যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ মাসে মিয়ানমার সফর করেছেন। এটা হচ্ছে ১৯৫৫ সালের পর গত ৫৬ বছরে কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর। পাশাপাশি, হিলারি ক্লিনটনের শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে আসার যে নির্ঘণ্ট ছিল তা অনির্দিষ্টকালের জন্য ভবিষ্যতের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
এটা এখন স্পষ্ট যে, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিপথে মিয়ানমার সবিশেষ গুরুত্ব নিয়ে ওপরে উঠে এসেছে; অপর দিকে, বাংলাদেশ নিচের দিকে নেমে গেছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার দীর্ঘকাল ধরে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এক ভাষণে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় শক্তিরূপে ‘এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার ভূমিকাকে জোরদার করবে’ (৩০ নভেম্বর সংখ্যা নয়া দিগন্তে প্রকাশিত আমার ‘যুক্তরাষ্ট্র চীন সম্পর্ক’ শীর্ষক কলাম দ্রষ্টব্য) চীনকে স্পষ্টত প্রতিপক্ষ করেই ওবামা এ বক্তব্য প্রদান করেন। মিয়ানমারকে চীনের আধিপত্য বলয় থেকে বের করে আনার ওপর যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করে প্রয়াস চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি মিয়ানমার সফর করেছেন। তার সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে। মিয়ানমার সফরে হিলারি ক্লিনটন গত বছর সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রধানের সাথে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন। অপর দিকে, গৃহে অন্তরীণ বিরোধীদলীয় নেত্রী ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামী অং সান সুচির সাথে হিলারির অত্যন্ত আবেগপূর্ণ আলিঙ্গন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।
চার দশকের অধিককাল ধরে মিয়ানমার-চীন সম্পর্ক এমন নিবিড়ভাবে গড়ে উঠেছে যে, চীন মিয়ানমারের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে এবং দেশটির বিপুল খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রধান গন্তব্য হচ্ছে চীন। মিয়ানমারের আমদানি বাণিজ্যের বেশির ভাগ পণ্যই আসে চীন থেকে এবং মিয়ানমারের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র মান্দালয়ের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মালিকানা হচ্ছে চীনাদের হাতে! হিলারি ক্লিনটনের সফরের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমার সরকার নোবেল বিজয়ী সংগ্রামী নেত্রী অং সান সুচিকে অন্তরীণ অবস্থা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। দুই শ’র বেশি রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। উপরন্তু, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ উ মিন্ট যিনি মিয়ানমার সরকারের বিরোধী পক্ষের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাকে মিয়ানমার সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনা হয়েছে। সর্বোপরি চীনের সাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে বহু বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মিয়িৎসোন জলবিদ্যুৎ নির্মাণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে প্রীত করেছে, যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় মিয়ানমার এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের মইয়ে অনেক ওপরের দিকে উঠে এসেছে। এ দিকে বাংলাদেশ সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রথম চিড় খেয়েছিল দু’বছর আগে যখন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকার কিছু বৈরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সে সময় হিলারি ক্লিনটন ফোনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে কথা বলেন এবং ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় আচরণ হবে না মর্মে নিশ্চয়তা চান। বাংলাদেশ সরকারের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো জানতেন না, অথবা জানলেও গুরুত্ব দেননি যে, মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হিলারি মুহাম্মদ ইউনূসের কেবল সহপাঠী ছিলেন না, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ভক্তও ছিলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার দেয়ার জন্য যে আবেদন পেশ করা হয় তাতে অন্যতম নোবেল বিজয়ীরূপে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন (স্পষ্টত স্ত্রী হিলারির অনুরোধে) সুপারিশে দস্তখত করেছিলেন। পারস্পরিক সম্পর্কের এই পশ্চাৎপটের কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ড. ইউনূসের ব্যাপারে শুরুতেই প্রটোকল বা কূটনৈতিক কর্মপদ্ধতির বাইরে গিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলে নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আশ্বাস সত্ত্বেও ড. ইউনূসের প্রতি ন্যায়বিচার হয়েছে মর্মে হিলারি ক্লিনটন ‘কনভিন্সড’ যে হতে পারেননি, তা স্পষ্ট হয়েছে ২৬ অক্টোবর হিলারি প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে যে চিঠি লেখেন তাতে। এ পত্রে হিলারি গ্রামীণ ব্যাংক, সুশীলসমাজের অবাধ অধিকার, মিডিয়ার স্বাধীনতা ইত্যাদিসহ কিছু বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র দেখতে চায় বলে ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহভরে লক্ষ করছে যে, ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যেভাবে ট্রানজিট সুবিধা আদায় করে নিয়েছে এবং বাংলাদেশের একাধিক বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের উপস্থিতি ও প্রভাব বাংলাদেশে সমপ্রসারিত করেছে তা বাংলাদেশে চীনের প্রভাবকে সংযত এবং সম্ভবত সঙ্কুচিত করতে সহায়ক হবে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে গড়ে তোলার তাগিদে এবং বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের অধীনে চলে যেতে থাকার কারণে বাংলাদেশের সাথে আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করছে না।
এ কারণেই হিলারি ক্লিনটনের আশু বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিবেচনায় গুরুত্বের আরো নিম্ন পর্যায়ে চলে যেতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
moyeenulalam@hotmail.com
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২২/১২/১১] |