মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; বিকেল ০৫:৫৭ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার গৃহকর্মীরা

মোকাররাম হোসাইন এ বাকী

ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিড়িয়া খুললেই ইদানিং এমন কিছু অরুন্তদ দৃশ্য চোখে ভেসে আসে, যা দেখলে হয়ত পাপীষ্ট সীমার বেঁচে থাকলে সেও ভয়ে আঁতকে উঠতো। আর তাহলো গৃহকর্মীদেরকে অমানুষিক নির্যাতনে হত্যার সে বিভৎস চিত্র। যে সময়টিতে সরকার নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে কোরআন সুন্নাহ বিরোধী তথা কথিত নারী উন্নয়ন নীতিমালা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তেমনি মুহূর্তে নারী নির্যাতনের মাত্রা যেন দ্রব্যমূল্যের মত সমানতালে লাগামহীনভাবে বেড়ে চলছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজে একজন নারী হওয়া সত্বেও নারীরা আজ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে অসহায় গৃহকর্মী নারীরা অনেক বেশী নির্যাতনের শিকার। যে গৃহকর্মীরা গৃহকর্তাদের অতি আদরের সন্তান লালন পালন থেকে শুরু করে ঘরদোর গোছ গাছ ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, কাপড় কাচা, রান্না বান্না সব কিছুই করে, অথচ তাদের কোপালে ঝুঁটে বাসি পোড়া খাবার, অকথ্য গালি গালাজ আর নির্মম শারীরিক নির্যাতন। গত বাইশ দিনে শুধু ঢাকা শহরেই দুজন কাজের মেয়েকে নির্যাতনের মাধ্যমে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অরেকজন এখনো ঢাকা সিএমএইচ এর বেড়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছে। এছাড়াও দেশের আনাচে কানাচে আরো কত গৃহকর্র্মী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার হিসেব কে রাখে? আমরা শুধু চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডগুলো মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারি। উল্লেখিত দুটি আলোচিত গৃহকর্মী হত্যাকান্ড ও একটি নির্মম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।

সুলতানা আক্তার তিশা:
বি-বাড়িয়ার কড়ইতলী গ্রামের ৭ বছরের ফুটফুটে সুন্দর ছোট্ট একটি অবুঝ শিশু সুলতানা আক্তার তিশা, যে বয়সে স্কুলের ব্যাগ নিয়ে নেচে গেয়ে স্কুলে ছুটে চলা এবং সাথীদের নিয়ে কানামাছি গোল্লাছুট খেলার কথা, ঠিক সে বয়সেই এ মেয়েটিকে পারিবারিক দন্যতার কারণে দু-মুঠো অন্নের জন্য গৃহকর্র্মী হিসেবে যোগ দিতে হলো, এমন ছোট্ট নিঃষ্পাপ শিশু কি এমন দোষ করতে পারে? যার জন্য শিশুটিকে প্রাণদন্ড দিতে হবে! হ্যাঁ সেই কাজটিই করলো সিংগাপুর প্রাবাসী পাষন্ড সোহেল এবং তার পাষাণী স্ত্রী ফাহমিদা। তারা শিশু তিশাকে পিটিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। মেয়েটির সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানীর মুগদাপাড়ায় যা ২৯ শে এপ্রিল আমার দেশ পত্রিকা সহ অনেকগুলো জাতীয় দৈনিক এ এসেছে।

তাসলিমা আক্তার:
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চানপুর গ্রামের ১৪ বছরের একটি মেয়ে। কৈশর সবে ছঁই ছঁই করছিলো, ছোট্ট হৃদয়ে ছোট ছোট কত স্বপ্ন ছিলো। প্রজাপতির মত স্বপ্নের রাজ্যে স্বাধীনভাবে বিচরণ করার এ সময়ে অভাবের তাড়নায় তাকেও গৃহকর্মীর পরাধীনতার জিঞ্জির পরে যোগ দিতে হলো নিউ ইস্কাটনের ১৫ নং কুইন্স গার্ডেনের বিদ্যূৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা শহীদুল ইসলামের বাসায়, কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতে শহীদুলের বদমেজাজী স্ত্রী হ্যাপী আক্তার অমানবিক নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে তাসলিমাকে, একটি নব কিশোরীর সব স্বপ্নের সাথে তাকেও পাষন্ডরা বিদায় করে দিল দুনিয়া থেকে। এ মেয়েটিরও পুরো শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। লোমহর্ষক এ ঘটনাটি গত ১৯ শে এপ্রিল দেশের অনেকগুলে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।

হাসিনা আক্তার :
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পুকুদিয়ার মাইছড়া গ্রামের ব্রিকফিল্ড শ্রমিক হানিফ মিয়ার ১১ বছরের মেয়ে। আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের কারণে ৬ সন্তানের সংসারের ভার বহন করা হানিফ মিয়ার পক্ষে অসম্ভব হওয়ায় শিশু কন্যা হাসিনা আক্তারকে গৃহকর্মী হিসেবে দেয়া হয় ঢাকায় বসবাস কারী মেজর আক্তার শাহেদের বাসায়। আক্তার শাহেদের স্ত্রী নুসরাত জাহান নিপার হিংস্রতায় শিশুটি আজ মৃত্যর পথযাত্রী। এমন অমানুষিক নির্যাতন তার উপর করা হয়েছে যে, মেয়েটির পুরো পিঠে শুধু দগদগে ঘা। পঁচে কালো হয়ে গেছে তার পুরো পিঠ,শরীরে হাঁড়গুলো একটা একটা করে গণনা করা যাবে। দেখলে যে কারো চোখে পানি না এসে পারে না। মেয়েটিকে প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিলো অবস্থার অবনতি হওয়াতে সেখান থেকে ঢাকা সিএমএইচ এ ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের বেড়ে এ মেয়েটি এখনো মৃত্যুর প্রহর গুণছে।

অবাক ব্যাপার হলো এ তিনটি লোমহর্ষক ঘটনার সাথে যারা জড়িত তারা নিজেরাও নারী। কালো টাকা, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে বিলাসী জীবন যাপন কারী মানুষগুলো অন্ধ হয়ে গেছে। তাদের নিজেদের ডাইরীতে হয়ত অপরাধ বলতে কিছু নেই। থাকবেই বা কেমন করে, তাদের কারো স্বামী সেনাবাহিনীর মেজর, আর কারো স্বামী সরকারী বড় কোন আমলা। ক্ষমতা আছে, আছে টাকা। এক-দুই লাখ ছিটিয়ে দিলে সব শেষ। অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় দেশের আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। যার কারণে একটির পর একটি তিশা, তাসলিমার মত কাজের মেয়ের জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। এবং অসংখ্য কাজের মেয়ে মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের খবর রাখার যেন কেউ নেই। তারা যেন নিজ দেশে পরবাসী। এই অসহায় নির্যাতিত মানুষের প্রতি সরকারের কোন দায় আছে বলে মনে হয় না। দায় থাকবেই বা কেমনে?

সরকার এবং সরকারের আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনী শুধু বিরোধী মত দমনে ব্যস্ত, এই সুযোগে অপরাধীরা আদিম নেশায় মেতে উঠেছে। প্রতিদিন দেশে অসংখ্য খুন, মৃত লাশকে খন্ডবিখন্ডিত করা, ধর্ষণ, অপহরণ, লুটতরাজের ঘটনা ঘটেছে অহরহ। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরা যেন এক নব্য জাহেলিয়ার যুগে প্রবেশ করেছি। অসহায় মানুষগুলোর জীবন আজ একেবারে মূল্যহীন। বাক স্বাধীনতা আজ রুদ্ধ, আসলে আমরা কি কোন রাজতান্ত্রিক দেশে বসবাস করছি? কথা বললেই মামলা- হামলা। দিনবদলের শ্লোগান আর ডিজিটাল শাসনে যদি মানুষকে অভুক্ত থাকতে হয়, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, সেই দিনবদল আর ডিজিটাল শাসন গরীবেরা চায় না। সরকারের কাছে অসহায় মানুষগুলো চাওয়া পাওয়া সীমিত, দুমুঠো অন্ন, একটু মোটা বস্ত্র, মাথাগোঁজার সামান্য ঠাই আর জীবনের নিরাপত্তা। সরকারকে খোঁচা দিয়ে কিছু লেখার মোটেও ইচ্ছে ছিলোনা কিন্তু যা বাস্তব বিবেকের তাড়নায় তা না লিখে পারা গেলনা। সরকার যদি গৃহকর্মীদের প্রতি সুদৃষ্টি না দেয় এবং তাদের নির্যাতনকারী মানুষ নামের হায়েনাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করায়, তাহলে প্রতিদিন অকালে ঝরে যাবে অসংখ্য তিশা ও তাসলিমা। সন্তান হারানো মাতা-পিতার বিলাপ আহাজারিতে ভারি হবে বাংলার আকাশ বাতাস, আর সে বাতাসে সৃষ্টি হতে পারে ক্রোদের মহাপ্রলয়, উপড়ে যেতে পারে সরকারের ক্ষমতার মসনদ।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MokarramHossainABaki
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে সাগর লিখেছেন, ১২ মে ২০১১; সকাল ০৫:৩৩
মনে হয় গৃহকর্মীদের নির্যাতন না করলে কিভাবে জনগন বুঝবে সে সরকারী চাকরীজিবী অথবা চাকুরীজিবীর বউ।নির্যতিন করাটাও এক প্রকার হাতের আরাম আর যেহেতু বর্তমান জালিম সরকারের সময়ে এই নির্যাতন করে কোন সাজা শাস্তি ছাড়্ই পার পাওয়া যায় তাহলে ধনীরা কেনই বা নির্যাতন করবে না।
56667
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy