আমেরিকান পপ সঙ্গীতের মূকুটহীন সম্রাজ্ঞী হুইটনি হিউস্টন সম্প্রতি মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর অকাল মৃত্যুর পেছনে ছিল ভয়ংকর মাদকের জীবন-বিধ্বংসী ছোবল। বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীও প্রায় একই সময়ে ফুসফুসের ক্যান্সারে মারা গেছেন। তাঁর ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ ছিল মাত্রারিক্ত ধূমপান ও মদ্যপান। বাংলাদেশের আরেক বিশিষ্ট চলচ্চিত্র অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের ছোট ছেলে খালেকুজ্জামান কুশল নিজ হাতে নিজ বাসায় ছুরিকাঘাতে খুন করেছে তারই বড় ভাই কামরুজ্জামান কবিরকে। অত্যন্ত মর্মান্তিক এ হত্যাকান্ডের নেপথ্যেও ছিল খালেকুজ্জামান কুশলের নিয়ন্ত্রণহীন মাদকাসক্তি। মাদক কেন্দ্রিক এ ধরণের ঘটনা আজকাল দেশে-বিদেশে প্রায়ই ঘটছে। আর এ ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে মাদকের নেশা শুধুই সর্বনাশা। কেবলই ধ্বংসাত্মক। মাদক ব্যক্তি জীবনের সমস্ত সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সৃষ্টি করে ভয়াবহ অশান্তি। মাদকের সবচেয়ে মারাত্মক দিক হলো ইহা মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি ও স্বাভাবিক আচরণ করার ক্ষমতা বিলুপ্ত করে দেয়। ফলে মাদকাসক্তরা সামান্য কারণেই অনেক মারাত্মক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
শুধু মাদকের কারণেই বিশ্বের অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে যায়। অনেক সুন্দর সম্ভাবনা পরিণত হয় পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যায়। মাদকের নেশা মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া করে দেয়, শরীরে নানা রকম দূরারোগ্য রোগের সৃষ্টি করে এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানব সভ্যতার জন্য অন্যতম এক হুমকি ও নীরব ঘাতকের নাম মাদক। উন্নত বিশ্ব থেকে অনুন্নত দুনিয়া – সর্বত্রই এই ভয়ংকর ঘাতকের বিপজ্জনক উপস্থিতি। সমীক্ষা থেকে জানা যায় অসচেতনতা, মদ উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলোর চটকদার ও মোহনীয় বিজ্ঞাপন, অসৎ ও মদাসক্ত বন্ধুদের সান্নিধ্য, ব্যক্তিগত হতাশা কিংবা মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে সাময়িক ‘মুক্তির’ আশায় মানুষ মদ বা অন্য কোন মাদকের নেশার জালে বন্দি হয়ে পড়ে।
ধূমপানের ক্ষতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে ভুল করার কারণে অনেকে ধূমপানকে হালকাভাবে নেন এবং একে মাদক বা নেশার পর্যায়ে ফেলতে চান না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৯০ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সারের সৃষ্টি হয় ধূমপান থেকে। তাছাড়া ধূমপান মানব দেহে আরো অনেক দূরারোগ্য রোগের জন্ম দেয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে ধূমপানের বদভ্যাস থেকেই জন্ম নেয় বেশীর ভাগ নেশা বা মাদকের আসক্তি। নেশাগ্রস্তরা ধূমপানের মাধ্যমেই মাদক বা নেশার অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। অধিকাংশ ধূমপায়ীর ধূমপানের বদভ্যাসটা গড়ে উঠে কৈশোর বা যৌবনের শুরুতে। বিড়ি ও সিগারেট প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলোর লোভনীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে বন্ধুদের আড্ডায় মজা করা কিংবা ‘স্মার্ট’ হওয়ার জন্য দু’ এক টান দিতে দিতেই ক্রমশঃ জড়ানো হয়ে যায় ধূঁয়ার নেশায়। ধূমপান কেন করা হয়? এ প্রশ্নের কোন সদুত্তর ধূমপায়ীদেরও জানা নেই। কারণ ধূমপানের কোন লাভজনক দিক নেই। ধূমপান শুধুই ক্ষতিকর। সস্তা দামের বিড়ি কিংবা দামী ব্রান্ডের সিগারেট কোনটাই নিরাপদ নয়। ধূমপান স্বাস্থ্য, অর্থ ও পরিবেশ সব কিছুর জন্যই ক্ষতিকর। সুতরাং ধূমপানকে প্রশ্রয় দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৬০ লাখ মানুষ মারা যায় ধূমপান জনিত রোগে এবং ধূমপান নিয়ন্ত্রণের দ্রুত কোন ব্যবস্থা না নেয়া হলে ২০৩০ ইং সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮০ লাখে। সুতরাং ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন হওয়ার এখনই সময়। দুঃখজনক হলেও দেখা যায় অনেক শিক্ষিত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিও ধূমপান করেন এবং এর ক্ষতির ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন থাকেন। চূড়ান্ত সর্বনাশ হয়ে যাওয়ার পর অর্থাৎ ক্যান্সারের জীবাণুরা ফুসফুসে বাসা বাঁধার পরই কেবল ধূমপায়ীরা বুঝতে পারে যে জীবনে কত বড় ভুল করা হয়ে গেছে। তখন দুঃসহ যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে কষ্টকর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। ধূমপান শুধু যে ধূমপানকারীর ক্ষতি করে তা নয়, অধূমপায়ী ব্যক্তিও এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না।
সুস্থ দেহ ও সুন্দর পরিবেশের জন্য ধূমপান সহ সকল প্রকার মাদক ও নেশাকে ‘না’ বলতে হবে। আর এভাবেই মাদকের ভয়ংকর ছোবল থেকে রক্ষা করা যাবে নিজেকে এবং সমাজকে। এ জন্যে সর্ব প্রথম প্রয়োজন ধূমপান ও মাদকের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা। পরিবার ও সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিরা সচেতনভাবে ধূমপান ও অন্যান্য নেশা থেকে মুক্ত থাকলে নতুন প্রজন্ম অর্থাৎ কিশোর-তরুণদের মধ্যে এ সব বদভ্যাস ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। তাই ধূমপান প্রতিরোধে সর্ব প্রথম এগিয়ে আসতে হবে পরিবার ও সমাজের জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের।