|
হৃদয়ের আর্তনাদে বাংলাদেশ
মুহাম্মদ হাফিজ রহমান |
|
বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।
এই দেশের মাটির সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্ব। রুপ আর বৈচিত্রের শোভায় বাংলাদেশ অনন্য একটি স্থান করে নিয়েছে পৃথিবীর মাঝে। বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখলেই আত্মগর্বে বুকটা ভরে যায়, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দেশের কথা ভাবতেই তনু মনের তন্ত্রীতে শিহরণ জাগ্রত হয়। আসলে মাতৃভূমি এবং মা সকলের কাছেই যেন অন্যরকম সমাদর পায়। আর সেই সমাদর থেকেই দেশের প্রতি অন্তরের এই টান- অফুরান্ত ভালোবাসি বাংলাদেশকে।
এবার নিজের কিছু এলোমেলো চেতনার কথা বলি। জীবিকার টানে অনেকে প্রবাসী হয়, আমি প্রবাসী হয়েছি নিয়তির টানে। পড়ালেখা নামক নিয়তিই আমাকে প্রবাসী বানিয়েছে। যদিও প্রবাসে বাংলাদেশী হওয়া মানেই নাক সিঁটকানির বিড়ম্বনা তো আছেই! অবশ্য সেটার জন্য বাংলাদেশ নামক দেশটা দায়ী নয়। দায়ী আমরা গুটিকয়েক মানুষ, যারা নেতিবাচক কাজের মাধ্যমেই আমাদের দেশটাকে অতলে ডুবিয়েছি, অহর্নিশ ডুবিয়ে যাচ্ছে। এই ডুবে যাওয়ার খেলায় যতবারই ভাসতে চেয়েছি, বাংলাদেশকে নিয়েই ভাসতে চেয়েছি। কথায় আছে- দূরে থাকলে নাকি টান বাড়ে। আর সেই টান হৃদয়ের অন্তঃপুর থেকে ভালোবাসার জন্ম দেয়। হয়তোবা সেই কারণেই বাংলাদেশকে ভালোবাসি হৃদয়ের ঐ অন্তঃপুর থেকে।
মাঝে মাঝে একলা চিত্তে ভাবি, আমরা বোধকরি দিনকে দিন এতটাই বস্তুবাদী হয়ে যাচ্ছি যে অর্থবিত্ত ছাড়া আর কিছুই চোখের সামনে দেখতে পাইনা। শয়নে স্বপনে শুধুই কাল্পনিক ধনী হতে চাই এবং সেটা বাস্তবে রুপ দেবার জন্য দিশেহারা হয়ে যায়। প্রয়োজনে অস উপায় অবলম্বন
করতেও দ্বিধাবোধ করিনা। নিজের স্বার্থের দিকে খেয়াল করার কারণে পরিবার, সমাজ তথা দেশের কথা বেমালুম ভুলে যাই!
বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় থাকে। এদেশের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে বারবার দুর্নীতির অভিযোগ আনিত হয়। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা জনগণের কাছে ভোট ভিক্ষা চায়, নির্বাচনের পর তারাই হয়ে ওঠে প্রকৃত শোষক। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বন্ধ থাকে বছরের প্রায় অর্ধেকটা সময়। শিক্ষার নামে চলে নোংরামী আর অরাজকতা। আর একটি দেশের রাজনীতি যখন নষ্ট হয় তখন সবকিছুই নষ্ট হবে এটাই চিরাচরিত নিয়ম। এ কারণেই আমাদের দেশে আমলাতন্ত্র মানেই দুর্ভোগ। আসলে লাল ফিতার দৌরাত্বের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয় আমাদের মত সাধারণ মানুষদের। যেখানেই নিয়ম সেখানেই অনিয়ম; কি বিচিত্র আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা! পুলিশ মানেই ঘুষ আতঙ্ক, এন. জি.ও মানেই বিদেশী টাকার লুটপাট। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- শিক্ষক সবাই আজ দুর্নীতিবাজ। এমন কোন বৃত্তকলা বা বিভাগ পাওয়া যাবেনা যেখানে অন্যায় অনিয়ম হয়নি। পুরো দেশটাই যেন আজ চলছে উল্টো পথে, অনিয়মের পথে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মানদন্ড বিবেচনা করা হয় সেদেশের বাক স্বাধীনতার পরিস্থিতি দিয়ে। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরে (১৯৭১ - ২০১১) পদার্পণ করলো বাংলাদেশ। অনেক স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। প্রাণ দিয়েছিল লাখো মানুষ। কিন্তু, যে স্বপ্ন নিয়ে এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল সে স্বপ্ন কি পূর্ণ হয়েছে? উন্নয়ন বা উন্নত জীবন তো দূরের কথা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারগুলোও কি আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? এমন হাজারো প্রশ্ন আমাদের মনে উঁকি দিয়ে যায়। উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হই প্রতিনিয়ত। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আত্মতৃপ্তিতে ব্যস্ত, বিধায় দেশে উন্নয়নের বিন্দুমাত্র পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। আমরা স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও আজতক রাজনৈতিক দুঃশাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পায়নি। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্লেটো তাঁর দেয়া Cave Theory’ তে স্পষ্ট করে বলেছেন যে, একমাত্র সরকারই পারে একটি রাষ্ট্রকে পরিপুর্ণতা দান এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সাধন করতে। সেক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় উপস্থিতি কাম্য। শুধুমাত্র ভূখন্ড, সার্বভৌমত্ব এবং খোড়া সরকার ব্যবস্থায় কি আমরা নিজেরদেরকে পরিপূর্ণ স্বাধীন দাবী করতে পারি? আপাত দৃষ্টিতে স্বাধীন মনে হলেও, বৃহৎ দৃষ্টিতে ইহাকে স্বাধীন হওয়া বলা চলে না। উন্নয়নের মান রক্ষার জন্য সরকারকে সর্বস্তরে কর্ম স্বাধীনতার সুযোগ নিশ্চিত করতে
হবে। সর্বক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ মানেই দুর্নীতির দ্বার চাঙ্গা করা। ইদানিং কালে চোখে পড়ে, সরকারের বৈরী চাপের কারণে অনেক সময় সংবাদ মাধ্যমগুলো মিথ্যার বেশাতী প্রকাশ করেন। অন্যদিকে আসল সত্যটা অধরায় রয়ে যায় অথবা সত্যটা কালের অতলে হারিয়ে যায়। সংবাদ মাধ্যমের প্রতি সরকারের অসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেতই বটে!
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সংসদই সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এটাই গণতান্ত্রিক প্রথা। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সংসদকে সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। বর্তমানে সংসদে সংখ্যা গরিষ্ঠতার দাপটে বিরোধী দলগুলোকে কোন
ঠাসা করে রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলগুলোর উপর এমন বিরুপ মন্তব্য ও আচরণ করা হচ্ছে যা গণতান্ত্রিক পন্থার পরিপন্থী। তবুও আমরা সবাই মনে করি সংসদই একমাত্র স্থান যেখানে সকল রাজনৈতিক দল তাদের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায়
দেশকে অগ্রগতির দ্বার প্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের কর্তব্য সংসদে যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া। কিন্তু কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে ইতিমধ্যেই। একটা বিষয় লক্ষ্য করলেই বোধগম্য হবে যে, সাধারণত
সন্ত্রাসী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি অথবা অল্প শিক্ষিত কোন ব্যক্তিকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে নির্বাচিত হয়ে সেসব সাংসদ তাদের স্বার্থের দিকটাই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। এ কারণেই জনগণ তাদের কাঙ্ক্ষিত সেবার অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকেন। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ভবিষ্যত উন্নয়নের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আমরা হয়তো জানিনা এর শেষ কোথায়? কেন আমরা চল্লিশ বছরেও দেশটাকে উন্নয়নের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারিনি? আমরা প্রত্যেকে কি আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো ভালোভাবে পালন করেছি? আমরা কি দেশটাকে যেভাবে ভালোবাসার দরকার ছিলো, সেভাবে ভালোবেসেছি? সেই ভালোবাসা থেকে যার যেভাবে কাজ করার কথা ছিল সেটা করতে পেরেছি? এদেশের আনাচে কাঁনাচে তো অনেক ভালো মানুষ আছেন, সাদা মনের মানুষ আছেন। দেশের প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সেই ভালোবাসা থেকে কিছু করার চেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে। চলুন আমরা সবাই মিলে আরেকটু ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে সাজিয়ে তুলি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে।
এটাও অস্বিকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর দূর্নীতিবাজ দেশগুলোর ভেতর শীর্ষস্থান দখল করে আছে। সহিংসতার রাজনীতির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল ও তার মেরুকরণের প্রক্রিয়াকে আঁকড়ে ধরে থাকা সত্বেও গত চার দশকে মানব সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশে হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখপানে। পৃথিবীর জাতীয় প্রবৃদ্ধির হারের এবং উন্নয়নের সূচকের সম্মানজনক বৃদ্ধি তার সাক্ষ্য বহন করে। দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নেয়াটাই যদি সব রাজনৈতিক দলের স্বপ্ন হয়ে থাকে তাহলে তার সঠিক বাস্তবায়ন একমাত্র দোষমুক্ত আদর্শভিত্তিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রক্রিয়াকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমেই সম্ভব। রাজনীতির বিরাজমান প্রক্রিয়ার ধ্বংসাত্নক ফলাফল জাতীর উপর চাপিয়ে দেয়া মোটেই সমীচীন নয়। তথাপি, গত চার দশক ধরে আমরা যেই পরিবেশ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছি তা পূনজাগরণ করতে যত বেশি ধৈর্য ধারণ করা দরকার তার জন্য আমাদের সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিগত দশকে যদি আমরা ধৈর্য ধারণ করতাম তাহলে দেশ অনেক এগিয়ে যেতে পারতো তার প্রমাণ ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত হয়েছে।
শেষকথা, বাংলাদেশ অপার ও অমিত সম্ভাবনার দেশ। এখানে নেই সাম্প্রদায়িক সংঘাত, নেই কোন বর্ণ বৈষম্য। ভাষাগত এবং জাতিগত কোন বিভেদ আমাদের মাঝে নেই। আমাদের প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, দক্ষ জনশক্তি এবং মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছেন, যারা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে
সুন্দর ভাবে পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন। তাহলে কিসের প্রতিবন্ধকতা আছে যা আমাদের প্রিয় দেশের উন্নয়নের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? আমার মনে হয়, বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছাতে শুধুমাত্র প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সম্প্রীতি। যোগ্য এবং সহিষ্ণু রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলেই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে উন্নত জাতির স্বীকৃতি পাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস- মনের অজান্তে ক্ষণে ক্ষণে সেই স্বপ্ন এখনও দেখি। আর হৃদয়ের আর্তনাদে যে বাংলাদেশ সর্বক্ষণে উচ্চাবেগে উচ্চারিত হয়, সেই বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব না তো কাকে নিয়ে দেখব?
লেখকঃ ছাত্র, সম্মান শ্রেণী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়া
E-mail: hafiz3367@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MuhammadHafizRahman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|
হাফিজ ভাই সুন্দর এবং সাবলীল করে “হৃদয়ের আর্তনাদে বাংলাদেশ” নামক প্রবন্ধ লেখার জন্য ধন্যবাদ। আমিও দুর প্রবাসে (আমেরিকা) বসে বাংলাদেশের কল্যাণ কামনা করি কায় মনোবাক্যে। তবে আপনার লেখনীতে আজ আরও কিছু বিষয়ে অবগত হলাম। আমার হৃদয়ের মাঝেও শুধু একটি নাম – বাংলাদেশ।
ভালো থাকবেন এই শুভকামনায়