মানব সমাজ যদি হয়ে থাকে নারী পুরুষের একটি সংমিশ্রিত রূপ, তবে এতে সন্দেহ নেই যে, নারী সে সমাজের ভারসাম্যের প্রতীক ও নিয়ন্ত্রণকারী সত্তা। নারী একজন পরম শ্রদ্ধেয়া মা, আদরের বোন, প্রেমময় সহধর্মিনী স্ত্রী এবং স্নেহভাজন কন্যা হিসেবে পুরুষের অন্তর্জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে অঘোষিতভাবে। মহান আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টির সহজাত প্রক্রিয়ায় নারী বিনে বা নারীর সক্রিয় উপস্থিতি বিনে একটি সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ ও সৃজনশীল সমাজ আশা করা যায় না। এজন্যেই মানব জাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলাম নারীকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছে। তাকে বসিয়েছে মর্যাদার আসনে এবং নিশ্চিত করেছে তার সামগ্রিক অধিকার। সন্তানকে মা’র সাথে সর্বোচ্চ সদাচরণ ও সেবার আদেশ দেওয়া হয়েছে। স্বামীকে দেওয়া হয়েছে স্ত্রীর ভরণ-পোষণসহ সার্বিক অধিকার আদায়ের আদেশ এবং কন্যা সন্তানের সঠিক লালন পালন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে প্রবলভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে পিতাকে। অথচ মা বোন স্ত্রী ও কন্যারাই জাহেলী যুগে চরম লাঞ্ছনা বঞ্চনার শিকার হতো। এ নির্জলা সত্যের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাস।
কিন্তু যারা ইসলামকে জানে না, বুঝে না বা জেনে শুনেও বিবেক যাদের শিকলবন্দী এবং দৃষ্টি যাদের একচোখা তারা প্রতিনিয়ত নারীকে ব্যবহার করে আসছে তাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে। বেশ কিছু দিন থেকে ৮৮% মুসলিম অধ্যুষিত প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও কথিত নারী আন্দোলনের নামে আমাদের রক্ষণশীল ইসলামপ্রিয় নারী সমাজকে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা শুরু হয়ছে। বিশ্ব নারী দিবসে পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপহার স্বরূপ নারী পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণ” নামে একটি খসড়া প্রস্তাব সামনে আসে এবং তা মন্ত্রীপরিষদে পাশ হয়। যাতে অন্যান্য দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি সম্পদের উত্তরাধিকারে নারীকে পুরুষের সমান অধিকার দান এবং কুরআনের শাশ্বত বিধান “ছেলে পাবে দুই মেয়ের অংশ” বিধানটি বিলুপ্ত করার দাবি জোরালো ভাবে উত্থাপন করা হয়। যার ফলে সরলমনা ইসলামী জ্ঞানহীন বা ধর্মহীন শিক্ষায় শিক্ষিত সমাজ (বিশেষত নারী সমাজ) ইসলামকে তাদের অধিকার হরণকারী একটি জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ভাবতে শুরু করেছে এবং আমাদের ধর্মপরায়ন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজেও এর সংক্রমণ হতে পারে সহজেই। বক্ষ্যমান নিবন্ধটিতে সম্পদে নারীর উত্তরাধিকারে ইসলামী বিধানের যৌক্তিকতা কুরআন সুন্নাহ, যুক্তি ও বাস্তবতার আলোকে তূলে ধরার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ-
ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানের বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতি:
ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানে নারীর অধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে সার্বিক দিক দিয়ে ইসলামী উত্তরাধিকারের কিছু বৈশিষ্ট্য ও মূলনীতি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। যেহেতু আলোচ্য বিষয়ের সাথে এর যোগসূত্র রয়েছে। এতে অনেক সংশয়েরও নিরসন ঘটবে।
প্রথমত: ইসলাম সুষম বন্টনে বিশ্বাসী – সম বন্টন নয়ঃ
অবস্থান ভেদে মানুষের প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন, ধরা যাক সরকারী তহবিল থেকে বন্টনের জন্য কিছু জিনিস আসলো। বন্টনের ক্ষেত্রে দেখা গেলো এক পরিবারে দশ জন সদস্য অন্য পরিবারে মাত্র দু’জন সদস্য। বিবেকবান মাত্রই এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে যে সমান অধিকারের নামে উভয় জনকে সমপরিমাণ দেওয়া কোন মতেই ন্যায় বিচার হতে পারে না। বরং এক্ষেত্রে ন্যায় বিচার হবে প্রয়োজনানুসারে বন্টন করা। যাকে বলা হয় সুষম বন্টন। তেমনিভাবে ইসলাম সমবন্টনকে ইনসাফের মূল ভিত্তি মনে করে না। বরং সুষম বন্টনই মূলত ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের মূল ভিত্তি। এর আলোকে বন্টনের ক্ষেত্রে কখনো সমান হবে; আবার কখনো অবস্থা ভেদে বিশাল পার্থক্য হতে পারে। উত্তরাধিকার বিধানেও ইসলাম এ নীতিটিই অবলম্বন করেছে।
দ্বিতীয়ত : ইসলামের উত্তরাধিকার আইন পুরুষ বা নারী কেন্দ্রিক নয়ঃ
তেমনিভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদের অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী–পুরুষের ব্যবধান মূখ্য বিষয় নয়। সুতরাং একথা বলার সুযোগ নেই যে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন পুরুষকেন্দ্রিক বা নারীকেন্দ্রিক।
তৃতীয়ত : অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি দিককে সামনে রাখা হয়ঃ
১. মৃত ব্যক্তির সাথে ওয়ারিসের নিকটাত্মীয়তা। যে ওয়ারিস মৃত ব্যক্তির যত কাছের আত্মীয় হবে তার অংশ তত বেশী হবে। যেমন ভাই বোনের তুলনায় ঔরসজাত সন্তানেরা বেশী পাবে এবং এটিই ইনসাফের দাবী।
২. নতুন প্রজন্ম বা বংশধর প্রবীণদের তুলনায় বেশী পাবে। যেমন সন্তান-সন্ততি পিতা মাতার তুলনায় বেশী পাবে এবং এটিই যুক্তির দাবী। যেহেতু নতুনদের সামনে রয়েছে ভবিষ্যতের এক বিশাল জীবন।
৩. আর্থিক প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক দায়ভারঃ অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি লক্ষণীয় দিক হলো অংশীদার ওয়ারিসের সামাজিক দায়ভার ও আর্থিক প্রয়োজনীয়তা। যেমন একটি পরিবারের সার্বিক খরচ নির্বাহ করার দায়িত্ব পুরুষের। স্ত্রীর ভরণপোষণ, সন্তান-সন্ততিদের খরচ যোগানো এবং পিতা-মাতার সার্বিক সেবা-শুশ্রূষা এসব তো শুধুই পুরুষের দায়িত্ব এবং সামাজিক ও নৈতিক কর্তব্য। এদিক লক্ষ্য রেখে ইসলাম অনেক ক্ষেত্রে অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারতম্য করেছে।যেমন মেয়ের তুলনায় ছেলের আর্থিক বাধ্য বাধকতা ও সামাজিক কর্তব্য বেশি। তাই ইসলাম ছেলের জন্য মেয়ের দ্বিগুণ অংশ নির্ধারণ করেছে।
চতুর্থত : দুর্বলদেরকেও অবহেলা করা হয়নি :
জাহেলি সমাজে নারী ও শিশুকে ওয়ারিস গণ্য করা হতো না, শুধুমাত্র তারা যুদ্ধ যেতে পারে না - এ অজুহাতে। এক কথায় দূর্বলের উপর সবলের খবরদারী। কিন্তু ইসলাম সে অমানবিক বৈষম্য দূর করে তাদেরকেও তাদের প্রাপ্য যথাযথভাবে দান করেছে।
পঞ্চমত : আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করাও উত্তরাধিকার বিধানের অন্যতম লক্ষ্যঃ মিরাছের সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলাম রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার উপর গুরুত্বারোপ করেছে। আল্লাহ পাক বলেন :
((وأولوا الأرحام بعضهم أولى ببعض في كتاب الله ))
আর রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়রা একে অপরের কাছে আল্লাহর কিতাবের ঘোষণা মতে অধিক হক্বদার।
নারীর উত্তরাধিকারঃ
পূর্বেই আলোচিত হয়েছে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন ন্যায়বিচার ও সুষম বন্টনের উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশেষত নারীর উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলাম যুগান্তকারী ও অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত বিধান দিয়েছে। যেখানে প্রাচীন রোমান সমাজে নারী একজন স্ত্রী হিসেবে কোন অংশ পেতনা। ইহুদী বিধানে ছেলে থাকা অবস্থায় নারীর কোন ধরনের অংশ নেই। আর ইসলামের আবির্ভাব যুগে জাহেলী সমাজের দিকে একটু দৃষ্টি দিলে ভেসে উঠে মায়ের জাতি নারীর করুণ চিত্র। সম্পদে তার উত্তরাধিকার তো দূরের কথা বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ নারীকেই মিরাছের সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করা হতো। কুরআনে কারীমের নারীর নামে নামকরণকৃত সূরা আন নিসার ১৯ নং আয়াত ((يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا)) ((হে ঈমানদারগণ, জোরপূর্বক নারীদেরকে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়)) এ করুণ বাস্তবতার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যান্য সাধারণ অবস্থায় নারীকে সমাজের বোঝা মনে করা হতো। যুদ্ধে যেতে পারে না, জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে না এ জাতীয় অজুহাত দেখিয়ে নারীকে সম্পূর্ণভাবে মিরাছের সম্পদ হতে বঞ্চিত করা হতো। এমন অবস্থায় ইসলাম সার্বজনীন ও কালজয়ী মানবিক বিধান দিয়ে নারীকে অবহেলা ও লাঞ্ছনার এ অতল গহ্বর থেকে রক্ষা করে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। দেখিয়েছে নতুন করে জীবন চলার আলোকিত পথ। কুরআনের শাশ্বত বাণীতে ঘোষিত হয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে নারীর প্রাপ্তির ঘোষণা।
প্রাপ্তির ঘোষণাঃ
বিশিষ্ট মুফাসসির তাবেঈ সাঈদ ইবনে জুবাইর ও ক্বাতাদাহ (রা) বলেন: ইসলামের পূর্বে মুশরিকরা মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের মাঝেই বন্টন করে দিত। নারী ও শিশুদেরকে কিছুই দিতো না। এরই প্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয় সূরা আন নিসার ৭ নং আয়াতঃ
((للرجال نصيب مما ترك الوالدان والأقربون وللنساء نصيب مما ترك الوالدان والأقربون مما قل منه أو كثر نصيبا مفروضا)) النساء : 7
))অর্থঃ "পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে এবং নারীদেরও সুনির্দিষ্ট অংশ রয়েছে। তা কম হোক বা বেশী হোক।)) পবিত্র কুরআনের এ ঘোষণার মাধ্যমে নারী উত্তরাধিকার সূত্রে সুনির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকারই লাভ করলো। এ বিধান কোনো কথিত নারীবাদী আন্দোলনে বাধ্য হয়ে প্রণীত হয়নি। বরং মহান প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা তার সৃষ্টি সম্মন্ধে সম্যক অবগত হয়েই তাদের সার্বিক কল্যাণের জন্যই এ বিধান দান করেছেন। এভাবেই নারী তার ব্যক্তি মালিকানার অধিকার পেলো। মা, মেয়ে, স্ত্রী, বোন, দাদী, নাতনী হিসেবে নারীর সুনির্দিষ্ট অংশ ঘোষিত হলো। এর বাইরেও বন্টনের পর অবশিষ্টাংশেও বিভিন্ন অবস্থায় রয়েছে নারীর প্রাপ্যাংশ।
* নির্দিষ্ট অংশ পাওয়া নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশীঃ ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানে নির্দিষ্ট অংশ পাওনাদার ১২ জন ওয়ারিসের মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮ জন (মা, মেয়ে, স্ত্রী, নাতনী(ছেলের মেয়ে), সহোদরা বোন, বৈমাত্রেয় বোন, বৈপিত্রেয় বোন, দাদী, নানী) আর পুরুষ হলো ৪ জন (বাবা, স্বামী, দাদা, মা সম্পর্কীয় ভাই)। যেখানে ঔরসজাত মেয়ে ও বোনের জন্য নির্দিষ্ট অংশ বন্টন করা করা হয়েছে সেখানে এর বিপরীতে ঔরসজাত ছেলে ও ভাইদের জন্য নির্দিষ্ট কোন অংশ নেই। বরং নির্দিষ্ট অংশধারী ওয়ারিসদের হিসসা বন্টনের পর আসবে তাদের প্রাপ্তির হিসাব।
প্রসঙ্গ : পুরুষ পাবে নারীর দ্বিগুণ, কখন? এবং কেন?
পবিত্র কুরআনের সূরা আন নিসার ১১ নং আয়াত للذكر مثل حظ الأنثيين “ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ” এ আয়াত নিয়ে অনেকের মধ্যে সংশয়ের সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিশেষত যারা প্রতিনিয়ত ইসলামের দূর্বলতা খুঁজে বের করার নোংরা ব্রতে লিপ্ত তারা এ আয়াতের মাধ্যমে এ কথা সাব্যস্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে থাকে যে, ইসলাম নারীকে পুরুষের অর্ধেক মনে করে। একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে নারীকে স্বীকৃতি দেয় না। তাই মিরাছের অংশও পুরুষের অর্ধেক দিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ আয়াত যে ইনসাফ ও সুষম বন্টনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারে না।
*দ্বিগুণ পাওয়া সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় :
কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী বিধানটি শুধুমাত্র ছেলে-মেয়ে এবং ভাই-বোনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অথচ নারী বলতে শুধুমাত্র মেয়ে সন্তান বা বোনদেরকে বুঝায় না। এরা ছাড়াও অনেক নারী ওয়ারিস রয়েছে যাদের বিপরীতে পুরুষের দ্বিগুণ পাওয়ার বিধান নেই। এজন্যই এ আয়াতের পরবর্তী আয়াতগুলোতে মা-স্ত্রী সহ অন্যান্য নারী ওয়ারিসদের নির্দিষ্ট অংশের বর্ণনা এসেছে। সেখানে তো পুরুষ নারীর দ্বিগুণ পায় না। তাছাড়া পুরুষদের পরস্পরের মধ্যেও বিভিন্ন অবস্থায় তো বিশাল ব্যবধান হয়ে থাকে। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাবে নারী পুরুষের সমান পাচ্ছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে বেশি পাচ্ছে। একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরলে ব্যাপারটি আরো পরিস্কার হয়ে যাবে আশা করি।
নারী পুরুষের অংশ প্রাপ্তির একটি তুলনামূলক চিত্র:
মিসরের জাতীয় ফতোয়া বোর্ড কর্তৃক প্রচারিত এক ফতোয়ায় মিরাছের সম্পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী পুরুষের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে যে বিস্ময়কর তথ্য এসেছে তার মাধ্যমে অনেকের চোখ খুলে যেতে পারে, বিবেক পেতে পারে নতুন খোরাক। এ পরিসংখ্যানে নারী কখন পুরুষের অর্ধেক পায়, আর কখন সমান পায়, আর কখন বেশি পায় তার বর্ণনা এসেছে অত্যন্ত পরিস্কারভাবে। লক্ষ্য করুনঃ
* শুধু মাত্র চার অবস্থায় নারী পুরুষের অর্ধেক পায় :
১. "মেয়ে ও নাতনী(ছেলের মেয়ে)" ছেলে ও নাতী (ছেলের ছেলে) থাকা অবস্থায়।
২. ছেলে সন্তান ও স্বামী বা স্ত্রী না থাকলে "মা" পিতার অর্ধেক পায় ।
৩. "সহোদরা বোন" সহোদর ভাইয়ের সাথে ওয়ারিস হলে।
৪. "বৈমাত্রেয় বোন" বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সাথে ওয়ারিস হলে।
* ১০ অবস্থায় নারী পুরুষের সমান পায়ঃ
১. পিতা-মাতা সমান অংশ পাবে ছেলের ছেলে থাকলে।
২. বৈপিত্রেয় ভাই-বোন সব সময় সমান অংশ পায়।
৩.বৈমাত্রেয় ভাই-বোন থাকলে সব ধরণের বোনেরা (সহোদরা, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয়) বৈপিত্রেয় ভাইয়ের সমান পাবে।
৪.শুধুমাত্র ঔরশজাত মেয়ে ও মৃতের ভাই একসাথে থাকলে উভয়ে সমান অংশ পাবে। (মেয়ে পাবে অর্ধেক আর বাকী অংশ পাবে চাচা)
৫. "নানী" বাবা ও ছেলের ছেলের সাথে সমান অংশ পায়।
৬. মা ও বৈপিত্রেয় দুই বোন স্বামী ও সহোদর ভাই এর সাথে সমান অংশ পায়।
৭. "সহোদর বোন" স্বামীর সাথে ওয়ারিস হলে সহোদর ভাইয়ের সমান অংশ পাবে। অর্থাৎ সহোদর বোনের পরিবর্তে সহোদর ভাই হলে যে অংশ পেত ঠিক সহোদরাও একই অংশ পাবে। অর্থাৎ মূল সম্পদের অর্ধেক পাবে।
৮. বৈমাত্রেয় বোন সহোদর ভাইয়ের সমান অংশ পায় যদি মৃত ব্যক্তির স্বামী, মা, বৈপিত্রেয় এক বোন এবং একজন সহোদর ভাই থাকে। এ অবস্থায় স্বামী মূল সম্পদের অর্ধেক, মা এক ষষ্ঠাংশ, বৈপিত্রেয় ভাই এক ষষ্ঠাংশ এবং বাকী এক ষষ্ঠাংশ পাবে সহোদর ভাই।
৯. নির্দিষ্ট অংশধারী ওয়ারিস এবং আছাবা সূত্রে পাওয়ার মত কেউ না থাকলে নিকটতম রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়রা সমান অংশ পাবে। যেমন মেয়ের ছেলে, মেয়ের মেয়ে, মামা ও খালা ছাড়া অন্য কোন ওয়ারিস না থাকলে এদের সবাই সমান অংশ পাবে।
১০. তিন প্রকারের মহিলা এবং তিন প্রকারের পুরুষ কখনো সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হয় না। এক্ষেত্রেও নারী পুরুষ সমান অধিকার ভোগ করছে।
* অনেক অবস্থায় নারী পুরুষের চেয়ে বেশী পায়। যেমন:
১. স্বামী থাকা অবস্থায় একমাত্র কন্যা পাবে অর্ধেক আর স্বামী পাবে এক চতুর্থাংশ ।
২. দুই কন্যা স্বামীর সাথে হলে। দুই মেয়ে পাবে দুই তৃতীয়াংশ আর স্বামী এক চতুর্থাংশ।
৩. কন্যা মৃতের একাধিক ভাইয়ের সাথে হলে বেশী পাবে।
৪. যদি মৃত ব্যক্তি স্বামী, বাবা, মা ও দুই কন্যা রেখে যায় তবে দুই মেয়ে দুই তৃতীয়াংশ সম্পদ পাবে। কিন্তু ঠিক একই অবস্থায় যদি মেয়ের পরিবর্তে দুই ছেলে থাকত তবে তারা নিশ্চিত ভাবে দুই মেয়ের তুলনায় কম পেত। কেননা ছেলের অংশ হলো এখানে অন্যান্য ওয়ারিসদেরকে তাদের নির্ধারিত অংশ দেওয়ার পর যা বাকী থাকে। সুতরাং স্বামী পাবে এক চতুর্থাংশ, বাবা ও মা উভয়ে পাবে এক ষষ্ঠাংশ করে এবং বাকী অংশ পাবে দুই ছেলে যা দুই তৃতীয়াংশ তো নয়ই; বরং অর্ধেকের চেয়েও কম।
৫. ঠিক একই ধরণের আরেকটি অবস্থা দুই সহোদর বোনের ক্ষেত্রে। যদি ওয়ারিসদের মধ্যে স্বামী, দুই সহোদর বোন এবং মা থাকে তখন দুই বোন দুই তৃতীয়াংশ সম্পদ পায়। কিন্তু ঠিক একই অবস্থায় যদি দুই বোনের বদলে দুই ভাই থাকত তখন ঐ দুই ভাই মিলে এক তৃতীয়াংশের বেশি পেত না।
৬. তেমনি ভাবে একই অবস্থায় বৈমাত্রেয় দুই বোন বৈমাত্রেয় দুই ভাইয়ের চেয়ে বেশী পায়।
৭. তেমনি ভাবে যদি ওয়ারিসদের মধ্যে স্বামী, বাবা, মা ও মেয়ে থাকে তবে মেয়ে মূল সম্পদের অর্ধেক পাবে। কিন্তু ঠিক একই অবস্থায় ছেলে থাকলে পেত তার চেয়ে কম। যেহেতু তার প্রাপ্যাংশ হলো অংশীদারদেরকে দেওয়ার পর অবশিষ্টাংশ।
৮. ওয়ারিস যদি হয় স্বামী, মা ও এক সহোদর বোন তখন ঐ সহোদর বোন অর্ধেক সম্পদ পাবে যা তার স্থানে সহোদর ভাই হলে পেত না।
৯. ওয়ারিস যদি হয় স্ত্রী, মা, বৈপিত্রেয় দুই বোন এবং দুই সহোদর ভাই তখন দূরের আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও বৈপিত্রেয় দুই বোন দুই সহোদরের চেয়ে বেশী পাবে। যেহেতু বৈপিত্রেয় বোনদ্বয় পাবে এক তৃতীয়াংশ, আর দুই সহোদর পাবে অবশিষ্টাংশ যা এক তৃতীয়াংশের চেয়েও কম।
১০. যদি স্বামী, বৈপিত্রেয় বোন ও দুই সহোদর ভাই থাকে সে ক্ষেত্রে বৈপিত্রেয় বোন এক তৃতীয়াংশ পাবে। অথচ এই দুই সহোদর অবশিষ্টাংশ থেকে যা পাবে তা ঐ বোনের এক চতুর্থাংশেরও কম।
১১. ওয়ারিস যদি হয় বাবা, মা ও স্বামী এ ক্ষেত্রে ইবনে আব্বাস (রা) এর মত অনুসারে মা পাবে এক তৃতীয়াংশ, আর বাবা পাবে এক ষষ্ঠাংশ; অর্থাৎ মায়ের অর্ধেক।
১২. স্বামী, মা, বৈপিত্রেয় বোন ও দুই সহোদর ভাই ওয়ারিস হলে এক্ষেত্রে ঐ বোন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও সহোদর ভাইদ্বয়ের দ্বিগুণ পাবে।
* অনেক সময় নারী মিরাছ পায় কিন্তু তার সমমানের পুরুষ বঞ্চিত হয় । যেমনঃ
১. ওয়ারিস যদি হয় স্বামী, বাবা, মা, মেয়ে ও নাতনী (ছেলের মেয়ে) এক্ষেত্রে নাতনী এক ষষ্ঠাংশ পাবে। অথচ একই অবস্থায় যদি নাতনীর পরিবর্তে নাতী (ছেলের ছেলে) থাকত তখন এই নাতী কিছুই পেত না।যেহেতু নির্ধারিত অংশীদারদেরকে দিয়ে অবশিষ্টাংশই তার প্রাপ্য ছিলো। অথচ এ অবস্থায় কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই তার প্রাপ্তির খাতাও শূন্য থাকবে।
২. স্বামী, সহোদর বোন ও বৈমাত্রেয় বোন থাকা অবস্থায় বৈমাত্রেয় বোন এক ষষ্ঠাংশ পাবে। অথচ তার স্থানে যদি বৈমাত্রেয় ভাই থাকতো তবে সে কিছুই পেত না, যেহেতু তার জন্য নির্ধারিত অংশ নেই।
৩. অনেক সময় দাদী মিরাছ পায়, কিন্তু দাদা বঞ্চিত হয়।
৪. মৃত ব্যক্তির যদি শুধুমাত্র নানা ও নানীই ওয়ারিস হিসেবে থাকে তখন সব সম্পত্তি পাবে নানী। নানা কোন কিছুই পাবে না।
এরপরও কি বলা হবে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলাম নারীকে ঠকিয়েছে? এ তুলনামূলক আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো এ বাস্তবতাকে সাব্যস্ত করা যে, নারী সব সময় পুরুষের অর্ধেক পায় না এবং অংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী কোন অংশেই পুরুষের চেয়ে কম নয় এবং আরো সাব্যস্ত হলো অংশ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বিভাজন টানা নিতান্তই অজ্ঞতার পরিচায়ক। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন-
www.dar-alifta.com
সম্ভবত এসব তথ্য জেনেই জনৈক মনীষী বলেছিলেনঃ "ইসলাম যদি ইনসাফের ধর্ম না হতো তাহলে আমি বলতাম উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীর বিপরীতে পুরুষকে ঠকানো হয়েছে।"
* ছেলে কেন মেয়ের দিগুণ পায়?
এখানে জোরালো একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, ছেলে থাকা অবস্থায় "মেয়ে", ভাই থাকলে "বোন" কেন তার অর্ধেক পাবে? তার মানে কি মেয়ে-সন্তান ছেলে-সন্তানের অর্ধেক মর্যাদা রাখে? এ সংশয় নিরসনের পূর্বে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানে নারী-পুরুষের বিভাজনটি মৌলিক কোন লক্ষণীয় বিষয় নয়। বরং সামাজিক দায়ভার ও আর্থিক প্রয়োজনীয়তার কারণেই সাধারণত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তফাৎ হয়ে থাকে। ছেলে সন্তান মেয়ের দ্বিগুণ পাওয়ার অনেক গুলো যৌক্তিক কারণের মধ্যে কয়েকটি হলোঃ
১. পারিবারিক দায়িত্বঃ পরিবারের কর্তা হিসেবে সব খরচপাতি বহন করতে হয় ছেলেকে। পিতা-মাতার খেদমত, সন্তান-সন্ততির লালনপালন এবং আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ খবর নেওয়ার দায়িত্বও মূলত পুরুষের উপরই অর্পন করেছে ইসলাম। বিপরীতে মেয়ে এসব দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। তারপরও ইসলাম তাকে বঞ্চিত করেনি।
২. স্ত্রীর যাবতীয় অধিকারঃ দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের পথে পুরুষকে গুণতে হয় স্ত্রীর দেনমোহর বাবদ একটি মোটা অংক। আর বিয়ের পর স্ত্রীর ভরণপোষণ ও যাবতীয় খরচের দায়ভারও এ বেচারা পুরুষটিকেই বহন করতে হয়। পক্ষান্তরে মেয়ে বিয়ের আগে পিতার আদর সোহাগ পেয়ে বড় হওয়ার পর বিয়ের সময় বড় অংকের দেনমোহর পাওয়ার পরও তার ভরণপোষণ সহ যাবতীয় খরচ বাবদ একটি পয়সাও তাকে খরচ করতে হয় না। সবই স্বামীর দায়িত্ব। স্বামীর অধিকারও নেই স্ত্রীর কাছে তা চাওয়ার। তাই মেয়ের সম্পদের মূলধন কখনো কমে না। এরপরও তো ইসলাম তাকে বঞ্চিত করেনি। বরং ইসলাম তার সম্পদকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছে অত্যন্ত সুন্দরভাবে।
এসব যৌক্তিক কারণে ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের দাবী হলো ছেলেকে মেয়ের চেয়ে বেশী দেওয়া। যেহেতু ইনসাফ হলো সুষম বন্টন; সমান বন্টন নয়।
পরিশেষে সত্য উচ্চারণ করে বলতে হয় - ইসলামের উত্তরাধিকার বিধান একটি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত বিধান। যেখানে প্রত্যেক শ্রেণীর ওয়ারিস তার উচিত প্রাপ্যাংশ লাভের নিশ্চয়তা রয়েছে। সত্য উপলব্ধিকারী অমুসলিম চিন্তাবিদ Gostaf lobon ইসলামী উত্তরাধিকার বিধানকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবেঃ কুরআনে বর্ণিত উত্তরাধিকার বিধান বড়ই ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক। এ বিধানকে ফরাসী ও ব্রিটিশ আইনের সাথে তুলনা করে আমার কাছে এ কথা স্পষ্ট হয়েছে যে ইসলামী শরীয়া বা বিধান স্ত্রীদেরকে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে এমন সব অধিকার দিয়েছে যার কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না আমাদের আইনসমূহে”।
হ্যাঁ, আল্লাহর দেওয়া বিধানের তুলনা কোন মানবগড়া বিধানের সাথে চলেনা। আল্লাহর আইন সর্বকালের সবখানের এবং সকলের জন্য। আর আল্লাহর আইন অনুসরণেই রয়েছে মানবতার মুক্তি, শান্তি ও সাফল্যের গ্যারান্টি।
আসসালামু আলাইকুম জনাব,
ধন্যবাদ। অত্যান্ত চমতকার তত্ববহুল। প্রবন্ধটির মধ্যে মিরাসের বিধান অনেক দিক পর্যালোচনা করেছেন। আশাকরি পাঠকগণ আল্লাহর ইনসাফ পূর্ণ বিধান বুঝতে সক্ষম হবেন। আমিও উপকৃত হলাম।
56840
২
Dhaka,gandaria থেকে MD.Jubaer hossain লিখেছেন,
২০ মে ২০১১; বিকেল ০৫:৩০
প্রথমেই ধন্যবাদ লেখককে।ইসলাম নারীকে যে অধিকার সে দিয়েছে সে সম্পর্কে যদি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের সকল জনগন জানত, তাহলে নারী আন্দোলনের নামে যারা লাফালাফি করছে তাদের মুখ বন্ধ হয়ে যেত।সুতারং সকলের উচিত্ ইসলাম সম্পর্কে জানা।
57232
৩
Toronto থেকে habib লিখেছেন,
২৪ মে ২০১১; দুপুর ০১:৪৪
তথ্যবহুল চমত্কার লেখা।
57524
৪
London থেকে Sanjida লিখেছেন,
২৬ মে ২০১১; সন্ধ্যা ০৬:২৯
Very Very authentic article in an most important issue, As a Muslim woman I got more confident about Islamic law and it's justice towards women...
I would like to request the writer to circular this kind of articles more and more, not online only but also in the printed media...also in English for worldwide message.
Thank you very much...
57729
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
ধন্যবাদ। অত্যান্ত চমতকার তত্ববহুল। প্রবন্ধটির মধ্যে মিরাসের বিধান অনেক দিক পর্যালোচনা করেছেন। আশাকরি পাঠকগণ আল্লাহর ইনসাফ পূর্ণ বিধান বুঝতে সক্ষম হবেন। আমিও উপকৃত হলাম।