|
প্রথম সুইজারল্যান্ড (জুরিখ) ভ্রমণ
মোকাররম হোসেন |
|
২০০৬ মাঝামাঝিতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে একটা বড় আকারের কনফারেন্স সম্পর্কে জানতে পারি। বছরের শেষের দিকে কনফারেন্স পেপার পাঠাতে হবে। যথা সময়ে পাঠিয়েও দিলাম। জুরিখ দুনিয়ার অন্যতম ব্যয়বহুল টুরিষ্ট শহর। খুব বড় কনফারেন্স। তাই হোটেল পাওয়া কষ্টের, আগে থেকেই বুকিং দিতে হবে। সাথে কিভাবে যাব, তার একটা প্রাথমিক পরিকল্পনাও দিতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে ভার্সিটিতে (কাইজার্সলাউটার্ণ, জার্মানী) পিএইচডি করতাম সেখান থেকে জুরিখের দুরত্ব প্রায় ৬০০ কিলোমিটার। প্রাইভেট কারেও যাওয়া যায়। ট্রেন যোগাযোগও ভালো। আমাদের প্রায় জনা দশেক কলিগ যাচ্ছেন সেখানে। এর মধ্যে পিএইচডি সহপাঠি রোমানিয়ান আকেজান্ডার (আলেক্স) প্রাইভেট কারে যেতে চায়। সাথে তার সহধর্মিনী মনিকা। আলেক্স প্রস্তাব দিল, আমি ইচ্ছে করলে তাদের সাথে শেয়ার করে যেতে পারি। লোভনীয় প্রস্তাব। কারন, প্রাইভেট কারযোগে যেতে পারলে দীর্ঘক্ষণ ধরে সুইজারল্যান্ডের গ্রীস্মকালীন প্রকৃতি দেখে দেখে যাওয়া যাবে। দরকার হলে রাস্তায় থেমে বিশ্রাম নেয়া যাবে, ছবিও তোলা যাবে। এতে খরচও কম পড়বে। যদিও কনফারেন্স খরচ পুরো বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়।
কনফারেন্স শুরু হবে সোমবার সকালে। চলবে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত (১৬-২০ জুলাই, ২০০৭)। কাইজার্সলাউটার্ণ থেকে জুরিখ যেতে সময় লাগবে প্রায় সাত ঘন্টা। রওয়ানা দিলাম রোববার দুপর দুটায়। দীর্ঘ পথে জার্মানীর ফ্রাইবুর্গ হয়ে ঢুকলাম সুইজারল্যান্ডের বাসেল (Bassel) সীমান্তে। সাথে পাসপোর্ট ছিলো। দরকার হয়নি। দুদেশের সীমান্তে শুধু মাত্র আমাদের গাড়িতে সুইজ সড়ক পরিবহনের ষ্টীকার ছাড়া আর কিছু লাগলো না। এর জন্য টোকেন ফি দিতে হলো বিশ ইউরো । ব্যস, সুইজারল্যান্ডে ঢুকে গেলাম। বাসেল (Bassel) থেকে সোজা হাইওয়ে হয়ে জুরিখ। গ্রীস্মকালীন সুইজারল্যান্ড আসলেই দেখার মতো, প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস করানো কঠিন। পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এতো হাইস্পিডের হাইওয়েতে ইচ্ছে থাকলেও থেমে ছবি তুলতে পারিনি। পাহাড়ের দুধার দিয়ে একে বেকে যাচ্ছে হাইওয়েও। জুরিখ পৌছলাম বিকেল ৯টায়। তখনো সন্ধ্যা হতে ৪৫ মিনিট বাকি। সাত ঘন্টার জার্নি ভালোই কেটেছে। রাস্তায় খাওয়ার জন্য আমরা যথেষ্ট রসদ নিয়েছিলাম। মনিকাও বেশ ঘরোয়া মেয়ে। তাদের সব খাওয়ার আমার সাথে শেয়ার করেছে। এখানে বলে রাখি, জুরিখ ভ্রমনের এক মাস পরে ২০০৭ আগষ্ট ভিয়েনায় দেখা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্তের বার্তা সম্পাদক মাসুমুর রহমান খলিলী ভাইয়ের সাথে। খলিলী ভাই প্যারিস থেকে জুরিখ হয়ে ভিয়েনা এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জম্নু-কাশ্মীরও নাকি দেখতে এরকরম। যদিও কাস্মীরের উপর দুচারটা ভ্রমণ কাহিনী ছাড়া তেমন কিছু পড়া/দেখার সুযোগ হয়নি।
এক সপ্তাহের জন্য হোটেল বুক করেছিলাম, ইয়থ হোষ্টেল। প্রতিরাতে পয়ত্রিশ ইউরো। আল্লাহ মাবুদ! ( ইয়থ হোষ্টেল ইউরোপের প্রায় সব শহরেই আছে। দামে কম, টিপটপ, ব্যাচেলদের জন্য বেশ মানানসই। কিন্তু সেগুলোতে যে তিন/চার জন করে রাত্রি যাপন করে তা আগে জানতাম না) জুরিখ ইয়থ হোষ্টেলে এক রুমে ৪ জন! ( খুব ব্যয়বহুল শহর হওয়ায় এখানে এক রুমে ৪ জন! অন্যান্য শহরে একরুমে দুজন/তিন জন করে থাকে সেটাই শুনেছিলাম) রাতে ঘুম তো হলোই না। সারা রাত একেক জনের নাক ডাকায় ঘুম হয় কি করে! (তার মধ্যে একজন ছিলো ভিয়েতনামী, তার কি নাক ডাকা রে বাবা!!) কি আর করা! রাত না পোহাতেই ফজর নামাজ পড়ে হালকা নাস্তা সেরে কনফারেন্স ভেন্যু জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় ও ETH এর দিকে রওয়ানা দিলাম ( ETH সুইজারল্যান্ডের তো বটেই বিশ্বের অন্যতম নামকরা শিক্ষাকেন্দ্র)। পথেই দেখা আমাদের প্রফেসর এর সাথে। উনি কনফারেন্স অন্যতম আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে প্রেজেন্টেশান দিতে যাচ্ছেন।
আমাকে ঘুম জাগা লাল টক টক চোখ দেখে মুচকি হেসে বললেন,
----"তুমি ঊঠেছো কোথায়?"
----ইয়থ হোষ্টেলে!
----মানে! ইয়থ হোষ্টেলে কেন? তুমি কি আগে ভালো হোটেল পাওনি?
---- না মানে, আমি তো ভেবেছিলাম, জুরিখ এই সময় (গ্রীস্মকালীন) ভালো হোটেল পাওয়া কঠিন, তাই চেষ্টাও করিনি। আর ইয়থ হোষ্টেলের অভিজ্ঞতাটাও নিলাম!
----- দেখে তো মনে হচ্ছে কাল রাতে তোমার ভালো ঘুম হয়নি। তুমি পারলে আমাদের হোটেলে চলে আসতে পারো (আমার বেশীর ভাগ সহকর্মী ছিলেন কনফারেন্স ভেন্যুর পাশেই একটি তিনতারা হোটেলে)। যাই হোক আর কথা না বাড়িয়ে আমরা প্রথম দিনের সেশানে চলে গেলাম।
প্রথম দিনের কনফারেন্স শেষে খুজছিলাম কোন বাংলাদেশী এসেছে কি না। বিশাল কনফারেন্স, প্রায় সাড়ে তিন হাজার অংশগ্রহনকারী। ভাগ্যক্রমে পেয়ে গেলাম জার্মানীর আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিরত বুয়েট সহপাঠি কাঊসারকে। কাউসার রোবোটিক্স নিয়ে কাজ করে। রোবটের হাত, পা কি সব সিমুল্যাশান! যদিও তার কাজের ফিন্ড বুঝি কম। যত এড়িয়ে যাই, ততই সে জোর করে রোবোটিক্স এর থিউরী বুঝিয়ে ছাড়বেই! ওকে পেয়ে বাংলা বলার একজন সাথী পেয়ে গেলাম। এরপর সেই জেদ ধরলো, কনফারেনন্স অংশগ্রহণকারীর তালিকা দেখে খুজে বের কর, আর কোন বাংলাদেশী এসেছে কি না। শেষ মেষ খুজে পেলাম ড. আসাফোদ্দৌলাহ নামের একজনকে। পরের দিন জনাব আসাফোদ্দৌলাহ সাথে দেখাও হলো। তিনি মনে হয় ম্যাথভিত্তিক কিছু সফটওয়ার (math-based software) ডেভেল্পমেন্টের চেষ্টা করছেন বাংলাদেশে। কিছু দিন আগে আমেরিকা থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরেছেন। মজার ব্যাপার হলো, উনি আমাদের দুইজনের সাথেই বেশী কথা বলতে আগ্রহ দেখালেন না। আমাদের প্রচন্ড আগ্রহ, অপরদিকে তার অনাগ্রহ আমাদের বেশ ব্যথিতই করেছিল বিদেশের মাঠিতে। ড. আসাফোদ্দৌলাহ আচরণে কাঊসার বেশী মর্মাহত হয়। আর হওয়ার মতোই ছিল। তার আগ্রহটা বেশী ছিল। সেদিন বিকেলে শহরতলীতে ডিনার করতে যেয়ে দেখলাম, আসাফোদ্দৌলাহ সাহেব জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী ঈশিতার সাথে হোটেল থেকে বের হচ্ছেন। যতটুকু মনে পড়ে, পত্রিকায় পড়েছিলাম আসাফোদ্দৌলাহ-ঈশিতা স্বামী-স্ত্রী। বাংলাদেশের শোবিজ কন্যারা নাকি বিয়ে করেন ছেলের টাকা দেখে। ড আসাফোদ্দৈলা বনাম ঈশিতার বয়সের পার্থক্য দেখে বুঝলাম, কথাটা মনে হয় মিথ্যা নয়।
জরিখ শহরঃ এখানে বলে রাখা ভালো সুইজারল্যান্ডের অফিসিয়াল ভাষা এক হালি। প্রধান ভাষা জার্মান ও ফ্রান্স। যেমন জুরিখের ভাষা জার্মান, অপরদিকে জেনেভার ভাষা ফ্রেন্স। জার্মানী থেকে গিয়েছি, তাই জার্মান অধুষ্যিত জুরিখে আমাদের ভাষার তেমন সমস্যা হয়নি। সুইজারল্যান্ডের প্রধান এই শহর সারাবিশ্বের ভ্রমণকামী মানুষদের তীর্থস্থান কেন তা বুঝা যায় খুব সহজে। জুরিখ বহু বছর ধরে জীপনযাপনের (high quality of living) জন্য বিশ্বের এক নম্বর শহর হিসেবে স্থান দখল করে আছে। একটা জিনিস লক্ষনীয়। পরিবেশ দুষনের ব্যপারে তারা কত সচেতন তা জুরিখ লেকের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকালেই বুঝা যায়। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা মুলত ট্রাম নির্ভর। মজার ব্যপার দেখলাম অফিস টাইমে প্রচুর লোক হেটে অফিসে যাচ্ছে, যা দুনিয়ার আর কোন শহরে দেখিনি। উইকিও তাই লিখেছে, দুনিয়ার পাবলিক পরিবহন (বড় বাস, ট্রাম, পাতাল ট্রেন ইত্যাদি) সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করে জুরিখবাসী। এতে দুষনও কম হয়, সাশ্রয়ীও।
বিশ্বের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্টান গুলোর হেড অফিস প্রধানত জুরিখে। আর স্বর্ণের ব্যবসাও নাকি এখানেই প্রধান। হাই-ফাই ঘড়ির জন্য তো জুরিখ বিখ্যাত সেই শত বছর থেকে। কয়েকটি দোকানে ঘড়ির দাম দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। অবশ্য বেশ কিছু আরব ভ্রাতাকে বিবি বাচ্চাসহ কেনা কাটা করতে দেখলাম। পেট্রো ডলার আছে, দুনিয়ায় গঠনমুলকভাবে কিছু ব্যয় না করলে মৈজমাস্তি করে তো ব্যয় করতে হবে, তাই না! শহরের রাস্তার মাঝে মাঝেই চমতকার সব ফোয়ারা। সেগুলো থেকে ঠান্ডা পানি বের হচ্ছে। অনেক টুরিষ্ট তা আবার পানও করছে। ৩৬-৩৭ ডিগ্রী তাপমাত্রায় আমরাও তা পান করে তেষ্টা মেটালাম। কনফারেন্সে আগত আরেকজন বাংলাদেশীর সাথে দৈব্যক্রমে (ট্রামে) পরিচয় হয়েছিল। তিনি ড. আমিনুল ইসলাম (নামটা ঠিক সিওর না। মনে নাই)। ইউকে থেকে এসেছেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম উনি কিং সৌউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহর আলীর ছেলে। ড. মোহর আলী ছিলেন প্রখ্যাত ইতিহাস গবেষক ও হিষ্ট্রি অফ মুসলিম বেঙ্গলের (History of Muslim Bengal) লেখক ও বাংলাদেশীদের মধ্যে একমাত্র বাদশা ফয়সাল পুরস্কার বিজয়ী। তার কিছুদিন আগে তিনি ইন্তেকাল করেছিলেন (১লা এপ্রিল ২০০৭)।
প্রতিদিন কনফারেন্স শেষে কোথাও না কোথাও বের হতাম। তবে অনেকের সাথে গাইড দিয়ে আল্পস পর্বত ভ্রমণের সুযোগটা নিতে পারিনি, ব্যয়বহুল বলে। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় শহরের ভিতর কিন্তু বেশ উচু পাহাড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যেতে হলে বাস বা ট্রামে করে যেতে হয়। সাইকেলে পাহাড়ের উপরে উঠা কঠিন। সেখান থেকে পুরো শহরটা ভালো দেখা যায়। ক্যাম্পাস থেকে সামনে তাকালেই আলপ্স পর্বতের সাদা সাদা তুষারও দেখা যাচ্ছে। সেসময় শহরের তাপমাত্রা ছিলো ৩৬-৩৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। একদিকে প্রচন্ড গরম (বাংলাদেশের মতো ঘাম ঝড়ানো আদ্রতা নেই) অপরদিকে দূর থেকে আল্পসের সাদা তুষার দেখতে আসলেই মনোরম লাগছিলো। দিনের শেষে ট্রাম/বাসে করে পুরো জুরিখ ঘুরে ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় ছিলো জুরিখ লেক। লেকের পানি যে কত স্বচ্ছ্ব হতে পারে তা জুরিখ লেক না দেখলে বলা মুসকিল। লেকে ছোট ছোট বোডে ভাসমান অসংখ্য টুরিষ্ট। লেকের ধারে হাটার বা বসার চমৎকার ব্যবস্থা।
এখানে একটা কথা বলে রাখি, দেশে তখন চলছে মইন-ফকরুদ্দীন জুটির জরুরী জমানা। ১৬ জুলাই এ জু্রিখে বসে বিবিসির নিউজ সাইট খুলতেই দেখি শেখ হাসিনাকে টানা হেচড়া করে গ্রেফতারের সেই বিখ্যাত ছবি। দেশের কথা চিন্তা করে মনটা কিছুটা হলেও খারাপ হয়ে গেল। কনফারেন্সে সব চেয়ে ভালো লেগেছে সুইসদের অতিথি আপ্যায়ন। সাড়ে তিন হাজার অংশগ্রহণকারী, কিন্তু এতো আয়োজন! খাওয়ার এতো আইটেম, শুধু ভাত ছাড়া! অনেক কনফারেন্সে গিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে জুরিখের আপ্যায়নটা ছিলো স্মরণ রাখার মতো। ভেতো বাঙ্গাগীর ভাত ছাড়া কি আর চলে? দ্বিতীয় (জুরিখে আসার তৃতীয় দিন) দিনে আর ভাত না খেয়ে পারছি না। কাঊসারসহ বের হলাম বাঙ্গালী/ইন্ডিয়ান/পাকিস্থানী রেষ্টুরেন্টের খোজে। ভাগ্যক্রমে বিশ্বদিদ্যায়নের পাশেই পেয়ে যাই একটি পাকিস্থানি রেষ্টুরেন্ট। ভাত, মাংস খেয়ে কিছুটা হলেও জানে পানি ফিরে পেলাম।
জুরিখ ভ্রমনের কয়েকটি জিনিস মনে থাকবে অনেকদিন। ইয়থ হোষ্টেলের ক্যাচাল, কনফারেন্স আয়োজকদের আতিথীয়তা আর সুইজারল্যান্ড ও জুরিখ লেকের মনোরম দৃশ্য।
লেখকঃ গবেষক, জার্মানী, ইমেইল, mokarram76@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MokarramHossain |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|
কবে যে যামু........!!!!! :'(