথচ আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা আয়ত্তে না থাকলে প্রধানমন্ত্রী কখনোই জনগণের উদ্দেশে এ ধরনের বক্তব্য রাখবেন না। জনমানুষকে উপহাস করে কথা বলার এখতিয়ার আপনাকে তো কেউ দেয়নি।
বর্তমান সরকারকে মানুষ ভোট দিয়েছিল কি না তা নিয়ে প্রদোষে কথা রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের বিগত নির্বাচনকালে তখনকার সাধারণ সম্পাদক গত বছর লন্ডনে থাকাকালীন উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন এক অসাধারণ কথা। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনকালীন সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারের সাথে এক গোপন আঁতাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনটি যে কারচুপির এক নির্বাচন ছিল তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না যখন বিজয়ী দলের সাধারণ সম্পাদক এই বিবৃতি প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ ঘোষণা করল, আবদুল জলিলের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে। অথচ তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ একজন সংসদ সদস্য ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মরত চেয়ারম্যান। সম্প্রতি দি ইকোনমিস্ট নামের বিশ্বের শীর্ষ একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকে বলা হয়েছে, ভারতের কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে এবং নির্বাচনকালীন সরকারের সমর্থন পেয়ে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয় ২০০৮ সালে। এর জবাবে আওয়ামী লীগ দি ইকোনমিস্টকে পাগল বলেনি, তবে বলেছে দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা টাকা খেয়ে ছেপেছে। তারা আরো বলেছেন, বিএনপি নিজেদের খরচে বিজ্ঞাপন হিসেবে ওই খবর ছেপেছে। বিজ্ঞাপনকে কখনোই নিউজ হিসেবে কোনো কাগজই ছাপবে না এমনকি বাংলাদেশেও না।
তিন হাজার ৩০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যদি উৎপাদিত ও জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালিত হয়ে থাকে, তাহলে তা গেল কোথায়? ঘনঘন লোডশেডিংয়ের জন্যই মানুষ আজকে এ প্রশ্ন করছে। বিদ্যুৎ তো হীরা, জহরত নয় যে পকেটে বা ব্যাগে বা সিন্দুকে লুকিয়ে রাখবে কেউ। তার ওপর দফায় দফায় বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। দামও বেশি দেবো আবার লোডশেডিংও সহ্য করতে হবে। এই দুই ব্যর্থতা তো মানুষ সহ্য করবে না। তার ওপরে খাবার পানি ও নদীর পানিসঙ্কট। বিদ্যুৎ ছাড়া অমানুষিকভাবে হলেও বাঁচতে পারে মানুষ। কিন্তু পানির অপর নাম তো জীবন। আর সেই থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ। নদীগুলো শুকনো মওসুমে পানিহীন, স্রোতহীন, কর্দমাক্ত। স্রোতহীন হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় লবণাক্ত সমুদ্রের বিষদুষ্ট পানি অনায়াসে প্রবেশ করে গভীর অভ্যন্তরে।
১৯৪৭ সালে বিবেকহীন র্যাডকিফ এমনভাবে ভাগ করলেন বাংলাকে যে সবগুলো নদীর উৎস পেল ভারত আর সমুদ্রের কাছাকাছি নিম্নাংশ পেল বাংলাদেশ। সে জন্য বাংলাদেশ অদ্যাবধি একটি সমন্বিত ভবিষ্যৎ পানিসম্পদ নীতি গ্রহণ করতে পারল না, যেহেতু নদী থেকে পানি প্রাপ্তির পরিমাণ শঙ্কা ও দ্বিধায় রইল বন্দী। ভাটির দেশটি রয়ে গেল উজান দেশের অনুকম্পায়। পেশিবল দিয়ে আর স্বাধীনতাকালে সাহায্যের সেই ঋণের বোঝা নিয়ে মাথা উঁচু করে সুবিচার চাওয়ার অধিকারও হারালো বাংলাদেশ। অথচ ‘হারমন ডকট্রিন’-এর মতো কুখ্যাত নীতি থেকে পৃথিবী বেরিয়ে এলো ১৯৬১ সালে। ১৯৬৬ সালের বিখ্যাত হেলসিংকি ডিকারেশনে ভাটি অঞ্চলের দেশের পানির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা হলো। বলা হলো, ভাটির দেশের অধিকারের কথা, সমতার ভিত্তিতে পানি বণ্টনের কথা, উজান অঞ্চলে এমন কিছু না করা, যাতে ভাটির দেশের মানুষ ও প্রকৃতির কোনো ক্ষতিসাধিত হয়। ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘সম্মত প্রেস রিলিজে’ বলা হয় যে, ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য চুক্তি সম্পাদনের পরে। অথচ ১৯৭২ সালে মাত্র ৪০ দিনের ট্রায়াল রান চালানোর পর থেকে ১৯৭৬ সালের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া অবধি ভারত একতরফাভাবে গঙ্গা-পদ্মার পানি প্রত্যাহার করে চলে।
নেপালকে আলোচনায় বসানোর সব বাংলাদেশী প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ভারত, যদিও গঙ্গার শুষ্ক মওসুমের ৭০ ভাগ পানির প্রবাহ আসে যে নদীগুলো থেকে তার মধ্যে ৭০ ভাগ আসে নেপাল থেকে। ভারত সব বিষয়ে আলোচনা দ্বিপক্ষীয় রাখতে চায়। তা হলে ুদ্র ও দুর্বলকে নিষ্পেষণ করা সহজ হয়ে যায়। ১৯৯৬ সালের বহুল প্রচারিত ফারাক্কা চুক্তিটি এতই দুর্বল ও অসঙ্গত যে, সেখানে নেই কোনো ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা, নেই কোনো আরবিট্রেশনের ব্যবস্থা, নেই কোনো জয়েন্ট অপারেশনের বিধান। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে এসব ব্যবস্থা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজ ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চয়তা না থাকায় পদ্মার কী অবস্থা তা গোয়ালন্দ-আরিচা পয়েন্টে গেলেই সাধারণ যে কেউ বুঝবে যে পদ্মাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে ফারাক্কায়। আর সেই সুযোগে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সমুদ্রতটরেখা থেকে ৩০০ মাইল পর্যন্ত প্রবেশ করেছে দেশের অভ্যন্তরে। প্রতি সেন্টিমিটারে যেখানে গড় ৫০০ (১৯৩০-১৯৭১) মাইক্রোমো ছিল লবণাক্ততা। তা ১৯৭৬ সালের এপ্রিলে উঠেছিল ১৩ হাজার ৬০০ মাইক্রোমোতে আর এখন তা উঠেছে ১৭ হাজারে। মানুষের পান করার জন্য ৪০০ মাইক্রোমো গ্রহণযোগ্য। তাই আজ মিষ্টি পানির নদীতে বইছে লবণাক্ত পানি, যার জন্য এসব নদীর পানি পান করে দুরারোগ্য পেটের পীড়া ও কলেরা হয়েছে নদীর পানি ব্যবহারকারী দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের কোটি কোটি মানুষের নিত্যকার সঙ্গী।
পরিবেশ বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মিষ্টি পানি যখন লবণাক্ত পানিতে রূপান্তরিত হয়, তখন তার চেয়ে ক্ষতিকর আর কোনো পরিবেশ দূষণ হয় না। অথচ এই বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের বাস করতে হবে। তিস্তা, ফেনী, সারি, কুশিয়ারার মতো নদীর পর নদী থেকে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক নদী ও পরিবেশসংক্রান্ত সব বিধানের পরিপন্থী। মরে গেছে আজ গড়াই, চন্দনা, বারাসিয়া, আড়িয়াল খাঁ, মধুমতি, সিবসা আরো বহু নদী; যেগুলোর দু’ধারে বসবাসরত মানুষ নিজেদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। তারা বসতি গড়তে পরিযান করতে বাধ্য হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনো দেশে। সে দেশ হতে পারে ভারত। সে কথা মনে রেখেই কি পূর্বাহ্নে এই তারকাঁটার সুদীর্ঘ প্রাচীর? এভাবে চলতে থাকলে সেদিন সুদূর নয়, যেদিন সব যৌথ নদী থেকেই ভারত পানি প্রত্যাহার করে নেবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নেই সরকারের। অদ্যাবধি ভারত দ্বারা একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের যে ক্ষতি হয়েছে সে ক্ষতিপূরণের দাবি করতে হবে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে এবং সেখানে সুবিচার না পেলে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালতে যেতে হবে, যেতে হবে জাতিসঙ্ঘে।
নিবন্ধের শুরু করেছিলাম সভ্যতা ও সৌজন্যের কথা দিয়ে। শেষও করতে চাই সে প্রসঙ্গ দিয়েই। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ বলেছেন, তিনি বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ থেকে বের করে দেবেন। আপনি কে? স্কুল-কলেজে শিক্ষকেরা যে আপনাকে সৌজন্য ও সভ্যতায় কোনো পাঠ দেননি তা বুঝতে অসুবিধা হয় না; কিন্তু বাড়িতে পিতামাতা?
(সূত্র : আমার দেশ, ১২/০৪/১২) |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MohammadAsafuddowla |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার |
|