মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:০৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পৃথিবীর বারান্দায়

মনির ইউসুফ

সদা হাস্যরস্য জল কল কল ছল ছল নোনাঘ্রাণ। লবণ বাতাসে সতেজ ও ফুরফুরে আমেজ। বিকেলটা তখন আমার কাছে হয়ে উঠে চলন্ত ঘোড়ার পিঠের চেয়ে দ্রুত ধাবমান অস্থির। তখন আমি চালিয়ে দিই পা লাঙ্গল। পৃথিবীর বারান্দায় সমুদ্রের সফেন ঢেউয়ে মিশে যায়। পৃথিবীর মিল অমিলের পর্বে আমি বসে থাকি সমুদ্রের রেতবালির উপর। একা নিঃশব্দ, দূরে উড়ে যায় ঝাঁক ঝাঁক গাংচিল। নীল দিগন্তে সাদা সাদা মেঘের নূপুর ইতিহাসের সীমানা পেরিয়ে আরেক ইতিহাসে ঢুকে যায়। আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঝাউবাঁশি অতলান্ত সূরের মূর্ছনায় মনটাকে নাঁচিয়ে তোলে। শিল্পী বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যমুদ্রার কসরতে নৃত্য করে ঝাউবিথি। একবার হাতের মুদ্রা খোলে, আরেকবার অনামিকা ছুঁয়ে মেতে উঠে ঝাউবন। সমুদ্র চরে তখন অসংখ্য মানব মানবীর উচ্ছ্বসিত পদচারণা। আমি ঝিনুককুমারীর হাত ধরে হাঁটি দিগন্তের এই জলের শহরে। হাতে হাতে জাগে শিহরণ, কামনা দৌলে উঠে বুকের তলে। স্বপ্নময়তায় ভরে দিতে ইচ্ছে হয় চেনাজানা এই পৃথিবী। আমার চোখে চোখ রেখে, চোখের তারা নাঁচিয়ে ঝিনুক কুমারী জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা বলতো, পৃথিবীর এমন সুন্দর স্বপ্নময় স্বপ্নীল স্থান ফেলে আমরা চলে যাবো, কোথায় যাবো? এইচর এই সমুদ্র এই মানুষ কোথায় কোন জগতে, ভাবতে বেশ লাগে। আমি বলি, তুমি দেখছি ভাবুক হয়ে উঠছো এমন এক প্রশ্ন করেছো যার উত্তর খুবই সহজ অবার অনেক কঠিনও আমরা চলে যাবো এটা একশভাগ ঠিক কিন্তু কোথায় যাব সেটাতো জানিনা। তবে যাবো সেটাই সত্যি। এই সত্য বুকে নিয়ে বড় হয় সবাই, বেড়ে উঠে সবাই। পৃথিবীর সব ধর্মে বলা আছে মানুষ মরলে হয় স্বর্গে যাবে নয় নরকে এবং এই একটি কথার নিনাদ নিয়ে মানুষের মাঝে কত কিংবদন্তী, কত আলোচনা সমালোচনা অবিশ্বাস। মানুষকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে, দিতে হয়েছে রক্তের নজরানা। এই প্রশ্নের আধুনিক উত্তর খোঁজার জন্য।

কথা বলতে বলতে ঝিনুক কুমারীর হাত আমার হতে একটু ঘনিষ্ট হয়। আমার ভেতর রক্তের স্পন্দন টের পাই। আমার অন্য আমি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাই। সে আমি এ মুহূর্তে ঝিনুক কুমারীর হাতে হাত ধরে থাকা শরীরে সঘন গহনে ঘনিষ্ট হয়ে যাই। জীবনানন্দের পঙক্তি গুলো মনে পড়ে। তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন। ঝিনুক কুমারীও আবেগী হয়ে উঠে। বলে, চলো আমরা এই নীল জলে ডুবে যাই। চলো আমরা দিগন্তের খেঁসাভেঙ্গে উড়ে যাই। চলো মেরাজ করি তারায়, তারায়। আমি বলি চল, চল শূন্যে ভেসে ভেসে স্রষ্টাশিল্পীর সৌন্দর্য খুঁজে বেড়াই।

তখনই একদল পর্যটক আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে হেসে খেলে সমুদ্রচর রাঙিয়ে দিচ্ছে। আমি বলি দেখো সৃষ্টি কত সুন্দর, আর যুথবদ্ধতার মধ্যে কেমন ছন্দ। ঝিনুককুমারী বললো যুবদ্ধতা মানে বললাম, একসংগে থাকা ও বলল আচ্ছা, আচ্ছা ....।

আমি বলি এই ঝিনুকবালা আমার চোখের দিকে ওমন করে তাকিয়ে আছো কেনো। ও বলে, তোমার চোখে কিসের যেন খৈ ফোটে। কিসের এক আগুনের ধোয়া উঠে আসমানে মিশে যায়। আমি বলি, সে তুমিও বোঝ আমি ও বুঝি। কিন্তু আমরা জীবনকে নিজেদের মাঝে লুকাতে ভালোবাসি। ভান করি কিছু জানিনা। শরীরের ভাষা বুঝতে একটা মানুষের যতটুকু বয়স আমাদের বয়স এখন ঠিক তার কানায় কানায়। এখন আমাদের অদম্য কামনা জুড়ে ফুটতে চাই অসংখ্য গোলাপ, অসংখ্য রজনীগন্ধা।

আমি ঝিনুকের পিঠে হাতরাখি একটু ঘনিষ্ট হয়। আমরা সামনে উত্তাল সমুদ্রের গর্জন শুনি। জোয়ার শুরু হয়েছে। জলসিঁড়ি ভেঙ্গে পড়ে। সূর্য ক্রমে ডুবে যাচ্ছে জলের বিথারে। সূর্যের লাল টুকটুকে থালাটা জলের নাভিমূলে এঁকে দিচ্ছে লালডুমোর। আলো ও সোনালি অন্ধকারে বিকেলটা হয়ে উঠে রহস্যময়। পর্যটকরা জোড়া জোড়া ঘনিষ্ট হচ্ছে সন্ধ্যার আলোতে।

কক্সবাজার দরিয়ানগরের এই বীচে স্থানীয়রা তেমন একটা হৈচৈ করেনা। উল্লাস আর্তি তেমন নেই রাত করে কেউ থাকেও না। মাগরিবের পর যে যার ঘরের দিকে রওয়ানা দেয়। আমি ঝিনুককে বলি দেখো আমরা এমন এক ঐশ্বর্যময় সমুদ্র পেয়ে এটাকে তেমন বড় করে ব্যবহার করতে পারছিনা রক্ষণশীল ও সংবেদশীল মনোভাবের কারণে। ধরো এই বীচটা যদি ভারতের কোন অঞ্চলে হতো এর চেহারাটাই পাল্টে যেতো। সমাজ ও প্রকৃতির বড়ত্বকে ধারণ করতে হলে সে সমাজের মানুষের মনকেও বড় হতে হয়, উদার হতে হয়। সংকীর্ণতা পরিহার করে যুথবদ্ধতা, মানবিকতার পাঠ নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু আমরা প্রকৃতির এ বিশালত্ব কোন ভাবেই ধারণ করতে পারিনি। আমিত্ব ও অহম আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। তুমি দেখ না কক্সবাজারের তরুণ তরণীরা এক একটা রাজকুমার ও রাজকুমারী। কেউ কাউকে কেয়ার করেনা। সম্মানবোধটা আমাদের মধ্যে উবে গেছে। মেধার মূল্যায়ন নেই। মফস্বলীয় চিন্তায় ঠাসা সবার মনমানসিকতা। আমি বলি, ঝিনুক আমাদের কিছু হবে না, কিছুই হবে না, মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। এত বিশাল বঙ্গোপসাগর তার সমুদ্র প্রকৃতি রেতবালি পাথর, প্রাকৃতিক গ্যাস সব সম্পদ বুকে ধুকে ধুকে কেমন হয়ে যাচ্ছে আমার জন্মজনপদ। স্থানীয় মানুষ সচেতন না হলে শিক্ষিত না হলে একটা আন্দোলন দানা বেধে না উঠলে কক্সবাজারে কোন উন্নতি হবেনা। ঝিনুক আমার এতসব কথা শুনে না। বলে আমার হাতটা শক্ত করে ধরো। চলো হাঁটি। এই বিকেলে হাঁটলে ভালো লাগবে। আমি বলি হায়! আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজ বিদঘুটে সমাজ। নিজস্ব কোন চিন্তা নেই, চেতনা নেই, মিডিয়ার চিন্তা ধার করে সারাজীবন সেভাবে চলে। শ্রেণীতে উঠার জন্য সংগ্রাম আর সংগ্রাম। টেলিভিশন, সংবাদপত্র মধ্যবিত্ত মানসিকতার চাষ করে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে উস্কে দেয়। আর আমাদের মধ্যবিত্ত মানুষেরা সে উসকে দেওয়া আগুনে ঝাপ দেয়। মধ্যবিত্ত তরুণ তরুণী, সুন্দরী প্রতিযোগিতা বিজ্ঞাপনের মডেল, নায়ক নায়ীকাকে অনুকরণ করে জীবন পার করে দেয়। সবাই হিরো হতে চাই। চলার ষ্টাইল, উচ্চারণ ভাবভঙ্গি সবে অনুকরণ। আমার সঙ্গে বসে থাকা এই সখা আমার কথা শুনেনা। কথা গুলো তার কাছে যথেষ্ট বিরক্তির উদ্রেক করে। বলে, এই, তুমি এসব ভারি ভারি নীতি কথা রাখ। আমি এবার যাবো। আমি বলি আচ্ছা চলো।

মনে মনে বলি আমাদের তরণ তরুণীরা পোশাকি হয়ে গেছে। গভীর জীবনবোধ, গভীর বিশ্বচেতনা এসবে ভালো লাগেনা, এসবে মন ও বসেনা। শুধু স্বার্থপরতা গোপনে নারীর শরীরে ঘষামাজা, প্রকাশ্যে সবাই ফেরেস্তা। ভাবখানা এমন আমরা ইছা মাছের লেছ পুড়ে খেতে জানিনা। আমি আর এসব ভাবিনা। ঝিনুকের হাতে হাত রেখে হাঁটতে থাকি বিশাল এই সমুদ্রে। জীবনের সামনে থোকা থোকা আলো ও অন্ধকার। বলি ঝিনুক আজকের এই বিকেলটা আমার কাছে স্বর্ণময় বিকেল হয়ে থাকবে। তোমার মত এত সুন্দরী আমার মত এমন এক অধমকে সময় দেবে ভাবতেও পারিনি। ঝিনুক বলে, তোমার এসব আবোল কথা বাদ দাও। অযথা বক বক করনা। চলো আমরা দুজনে আজকের বিকেলটা উপভোগ করি। তুমি আমার চুলে বিলিকেটে দাও আমি তোমার চুলে। বিলিকাটার শিল্প থেকে যে বিদ্যুৎ শক তৈরি হবে চলো আমরা তাকে ধারণ করি দুজনে। আমি ঝিনুকের কথা শুনে ভেতরে ভেতরে নরম নিরব হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে আমার ভেতর ফুঁসে উঠে কামনার বিষ। দুজনের বিলিকাটার একটা ঐন্দ্রজালিক বিস্ময় জেগে উঠে শরীরে। আমি ঝিনুকের সাতসমুদ্র রহস্যকে উপভোগ করি। ঝিনুকও । তখন বাতাসে ঢেউবাঁশি বেজে যায় একটানা।

আলোও সোনালি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে ফিরে আসি হাজার বছর। ফিরে আসি ঘরে। তখনো পৃথিবীর আদিমতার কোন পরিবর্তন হয়নি, না এখনো। সমুদ্রকে পিছনে ফেলে হঁটতে থাকি বিপরীত দিকে। সমুদ্র গর্জন করে। আমাদের নিয়ত কাছে ডাকে। আমি কার ডাক শুনবো। সমুদ্র না ঝিনুকের। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতে থাকতে আমি হয়ে যায় সমুদ্রমানব। সমুদ্র আমাকে ধারণ করে রাখে হাজার বছর।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MonirUsuf
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
চট্টগ্রাম থেকে আ্লী প্রয়াস লিখেছেন, ১০ জুন ২০১১; রাত ১০:১৬
মনযোগের সাথে পড়লাম। পড়ে মুগ্ধ হলাম।গল্পের ভাষা সরস ও সুললিত...স্থানিক বিষয়কে ধারণ করে একজন প্রেমিকের বিশ্বমানব হয়ে উঠার তীব্র অভব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে এই গল্পে। ঝিনুকবালাকে নিয়ে গল্পকার পৌঁছে যাক জাতীয়তা ও আর্ন্তজাতকিতায়.......
59102
sylhet থেকে Md. Kamal Uddin লিখেছেন, ১১ জুন ২০১১; বিকেল ০৫:০৬
amar onek valo legeche
very nice
go ahead
59206
ঢাকা থেকে মাসুদ আনোয়ার লিখেছেন, ১৪ জুন ২০১১; সন্ধ্যা ০৭:৪৪
একটা চমৎকার গল্প। অভিনন্দন মনির ইউসুফ। আরো লেখা চাই।
59571
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy