|
ভূমিকম্প রোধে প্রস্তুতি কতটুকু
মুহাম্মাদ রিয়াজ উদ্দিন |
|
দেশে একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটে চলেছে। এ যাবৎ ঘটে যাওয়া সবগুলি ভূকম্পনই ছিল মৃদু। তাই হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও অনেক বহুতল ভবনে ফাটল দেখা গেছে। যে দেশে ভূমিকম্প ছাড়াই বহুতল ভবন হেলে পড়ে কিংবা ফাটল ধরে সে দেশে উচ্চমাত্রা সম্পন্ন ভূমিকম্প হলে কী হবে সেটা নিশ্চয়ই অভাবনীয় নয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছেন উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হলে দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা যাবে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা শহরেই গড়ে উঠেছে অনুমতিবিহীন বহুতল ভবন। প্রতিনিয়তই বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন।
গত ১৯ মার্চ ঢাকায় ৪ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূকম্পনটির কেন্দ্র আগারগাঁও ভূকম্পন কেন্দ্র থেকে মাত্র ২১ কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল। ১০ সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে এক বৃদ্ধার নিহতের ঘটনা জানা গেছে। এর পূর্বে গতবছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে প্রায় ৬১ বছর পরে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিট থেকে ৪৪ মিনিট পর্যন্ত ভূমিকম্পটি ২মিনিট স্থায়ী হয়। ঢাকা তথা দেশের ইতিহাসে প্রায় ৬১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। ধ্বংসাত্মক ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৬.৮। বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতে অনুভূত কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪৯৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের সিকিম রাজ্যের রাজধানী গ্যাংটক থেকে ৬৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয় বৃহত্তর দিনাজপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা এলাকায়। ওই কম্পনের ফলে রাজধানী ঢাকার কয়েকটি ভবন হেলে পড়েছে এমন সংবাদ জানা গেছে। তবে বড় ধরনের কোন ক্ষতি থেকে দেশ রক্ষা পেয়েছে এমনটি বলেছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা। ২মিনিট স্থায়ী ওই কম্পনের ফলে ঢাকার বড় ভবনগুলো হঠাৎ করে দুলে ওঠে। আমাদের দেশে কোন কিছুর ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেই হুলস্থূল লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু ঘটনার পূর্বে সবার করণীয় কী এমন প্রচারণা খুব কমই দেখা যায়। ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। রিখটার স্কেলে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার হাজার হাজার বহুতল ভবন ধ্বসে পড়বে। আর দুর্যোগ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাকসুদ কামালের মতে, ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প ৪৫০টি আণবিক বোমার সমান। ফলে এর ধ্বংসাত্মাক ক্ষতির পরিমাণও বেশি। মানুষের ঘনবসতি খোদ রাজধানী ঢাকা পরিণত হবে মৃত্যুপুরী এক নগরীতে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, ভূমিকম্পের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি ঘটবে, তার প্রধানটিই হবে জীর্ণদশা ও অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের কারণে। অন্যদিকে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় বিনাচিকিৎসা বা উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য মানুষের প্রাণ ও অঙ্গহানি ঘটবে বলে আশঙ্কা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্প আঘাত হানলে পুরনো ঢাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী ও প্রফেসর মেহেদী আহমদ আনসারী ওই এলাকা সমীক্ষা করে এরকম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাদের লিখিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে। কারণ পুরনো ঢাকায় ঘনবসতি এলাকা সবচেয়ে বেশি এবং ঘরবাড়ি বহু বছরের পুরনো। এখানে ৩০টিরও অধিক ঐতিহাসিক দালানকোঠা রয়েছে যা এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ। পুরনো ঢাকায় রাস্তা এত সরু যে, দমকলের গাড়ি প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। ভূমিকম্পের সময় মানুষ কিভাবে নিজেকে রক্ষা করবে সে বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। ভূমিকম্পের স্থায়িত্বকাল ৩০-৪০ সেকেন্ড হলে বিচলিত না হয়ে মাথা স্থির রেখে নিজের মাথাকে সুরার জন্য হাতের কাছে যা পাওয়া যায় (যেমন-বালিশ, কম্বল, কাঁথা, বই-খাতা, মজবুত হাঁড়ি-পাতিল) ইত্যাদি দিয়ে মাথাটাকে ঢেকে রাখতে হবে। অথবা খাট ও টেবিলের নিচে, করে কর্নারে আশ্রয় নিতে হবে। সম্ভব হলে দ্রুত খোলা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। চুলা জ্বালানো থাকলে দ্রুত বেরিয়ে বাইরে আশ্রয় নিতে হবে। ভূমিকম্পের সময় কোন অবস্থাতেই জানালার পাশে যাওয়া যাবে না। লিফট ব্যবহার করা যাবে না। ঘরের বাইরে থাকলে বড় গাছ, বহুবতল ভবন বা বিদ্যুৎ খুঁটির থেকে দূরে থাকতে হবে। যানবাহন চলাচল অবস্থায় ভূমিকম্প হলে রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ির মধ্যে সবাইকে অবস্থান করতে হবে। সম্ভব হলে টর্চ লাইট হাতের কাছে রাখতে হবে। ভূমিকম্পে ভাঙ্গা দেয়ালে চাপা পড়লে কোন প্রকার নড়াচড়া করা যাবে না এবং শ্বাসনালিতে যাতে ধূলাবালি ঢুকতে না পারে সেজন্য সম্ভব হলে নাক-মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। ভূমিকম্পের সময় হুড়োহুড়ি বা ছোটাছুটি না করে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে আত্মরক্ষার পাশাপাশি উদ্ধারকর্মীদের খবর দেয়ার চেষ্টা করতে হবে।
ভূমিকম্পের সময় করণীয় কী সে সম্পর্কে প্রতিটি নাগরিকের জানা প্রয়োজন। দেশের সবার কাছে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা এবং ভূমিকম্পের সময় কী করণীয় এবং কী কাজ করলে মারাত্মক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এমন তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকম্প বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। প্রয়োজনে বিভিন্ন মেয়াদে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে অন্তত পক্ষে মানুষের জীবন রক্ষা পেতে পারে। এক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক মিডিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন ও বেতারের মাধ্যমে সংবাদের আগে ও পরে এ সম্পর্কিত বুলেটিন প্রচার করা যেতে পারে। যার মাধ্যমে সচেতন হবে প্রতিটি নাগরিক। সতর্ক থাকবে নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মাণে। একটু সতর্কতাই পারবে ভূমিকম্পের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে। সতর্কতাই জীবন বাঁচানোর অস্ত্র হয়ে উঠুক। আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক ও করণীয় সম্পর্কে এখন থেকেই নিজে জানি এবং অপরকেও জানাই। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও হতে পারে ভূমিকম্প সম্পর্কিত নানা প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মশালা। সর্বোপরি দেশের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
লেখকঃ সংবাদকর্মী, সিলেট
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MuhammadRiazUddin |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| মুহাম্মাদ রিয়াজ উদ্দিন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার চন্দ্রহার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মুক্তিযোদ্ধা কে এম মোয়াজ্জেম হোসেন, মা মনোয়ারা বেগম। ২০০০ সালে শিক্ষাবিচিত্রার রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে নিরুদ্দেশ (২০০৫), কালোপরী (২০০৯) এবং কবিতার বই নানা রঙের দিনগুলি (২০১০) সম্পাদিত। বর্তমানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৪র্থ বর্ষ ২য় সেমিস্টারে অধ্যয়নরত। |
|