|
আশুরা এবং হযরত হোসাঈনের আত্মত্যাগ
মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম |
|
মুহররম মাস আসলে সর্বত্র হৈ হৈ রব উঠে। বিশেষ করে শিয়া সম্প্রদায় মুহররম মাস পালন করে রামাদ্বানের চেয়ে অনেক অনেক বেশী গুরুত্ব দিয়ে। ১০ই মুহররমে আয়োজিত হয় নানাবিধ উৎসব। বর্ণাঢ্য র্যালী, শোভাযাত্রা, মাতম, মার্সিয়া, জারী ইত্যাদি রকমারী আয়োজনের পাশাপাশি থাকে সর্বত্র জিয়াফাত বা খাবার দাবারের আয়োজন। ঢাকার হোসনি দালান থেকে প্রতি বছর যে শোভাযাত্রা বের হয়, তাতে "ইয়া হোসাঈন-ইয়া হোসাঈন" বলে মাতম করা হয়। হযরত হোসাঈনের ত্যাগের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করতে চাকু, চেইন ইত্যাদি দিয়ে অনেক আশেকান নিজ শরীরকে করেন রক্তাক্ত। প্রিন্ট মিডিয়া গুলো ঐ দিনে ছাপে বিশেষ ক্রোড়পত্র। মুহররম শুরু হলেই "ত্যাগের মাস", "চাই ত্যাগ নহে ক্রন্দন মার্সিয়া" ইত্যাদি নানাবিধ শিরোনামে চলে চমকপ্রদ উপস্থাপনা। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে প্রচার চলে সমান্তরাল গুরুত্ব সহকারে। ঐ দিন থাকে সরকারী ছুটি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় সংগঠন আয়োজন করে বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানের। আর এই সব কিছুতেই হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগের কাহিনী প্রাধান্য পায়। অপর দিকে কোথাও কোথাও ইয়াজিদের সমালোচনা করে তাকে কাফের পর্যন্ত ফতওয়া দেয়া হয়।
সত্যিকথা বলতে, মুহররম বা আশুরা শব্দ দু'টির যে কোন একটি উচ্চারিত হলেই আমাদের মন চলে যায় দূর অতীতে কারবালার প্রান্তরে, ফুরাতের তীরে। ইয়াজিদ বাহিনীর অবরোধের মুখে পানিহীন অবস্থায় কাটাচ্ছে রাসূল (সা.) এর দৌহিত্র, হযরত ফাতেমার নয়নের মনি হযরত হোসাঈন (রা.) -এর পরিবার আর সহযোদ্ধারা। এমনি এক অবস্থায় ফুরসত মিলে হযরত হোসাঈন (রা.) এর ফুরাতের পানি পানের। এক বুক তৃষ্ণা নিয়ে হযরত হোসাঈন (রা.) অঞ্জলী ভরে নেন পানি পানের জন্য। কিন্তু সঙ্গী সাথী আর দুধের শিশুর পানি পান না করার করুন অবস্থা ভেসে উঠে হৃদয়পটে। পানি পান প্রত্যাখ্যান করেন হযরত হোসাঈন (রা.)।............................................. ইত্যাদি।
একই ভাবে, মুহররম বা আশুরা শব্দদ্বয় উচ্চারণে মন চলে যায় কৈশোরে। মীর মোশাররাফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধুর পাতায় পাতায়। রসের বেসাতী মিশিয়ে তিনি উপস্থাপন করছেন কারবালার প্রান্তরে হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগের হৃদয় কাঁপা কাহিনী। আর সেই কাহিনী পাঠ করে চোখেঁর অশ্রুতে বুক ভাসানো।............... ইত্যাদি।
অপর দিকে, মুহররম বা আশুরা শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে ফারসী টেলিফিল্ম 'ম্যাসেঞ্জার'-এর ভিডিও ফুটেজে প্রদর্শিত লোমহর্ষক চিত্র সমূহ। যেখানে উপস্থাপিত হয়েছে হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগ আর হযরত ইয়াজিদের ঔদ্ধত্যতার চিত্র। হযরত হোসাঈন (রা.) এর ম্যাসেঞ্জারের সাথে কিনা বর্বর আচরণ করেছিল সেই সময়ের শাসকেরা।............................................................................................................. ইত্যাদি।
ইতিহাস বলে নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ইন্তিকালের অনেক অনেক দিন পর, যখন পর্যায়ক্রমে চার খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) (যার প্রকৃত নাম-আব্দুল্লাহ ইবনে আবু কুহাফা), হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.) (উমর ফারুক নামে যিনি পরিচিত), হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.) (উসমান গনী বা জিন্নুরাইন নামে যিনিকে সবাই চেনে), এবং হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) (রাসূল (সা.) এর জামাতা হিসাবে যার বহুল পরিচিতি), এর শাসনকাল সমাপ্ত, তখন মুসলিম সাম্রাজ্য শাসনের দায়িত্বে ছিলেন আমীর মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.)। তিনি যখন জীবন সায়ান্নে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন তাঁরই পুত্র ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া (রা.) কে। কিন্তু সততা, যোগ্যতা আর আমানতদারী ইত্যাদির বিবেচনায় নেতৃত্বের হকদার ছিলেন নবী (সা.) এর দৌহিত্র হযরত আলী (রা.) এবং ফাতেমা (রা.) তনয় হযরত হোসাঈন (রা.)।
কোন রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান পরিবর্তন হলে বা কোন অঞ্চলে নতুন গভর্নর নিযুক্ত হলে তখনকার দিনের রীতি ছিল, সেই জনপদের অধিবাসীরা রাষ্ট্র প্রধান বা গভর্নরের নিকট অথবা তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধিদের নিকট আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করতেন। (সম্প্রতি সৌদী আরবের বাদশাহ আব্দুল্লাহর অভিষেকের পরও এই দৃশ্য আমরা প্রত্যক্ষ করেছি) সেই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রের সকল মানুষ মুয়াবিয়া (রা.) পুত্র ইয়াজিদের নিকট আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করে। মদীনার গভর্ণরের মাধ্যমে হযরত হোসাইন (রা.) কে আমন্ত্রণ জানানো হয় ইয়াজিদের নামে বাইয়াত গ্রহণের। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করেন এবং মদীনা থেকে মক্কায় হিজরত করেন।
ইত্যবসরে কুফার অধিবাসী দেড় শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি হযরত হোসাইন (রা.) এর আনুগত্য স্বীকার করে চিঠি লিখেন এবং তাঁকে কুফা গমনের আমন্ত্রণ জানান। হযরত হোসাইন (রা.) পরিবার পরিজন এবং সহযোদ্ধা সহ মোট ৭০ জনের একটি কাফেলা নিয়ে কুফা অভিমুখে যাত্রা করেন। উল্লেখ্য যে, মুসলিম সাম্রাজ্যের তদানীন্তন রাজধানী ছিল এই কুফায়-যা এখন ইরাকের সীমানায় অবস্থিত। যেখানে রয়েছে হযরত হোসাঈন (রা.) এর পিতা হযরত আলী (রা.) এর কবর। কিন্তু ইয়াজিদের সৈন্যরা পথিমধ্যে হযরত হোসাইন (রা.) এর কাফেলাকে বাঁধা প্রদান করে এবং কাফেলাকে অবরোধ করে ফেলে। হযরত হোসাঈন (রা.) নিরুপায় হয়ে তাদের বলেন-১. আমাকে মক্কায় ফিরে যেতে দাও। ২. আমাকে ইয়াজিদের কাছে যেতে দাও। ৩. আমাকে কোন মুসলিম সীমান্তে যেতে দাও। কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনী তাঁর কোন কথায় কর্ণপাত না করে দু'দফা প্রস্তাব প্রদান করলো। ১. ইয়াজিদের শাসন মেনে নাও। ২. যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে হযরত হোসাঈন (রা.) বাধ্য হলেন যুদ্ধ করতে। একদল মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে।
৬১ হিজরী সনের কথা। মুহররমের ১০ তারিখ-আশুরার দিবসে ফুরাতের তীরে, কারবালার প্রান্তরে দু'দল মুসলিম সৈন্য পরস্পর মুখোমুখী। একদল আলী আর ফাতেমা (রা.) পুত্র হযরত হোসাঈন (রা.) এর পক্ষে-যার সৈন্য সংখ্যা মাত্র ৭০ জন। আরেকদল আমীর মুয়াবিয়া (রা.) পুত্র ইয়াজিদের পক্ষে-যার সৈন্য সংখ্যা ৪ হাজার। যুদ্ধ শুরু হবে হবে এমন অবস্থা। হযরত হোসাঈন (রা.) দাঁড়ালেন দু'দল সৈন্যের মাঝখানে। আর আবেগময় কন্ঠে উচ্চারণ করলেন "তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করছো। অথচ আমার একটি অপরাধ, আমি ইয়াজিদের ন্যায় একজন অত্যাচারী (জালেম) এবং পথভ্রষ্ট (গোমরাহ)কে মুসলিমদের আমীর বলে স্বীকার করছিনা। আর সেই অপরাধে আজ তোমরা আমার রক্ত পান করতে যাচ্ছ।" ইমাম হোসাঈন (রা.) এর এই আবেগময় উক্তি ইয়াজিদ বাহিনীর মনে কোন রেখা ফেলতে পারলোনা। শুরু হলো যুদ্ধ। হযরত হুসাঈন (রা.) এর পক্ষের একে একে সবাই শাহাদাত বরণ করলেন। হযরত হোসাঈন (রা.) একাই অনেকক্ষণ লড়াই করে অবশেষে তিনিও শাহাদাত বরণ করেন।
কূফার অধিবাসী যারা হযরত হোসাঈন (রা.) কে চিঠি লিখেছিল, তারা হযরত হোসাঈন (রা.) আসতেছেন এ খবর জানতো। তারা হযরত হোসাঈন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কেও ছিল অবগত। কিন্তু তারা হযরত হোসাঈন (রা.) এর এ দূঃসময়ে তাঁর জন্য চোখেঁর পানিতে বুক ভাসিয়েছে, ইয়া হোসাইন-ইয়া হোসাঈন বলে চিৎকার করেছে। কিন্তু হযরত হোসাঈন (রা.) এর জন্য সামান্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি। বরং এই সময়ে ইয়াজিদ এবং তার বাহিনী যে সহযোগিতা চেয়েছিল, তামাম সহযোগিতা তাদের কাছ থেকে তারা পেয়েছে।
ইসলামী গবেষকরা এই ঘটনা থেকে এই শিক্ষা গ্রহণের নসিহত করেন যে, ১. একজন মুমিন কোন অবস্থায়ই আধিপত্যবাদ, অসত্য ও অন্যায়ের সামনে মাথা নত করবে না, প্রয়োজনে জীবন দেবে। ২. ইসলামের জন্য চোখের পানি ফেলা, দোয়া করা, সুললিত কন্ঠে ইসলামী নেতৃত্ব বা ব্যক্তিত্বের প্রসংশা করা খুবই সহজ কাজ। কিন্তু তা ইসলামে কোন বড় প্রয়োজনে আসেনা। বরং এসব যারা করে, তারা ইসলামের প্রকৃত প্রয়োজনের সময় কোন ভূমিকা রাখেনা, রাখতে পারেনা। তাই চোখের পানির চেয়ে কাজটাই বড়, যদিও তা হয় অতিক্ষুদ্র।
সুধী পাঠক! আশুরা বলতে আমরা উপরোক্ত ঘটনাই জানি। কিন্তু আমাদের জিজ্ঞাসা মুহররম আর আশুরার ফজিলত বা তাৎপর্য কি হযরত হোসাঈন (রা.) এর এই কারবালার আত্মত্যাগ থেকে? স্কুল মাদ্রাসার এসএসসি বা দাখিল পর্যায়ের একজন ছাত্র বা ছাত্রী আশুরা বলতে তা-ই জানে। কিন্তু আমাদের উত্তর হচ্ছে, না! না!! আশুরা মানে হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগ নয়। বরং তার চেয়ে কমপক্ষে ৫ দশক পূর্বে হযরত হোসাঈন (রা.) এর নানা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছেন এই দিনে এবং এর আগে বা পরে যে কোন এক দিনে সিয়াম পালনের। আর এ নসিহতই প্রমাণ করে যে, প্রথমতঃ মুহররম বা আশুরার ফজিলত হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগ বা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা থেকে নয়। আর দ্বিতীয়তঃ আশুরা একটি ইসলামী পরিভাষা, যার উৎপত্তি আশুরা আরবী শব্দ থেকে-অর্থ ১০। আর এই আশুরার সাথে হযরত হোসাঈন (রা.) এর আত্মত্যাগের কোন সম্পর্ক নেই। বরং হযরত হোসাঈন (রা.) এর এই ঘটনা দৈব্যদূর্বিপাকে ঐ বছরের আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছিল।
কারবালার প্রান্তরে হযরত হোসাঈন (রা.) শাহাদাতের ঘটনার অনেক অনেক বছর পূর্বে নবী মুহাম্মদ (সা.) আশুরা বা মুহররমের ১০ তারিখ যথাযথ মর্যাদার সাথে পালনের নির্দেশ দেন। তখন হযরত হোসাঈন (রা.) শৈশব অতিক্রম করে কৈশোর বয়সে পাঁ রাখছেন মাত্র।
হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন যে, (**********) রাসূল (সা.) আশুরায় রোযা ছিলেন এবং আশুরায় রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায় যে, নবী (সা.) যখন মদীনায় গমন করলেন, তখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, আশুরার দিবসে ইয়াহুদীরা রোযা রাখছে। তিনি এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল-ঐদিন হযরত মুসা (আ.)কে আল্লাহ মুক্তিদান করেন এবং ফেরাউনকে নীল নদে নিমজ্জিত করেন। মুসা (আ.) ঐ দিনে শুকরিয়া হিসাবে রোযা রেখেছেন। তখন রাসূল সা. বললেন-(********) "মুসা (আ.) এর সাথে তোমাদের থেকে আমাদের সম্পর্ক অগ্রাধিকার মূলক এবং নিকটতর।" অতঃপর তিনি আশুরায় রোযা রেখেছেন এবং রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ এ সম্পর্কে নবী (সা.) কে পরে প্রশ্ন করা হয় যে, ইহা ইয়াহুদীদের অনুসরণ হয়ে যায় কিনা? তথন তিনি আশুরা তথা ১০ দিবসের রোযার সাথে আরেকটি রোযা (তথা ৯ম দিবসে বা ১১তম দিবসে) মিলিয়ে রাখার নসিহত করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তাহলে মহররমে ৯ম দিবসেও রোযা রাখবো। আর ইবনে আব্বাস (রা.) তাই বলেছেন-(**********) "নবম এবং দশম তারিখে রোযা রাখো, ইহুদীদের সাথে ভিন্নতা সৃষ্টির জন্য"। আর এই রোযার ফজিলত সম্পর্কে রাসূল )সা.) বলেছেন-আশুরার রোযার ফজলে পূর্ববর্তী বছরের সকল গুনাহ মাফ করা হয়।
রমজানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরার রোযা ফরয ছিল। আশুরা তাই নবী (সা.) এর যুগ থেকেই ফজিলতময় নয়, বরং তারও পূর্ব থেকে। বিধায় হযরত হোসাঈনের ঘটনার কারণে আশুরা বরকতময় নয়, বরং আশুরার বরকতময় দিবসে হযরত হোসাঈন (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনা ঘটেছে। কেন এই দিবস অন্যান্য দিবসের চেয়ে ফজিলতময়? ১০ই মহররম ১০টি কারণে আশুরায় পরিণত হয়েছে বলে জানা যায়।
১. আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা এই বিশ্বধরনী বা পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা করেছেন মুহররম মাসের ১০ তারিখের এই দিনে।
২. পৃথিবীর সকল কার্যক্রম যখন শেষ হবে, তখন পৃথিবী ধ্বংস হবে একদিন। আর কিয়ামত সংঘটিত হবে। তাও মুহাররামের ১০ তারিখের এই দিনে।
৩. মানব জাতির হেদায়াতের জন্য, পথহারা মানুষকে পথের দিশা দিতে, সীরাতাল মুস্তাকিমের পথ দেখিয়ে দিতে, মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ যুগে যুগে অনেক অনেক নবী এবং রাসূল এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এরা সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ট সন্তান। এই সব প্রেরিত নবীদের অনেকের জন্ম মুহররমের ১০ তারিখের এই দিনে।
৪. আল্লাহ যে সব নবীকে এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, তাদের অনেকে অনেক সময় বিভিন্ন ইস্যুতে নানাবিধ প্রয়োজনে তাদের রবের বরাবরে হরেক রকম আঁকুতি জানিয়েছেন-মুনাজাত করেছেন। অধিকাংশ নবীদের দোয়া কবুলের দিন হচ্ছে এই মুহররমের ১০ তারিখ।
৫. আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা সারা জাহানের সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আদম (আ.) থেকে আর আদম (আ.)কে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। মাটি থেকে সৃষ্ট আদম থেকে প্রথমেই তৈরী হন তার স্ত্রী হাওয়া (আ.)। যারা দু'জন আমাদের আদি পিতা এবং আদি মাতা। যারা এক সময় জান্নাতে ছিলেন বসবাসরত এবং আল্লাহ এক সময় তাদের দু'জনকে পৃথিবীর দূ'প্রান্তে তথা একজনকে সৌদি আরবে আর আরেকজনকে শ্রীলংকায় প্রেরণ করেন। দূ'জন দীর্ঘ বিরহে অবস্থানের পর হযরত আদম আ. ক্ষমা ভিক্ষা করে আল্লাহর নিকট দোয়া করেন "হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো, আর আমাদেরকে (ক্ষমার সাথে ) যদি দয়া না কর, তাহলে আমরা আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাবো"। আদমের রব আল্লাহ মুহাররামের এই দিনে তাঁর দোয়া কবুল করেছিলেন।
৬. হযরত নূহ (আ.) দীর্ঘ ৯০০ বছর মানুষকে এক আল্লাহ দাসত্বের আহবান জানালেন। কিন্তু তাঁর জাতি দম্ভভরে সে আহবান প্রত্যাখ্যান করলো। অবশেষে তাদের প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি স্বরূপ আসলো মহাপ্লাবন। সেই মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর নির্দেশে হযরত নুহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা বিশাল নৌযান তৈরী করে তাতে আরোহণ করেন। দীর্ঘ ৪০ দিন মহাপ্লাবন সবকিছু লন্ডভন্ড করে অস্বীকারকারীদের স্বমূলে ধ্বংস করার পর মুহররমের এই ১০ তারিখের এই দিনে নূহ (আ.) এর কিস্তি তীরে ভীড়ে।
৭. হযর ইউনুছ (আ.) জাহাজ থেকে সাগরে লাফ দিয়ে ছিলেন আর সাথে সাথে একটি তিমি মাছ তাকেঁ গিলে ফেলে। এর পর সে চলে যায় সাগরের তলে অতলে। যেখানে নেই কোন সাড়া চিত্কার। কিন্তু সেখানেও আল্লাহর নবী ইউনুছ (আ.) শুনতে পান যেন কিসের শব্দ। ভাল ভাবে কান পেতে শুনেন আল্লাহর যিকির "লা ইলাহা ইল্লাহ আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যওয়ালিমীন"। হযরত ইউনুছ (আ.) সাথে সাথে এই যিকির পড়ে আল্লাহ নিকট নিবেদন করলেন। আর সাথে সাথেই মাছ অস্তির হয়ে ছুটে আসে প্রসব বেদনা নিয়ে তীরের দিকে। বমি করে ছুড়ে ফেলে হযরত ইউনুস (আ.) কে। মাছের পেট থেকে হযরত ইউনুছ (আ.) মুক্তিপান মুহররমের ১০ তারিখের এই দিনে।
৮. সকল নবীকে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা পরীক্ষা করেছেন। এই পরীক্ষার মধ্যে সবচেয়ে কমন পরীক্ষা ছিল নবীদের সবর বা ধৈর্য্যের পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষার ধরণ এক ছিলনা-ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এমনই এক পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল নবী হযরত আইয়ুব (আ.) থেকে। তার সারা শরীরে কুষ্ঠ রোগ প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু নবী ধৈর্য হারা হননি। ক্রমে রোগ বাড়তে বাড়তে সারা শরীর জুড়ে গেল। তার আপনজন যারা ছিল-এমনকি প্রিয়তমা স্ত্রী পর্যন্ত তাকে ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু নবী ধৈর্য হারাননি। অবশেষে যখন রোগ জিহবায় ছড়িয়ে পড়লো, তখন নবী শুধু এই অভিযোগ করলেন, হে মাবুদ! তুমি আমাকে রোগ দিয়েছো, এতে আমার কোন আপত্তি নেই। আমি অসন্তুষ্ট নই। কিন্তু যে জিহবা দিয়ে আমি তোমাকে আল্লাহ বলে ডাকি, সেই জিহবায় যদি রোগ হয়ে যায় তাহলে তুমি আল্লাহকে 'আল্লাহ' বলে এ গোলাম কেমনে ডাকবে? আল্লাহ তাঁর নবীর এ আবেদন শুনে খুশী হয়ে তাকে এই কঠিন রোগ থেকে মুক্তি দেন মুহররমের ১০ তারিখের এই দিনে।
৯. মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)। নবীদের তালিকায় ইব্রাহীম (আ.) একটি ব্যতিক্রমী নাম। এই ইব্রাহীম (আ.)কে ইহুদী আর খৃষ্টানেরাও মানে। তারা ডাকে আব্রাহাম। সেই ইব্রাহীম (আ.)কে সীমাহীন পরীক্ষা করেছিলেন তার বর। তদানিন্তন সম্রাট নমরুদের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে যখন তিনি তাওহীদের দাওয়াত প্রদান করলেন এবং নমরূদকে রব মানতে অস্বীকার করলেন। তখন নমরূদ তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার জন্য একটি অগ্নিকূন্ড তৈরী করে এবং যাতে হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে নিক্ষেপ করে। তখন ফেরেশতা সরদার হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর বরাবরে উপস্থিত হন এবং সাহায্য করার কথা বলেন। কিন্তু ইব্রাহীম (আ.) জিব্রাঈলকে বলেন-"আমি এমন কোন রবের গোলামী করিনা, যিনি আমার অবস্থা দেখেন না"। আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তায়ালা তাঁর এই জবাবে খুশী হয়ে আগুনকে নির্দেশ দিলেন "হে আগনু! ঠান্ডা হয়ে যাও এবং ইব্রাহীমের জন্য শাস্তির কারণ হয়ে যাও।" সেই অগ্নিকূন্ড থেকে হযরত ইব্রাহীম (আ.)কে হেফাজত করেন আল্লাহ মুহররমের ১০ তারিখের এই দিনে।
১০. হযরত মুসা (আ.)। যার জন্মকে রুখে দেয়ার জন্য তদানিন্তন ফেরাউন জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল। ফেরাউনী সেই বাঁধা ডিঙিয়ে হযরত মুসা (আ.) এই পৃথিবীতে আসেন এবং তার শত্রু ফিরাউনের তত্ত্বাবধানেই বড় হন এবং এক সময় ফেরাউনের নিকট দাওয়াত নিয়ে উপস্থিত হন, যখন ফেরাউন নিজেকে রব বলে দাবী করেছিল। দীর্ঘ সংগ্রামের এক সময়ে হযরত মুসা (আ.) আর তার অনুসারীদের নির্মূল করার জন্য ফিরাউনের বাহিনী যথন নীল নদের অববাহিকায় তাদেরকে অবরোধ করে ফেলে, এবং যখন মুসা আ(.) এবং তাঁর অনুসারীদের সামনে নীল নদে ঝাপিয়ে মরা ছাড়া অন্য কোন পথ ছিলনা, তখন মুসা (আ.)তাঁর রবের কাছে সাহায্য চাইলেন। প্রবল বেগে বেগবান নীল নদে আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাঁর হাতের লাঠি ফেললেন। সহসাই সেখানে একটি মসৃণ রাস্তা হয়ে গেল এবং যেই রাস্তা দিয়ে মুসা (আ.) এবং তাঁর অনুসারীরা নিরাপদে নীল নদের ওপারে চলে গেলেন। অগত্যা ফিরাউন তার দলবল নিয়ে নীল নদের তীরে হাজির। দেখে "এইতো মুসা (আ.) যায় তার দলবল নিয়ে"। পিছু দাওয়া করতে সেও নামে সেই পথে। নীল নদের মাঝখানে পৌছামাত্র দূ'দিক থেকে পানি এসে ভাসিয়ে নেয় ফিরাউন আর তার সাথীদেরকে। সলীল সমাধী হয় ফেরাউন ও তার সঙ্গী সাথীদের। ফেরাউনের হামলা থেকে মুক্তি পান হযরত মুসা (আ.) এবং তার অনুসারীরা আর নিঃশেষ হয় ফিরাউন আর তার দলবল মুহররমের ১০ তারিখের এই দিনে।
প্রিয় পাঠক! নবী মুহাম্মদ (সা.) কে আমরা অনুসরণ করে যদি আশুরার বারাকাত নিতে চাই, তাহলে উপরে বর্ণিত সকল ঘটনা নয়, কেবল হযরত মুসা (আ.) এর ঘটনাকে স্মরণে রেখে রাসূল (সা.) এর দেখানো তরীকা মতে তথা মুহররমের ৯ এবং ১০ অথবা ১০ এবং ১১ তারিখে রোযা রেখে আমরা আশুরা পালন করবো। মনে রাখতে হবে মুহররমের ১০ তারিখে আশুরা, যা নির্ধারিত হয়েছে হযরত হোসাইন (রা.) এর জন্মেরও পূর্বে। বিধায় হযরত হোসাইন (রা.) এর আত্মত্যাগের কারণে আশুরা মহিমান্বিত নয়, বরং বরকতময় আশুরার দিবসে হযরত হোসাঈন (রা.) আত্মত্যাগ করেছিলেন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক জনাব মতিউর রহমান "ময়না স্যার"। "রসের বেসাতী" শব্দটি কৈশোরে তাঁর থেকে শেখা।
# লেখকঃ মুহাম্মদ নজরুল ইসলামঃ মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী সরকারী চাকুরীজীবি। ই-মেইলঃ mnibwch@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MuhammadNazrulIslam |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
|