মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৫:৪৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
সদ্য প্রত্যাগত প্রবাসীর চোখে ঢাকায় কোরবানী ঈদ (২৭/১১/২০১০)
খানায়ে ক্বাবা (২১/১১/২০১০)
ইভ টিজিং ও দু’টি অপমৃত্যু: ব্যক্তি, রাষ্ট্র বনাম সমাজের দায়বদ্ধতা (০৬/১১/২০১০)
বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে? (২৩/১০/২০১০)
বোরখা বা ইসলামী পোষাকের প্রতি উচ্চ আদালতের রুল প্রসঙ্গে (০৯/১০/২০১০)
আমি আশ্চর্য্য হবোনা (দুটি কবিতা) (০২/১০/২০১০)
বাঙ্গালীর সৌজন্যবোধ, লৌকিকতা ও ব্যবহারিক সংস্কৃতির পোষ্টমর্টেম (১৮/০৯/২০১০)
করাচীতে ফেলে আসা শৈশবের সেসব টুকরো স্মৃতিগুলো-২ (০৯/০৯/২০১০)
তারাবীহর নামাজ, রমজানে বাজার সাজার এবং বিবিধ বচন (২১/০৮/২০১০)
একটি ওড়নার আত্মকথা (১৪/০৮/২০১০)
করাচীতে ফেলে আসা শৈশবের সেসব টুকরো স্মৃতিগুলো-১ (৩১/০৭/২০১০)
হিজাবঃ এক নও-মুসলিমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা (১০/০৭/২০১০)
সেক্স এডুকেশন নিয়ে কিছু কথা (২৬/০৬/২০১০)
ফল-ফলারী (১৯/০৬/২০১০)
আগের লেখা
810


সদ্য প্রত্যাগত প্রবাসীর চোখে ঢাকায় কোরবানী ঈদ

মোহাম্মদ শাহজাহান

কোরবানীর ঈদ আসছি আসছি করে এসে গেছে, এসে আবার চলেও গেছে। ঢাকাবাসীর এবারের ঈদ কেমন কেটেছে? ঢাকার বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকের নিকটই এমন প্রশ্নের কিছু রেডিমেড় জবাব বেশ আগ্রহের সৃষ্টি করবে। এমনতরো চিন্তা হতেই আমার আজকের লেখার শিরোনাম। তবে আগেই বলে রাখি, যেহেতু দীর্ঘ সাত বছর পর ঢাকায় এটি আমার প্রথম কোরবানীর ঈদ, অভিজ্ঞতার স্বল্পতায় হয়তো সবার মনের প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হবোনা, তবে চেষ্টার ত্রুটি হবেনা, এ আশ্বাস দিচ্ছি।

কোরবানীর ঈদের প্রসঙ্গ এলেই প্রথমে যে চিত্র মানসপটে ভেসে ওঠে, তা হলো চারদিকে অগনিত কোরবানীর পশু, গরু, ছাগল, আবার ভূলে ভালে দু একটা দুম্বা বা ভেড়ার দেখা মিলে যাওয়া, যেগুলো অশ্রুসিক্ত নয়নে তাদের কোরবানী হবার প্রতীক্ষা করছে, আর মাঝে মাঝেই হাম্বারব কিংবা ম্যাঁ..এঁ.. এঁ.এঁ.এঁ... শব্দে রাতের নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে হয়তো প্রতিবাদ জানাচ্ছে, নয়তো দয়াময়ের নিকট কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে তাদেরকে কোরবানীর মতো পবিত্র একটি উৎসবে উৎসর্গীকৃত হবার সুযোগদানের জন্য। ওদের ভাষাতো আর আমার বুঝার ক্ষমতা নেই। যতোই ঈদের দিন ঘনিয়ে আসে ততোই এ দৃশ্য যেন নিজস্ব গতি ও ছন্দ লাভ করে। মাসখানেক পূর্ব হতেই বড় বড় রাস্তার মোড়ে ‘বিরাট কোরবানীর হাট’ এর চাঁদতারা খচিত রঙ্গিন ব্যানার গুলো শোভা পেতে থাকে। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে হাটবার; কর্মক্ষেত্রে যাবার পথে বাসের জানলা দিয়ে দেখতে পাওয়া তাগড়া গরুকে খেদিয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া, ‘ভাই গরুটির দাম কত হয়েছে?’ আবার সাথে সাথে তার জবাবও মিলে যাওয়া। তখন আবার যাত্রীদের মাঝে ঐ দাম নিয়ে নানাজনের নানা মন্তব্য; সস্তা হয়েছে, মোটামুটি ভালো, কিংবা, এবারে আমদানী বেশী হয়েছে, সামনে দাম আরো কমবে জাতীয় কমেন্টগুলোর কিছুক্ষণ বাতাসে গুঞ্জরণ সৃষ্টি করে যাওয়া। আবার মাঝে মাঝে শহরের বাহির হতে শহরে প্রবেশ করা গরুর সাপ্লাই নিয়ে আসা বড় বড় চলন্ত ট্রাকগুলোর ক্যারিয়ারে ঐসব অবলা পশুদের সামনে পেছনে দোলায়মান শিংযুক্ত মস্তকগুলো দেখেও কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়ি। ওগুলোকে তখন পশু মনে না হয়ে মনে হয় যেন প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া এক দংগল রাজনৈতিক বন্দী, যাদের ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে।

এরই মাঝে একদিন একটি দৈনিক সংবাদপত্রের ছোট্ট একটি খবরে দৃষ্টি আনত হয়ে সেখানে তা কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে গেল। ঐ সংবাদে বলা হয়েছে, যশোহরের দিকে কোন কোন এলাকায় নাকি কোরবানীর গরুকে স্বল্প সময়ে মোটা-তাজা করণের এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে কোরবানীর পশুপালন ও বিক্রেতাগোষ্ঠী। মাসখানেক কিংবা দেড় মাসেই একটি মাঝারি সাইজের গরুকে গায়ে গতরে ডাবল বানিয়ে ফেলার এই অভিনব কারিগরি(?) প্রযুক্তিটি কি, কোথা হতে এই প্রযুক্তির আমদানী তা অবশ্য স্পষ্ট করে কিছুই বলা হয়নি ঐ সংবাদে। কোন দৈত্য মারফত প্রাপ্ত আলৌকিক কোন ইঞ্জেকশান, নাকি খাবারের সাথে মিশানোর জন্য আসমান হতে নিপতিত মান্না ছালওয়া জাতীয় কোন উদ্ভিদ তাও খবর নেয়া হলোনা। তবে দৈনিক পত্রিকায় যখন খবর হয়ে এসেছে, তাই তাতে কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা আছে একথা মনে মনে স্বীকার করে নিলাম। হায় রে বাংগালী, কত যাদু জানো তোমরা, এ গ্লোবাল ভিলেজে তোমাদের ক্রম উন্থানকে আর কে ঠেকায়?

আমার কলেজ পড়ুয়া ছোট্ট মেয়ে, যার জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে বিদেশে, তার আবার গরু-ছাগল প্রীতি একটু আলাদা ধরণের। কেমন যেন ওগুলো দেখলে সে আহ্লাদী হয়ে পড়ে, ওগুলোকে নিকটে গিয়ে আদর করে গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। ওদেরকে নিজ হাতে ঘাস-পাতা খাইয়ে দিতে বিচলিত হয়ে পড়ে। প্রায় ছয় বছর একটানা বিদেশে(আবু ধাবী) কাটিয়ে এসে এটাই তার এখানে প্রথম কোরবানীর ঈদ। দীর্ঘ ছয়টি বছর কোরবানীর পশুর দর্শন হতে ছিল বঞ্চিত(কারণটা পরবর্তীতে বর্ণিত হয়েছে), তাই তার আনন্দেরও যেন সীমা নেই। কলেজে কোচিং শেষে বাসায় ফেরার পথে রাস্তা অতিক্রমরত গরু বা ছাগলের সারি দেখে সে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়ে, আমাকে খুঁচিয়ে অস্থির করে তুলে দামটা জেনে নিতে...। ওগুলোর বাহারী রং আর অঙ্গভঙ্গিমা লক্ষ্য করে প্রীত হয়। আমাদের বাসার অনতিদূরে এক বাসার আঙ্গিনায় সুবিশাল আকারের তিনটে গরু দেখে তো আমার নিজের চোখ ছানাবড়া। প্রহরীকে ডেকে দামটা জেনে নেই, বললো তিনটে গরুর দাম একত্রে পাঁচ লাখ নিয়েছে, আমি নিজেও সেরকমই অনুমান করেছিলাম। আমি দেখছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম আমার কন্যাটি যদি এখন কাছে থাকতো! আমাদের কেনা গরুটা সে দেখতে পারেনি বলে তার সে কি আফসোস। কারণ শরীকের গরু, প্রধান শরীকের বাড়ীর আঙ্গিনায় রাখা হয়েছে, সেটা নিরাপদ স্থান বলে। সেখান তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে তার অনুরোধে আমার মোবাইলের ক্যামেরায় তার জন্য গরুর দু’ তিনটে ছবি তুলে এনেছিলাম।

হ্যাঁ গরুর দাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। এবারে আমদানীর প্রাচুর্য্য হেতু গরুর দাম ছিল মোটামুটি গা সওয়া। অনেকের মতে দাম ফ্লাকচুয়েট করেছে বেশ, মানে ওঠানামা করেছে, সকালে এক দাম তো দুপুর বারোটায় আর এক দাম। আবার বিকেলে দেখা গেল তার চাইতেও কম বা বেশী। এজন্যে কেউ বা কোরবানীর পশু কিনে জেতার খুশীতে আনন্দে তা পড়শীর নিকট বিভিন্ন ছুতায় বর্ণনা করছে, কিভাবে, কি কায়দায় সে বিক্রেতাকে কাবু করেছে। আবার যেজন ভাবছে, বিক্রেতা তাকে ঠকিয়ে দিয়েছে, বা পাশের ভদ্রলোকটার মতো ভালো দামে নিতে পারেনি, সে তখন নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য তার শরীকদের নিকট ফ্লাকচুয়েশান থিওরীর আদ্যোপান্ত বর্ণনা করছে, আর বলছে, নিয়্যতটাই বড়ো, দামে কমবেশী সেটাতো বড় কথা নয়....। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ঈদের পূর্বদিন সকালে যে গরুটির মূল্য ছাব্বিশ হাজার পেতেও কষ্ট হচ্ছিল, সেই গরুটিই তার আগের দিন রাতে একত্রিশ হাজার টাকা দর করলেও বিক্রেতা তা ছাড়েনি,পরদিন অর্থাৎ ঈদের আগেরদিন আরো বেশী মূল্য পাবে এই আশায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে পরদিন তাকে পাঁচ হাজার কমেই তা অশ্রুসজল নয়নে ছেড়ে দিতে হয়। কেন ছেড়ে দিতে হয় তার কারণ, গত তিনদিনে ধরে সে ঘুমায়নি, কোন এক অজপাড়াগাঁ হতে নিয়ে এসেছে ঢাকায়, বেশী মূল্য পাবার আশায়, ঘুমে তার চোখ দু’টো ঢুলুঢুলু করছে, কিন্তু আশানুরূপ মূল্য পাচ্ছেনা। এদিকে বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কিছু চাঁদাও গুনতে হয়েছে। শুনেছে ঈদপূর্ব রাতে দাম আরো পড়ে যাবে, সে আশংকায় ছাব্বিশ হাজারেই বেচে দিল। অবশ্য সেই একই সাইজের গরু দেখলাম আমাদের অন্য এক পড়শী গাবতলী হতে সন্ধ্যেবেলায় কিনে এনেছেন বত্রিশ হাজার টাকায়। মহা ফ্লাকচুয়েশান যাকে বলে। ঐ গ্রাম্য সরল লোকটির কথা মনে পড়ে তখন মনে কষ্টই পেলাম। আবার ভাবছি, তার ভাগ্যতে এর চাইতে বেশী ছিলনা বলেই তো সে ঐ মূল্যই পেয়েছে, যা তার নসীবের লিখন। অবশ্য আমাদের মতো একটি অনুনন্নত ও পেছনের দিকে চলা দেশের আম জনতার ভাগ্য যে প্রভূর পরে দেশের হর্তাকর্তাদের অবিমৃষ্যকারিতার উপর ও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তা চাঁদাবাজির অসহায় শিকারদের চাইতে কে ভালো বুঝবে।

চলুন এবার একটু রান্নাঘরের দিকটায় ঘুরে আসা যাক। ঢাকার বেশ কিছু এলাকার রান্নাঘরসমূহ আজকাল অনেকটা আনপ্রেডিক্টবল হয়ে গেছে। এই গ্যাস আছে তো এই নেই। আমাদের এলাকায় (মোহাম্মদপুর দক্ষিণ) দেখা যায় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ গ্যাসের প্রেশার জিরো ছুঁই ছুঁই করে। বেলা একটা দেড়টায় আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে। তাই ঝামেলা এড়াতে গিন্নি আগের রাতেই রান্নাবান্নার কাজ অনেকটা (শুধু গোশত্ পোলাও বাকী রেখে) সেরে রাখেন। অনুসন্ধান নিয়ে জানলাম অনেকে তাই করেন। আমাদের গরুটি সকাল নয়টায় জবাই হলেও গোশত্ নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে বেলা সাড়ে বারোটা বেজে যায়। ঈদের দিনের কাজ আমার এখানেই শেষ। এরপর সব হোম মিনিস্টারের দায়িত্ব। এখন আমি নাক ডেকে একটা আয়েশী ঘুম দিতে পারি। অবশ্য গিন্নীর এক দন্ড জিরোবার কিংবা গা এলিয়ে দেবার কোন সুযোগ নেই। কাজের বুয়াও তিনি রাখেন না, ওদের কাজকর্ম পছন্দ হয়না বলে। তাছাড়া বিশ্বস্ততার ব্যাপারটিকেও উনি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। কারণ গত তিন মাসের ব্যবধানে আমাদের বিল্ডিং এ গৃহস্থের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে দুটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙ্গে চোর ঢুকেছিল, পরে প্রমাণিত হয়েছিল ঐসব ঘটনার পেছনে ছুটা বুয়াদের ঘনিষ্ট সংযোগ রয়েছে। এদিকে সন্ধ্যে অব্দি অতিথি আসার কোন চান্স নেই। কোরবানীর ঈদের এই একটি বিশেষত্ব। কারণ সবাই গোশত কাটাকুটি আর বিলি বন্টনে ব্যস্ত থাকে। আমি এ সময়টার সদ্ব্যবহার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, পিসি অন্ করে আমার প্রিয় ব্লগে প্রবেশ করি। সেখানে প্রায় ঘন্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাই। মাঝে মাঝে মোবাইল কোম্পানীগুলোর দেয়া স্পেশাল ঈদ অফারের সদ্ব্যবহার করতে বন্ধু-বান্ধবদের নিকট এস.এম.এসে. ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়, কিংবা ফোনালাপে ঈদ মোবারক জানানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মনে হয় আমার মতো অনেকেই অলস সময়টা এভাবে কাটিয়েছেন।

এ ঈদে আমাদের অতিথি আপ্যায়ন পর্বটি অন্যান্যবারের মতো জমজমাট হয়নি। কারণ টানা ছয় বছর বিদেশে থাকার পর এবারই আক্ষরিক অর্থে ঢাকায় প্রথম কোরবানীর ঈদ, রোজার ঈদ হয়েছিল গ্রামের বাড়িতে। এ স্বল্প সময়ে চেনাজানা গন্ডি ততোটা বড় হয়ে উঠেনি কিংবা, অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবার সাথে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের বাড়িতে চলে যান। অতিথি কম হবার আরো একটি নিগুঢ় কারণ আছে। খোলাসা করে বলছি। ধরুন উত্তরা সাত কিংবা এগার নম্বর সেক্টর হতে কেউ মোহাম্মদপুর বেড়াতে আসবে। আগে যেখানে সি.এন.জি. ভাড়া ছিল দেড়শত টাকা, তা সাম্প্রতিক ভাড়া বৃদ্ধির কারণে ২৪০/২৫০ এ গিয়ে ঠেকেছে। তার উপর ঈদের জন্য আলাদা আব্দার তো আছেই। একজন ছোট্ট পরিবার যদি এক বাসায় বেড়াতে বের হয়, তার কম করে এক হাজার টাকার বাজেট ধরতে হবে (আপ-ডাউন ৫০০+ কেক,বিস্কিট/আইসক্রীম আরো ৪০০), আর তিন/চার বাসায় গেলে ধরুন আরো হাজার দেড়েক টাকা ফাও। এ দূমূর্ল্যের বাজারে, কোরবানীর বাজারে একবার কোরবান হয়ে, আবার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে যাবার জন্য আরো একবার কোরবানীর ছুরির নীচে মাথা বিছেয়ে দিতে বেচারা গৃহকর্তাকে যে ধৈর্য্য আর সৎসাহসের অধিকারী হতে হবে, তা কয়জনের আছে? আমার এলাকায় এমন পরিবারও দেখেছি, যারা কসাইর সকাল বেলার গরু জবাই ও গোশত বানানোর চার্জ মোট তিন হাজার টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে তাকে বিকেলে আসার অনুরোধ করে। আর সে সময়ে কসাই আঠার শত টাকাতেই গরু জবাই ও বানান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দিয়ে যায়। সকালে আমাদের এলাকায় কসাইদের চার্জ ছিল এ প্রকারের- গরুর মূল্য প্রতি এক হাজার টাকায় কেউ ১৫০ টাকা চার্জ ধার্য্য করেছে আবার কেউ বা একশত টাকা। একটুখানি সংশোধনী দিচ্ছি- কসাইগন জবাই করেন না, জবাই করেন মসজিদের ইমাম/মোয়াজ্জিন কিংবা মাদ্রাসার তালেব এলেমগন, বিনিময়ে তাঁরা পশুর চামড়াটি তাঁদের প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে বিনে পয়সায়/স্বল্পমূল্যে পেয়ে যান, তাঁরাও দানকারীদের মতোই সওয়াবের ভাগীদার হন।

বিকেলে শুরু হয় ফকির মিসকিনদের আনাগোনা। একজন দু’জন করে, ক্রমে জোড়ায় জোড়ায়, আরো পরে দশ বারোজনের ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে। সবার হাতেই জমাকৃত গোশতের বড় বড় ব্যাগ ধরা। আমাদের ফ্ল্যাটের অদুরেই এক ধনাঢ়্য ব্যবসায়ীর বাসা। মাগরিবের নামাজে যাবার পথে দেখি তার বাসার সামনে বিরাট জটলা। ভদ্রলোকের কর্মচারীরা লোহার গেট সামান্য ফাঁক করে ওদের হাতে এক এক করে গোশত তুলে দিচ্ছেন। আবার কার আগে কে নিবে এই প্রতিযোগীতায় বেশ শোরগোল ও হচ্ছিল। ভাবলাম একটি বাসার সামনে যদি এত বড় জটলা হয়, তাহলে এক বর্গমাইল এলাকায় এরকম যদি বিশজন বড় পার্টি থাকেন আর সেখানেও গোশত শিকারীদের এমনই জটলা হয়, তাহলে ঢাকাতে বর্তমানে কত লক্ষ চরম ভিখারী মানুষের বসবাস হতে পারে? মনটা সত্যিই বিষন্ন হয়ে পড়ে, সোনার বাংলাদেশের অগনিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর চরম দারিদ্রের কথা স্মরণ করে। এরা হয়তঃ সারা বছরে এই একটি সময়েই মোটা ভাতের সাথে সামান্য গোশত-ঝোল দিয়ে খানা খাবার সুযোগ লাভ করে। কোরবানীর/রোজার ঈদ এদেশের শতকরা ক’জনের জন্য আনন্দবার্তা বয়ে আনে, তা ভাবতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।

মনে পড়ে যায় আবুধাবীতে ছয়টি কোরবানীর ঈদ ও ছয়টি রমযানের ঈদ উদযাপনের কথা। তৈল নামক কালো সোনার খনি আবিষ্কারের পূর্বে একসময় যদিও ইউ.এ.ই. চরম দারিদ্র প্রপীড়িত একটি দেশ ছিল, বর্তমানে দেশটিতে দারিদ্র কি বস্তু তা হয়তঃ একটি গবেষণার বিষয়। পুরুষ ভিখারী কখনো দৃষ্টিগোচর হয়েছে বলে মনেই হয়নি। রমজানে কখনো সখনো আপাদমস্তক কালো বোরখায় ঢাকা দু’একজন নারী দরজার বেল বাজিয়ে সচকিত করতো, দরজা খুললে দেখা যায় আরবী ভাষায় কিছু বলতে চাইছে। দু’একবার আনা গোনার পর জানা যায় ওরা প্যালেস্টাইনী উদ্বাস্ত্ত তথা গৃহহারা রমনী। অর্থাৎ স্থানীয় কেউ ভিখ করছে দেখতে আশা করা যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই অকল্পনীয় ব্যাপার। দৈবাৎ কখনো আবার মসজিদে, নামাযের সালাম ফিরানো শেষে কোন ভাগ্যাহত পাকিস্তানী নাগরিক উঠে গিয়ে মুসল্লীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যার সারমর্ম হয়, তিনি দুর্ঘটনার কারণে পংগু হয়ে গেছেন, কিংবা তাঁর হাতে বর্তমানে কাজ নেই, বাড়ি ফিরে যাবার জন্য পর্যাপ্ত টাকা নেই, তাঁকে দেশে ফিরে যেতে যেন সবাই যথাসাধ্য সাহায্য করেন।

পরিবেশ সচেতনতায়ও দেশটি বেশ উন্নতির পরিচয় দিয়েছে। কোরবানীর পশুকে ঢাকা শহরের ন্যায় যত্রতত্র যবেহ করার কোন সুযোগ নেই। মিউনিসিপালিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিশেষ বিশেষ ‘স্লটার হাউজ’ কিংবা শহরের বাইরে দূরের কোন কোন এলাকায় নির্দিষ্ট স্থানে অনুমতি সাপেক্ষে কোরবানীর পশু যবেহ করতে হয়। অর্থাৎ এ দিক দিয়ে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর হাইজিনিক লেভেল অর্জন করে ফেলেছে, যা আমাদের এ দেশের ব্যাপারে অদুর কিংবা সুদুর ভবিষ্যতেও কল্পনা করা যায়না। কোরবানীর দুই দিন পর, অর্থাৎ ১২ই জ্বিলহজ্জ তারিখে আমরা শেওড়াপাড়া ও মতিঝিলে বন্ধুদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য বের হই। আমাদের বহনকারী সি.এন.জি. যখন কোন কোন এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন কোরবানীর পশুর বর্জ হতে আসা দুর্গন্ধে পেট গুলিয়ে আসছিল। আল্লাহ আল্লাহ করছিলাম পেছনে বসা স্পর্শকাতর গিন্নি যেন ওয়াক্ ওয়াক্ শব্দটি উচ্চারণ করে না ফেলেন। পরে অবশ্য কন্যাদ্বয়ের মুখে জেনেছিলাম তিনি সেকাজটি করেছিলেন, সাথে রাখা পলিথিন ব্যাগের কল্যাণে বড় কোন ঝামেলা না পাকিয়েই। গাড়ির শব্দের কারণে তা ড্রাইভার বা আমি টের পাইনি। বেশ বাঁচা বেঁচেছি। একবিংশ শতাব্দিতে এসেও আমাদের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের কর্তাদের ঢাকার মতো রাজধানী শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার ন্যুনতম কোন উদ্যোগ বা মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়না। আশ্চর্য্য হচ্ছিলাম ভেবে, এই ঢাকা শহরেই নাকি আগামী ফেব্রুয়ারী মাসে বিশ্ব ক্রিকেটের আসর জমাতে চলছেন আমাদের সরকার বাহাদুর।

লেখার শুরুতে বর্ণিত শব্দগুচ্ছ আবার যোগ করছি - কোরবানীর ঈদ আসছি আসছি করে এসে গেছে, এসে আবার চলেও গেছে। তা কি ঢাকাবাসীকে ঈদের সত্যিকার আনন্দ দান করতে পেরেছে? প্রশ্নটা আমার মনে বার বার উঁকি দিয়ে যায়। আমরা আজ হতে বিশ পঁচিশ বছর পূর্বে ঢাকায় যেভাবে ঈদ উদযাপন করেছি, আনন্দ করেছি সেভাবে এখনকার প্রজম্মরা কি আনন্দ উপভোগ করতে পারে? আমরাই কি পারি মন খুলে সবার সাথে কথা বলতে, নির্মল হাসি আনন্দে মেতে উঠতে সেই আগেকার মতো? তখন হয়তঃ বর্তমানের মত ফ্যান্টাসী কিংডম, ওয়ান্ডারল্যান্ড, শিশুপার্ক জাতীয় এতো বিনোদন কেন্দ্র ছিলনা, কিন্তু ছিলো প্রচুর খোলা জায়গা, খেলার মাঠ, যেখানে শিশু কিশোররা তাদের ইচ্ছেমতো ঘুরাফিরা এবং খেলাধুলা করতে পারতো, গাঁটের পয়সা খরচ না করেই।

তখনো ফকির মিসকিন ছিল, কিন্তু এখনকার মতো দৃষ্টি অসহনীয় এতো বেশী ছিলনা, তখনো জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে ঈদকে কেন্দ্র করে, কিন্তু এখনকার মতো গলাকাটা দাম বাড়েনি, এখনকার মতো তখনো অতিথি আপ্যায়ন ছিল, দল বেঁধে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর রেওয়াজ ছিল; কিন্তু বর্তমানের অতিথি আপ্যায়নের সাথে তখনকার দিনের আপ্যায়নে যে আপনত্ববোধ, উচ্ছাস, আর নাড়ীর টান ছিল তার কি কোন তুলনা চলে? তখনকার দিনে দশতলা, বিশতলা দালান ছিলনা, কিন্তু সেই না থাকাটা কিন্তু টিন এজড্ কিংবা কিশোর কিশোরীদের নির্মল আনন্দ আর ঘুরে বেড়ানোর সহায়ক ছিল। তখনকার দিনের আনন্দ আর বেড়ানো ছিলো যেনো প্রকৃতির সাথে মিতালী। আজকালকার হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো যেন ওদেরকে পংগু করে দিয়েছে, ওদেরকে ঘরের কোনে আবদ্ধ করে দিয়েছে। অবৈধ প্রেমের কাহিনীতে আগাগোড়া মোড়ানো নাটক আর ধুম ধাড়াক্কা মার্কা টিভি প্রোগ্রাম, ইন্টারনেট/ফেসবুক, জনে জনে সবার হাতে মোবাইল ইত্যাদি ওদের এই স্বেচ্ছা গৃহবন্দীত্বকে আরো প্রগাঢ় হতে সাহায্য করছে। এমনো দেখেছি খুব নিকটাত্বীয় কারো বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। কিন্তু প্রায় ঘন্টা,দু’ঘন্টা কাটিয়ে এলেও দেখা গেল বিদায়ের মূহুর্তেও গৃহের বড় মেয়েটির দেখা নেই। মনে মনে ভাবি হয়তো সে ঘরে নেই। কিন্তু প্রশ্ন করলে জানা যায় সে দরজা বন্ধ করে তার কামরাতেই অন্তরীন, নিজেকে নিয়ে মহাব্যস্ত। কে এলো গেলো নিজে তো তার ধার ধারেই না, বাবা-মাও তাকে ডেকে এনে দেখা করাবে, বা অতিথিদের আপ্যায়নে বড়দের সহায়তা করবে এমন আদেশ দেবার গরজও দেখা যায়না অনেকের মাঝে। অর্থাৎ ওরা দিন দিন যেন সবাই ফার্মের মুরগীসম হতে চলেছে। ফার্মের মুরগীতে যেমন কোন গুন নেই, বসে বসে ঝিমুনই প্রধান গুন, এদের অবস্থাও অনেকটা তাই। সব কিছুতেই ঐ কাজের বুয়াই ভরসা। কি এক যুগসন্ধিক্ষণে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি।

রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা আমাদের আজ এমন এক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে যে আমরা অনেকে নিজ দেশেই পরবাসী। কথা বলার নেই স্বাধীনতা, কখন কে আবার জঙ্গী/জেহাদী রং মেখে রিমান্ডে নিয়ে যাবে সর্বক্ষণ সেই ভয়ে থাকেন টুপি-দাঁড়িওয়ালা তথা ইসলামপ্রিয় মানুষগুলো। এই তো ঈদের পরদিনই নাকি প্রধান বিচারপতির বাসায় ককটেল বিষ্ফারণ ঘটিয়েছে কে বা কারা, যদিও বিনা প্রমাণেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে দিয়েছেন ‘ওরা তারাই যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, ওদের চিনতে নাকি বাকি নেই’। এদিকে প্রধান বিরোধী দল আবারো হরতাল ডেকেছে। সেই হরতালকে প্রতিরোধের জন্যই এসব গুপ্ত বোমা, আত্মঘাতি বোমার আগমন শুরু হয়েছে কিনা, তাও ভাবছেন অনেকেই। অর্থাৎ ঈদের আনন্দ না ফুরোতেই শুরু হয়ে গেল হট্টগোল। তা আনন্দই বা আর কি হয়েছে! এমন যে দেশের অবস্থা তাতো নুতন নয়। মনে হয় যেমন করে কোন অপারেশনের রুগীকে তার অপারেশনকালীন ব্যথা হতে নিষ্কৃতি দেয়ার জন্য অপারেশন টেবিলে শুইয়ে এ্যানেসথেসিয়ার ইঞ্জেকশান দিয়ে কিছুক্ষণ অচেতন করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়, ঠিক তেমনি যেন ঈদ ঢাকাবাসীকে ঈদ নামক এ্যনেসথেসিয়ার ইঞ্জেকশান দিয়ে চব্বিশ ঘন্টার জন্য অচেতন করে রেখেছে, সব ব্যথা-বেদনা হতে মুক্তি দিয়েছে, এই আর কি। ঈদ শেষ, তার পুরনো ব্যথা-বেদনার আবার প্রত্যাবর্তন। আবারো দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ট্রাফিক জ্যামের মহাযন্ত্রণা, মূল্যবৃদ্ধির যাঁতাকলে নিষ্পেশিত হওয়ার অব্যক্ত যাতনা, ইভ টিজিং এর ভয়ে কিশোরী ও তাদের অভিভাকদের নিঁদ হারাম, অমুককে রিমান্ড, তমুককে উচ্ছেদ, অমুক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় এক ডজন হতভাগা মানবের অপমৃত্যু, কর্মস্থল হতে বাসায় ফেরার পথে কোন গার্মেন্টসকর্মীকে ধরে নিয়ে গনধর্ষণ, দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে তমুকের লক্ষ টাকা ছিনতাই ও পৈতৃক প্রানটাও বন্ধক দিয়ে দেয়া, এসব হাজারো নিদারুন যন্ত্রণার মাঝে আবার ডুবে যেতে হবে অসহায় ঢাকাবাসীকে!!
*****
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MohammadShahjahan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy