বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে এখন সাধারণ মানুষ খুবই উদ্বিগ্ন। বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর অপহরণ, তাঁকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে পর পর হরতাল, হরতাল উপলক্ষে নানা ধরনের সন্ত্রাস, বিভিন্ন স্থানে অপঘাতে কয়েকজন নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনায় বর্তমান রাজনীতি মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
বিএনপি আহূত টানা হরতালে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন আয়-রোজগার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সমগ্র দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামনে আরও কী সংকট অপেক্ষা করছে, তা ভেবে সাধারণ মানুষ আরও উত্কণ্ঠিত।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির এই যে একটা রূপরেখা কয়েকটি বাক্যে তুলে ধরা হলো, তা কি খুবই নতুন ঘটনা? নতুন কোনো চিত্র? ইলিয়াস আলীর মতো আরও অনেক নেতা ও ব্যবসায়ী অতীতে গুম হয়েছেন। হয়তো তাঁদের ফিরে পাওয়ার দাবিতে টানা এত দিন হরতাল হয়নি। কিন্তু অন্য নানা উপলক্ষে কি বাংলাদেশে টানা হরতাল হয়নি? বাস পোড়ানো হয়নি? বাসের মধ্যে পুড়ে মানুষ মারা যায়নি? কোন কাজটা এখন নতুন হচ্ছে, পাঠক কি চিহ্নিত করতে পারবেন?
একটাও নতুন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৯১ সাল থেকে একই বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে একই ভাষায় এই অপরাজনীতির সমালোচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরেকজন ইলিয়াস আলী যদি গুম হন, তাহলে মিডিয়া প্রায় একই ভাষায় সমালোচনা করবে।
তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে? আমরা কুড়ি বছর ধরে গণতান্ত্রিক রাজনীতির নামে একধরনের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি করে যাচ্ছি। পাঁচ বছর পর পর সংসদ নির্বাচন করে আমরা গণতন্ত্রের পতাকা ওড়াই। সরকার পরিবর্তন করি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। আমাদের রাজনীতির বাকি সব কাজ দুর্বৃত্তায়নের নীলনকশায় পরিচালিত। তারই ফল রাজনৈতিক নেতা বা ব্যবসায়ী গুম হয়ে যাওয়া, দিনের পর দিন হরতাল হওয়া, বাস পোড়ানো, গাড়ি ভাঙা, বোমা ফাটানো—আরও কত কী! সবই ধ্বংসাত্মক কাজ, কিন্তু গণতন্ত্রের নামে, রাজনীতির নামে।
কিছুদিন পর পরই এসব ঘটনা ঘটে। এ ধরনের ঘটনা ঘটার পর অনেকে খুবই বিস্ময় ও ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘এভাবে চলা যায় না।’ যাঁরা বিস্ময় বা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তাঁদের কি ধারণা, বর্তমান মেইনস্ট্রিম রাজনীতিতে (বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত) অন্য রকম কিছু হওয়ার কথা? এই দলগুলো কি গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা পরিচালিত? এই দলগুলোর ভেতরে কি গণতন্ত্রের চর্চা আছে? এই দলগুলো কি সুস্থ, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী? তাদের দল কীভাবে চলে? তাদের দলের নেতা-নেত্রীরা কীভাবে দলনেতা হয়েছেন? প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন? প্রধানমন্ত্রীরা কাদের মন্ত্রী বানান? কী যোগ্যতায় তাঁরা মন্ত্রী হন? কারা মন্ত্রী হতে পারেন না? প্রশাসনকে তাঁরা কীভাবে পরিচালনা করছেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাঠক যদি খুঁজে পান, তাহলে বুঝতে পারবেন আমাদের প্রধান দলগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তায়নই এসব দলের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ক্ষমতায় থাকার সময় এবং ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েও প্রধান দলগুলো দুর্বৃত্তায়ন ও সন্ত্রাসের ওপরই নির্ভরশীল।
কাজেই হঠাৎইলিয়াস আলী ইস্যু, টানা হরতাল, গাড়ি ভাঙচুর, বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগরে অচলাবস্থার কারণে আমাদের রাজনীতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বিষয়টা তা নয়। এগুলোই আমাদের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই সত্য বিস্মৃত হওয়া উচিত হবে না।
পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ আশা করেন যে ইলিয়াস আলী ইস্যুটা এত জটিল হওয়া উচিত হয়নি বা টানা হরতাল দেওয়া উচিত হয়নি বা জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষকদের ভিসির বিরুদ্ধে এ রকম আন্দোলন করা উচিত হয়নি, তাঁরা পরিস্থিতির সাময়িক ‘রোগমুক্তির’ বিষয়েই শুধু আগ্রহী। রাজনীতির আসল রোগ সম্পর্কে তাঁরা মাথা ঘামাচ্ছেন না। আমাদের মেইনস্ট্রিম রাজনীতি আসলে জটিল রোগে আক্রান্ত। এর চিকিত্সা খুব সহজ নয়।
ইলিয়াস আলীকে আজ না হোক কাল হয়তো পাওয়া যাবে (আমরা আশাবাদী), কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে নেতা বা ব্যবসায়ীকে গুম করে ফেলার যে প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা দূর হবে কি না বা কবে দূর হবে, তা কে বলতে পারেন? এ ব্যাপারে আমরা সাধারণ মানুষ কি কিছু করছি? আমরা কি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারছি? আমরা কি তাদের গণতান্ত্রিক পথে চলতে প্রভাবিত করতে পারছি?
বাস্তব সত্য হলো, তা আমরা পারিনি। এমনকি এ ব্যাপারে খুব চেষ্টাও করা হয়নি। বরং একটা উল্টো ঘটনা ঘটেছে এবং তা ঘটাচ্ছি আমরা, সাধারণ মানুষই। তা হলো, এত দুর্বৃত্তায়ন ও সন্ত্রাসী রাজনীতি সত্ত্বেও আমরা সাধারণ মানুষ পাঁচ বছর অন্তর তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছি। বড় দুই দল কিন্তু সন্ত্রাসী পদ্ধতিতে কখনো ক্ষমতায় যায়নি। তারা জনগণের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় গেছে। কাজেই বড় দুই দলের মধ্যে যদি এমন ধারণা জন্মে, জনগণ তাদের দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস, টেন্ডার-বাণিজ্য, দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, দলের ভেতরে একনায়কত্ব ইত্যাদি উপসর্গ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন করেছে, তাহলে বড় দুই দলকে কি দোষ দেওয়া যাবে?
কাজেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ও পরিচ্ছন্ন করতে হলে সাধারণ মানুষকে সক্রিয় হতে হবে। সাধারণ মানুষ যদি পাঁচ বছর অন্তর পালা করে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিকেই ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনে; তাহলে সারা বছর গুম, হত্যা, সন্ত্রাস, হরতাল, দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, একনায়কত্ব, সংসদ বর্জন ইত্যাদি নিয়ে হা-হুতাশ করে লাভ হবে কি? জনগণ তো ভোট দিয়ে তাদের অপকর্মকে অনুমোদন দিচ্ছে। যারা সুস্থ রাজনীতি করে, গণতান্ত্রিক রাজনীতি করে, জনগণ তো তাদের ভোট দেয় না। ভোট দেয় যারা দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি করে, তাদের।
এখন জনগণকে স্থির করতে হবে, তারা কী রকম দেশ চায়, কী রকম রাজনীতি চায়। সবই কিন্তু জনগণের হাতে। দেশে এখন সামরিক শাসন চলছে না। কোনো শক্তি বন্দুকের জোরে দেশ শাসন করছে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত দল বা জোট দেশ শাসন করছে।
আমাদের জনগণ দেশে ইতিবাচক বহু ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি ও সন্ত্রাসের রাজনীতিকে তারাই প্রতিষ্ঠিত করেছে ভোটের মাধ্যমে। কাজেই ইলিয়াস আলী গুম, টানা হরতাল, হরতালকে কেন্দ্র করে নানা রকম সন্ত্রাস ইত্যাদি নিয়ে জনগণ এখন হা-হুতাশ করলে খুব লাভ হবে না। কারণ, যে রাজনীতিকে তারা সমর্থন দিয়েছে, তাদের হাতে এ রকম ঘটনাই তো ঘটবে। বাগানে গাঁদা ফুলের গাছ লাগিয়ে গোলাপ ফুলের সৌরভ আশা করা জনগণের উচিত হবে না। জনগণকে গাঁদা ফুলের গন্ধই মেনে নিতে হবে। জনগণ যে রকম নেতৃত্ব নির্বাচন করেছে, সেই নেতৃত্বের কাছে জনগণকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। অন্তত পাঁচ বছরের জন্য সেই নেতৃত্বের কাছে জনগণ জিম্মি। এটাও আমাদের গণতন্ত্রের একটা বড় দুর্বলতা।
আমাদের সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া—সবাইকে বিষয়টা ভাবার জন্য অনুরোধ করি। আমরা হঠাৎএকজন ইলিয়াস আলী নিয়ে উদ্বিগ্ন হব, হঠাৎটানা হরতাল নিয়ে উদ্বিগ্ন হব, নাকি দুর্বৃত্তায়নের সামগ্রিক রাজনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হব?
কোনো পাঠক কি বলতে পারবেন, ইলিয়াস আলীকে পাওয়া গেলে আর কোনো নেতা বা ব্যবসায়ী কখনো গুম হবেন না? দেশে আর কোনো দিন টানা তিন ও চার দিনের হরতাল হবে না? হরতালকে কেন্দ্র করে বাস বা গাড়ি পোড়ানো হবে না? কেউ আগুনে পুড়ে মারা যাবে না?
যদি পাঠকের উত্তর হয় ‘না, এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না’, তাহলে আমরা সাময়িক ব্যথা উপশমের জন্য টিভিতে এত গলা ফাটাচ্ছি কেন? এত লেখালেখি করছি কেন? সাময়িক ব্যথা উপশম গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। ইলিয়াস আলীকে খুঁজে পেতে হবে। হরতালও বন্ধ করতে হবে। কিন্তু পাশাপাশি সবাইকে ভাবতে হবে, আমাদের রাজনীতিকে কীভাবে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করা যায়। কীভাবে সন্ত্রাসমুক্ত করা যায়। কীভাবে পরিবারতন্ত্র থেকে মুক্ত করা যায়। কীভাবে দলীয় একনায়কত্ব থেকে মুক্ত করা যায়।
এই পথের সন্ধান যদি আমরা করতে না পারি, তাহলে কিছুদিন পর পরই ইলিয়াস আলীর মতো ইস্যু, হরতাল, সন্ত্রাস, গাড়ি-বাস পোড়ানো, দলীয়করণ, পরিবারতন্ত্র, সংসদ বর্জনসহ নানা অপরাজনীতি দ্বারা আমরা আক্রান্ত হতে থাকব।
আমাদের দেশ কি এই অপরাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে? কখনো কি আমরা প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও সুস্থ রাজনীতির স্বাদ গ্রহণ করতে পারব না?
প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও সুস্থ রাজনীতির জন্য আমাদের একটা পথ খুঁজে বের করতেই হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।
[সূত্রঃ প্রথম আলো, ০৩/০৫/১২] |
First they came for the Communists
And I did not speak out
Because I was not a Communist
Then they came for the Socialists
And I did not speak out
Because I was not a Socialist
Then they came for the trade unionists
And I did not speak out
Because I was not a trade unionist
Then they came for the Jews
And I did not speak out
Because I was not a Jew
Then they came for me
And there was no one left
To speak out for me
(প্রথমে ওরা ইহুদীদের ধরতে এলো, আমি কোনো কথা বলিনি; কারণ আমি ইহুদী ছিলাম না।
এরপর তারা এলো কমিউনিস্টদের ধরতে, তখনও আমি কথা বলিনি; কারণ আমি কমিউনিস্ট ছিলাম না।
অতপর তারা শ্রমিক ইউনিয়নের লোকদের ধরতে এলো, তবুও আমি কিছু বলিনি; কারণ আমি শ্রমিক ইউনিয়নের কেউ ছিলাম না।
এরপর যখন তারা আমাকে ধরতে এলো, তখন আমার পক্ষে কথা বলার জন্য কেউ আর অবশিষ্ট ছিল না।)