প্রসঙ্গকথা
স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে অনেকদিন ধরে কথার ছোড়াছুড়ি হচ্ছে; দলীল ছোড়াছূড়ি হচ্ছে। কিন্তু এপর্যায়ে এসে দুই পক্ষের প্রকাশিত তথ্যাদি ও যুক্তির আলোকে সতত মনে হয় যে স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি শুধু দুই ব্যক্তি কেন্দ্রিক বিষয় নয়, না হলে এর জের এত দীর্ঘ হতে পারতো না। এখানে মনে হয় গোটা স্বাধীনতার বিষয়টি দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যার ধারায় ছুটে চলেছে, তাদের আপন আপন পরিধীতে স্বাধীনতার ঘোষণাটি প্রধান একটি ল্যাণ্ডমার্ক হয়ে আছে। এ ধারা দুটি এমন হয়ে পড়েছে যে এর মধ্যে কোন মিমাংসা সম্ভব নয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সেখানে জিয়াউর রহমানকে ঘোষক বলা গঠণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক কী না তা দেখার কসুরতে অপর পক্ষ মুজিবকে ঘোষক নির্ধারণের কৌশল অবলম্বন করেন। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বরং বেশী হয়েছে মনে হয়। আদালত অন্যান্য বিষয়াদির পাশে তখনকার আন্দোলনী পটভুমির ব্যাখ্যায় মুজিবকে ঘোষক বলে দেন। কিন্তু ঐতিহাসিক বিষয়ে এই আদালতি রায় কোন কোন ফায়দা দিতে পারে নাই। আন্দোনলনের-পটভূমি প্রতিপক্ষের ব্যাখ্যায় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিএনপি ঘরানার লিখকদের লিখায় যা লক্ষ্যণীয় তা হল মুজিবের আন্দোলনের মূল পটভুমি ছিল ছয়দফা ভিত্তিক স্বাধীকারের আন্দোলন। এটি বাস্তবায়ণের লক্ষ্যে ফেব্রুয়ারী/মার্চে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে উঠে। স্বায়ত্ব-স্বাধীকারের আন্দোলন ব্যতীত মুজিবের আর কোন প্রস্তুতি ছিল না। মুজিব তার ছয়-দফা ভিত্তিক অটোনমীর উর্ধ্বে উঠে পাকিস্তান ভাংতে চাননি, যদিও তার দলের মধ্যে দ্বিতীয়টির পক্ষেও প্রেরনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসতে ব্যর্থ হলে জিয়ার ঘোষণায় যে যুদ্ধ শুরু হয় তাই হয় স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই ঘোষণার মাধ্যমে মুজিবের স্বাধীকার আন্দোলনের অবসান ঘটে এবং তা স্বাধীনতার আন্দোলনে পর্যবেশিত হয়। এইই যদি হয় পটভুমির ভিন্নতা, তবে অদূর ভবিষ্যতে এর মিমাংসার কোন সম্ভাবনা নেই; এখানে কে ঘোষক তা যদিও জরুরী কিন্তু এর সম্পর্ক শুধু ঘোষণার সাথে নয় বরং এক আন্দোলনের শেষ এবং অপরটির শুরু সংক্রান্ত; এটি বরং পটপরিবর্তনের সূক্ষ্ম বিষয় সম্পর্কিত; জাতীর স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে বিজড়িত।
ঘোষণা ও ঘোষক
১৯৭১ এর (২৬/২৭) মার্চে যখন জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে দেশের জনগণ ও বাইরের জনগণ স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে পান তখন এ ঘোষণার মূল ব্যক্তি হিসেবে মুজিবকেই ধরে নেন। তখনকার পরিস্থিতে মুজিবের নির্দেশেই জিয়া এই ঘোষণা দিবেন এটাই ছিল অনুমেয়। তাই যেমন দেশের ভিতর তেমনি বিদেশী সূত্রাদি জিয়া কতৃক ঘোষিত বাক্যের কতৃপদে মুজিবকেই, the assumed subject in context, হিসেবে চালিয়ে যান। তাৎক্ষণিক ভাবে এসবের মূলে কী ছিল তা নির্ধারণ করা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাছাড়া একটি ঘোষণায় জিয়া মুজিবের পক্ষ হয়ে বলাতে সেই ধারনা (assumption) আরো সুদৃঢ় হয়। সুতরাং তখনকার কোন দেশী বিদেশী তথ্যে মুজিবের নাম উল্লেখ দেখলেই সেটি মুজিবের বলে মেনে নেয়ার আগে প্রসঙ্গ দেখতে হবে, বিষয়কেন্দ্রিক ধারনা বুঝতে হবে, টেক্সটের সাবজেক্ট এসিউমড ছিল কী না তা বিবেচনা করতে কনটেক্সট দেখতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে। আমেরিকান বলয়ের কোন দলীলে মুজিবকে ঘোষক উল্লেখ করার রাজনৈতিক কারণও সামনে আনতে হবে। পাকিস্তান আমেরিকান বলয়ের একটি দেশ ছিল। আমেরিকা পাকিস্তানী ক্রাকডাইনকে সমর্থন দিতে মুজিবকে বিদ্রোহী (রেবেল) হিসেবে দেখাতে হত। যেকোন উপায়ে মুজিবের নাম পেয়ে যাওয়াটা রাজনৈতিকভাবে প্রয়োজনীয় ছিল। সুতরাং কোথাও তার নাম ধারনাগত, কোথাও রাজনৈতিক কৌশলগত আবার কোথাও উভয় অর্থে ব্যবহৃত হওয়া স্বাভাবিক ছিল।
আলোচনা কীভাবে হতে পারে
জিয়া ঘোষক, না মুজিব ঘোষক তা প্রথমে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ ক প্রথমে তার নিজ অবস্থান ব্যাখ্যা করবে; সে খ -এর সমলোচনায় যাবে না। কেননা খ ব্যতিরেখে তার নিজ সত্যতা প্রমান করতে হবে। জিয়ার প্রথম ঘোষণা কী ছিল, দ্বিতীয় ঘোষণা কী ছিল, দিন ও তারিখে কী পার্থক্য ছিল, এসবে যাবার আগে মুজিবুর রহমানের ঘোষণা দেখতে হবে। আপাতত শেখ মুজিবুর রহমানের স্বকণ্ঠে উচ্চারিত কোন ঘোষণার অস্থিত্ব পাওয়া যাচ্ছেনা। তবে আলীগী পক্ষ এটা প্রমাণ করতে বসে নেই। এতে তারা তিন ধরনের প্রয়াস চালাচ্ছেন। এক, অমুকের কাছে বলে গেছেন, তোমাদেরকে স্বাধীনতা দিলাম, এটি বিনপি পক্ষ কানেই নিচ্ছেন না। দ্বিতীয়টি, মুজিব ওয়ারলেসে স্বাধীতা ঘোষণা করেছিলেন, অমুক সংস্থা শুনেছেন, তমুক এজেন্সি শুনেছেন, এটাও দ্বিতীয় পক্ষ মানছেনননা, কারন তারা অমুক-তমুকের কথা শুনতে নারাজ। তৃতীয়ত, মুজিব না কী এক টুকরা কাগজে স্বাধীনতা ঘোষণা লিখে তার নিজ হাতে স্বাক্ষর করে গিয়েছিলেন, এটাও দ্বিতীয় পক্ষ বনোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এই স্বাক্ষরিত কপির মূল-কপি পেলে এটার উপর ফরেনজিক টেষ্ট ও হস্তলিপি বিশেষজ্ঞদের তাহকীক বিবেচনায় আনা যেতে পারে। কিন্তু এধরনের দলীলে অনেক সময় সমস্যা থেকেই যায়।
একাডেমিক উপায়
সকল তথ্য সামনে রেখে কোন একাডেমিক গবেষকদল ঢুকালে কেমন হবে? তারা কী দলিলগুলির উপর গবেষণা চালিয়ে একটি নিদৃষ্ট সিদ্ধাতে পৌঁছেতে সক্ষম? আমার বিবেচনায় তা মোটেই সম্ভব নয়। সেখানে ডক্যুম্যান্ট ও মৌখিক বিবরণ ব্যাখায় নীতিগত ও মেথড-মেথডলজিক্যালের ভিন্নতা আসবে। সেখানে অর্থ ব্যাখার ভাষাতাত্ত্বিক ও দার্শনিক নানান নিয়মনীতি প্রয়োগ করা হবে। লিখার পর লিখা বেরিয়ে আসবে, কিন্তু সমাধান আসবে বলে মনে হয় না। প্রত্যেকটি গবেষণা তার আপন গবেষণা-পরিধীতে শুদ্ধ ও সত্য মনে হবে; গবেষকরা সেমিনার দিবে; তাদের মধ্যে ইন্টেলেকচুয়্যাল এক্সঞ্জেজ হবে; কিতাবের সংখ্যা বর্ধিত হবে; কিন্তু ঘোষক কে তা সর্বসাধারনে এবং, একাডেমিসিয়ানদের মধ্যে, আগের মতই থেকে যাবার সম্ভাবনাই বেশী।
মৌখিক বিবরণ অন্য ধারায় যাবে। আজ যিনি বলছেন আমি সেদিন মুক্তি যুদ্ধ করেছি, এ ব্যাপারে আমি জানি, তার জানার সব কথা তখন ঠিকে নাও থাকতে পারে। রেডিও টেলিভিশনে যেভাবে জানার কথা অনর্গল বলছেন, গবেষকের কাছে তার সব কথার মূল্য সেভাবে থাকবে না। তার বর্ণনাকে নানা শ্রেণীতে আনা হবে। কোথায় তার জানা বিষয় অতিক্রম করে অভিমতে রূপলাভ করছে; কোথায় ঐতিহাসিক বিষয়কে তিনি মন্তব্যের আকারে আনছেন, কোথায় তিনি অতীতকে বর্তমানের আলোকে বর্ণনা দিচ্ছেন, কোথায় তার আদর্শিক অবস্থান বর্ণনার সাথে তালগুল পাকাচ্ছে; কোথায় তিনি দলীয় অভিমত ইতিহাসের আংগিকে বর্ণনা দিচ্ছেন -এসব যখন শ্রেণীবিন্যাস করা হবে তখন হয়ত দেখা যাবে মৌখিক অনেক সত্য আর সত্যের আওতায় নেই। তারপর তার বিবরণে তার বর্তমান জাতীয় মর্যাদা, তাঁর সেলেব্রিটি স্টেটাস ইত্যাদি কতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাও দেখা হবে।
যারা বিজ্ঞ বর্ণনাকারী তাদের কথাও ইন্টারডিসিপ্লিনারী মার্জারের বিবেচনায় আনা হবে। যে বিষয়ে একজন বিষেশজ্ঞ, তার কথার মূল্য সেখানেই থাকবে, অন্য ময়দানে নয়। নানা শ্রেণীবিন্যাসের পর কেবল সে কথাগুলিই রাখা হবে যেখানে যার জানার ব্যাপার সম্ভব ছিল।
পরবর্তি অবস্থা
আমরা যারা এখন গ্যালারিতে বসে তাম্বুক খাচ্ছি, তাদের জন্য আগামীতে হয়ত অনেক কিছু দেখার আসছে। এ বিষয়টি আমি যেভাবে উপস্থাপন করেছি তার মধ্যে যদি যৌক্তকতা থেকে থাকে তবে শেষ পর্যন্ত জনগণ নিজ নিজ স্থানেই ঠিকে থাকবে। অনেক বড় বড় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনেক রূপক বিশ্বাসের জন্ম হয়। যুদ্ধ ও যুদ্ধারা মিথোলজিক্যাল অঙ্গনে চলে যান। রেডিও, ভিডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য মিডিয়ার মাধ্যমে ১৯৭১ এর বাস্তবতা এখন এমন রং ও রূপে চিত্রিত হয়ে আসছে যে এখানে কল্পনা, বিশ্বাস, সৃষ্টিশিল চিন্তা, আবেগ, আদর্শ, ব্যক্তিপূজা, (personality cultism) সবকিছু এক গোলক-ধাঁধাঁয় আবর্তিত হচ্ছে। কোরানের ভাষায়, ওয়া কুল্লু হিজবিম বিমা লাদাইহিম ফারিহুন, প্রত্যেক দল তার নিজ নজ বিষয় নিয়ে আত্মতৃপ্ত -এটিই হয়ত হবে মূল বাস্তবতা।
আমি মনে করি যেহেতু শেখ মুজিবের পক্ষে মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছিলেন কাজেই এ ক্ষেত্রে কৃতিত্ব ও অবদান দুজনেরই আছে। শেখ মুজিব যেহেতু ঘোষনাটি পাঠ করেন নাই কাজেই জিয়াউর রহমানকে 'স্বাধীনতার ঘোষক' এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে 'স্বাধীনতার স্থপতি' বলতে শেখ হাসিনার এত আপত্তি কেন ? ঘোষকের চেয়ে স্থপতির স্থান অনেক উঁচুতে নয় কি ?
12435
২
ঢাকা থেকে বাংলার মানুষ লিখেছেন,
০৭ এপ্রিল ২০১০; সকাল ০৭:৫৮
আমার একটা প্রশ্ন সোনার বাংলাদেশের সম্পাদকের কাছে। এসব বস্তাপচা লেখা ছাপান কেনো? স্বাধীনতার ঘোষণা বিতর্ক নিয়া আর কোনো লেখা পান নাই আপনারা? লেখক কি বলতে চাচ্ছে তাতো বোধগম্য হলো না। দয়া করে লেখা ছাপানোর আগে নিজেরা পড়বেন। আপনাদের সময় না থাকলে আমাদের বলেন সাহায্য করি।
12964
৩
italy থেকে minto লিখেছেন,
১১ এপ্রিল ২০১০; সন্ধ্যা ০৬:০৬
ঘোষকের চেয়ে স্থপতির স্থান অনেক উঁচুতে নয় কি ?
13426
৪
ঢাকা থেকে আলাল লিখেছেন,
১৪ এপ্রিল ২০১০; রাত ০২:৩০
@ বাংলার মানুষ দলান্ধরা এই লেখার মর্ম না বুঝার কথা। লেখকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
13637
৫
আল - খোবার, সৌদি আরব থেকে আব্দূল হান্নান চৌধূরী লিখেছেন,
২১ এপ্রিল ২০১০; সন্ধ্যা ০৭:০৩
সত্যকে বেশীদিন কোন কিছু দিয়েই চাপিয়ে রাখা যায়না। একদিন সত্য প্রকাশ হবেই। স্বাধীনতার ক্ষেত্রে শেখ মুজিব ও জিয়াউর রহমান উভয়েরই অবদান রয়েছে। আওয়ামি লীগারদের উচিত গোঁয়ার্তুমি বাদ দিয়ে সরলটাকে মেনে নেয়া।
14613
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: