|
কীর্তিময় সময়-২ : উদরাময় বনাম কোষ্ঠকাঠিন্য
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান |
|
উদরাময় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দুটোই বিদঘুটে পেটের পীড়া। প্রথমটির বেগ প্রবল। চাপ আসামাত্র টয়লেটে ছুটতে হয়। অনেক সময় বিছানা থেকে নামারও সময় দেয় না। বেরিয়ে যায়। দ্বিতীয়টি বেরোতেই চায় না। চাপ আসতেই চায় না। একটু চাপ-চাপ ভাব এলেও প্রায়ই তা নিষম্ফল হয়। এই বিদঘুটে রোগ দুটির কথা মনে এলো বাংলাদেশ-ভারতের লেনদেনের প্রসঙ্গে। ভারতকে যখন কিছু দেয়ার কথা হয়, কথা মাটিতে পড়ার আগেই ভারতের পা চাটা সারমেয় স্বভাবের চাটুবুদ্ধিজীবী, অতি মাত্রায় অথবা বলা যায় উদগ্র আকাঙ্ক্ষার আমলারা, কৃতজ্ঞ মন্ত্রী মহোদয়রা, সবার মধ্যে যেন উদরাময়ের বেগ এসে যায়, এমনকি বিষয়টি যেসব মন্ত্রণালয়ের নয় সেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মহোদয়রাসহ সরকারদলীয় নেতারাও অধীর হয়ে ওঠেন। যে উপদেষ্টাদের দেশে আসার সময় হয় না তারাও ছুটে আসেন। বিপরীতে ভারতের পক্ষ থেকে কিছু দেয়ার কথা উঠলেই কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, আমলাতন্ত্র, সব কোষ্ঠশুদ্ধির অযোগ্য কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত হয়। স্বাধীনতার পর থেকেই এটা দেখে আসছি। কেবল ভারতীয় স্বার্থে বাংলাদেশের গলাটিপে ধরে হলেও ভারত যা করতে চায়, ভারতীয়দের চেয়ে এ দেশী ভারতীয় দালালদের উত্সাহ তাতে দ্বিগুণ বেশি। কারণ সন্দেহাতীতভাবে এরা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়। দেশ-জাতির স্বার্থ গোল্লায় যাক, নিজের পকেট কতটা স্ফিত হলো তার ওপরেই নির্ভর করে এদের তত্পরতার বেগ। যেমন—সম্প্রতি একজন উপদেষ্টা মহোদয়কে দেখা গেল প্রবাস থেকে ছুটে এসে যেন বহুদিনের আটকে রাখা বেগকে একঝটকায় বের করে দিলেন। বললেন, ট্রানজিটের জন্য ৪০ বছর অপেক্ষা করেছি, আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রথমেই দেখা যাক ট্রানজিট আজ কারা চাচ্ছে এবং সেটা আদৌ ট্রানজিট কিনা। ট্রানজিট বলতে বোঝায়, কোনো দেশ যা অন্যান্য দেশের ভূমিদ্বারা বেষ্টিত, পার্শ্ববর্তী দেশের ভেতর দিয়ে সেই দেশের মানুষ বা পণ্যের তৃতীয় দেশে চলাচলের অধিকার। এই ট্রানজিট চাইছে কারা? ভারত।
ভারত কি আদৌ অন্যান্য দেশের ভূমি দ্বারা বেষ্টিত কোনো দেশ? বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ছাড়া তার কি তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার কোনো পথ নেই? পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, নেপাল, ভুটান, চীনসহ পৃথিবীর কোনো দেশে যাওয়ার জন্যই ভারতের প্রয়োজন নেই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চলাচলের। ভারত চায়, তারই এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে চলাচলের জন্য রেলপথ, সড়ক পথ, জলপথে বাংলাদেশকে ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে চিরে-ফেড়ে ফালাফালা করতে। বিশ্বের কোনো মানদণ্ডেই একে ট্রানজিট বলা যায় না। ভারত চায় করিডোর—ভারতীয় করিডোর। হ্যাঁ, এর জন্য ভারত অপেক্ষা করছে। শুধু ৪০ বছর নয়, পাকিস্তানের ২৩ বছর যোগ করলে ৬৩ বছর অপেক্ষা করছে ভারত। কিন্তু উপদেষ্টা মহোদয় কেন বললেন যে, তিনি অপেক্ষা করছেন? তিনি কি ভারতীয়? এই যে করিডোর, এতে বাংলাদেশের কী লাভ হবে? বড় জোর, নেপাল বা ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটলেও ঘটতে পারে। প্রবল ভারতের কাছে দুর্বল বাংলাদেশ যা কখনোই অধিকার হিসেবে দাবি করতে পারবে না। ভারতের কৃপার ওপরে নির্ভর করে থাকতে হবে। এছাড়া মিয়ানমার হয়ে চীনসহ আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের যে ব্যবস্থা, যা মূল ট্রানজিট হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সেটিই হতো বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত লাভজনক। যার তুলনায় নেপাল ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগ লক্ষাংশও নয়। কিন্তু ভারতের কারণেই ট্রানজিটের এই রুটটি আলোচনার বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশকে দেয়া শুধু নয়, কোনোভাবে বাংলাদেশের কোনো লাভের সম্ভাবনা দেখা গেলেই ভারতের কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হয়ে যায়। ভারতীয় ও কেবল ভারতীয় স্বার্থেই বাংলাদেশ এখন সব ভুলে করিডোর দেয়ার জন্য কৃষ্ণপ্রেমে ব্যাকুল রাধার চেয়েও উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো মন্ত্রী-উপদেষ্টা তো করিডোরের রাস্তা ভাড়া দিয়েই বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর ঢোল পিটিয়েছেন জোরেশোরে। কিন্তু দু’দিনেই সেই ঢোলের বাদ্যি ‘ফুস্’। উদরাময়গ্রস্ত পেটের মতো অবস্থা হলে জোরে পেটালে ‘ফুস্’ তো হবেই, সঙ্গে দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থও বেরিয়ে যেতে পারে। গেছেও। এখন সেই অসভ্যতা ঢাকতে উল্টো বলা হচ্ছে, ভারতের কাছে ট্রানজিট ফি চাওয়া অসভ্যতা। যাদের আত্মমর্যাদা বলতে কিছু মাত্র আছে, তারা এভাবে ‘অ্যাবাউট টার্ন’ করতে পারেন কি? অ্যাবাউট টার্নের আর এক নজির দেখলাম এবার তিস্তা চুক্তি নিয়ে।
এই অ্যাবাউ টার্ন অবশ্য উদরাময়জনিত নয়, কোষ্ঠকাঠিন্য জনিত অর্থাত্ ভারতের। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমনের বেশ আগে থেকেই তিস্তা চুক্তির ঢাক পিটিয়ে আসছিলেন। বাংলাদেশী কূটনৈতিক সাফল্যকে তিনি কোন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা দেখিয়েই ছাড়বেন বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক অ্যাবাউট টার্নের ঝটকায় (ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে ‘বডিডজ’, ছিটকে পড়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন পররাষ্ট্রনীতি তো বটেই, রাজনীতিতেও তিনি এখনও খুকুমনি। এখন তিনি মিন মিন করছেন তিস্তা চুক্তি আজ না হলেও হবেই। এমন মমতার পদে কত তৈল মালিশ করতে হবে কে জানে? কিন্তু, দুটি দেশ যখন কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো চুক্তি করতে যায়, তখন কোনো দেশের কোনো রাজ্য সরকারের আপত্তি তো গ্রাহ্য হওয়ার কথা নয়। আসলে এসবই ভারতের পাতানো খেলা। কোষ্ঠ-কাঠিন্যের কৌশল। কে জানে, বাংলাদেশ সরকারও আগে থেকেই অবগত ছিল কি না। তিস্তা চুক্তি না হওয়াতে করিডোর (ট্রানজিট নয়) চুক্তিও করেনি বাংলাদেশ এমন একটি বাহাদুরীর ভান দেখানো হচ্ছে এখন। আসলে তলে তলে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট সইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সার্বিক সর্বনাশ যে ঘটিয়ে ফেলা হয়েছে তা ১৭ সেপ্টেম্বরের আমার দেশের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত নিবন্ধে অর্থনতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ পরিষ্কার করে দিয়েছেন। আর সেই ছুটে আসা উপদেষ্টা মহোদয় তো বলেই বসেছেন, মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির মাধ্যমেই ট্রানজিট দেয়া হয়ে গেছে। নতুন চুক্তির দরকার নেই। সত্যিই মহা মহা কীর্তিমানদের বদৌলতে মহা কীর্তিময় সময় চলছে এখন। কবে এই উদরাময়গ্রস্থদের পেটশুদ্ধি হবে, কে জানে?
লেখক : কবি ও সাহিত্যিক
[সূত্রঃ আমার দেশ, ২১/০৯/১১] |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MohammadRafiquzzaman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| লেখক : কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব |
|