|
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর মি‘রাজ ও আজকের বাস্তবতা
মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ |
|
বর্তমান যুগ অতি আধুনিক যুগ। আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি আজকাল আধুনিকতার নামে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, কুটনীতিক অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মিথ্যা, প্রতারণা আর ধোকাবাজী করে নিজেদের অধিক কৌশুলী ও চতুর বলে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অপপ্রয়াস চালাচ্ছেন। নির্বিচারে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করছেন ইরাক, আফগানিস্থান, কাশ্মীর, পাকিস্থান, ফিলিস্তিন, লিবিয়া আর লেবাননের মানব সভ্যতাকে। উল্টো আবার তাদেরকেই সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দিচ্ছেন। মিথ্যাচার আর অবিচারের ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে রেহাই পাচ্ছেনা বাংলাদেশও। অসহায় মানবতা নির্জনে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেললেও শাসক শ্রেণীর অত্যাচারের কোন প্রতিকার পাচ্ছে না। এমনি এক বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে মিরাজের গুরুত্ব আলোচনা মুসলিম মিল্লাতের জন্য নিংসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। একটি জনকল্যাণমুখী সমাজ গড়তে প্রয়োজন জবাবদিহিতার অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ এবং তার প্রয়োজনীয় উপাদান। সে মানুষ তৈরী করতে হলে মানুষের শেষ পরিণতি সম্পর্কে প্রামাণ্য জ্ঞান প্রয়োজন। এই প্রামাণ্য জ্ঞান রাসুলুল্লাহ (স.) এর মি’রাজ থেকে পাওয়া যায়।
মি‘রাজ আরবী শব্দ। এর অর্থ আরোহন করার মাধ্যম। উ‘রুজ শব্দের অর্থ উর্ধ্বে গমন করা। রাসুলুল্লাহ (স.) মাক্কি জীবনের শেষ দিকে হিজরতের পূর্বে একই রাত্রে মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা অত:পর উর্ধ্বারোহন করে সাত আসমান পাড়ি দিয়ে সিদরাতুল মুন্তাহায় পৌঁছেন এবং আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভের পর প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা নিয়ে পুন:রায় মক্কায় ফিরে আসেন। এই ঘটনাটি রাসুলুল্লাহ (স.) এর মি’রাজ নামে পরিচিত। আল্লাহ বলেছেন, “মহাপবিত্র মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি আপন বান্দাকে রাত্রের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারদিক আমি বরকত দিয়ে ভরে রেখেছি। যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরাতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয় তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন।” মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (স.) এর ভ্রমণের নাম “ইসরা” যা আল কোরআন দ্বারা প্রমাণিত। আর যমীন থেকে আসমানের দিকে আরোহনের নাম “মি,রাজ” যা মাশুহুর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তাফসীরে জালালাইনে উল্লেখ করা হয়েছে: মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী (স.) কে উত্তমভাবে পুরস্কৃত করেছেন “ইসরা” দিয়ে, যার মধ্যে রয়েছে অন্য নবীগণের সাথে একত্রে মিলিত হওয়া, আসমানের দিকে আরোহন করা, জগতের অসংখ্য বিস্ময়কর জিনিস স্বচক্ষে দেখা এবং মহান প্রভূর সাথে মুনাজাতে মাশগুল হওয়া। এ মি‘রাজ প্রত্যেক নবী-রাসুলেরই হয়েছিল। কিন্তু সবার মি‘রাজ একই স্থানে এবং একই ধরনের হয়নি। যেমন আদম (আ:) এর মি‘রাজ হয়েছিল বেহেশতের মধ্যে মূসা (আ:) এর তুর পাহাড়ে, ইব্রাহিম (আ:) এর মরুভূমির মধ্যে আর আমাদের নবী (স.) এর সাত-তবাক আসমানের উপরে আরশে মুয়াল্লায়।
এই মি‘রাজকে অবলম্বন করে মানুষের কতগুলো প্রশ্নের উদ্রেক হয়। যেমন: আল্লাহর রাসুল (স.) কি উদ্দেশ্যে, কিভাবে এত অল্প সময়ে, কিসের মাধ্যমে সাত আসমান সফর করেছিলেন, তিনি কি স্বপ্নে না স্বশরীরে সফর করেছিলেন, তিনি কি কি দেখেছিলেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে কিইবা পয়গাম নিয়ে এসেছিলেন ইত্যাদি বিষয়ে কোরআন ও হাদিসের আলোকে যৌক্তিক আলোচনা উপস্থাপন অত্র প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয়।
* মি‘রাজের উদ্দেশ্য
হিজরতের পর নবী (স.) মদিনার সর্বময় কর্তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজন ছিল আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় জ্ঞান, যোগ্যতা ও দক্ষতার। তাই আল্লাহ তায়ালা নবী (স.)-কে প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ দানের উদ্দেশ্যেই নিজ সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেছেন, “ রাত্রের বেলা তাঁর এ মহা পরিভ্রমণের ব্যবস্থা করার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে আমার কুদরাতের কিছু নিদর্শন তাঁর আপন চোখে দেখার সুব্যবস্থা করা।” এভাবে আমি ইব্রাহিম (আ:) ও মুসা (আ:)-কেও আসমান ও যমীনের কুদরাত-ই ব্যবস্থাপনা দেখিয়েছি। যাতে তিনি দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান। নবীগণ আল্লাহর কুদরাত সরাসরি প্রত্যক্ষ করার কারণে তাঁরা যেভাবে অকাতরে যুলুম নির্যাতন সহ্য করতে পেরেছিলেন এবং আল্লাহর পথে জীবন কুরবাণী দিয়েছিলেন অন্যরা তা পারেননি।
* মি‘রাজ কি স্বশ্বরীরে না স্বপ্নে
আল কুরআনে ঘটনার শুরু হয়েছে ‘সুবহানাল্লাজি আসরা’ দ্বারা। সূরা-নজমের ১৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, “তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। তিনি তাঁর মহান প্রভূর নিদর্শন সমূহ পরিদর্শন করেছেন”। এ শব্দ ও ভাষণ হতে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ সফর শারীরিকভাবে হয়েছিল। বিখ্যাত আকাইদ গ্রন্থ “শরহে আকাইদে নাসাফীতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আসমান এবং তদূর্ধ জগতে আল্লাহর মঞ্জুর মুতাবিক তাঁর রাসূল (স.) এর স্বশরীরে জগ্রত অবস্থায় মি‘রাজের ঘটনা সত্য বাস্তব এবং তা গ্রহণযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। নবী (স.) বলেছেন,” আমি উঁকি মারিয়াছিলাম বেহেশতে, দেখিলাম উহার অধিকাংশ অধিবাসি দরিদ্রলোক এবং উঁকি মারিয়াছিলাম দোযখে, দেখিলাম উহার অধিকাংশ অধিবাসি স্ত্রীলোক।” তিনি আরো বলেছেন, “আমি ঈশা, মুসা ও ইব্রাহিম (আ:) কে দেখিয়াছি, ঈশা (আ:) গৌরবর্ণ বক্রকেশ ও প্রশস্তবক্ষ আর মুসা (আ:) গোধুম বর্ণ স্থুলকায় ও সরলকেশা যেন যও গোত্রীয়।” স্বপ্নযোগে মি‘রাজ হলে রাসূল (স.) এর বাণী ভিন্নতর হতো। স্বশরীরে মি‘রাজ হলে কোটি কোটি মাইল একই রাত্রে রাসূল (স.) কিভাবে ভ্রমণ করলেন? এ প্রশ্ন তারাই করতে পারেন, মহান আল্লাহর নিরংকুশ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হওয়া সম্পর্কে যার দৃঢ় বিশ্বাস নেই। মোদ্দা কথা হল এ বিশাল আকাশ যিনি কোন খুটি ছাড়া ঝুলন্ত রেখেছেন তিনিই রাসূল (স.) কে মি‘রাজ করিয়েছিলেন। অতএব মি‘রাজ স্বপ্নে নয় বরং স্বশরীরে হয়েছিলে। তাছাড়া বিজ্ঞানীদের তথ্যও আজ ভূল প্রমাণিত। বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন পৃথিবীর উপরে ৫২ মাইল ব্যাপী বায়ুমণ্ডল অবস্থিত। এর উপরে আর বায়ুমণ্ডল নেই। আছে হিলিয়াম ক্রিপটন জিয়ন ইত্যাদি গ্যাসীয় পদার্থ। বায়ূস্তর ভেদ করে এসব গ্যাসীয় পদার্থের অভ্যান্তরে কোন প্রাণ রক্ষা সম্ভব নয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালে আমেরিকার নভোচারী ও তার সহচরবৃন্দ পৃথিবী হতে দু-লক্ষ চল্লিশ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত চাঁদে পৌঁছেছিলেন। মহাকাশ ভ্রমণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব একথা আজ আর কেউ বিশ্বাস করেন না।
* মি‘রাজের বাহন
হযরত মুহাম্মদ (স.) যে বাহনে চড়ে আকাশ ভ্রমণ করেছিলেন তার নাম বোরাক। হাদিসে বোরাকের বর্ণনায় বলা হয়েছে, এটি ছিল সাদা রংয়ের গাধার চেয়ে বড় এবং খচ্চরের চেয়ে ছোট এক ধরনের চতুস্পদ জন্তুর ন্যায়। এর গতিবেগ ছিল প্রতিটি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায়। নিউক্লিয়ার সাইন্স আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত মি’রাজ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ছিল। একটি রক্ত মাংসের মানব শরীর মাধ্যকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে কিভাবে উর্ধ্বালোকে গমন করতে পারে? কিন্তু নবী (স.) বোরাক শব্দ উল্লেখে করে মিরাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহজ করে দিয়েছেন। আরবী “বারকুন” শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ আর বারকুন এর Superlative Degree হলো বোরাক। অতএব বোরাক মানে কোন জন্তু-জানায়ার, খচ্চর কিংবা ঘোড়া নয়। হাদিসের বোরাক তথ্যের আলোকে মুসলিম বিজ্ঞানীরা মি’রাজের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে;
The greatest Prophet of Islam Mohammad (s.) Almighty Allah might have Converted his physical body first into barq (Electricity) and then into noor (light), a noor having a speed much faster than that of out ordinary noor and he appeared in person before his majesty in a twinkling of an eye.
সাধারণ আলো প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ্য কি:মি: বেগে চলে কিন্তু এ আলোকে Superlative Degree করায় এর গতিবেগ ছিল সর্বাধিক। তাই চোখের পলকে মুহাম্মদ (স.) তার প্রভুর সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন। এ ঘটনার কারণে অনেকেই নবী (স.) কে নুর দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে প্রচার করেন। কিন্ত সে ধারণা সঠিক নয়। আল্লাহ বলেছেন, “আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে একটি আলো এবং একখানা কিতাব।” মূলত আল্লাহ হচ্ছেন আলোর উৎস আর মুহাম্মদ (স.) হচ্ছেন আলোকিত। যেমন চন্দ্র সুর্যের আলো দ্বারা আলোকিত।
একই রাত্রে অতি অল্প সময়ে মহাকাশ ভ্রমণ নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। কিন্তু আইনষ্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী বস্তু যখন আলোর গতিতে চলে সময় তখন স্থির হয়ে যায়। মহানবী (স.) বলেছেন, মিরাজে আমি আল্লাহর দরবারে ২৭ বছর ছিলাম। সপ্তম আকাশের দুরত্ব ২০ বিলিয়ন আলোক বর্ষ। আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী সেখানকার লক্ষ্য লক্ষ্য বছর পৃথিবীর জন্য Zero time। সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কোরআনের স্পষ্ট ধারণা হল, “প্রকৃত পক্ষে মহান প্রভূর দরবারে ০১ দিন তোমাদের হিসাবে ১০০০ বছরের সমান। (সূরা হজ্জ-৪৭)
১০০০ বছর = ১দিন
২৭ বছর = = ৩৮ মিনিট (প্রায়)
আবার আল্লাহ বলেছেন, “ফেরেশতা গণ এবং রূহ আল্লাহর নিকট পৌছে ০১ দিনে। ০১ দিনের পরিমাপ হলো ৫০,০০০ বছরের সমান।” (সূরা-মা’আরিজ-৪)
তাহলে ৫০,০০০ বৎসর = ১দিন
২৭ বৎসর = = ৪৬ সেকেন্ড
এখানে বিষয়টি অনুমান করা যায় যে, মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর দরবারে পৌঁছেছিলেন ৪৬ সেকেন্ডে এবং আল্লাহর সৃষ্টি সমূহ পরির্দশনে নবীজীর যে ২৭ বছর সময় লেগেছিল, পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখেন তা ৩৮ মিনিটের সফর। বস্তুত সৃষ্টিতে সময়ের চেয়ে কঠিন বিষয় আর কিছু নেই। অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন তারা যদি সময়ের চরিত্রকে ভালভাবে বুঝতে পারতেন তাহলে স্রষ্টাকে আরো বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম হতেন। বস্তুত আল্লার নিকট একটি মাত্র কালের অস্তিত্ব আছে তা হল বর্তমান কাল। এখানে আমরা বলতে পারি যে একজন হজ্জ যাত্রী উড়োজাহাজ না পানি জাহাজযোগে গেলেন সেটি মুখ্য বিষয় নয় বরং হজ্জ্বে কি আরকান আহকাম পালন করলেন সেটিই আসল বিষয়।
* মি‘রাজে রাসূল (স.) কি দেখেছিলেন
রাসুলুল্লাহ (স.) উম্মেহানী (রা.) বিন্তে আবি তালিবের বাড়ীতে ঘুমিয়ে ছিলেন। জিবরাঈল(আ.) এসে তাঁকে ঘুম থেকে উঠিয়ে যমযম কুপের নিকট নিয়ে যান। তার বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং যমযম কুপের পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলেন। তারপর ঈমান একীন প্রজ্ঞা ও সহনশীলতা দিয়ে বক্ষ পরিপূর্ণ করে দেন। তারপর বোরাকে আরোহন করে প্রথমে বায়তুল মাকদাসে এবং সেখান থেকে উর্ধ্বজগতে যান। প্রথম আসমানে রাসূলুল্লাহ (স.) ১৪টি দৃশ্য দেখেছিলেন: এ সম্পর্কে রাসুল্লাহ প্রশ্ন করেন জীবরাইল (আ:) যে উত্তর দিয়েছিলেন তা নিম্নরুপ;
প্রথম আসমানের দৃশ্য দেখে রাসূল (স.) প্রশ্ন করলেন। কারণ হিসেবে জীবরাঈল (আ:) যা বললেন
১। আদম (আ:) এর ডানে বামে অনেক লোক ছিল। ডানে তাকালে আনন্দিত হতেন বামে তাকালে কাঁদতেন। রাসূল কারণ জিজ্ঞাসা করলেন? ১। এরা আদমের বংশধর আদম (আ:) নেক লোকদের দেখে খুশি হতেন অসৎ লোকদের দেখে কাঁদতেন।
২। একস্থানে দেখলেন কিছু লোক ফসল কাটছে। যতোই কাটছে ততোই বেড়ে যাচ্ছে। এরা কারা? ২। এরা হল আল্লাহর পথে জিহাদকারী
৩। একদল মানুষকে মাথায় পাথর মেরে চুর্ণ করা হচ্ছে। এরা কারা? ৩। এরা নামাজে অমনোযোগী
৪। কিছু লোকের কাপড়ে তালি লাগানো এবং পশুর মতো ঘাস খাচ্ছে। এরা কারা? ৪। এরা যাকাত অস্বীকার কারী
৫। একদল লোক কাঠ জমা করে তার বোঝা উঠাবার চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না অথচ আরো কাঠ এনে বোঝা ভারী করছিল। ৫। এরা নিজ দয়িত্ব পালন করতে পারত না। আবার আরো দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিত। অন্য বর্ণনায় আমানতের খেয়ানতকারী।
৬। একদল লোকের জিহবা ও ওষ্ঠ কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। ৬। এরা দায়িত্ব জ্ঞানহীন বক্তা। সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করত।
৭। এক স্থানে দেখলেন পাথরের ভিতর থেকে ষাঁড় বের হচ্ছে আবার পাথরের ভিতর ঢুকবার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। ৭। এরা বড় বড় কথা বলত পরে লজ্জিত হয়ে তা আর ফেরত নিতে পারত না।
৮। এক স্থানে কিছু লোক নিজেদের গোশত কেটে কেটে খাচ্ছে। ৮। এরা অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ ও কটুক্তি করত।
৯। এমন লোক দেখা গেল যাদের ওষ্ঠদ্বয় উটের ওষ্ঠের মতো মোটা এবং তারা আগুণ ভক্ষণ করছিল। ৯। এরা এতিমের সম্পদ ভক্ষণকারী
১০। এমন কিছু লোক যাদের পেট ছিল অসম্ভব বড় এবং তা সাপে পরিপূর্ণ ১০। এরা সুদখোর
১১। একদল লোক ভাল গোশত ছেড়ে পঁচা গোশত খাচ্ছিল। ১১। এরা সেই নারী-পুরুষ যারা বৈধ স্বামী-স্ত্রী থাকা সত্বেও অবৈধ পথে যৌন বাসনা চরিতার্থ করেছে।
১২। এমন কিছু স্ত্রী লোক যারা স্তনের সাহায্যে লটকানো ছিল। ১২। এরা এমন সন্তানকে তাদের ঔরসজাত বলত যারা তাদের ঔরসজাত ছিল না।
সূরা বণী ইসরাইলের ২৩-৩৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যে সকল মূলনীতি অনুসরণ করতে বলেছেন এই মূলনীতির অস্বীকারকারীর কি ধরনের শাস্তি হবে তা স্বচক্ষে নবী (স.) কে দেখিয়েছিলেন। এর পর ৭ম আসমান পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে হযরত ঈশা (আ:), হযরত ইউসুফ (আ:), হযরত মুসা (আ:), হযরত হারুন (আ:), হযরত ইব্রাহিম (আ:) এর সাথে নবী (স.) এর সাক্ষাৎ হয়। অত:পর তিনি সিদরাতুল মুস্তাহায় পৌঁছেন এবং আল্লাহর দিদার লাভ করেন। কথপকথনে আল্লাহ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত শিক্ষা, শিরক ব্যাতিত সব গুনাহ মাফ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অত:পর রাসুল (স.) পুন:রায় বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন।
* রাসুল (স.) কি আল্লাহ কে দেখেছিলেন?
কোরআনের আয়াতে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর রবের বড় বড় নিদর্শন দেখেছেন। তবে কারও মতে তিনি আল্লাহকে দেখেছেন আবার কারও মতে আল্লাহকে নয় তিনি জিবরাইল (আ.) কে দেখেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন, যে বলবে মুহাম্মদ (স.) আল্লাহকে দেখেছেন সে মিথ্যা কথা বলছে। সুতরাং মহানবী (স.) এর সাথে আল্লাহ তায়ালার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি।
* ২৭ শে রজব উপলক্ষে সমাজে প্রচলিত বিদয়াত
মিরাজকে ঘিরে বহু সংখ্যক আজগুবী গল্প, কিচ্ছা-কাহিনী ও ইবাদাত বন্দেগী রয়েছে। যেমন; রজব মাসের ২৭ তরিখ রোযা রাখলে, রাত্রে দাড়িয়ে সালাত আদায় করলে ১০০ বছর সিয়াম ও সারারাত সালাত আদায় করার সাওয়াব পাবে, ভাল খাবার খেলে সারা জীবন খেতে পাবে, ভাগ্যের ভাল মন্দ লিখা হবে(ভাগ্য রজনী), এ মাসে সালাত সিয়াম, দান-খয়রাত, যিকর, দরুদ-দুয়া ইত্যাদী আমল করলে এর সওয়াব অনেক বৃদ্ধি পায় ইত্যাদি বিষয়ে ইবনু হাজার আল আসকালানী, মোল্লা আলী কারী, মোহাম্মদ বিন ইসমাইল আজলুনী, আব্দুল হাই লাখনবী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ২৭ রজবের ফজীলাত এ তারিখের এবাদত দিনে সিয়াম পালন বিষয়ে বর্ণিত সকল কথাই বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।
* মি‘রাজের প্রকৃত শিক্ষা
মি‘রাজের প্রকৃত শিক্ষা সূরা বাণী ইসরাইলের ২৩-৩৭ আয়াতে সুস্পষ্টে ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই নির্দেশনা মোতাবেক রাসুল (স.) মদিনায় একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করেছেন। বর্তমান সমাজেও শান্তি স্থাপনে এই নির্দেশনার বিকল্প নেই। মাজারে গোলাপ জল-মোমবাতি দান, সিরনী পোলাও বিতরণ, সারা-রাত নামাজ পড়ে সমাজের অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার দুরিভূত হবেনা-হচ্ছেও না। কল্যাণমুলক সমাজ-রাষ্ট্র পেতে হলে নিম্নের নির্দেশনা গুলো পালন করতে হবে;
১. এক আল্লাহ ছাড়া কারো উপাসনা করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে শিখা চিরন্তন আর প্রয়াত নেতাদের Monument তৈরী করে নিয়মিত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হচ্ছে। যা শির্কের সমতুল্য।
২. পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আজকাল Old home তৈরী করে বৃদ্ধদের কয়েদির মত রাখা হচ্ছে। যা অমানবিক ও অকৃজ্ঞতার শামিল।
৩. আত্মীয়, মিসকিন ও পথিকদের হক বুঝিয়ে দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে মিসকিনদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত সম্পদগুলো কৌশলে লুটপাট করা হচ্ছে।
৪. বেহদা খরচ করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে পুঁজি পতিরা আরাম-আয়েশ আর বিল সিতায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছেন। পাশেই না খেয়ে বহু বণি আদম রাত যাপন করছে।
৫. কৃপনতা করা যাবে না। কিন্তু বর্তমানে বিশাল অট্টালিকার পাশে অসংখ্য মানুষ পলিথিন দিয়ে মাথা গোজাবার ব্যর্থ চেষ্টা করছ
৬. সম্পদের সুষম বণ্টন করতে হবে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের ১০ ভাগ লোক ৯০ ভাগ সম্পদের মালিক। বর্তমানে সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এক চরম অসম অবস্থা বিরাজ করছে।
৭. রিযিকের ভয়ে সন্তান হত্যা করা যাবে না। অথচ মহাসমারোহে জন্ম নিরোধক উপকরণ বিক্রয় ও বিতরণ করা হচ্ছে আর গর্ভপাতকে সহজলভ্য করা হচ্ছে।
৮. ব্যাভীচারের নিকটবর্তী হওয়া যাবে না। অথচ সরকারি সহায়তায় পতিতালয় হচ্ছে, আয়োজন করা হচ্ছে অশ্লীল নাচ-গান আর নারী দেহ প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা, ডিজিটাল কায়দায় অশ্লিলতা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ।
৯. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না। অথচ আজ মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরই কোন নিরাপত্তা নেই।
১০. এতিমের মাল ভক্ষণ করা যাবে না। বর্তমান সমাজে এতিম অসহায়দের চাকুরী পাওয়ার, বিচার পাওয়ার বা আইনের আশ্রয় লাভের কোন অধিকার আছে বলে মনে হয় না।
১১. ওয়াদা চুক্তি ও অঙ্গীকার পুরণ করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে কর্তা ব্যক্তিদের কিছু শপথ বাক্যের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তারা শপথের পর তা বেমালুম ভূলে যান। আপন ইচ্ছামত কাজ করছেন। রাগ অনুরাগ বা বিরার্গের বশবর্তি হয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করবেন না বলে শপথ নিলেও অহর্নিশ প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষকে আক্রমনাত্মক বক্তব্য দিয়ে চলেছেন।
১২. ধারণার বশবর্তী হয়ে কোন কাজ করা যাবে না। অথচ অনুমান ও ধারণার বশবর্তী হয়ে আজ দেশ ও জনপদ মরণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে। আয়োজন করা হচ্ছে মানুষকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার।
১৩. ওজনে কম-বেশি করা যাবে না। অথচ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলো ওজনে কম দেওয়াকে ফ্যাসান হিসেবে গ্রহণ করেছে।
১৪. যমীনের উপর গর্বভরে চলা যাবে না। অথচ বিশ্বব্যাপী আজ গর্ব ও অহংকারের প্রতিযোগিতা চলছে।
আমরা লক্ষ করছি সমাজের প্রত্যেকটি স্তরে আল্লাহর নির্দেশের বিপরিত কার্যক্রম চলছে। এ অবস্থায় প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তির বসে থাকার সুযোগ নেই। সংঘবদ্ধ ভাবে এই খোদাদ্রোহী সমাজ ও গোষ্ঠির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কায়েম করতে হবে সমাজের সর্বত্র আল্লাহর উলুহিয়াত। তবেই মি’রাজের শিক্ষা কাজে লাগবে। নচেৎ শাসকেরা মন, মর্জি, খেয়াল, খুশি মত চলবে। ফলে সেখানে আল্লাহর গজবের নীতি চালু হবে। আল্লাহ বলেছেন,“যখন আমি কোন জনবসতিকে ধ্বংস করার সংকল্প করি তখন তার সমৃদ্ধশালী লোকদেরকে নির্দেশ দিয়ে থাকি ফলে তারা সেখানে নাফরমানী করতে থাকে আর তখন আযাবের ফায়সালা সেই জনবসতির উপর বলবত হয়ে যায় এবং আমি সে জনবসতিকে ধ্বংস করে দিই।” (সুরা-বাণী ইসরাইল-১৬)
লেখকঃ পিএইচ ডি (গবেষক), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MohammadObaidullah |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
নিয়মিত লেখা পেতে চাই......