পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২ এর সংবিধান প্রায় পূনঃ প্রতিষ্ঠা করেছে বর্তমান সরকার। রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণীত হয় রাষ্ট্রীয় ভূ-খন্ডের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। সঙ্গত কারণে সংবিধান নাগরিকের জাতিসত্ত্বা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে।
১৯৭১ সালে অসম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। ফলে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠির জন্য সংবিধান প্রণয়ন অনিবার্য হয়ে পড়ে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭২ সালে একটি সংবিধান প্রণীত হয়।
প্রথমে বলা দরকার, যে সভা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, তাদের কোন আইন সম্ভব এখতিয়ার সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে ছিলনা। ১৯৭২ সালের সংবিধান সভা গঠিত হয়েছে পাকিস্তানের ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের নিয়ে। ১৯৭০ সালের নির্বাচিত এই প্রতিনিধিদের দায়িত্ব ছিল শুধুমাত্র পাকিস্তানের গণপরিষদে আইন প্রণয়ন। তাদের প্রতি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কোন ম্যান্ডেট ছিল না।
এক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয় হল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে মানুষের চিন্তায় যে পরিবর্তন এসেছিল, এই যুদ্ধের মধ্যে জনগণের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেই অসামান্য পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পাকিস্তানি আমলে নির্বাচিত পরিষদের মধ্যে ছিল না। কারণ যারা ১৯৭০ সালে সক্রিয়ভাবে লড়াই করেছিল, তারা কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য হয়নি। তাই মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল তাদের। কাজেই পাকিস্তানি পরিষদ সদস্যদের কোন প্রকৃত এখতিয়ার এমন কি আইনগত বৈধতা ছিল না স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের। বলা যায় পাকিস্তানি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের দিয়ে সংবিধান প্রণয়ন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। বাংলাদেশের এখন সংবিধান নিয়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে তার মূল এই বিশ্বাসঘাতকতার মধ্যেই সন্ধান করতে হবে।
স্বাধীন বাংলদেশের প্রথম প্রশ্নবিদ্ধ সংবিধানের (১৯৭২) মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেতা ও সমাজতন্ত্র। জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সম্পৃক্ত করা যায়। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামীলীগ রহস্যময় প্রধান ভুমিকা পালন করেছিল। কিন্তু আওয়ামীলীগের কতজন নেতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল বা কতজন কলকাতায় পাচঁতারা হোটেলে ভোগ বিলাসে মত্ত ছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। আওয়ামীলীগের দাবী বাহাত্তের সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু ১৯৫২ থেকে ১৯৭২ এই দীর্ঘ সংগ্রামে আওয়ামী লীগের কোথাও এই চার মূলনীতির কথা বলা হয়নি। ১৯৫২ এর যুক্তফ্রন্টের ২১দফা, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা, ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান, ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ইশতেহার, ৭ মার্চের শেখ মুজিবের ভাষণ, অস্থায়ী সরকারের ইশতেহার এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের কোথাও সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেতা উল্লেখ ছিল না। তাহলে কোথা থেকে এই মূলনীতি দুটি বাংলাদেশের সংবিধানে উড়ে এল বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠি এখনো সেই উত্তর পায়নি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ যখন ভারতে অবস্থান করছিল, তখন ভারত তাদের ঠুনকো সহযোগিতার বিনিময়ে তাদের সংবিধানের এই মূলনীতিগুলো আমাদের সংবিধানে চাপিয়ে দেয়। যে গুলো আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে দাবী করেছে, তার ধারা এখনও অব্যাহত আছে। কিন্তু অন্য একটি দেশের সংবিধানের মূলনীতি কখনো আরেকটি স্বাধীন দেশের সংবিধানের মূলনীতি হিসাবে গৃহিত হতে পারে না। তা গণমানুষের বিশ্বাস ও প্রত্যাশার পরিপন্থী। যে সংবিধান বৈধ ভাবে রচিত হয়নি, সেই সংবিধান কিভাবে দেশের অধিকাংশ মানুষের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটাতে পারে? বরং জাতি হিসাবে আমাদেরকে গ্লানিকর বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে চিরকাল।
* পঞ্চদশ সংশোধনীর অন্তরালে:
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক কালো অধ্যায়। পূর্ববর্তী দুই বছর আওয়ামী তান্ডব দেশকে চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়। যার ফলে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক জরুরী সরকার ক্ষমতায় আসে। আর এই সরকারের সাজানো ম্যাকানিজমে প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে জরুরী সরকার জাতীয় নেতাদেরকে কারান্তরীণ করে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় দশ টাকায় চাল ও বিনা মূল্যে সার এবং কোরআন সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন করবেনা বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। মূলত: ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় (যা ইকোনোমিস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রমাণিত) নির্বাচনে বিশাল জয়লাভ করে আওয়ামীলীগ। ক্ষমতায় এসে ভারতের আবদার পূরণকে একমাত্র এজেন্ডা হিসাবে গ্রহণ করে। আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পরপরই চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে ভারতের রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন, “ভারত চাই তাদের মত সেক্যুলার বাংলাদেশ”। সেই ধারাবাহিকতায় সংবিধান সংশোধনে উচ্চ আদালতের বিতর্কিত রায় ধরে এগিয়ে যায় সরকার। বাংলাদেশের পরজীবী বাম রাজনৈতিক দল ও আওয়ামীলীগের সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্তকে প্রধান করে কমিটি ঘোষনা করে। কমিটি ২৮টি বৈঠকের মাধ্যমে সংশোধিত সংবিধানের সুপারিশমালা তৈরী করে। জনগণের প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা নেই বিধায় সংশোধনীর বিষয়ে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংবিধানের অসঙ্গতি তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক।
* পঞ্চদশ সংশোধনীর মৌলিক অসঙ্গতি:
বর্তমান সরকার তার সকল বিতর্কিত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য আদালতকে আশ্রয়স্থল বানিয়েছে। প্রত্যেক স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়ন, সংযোজন বা সংশোধনের দায়িত্ব নির্বাচিত আইন সভার সদস্যদের। কিন্তু সরকার আদালতের রায়ে সংবিধান সংশোধনের সুযোগ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে আদালতের রায়কেও পুরোপুরি অনুসরণ করেনি। নিজেদের ইচ্ছামত ধারা-উপধারা সংযোজন বিয়োজন করায় সংবিধানে নানা অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া অবিশ্বাস্যভাবে দ্রুতগতিতে সংশোধন করতে অন্যদের মতামত নিলেও তা গৃহিত হয়নি। সংবিধানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ সংশোধন অযোগ্য করে আমাদের সংবিধানের “চেকস এ্যান্ড ব্যালেন্স” পদ্ধতিকেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
* জনগনের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী:
পঞ্চদশ সংশোধনীর আলোকে সংবিধানের ২য় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে ৮(১ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস হইবে যাবতীয় কার্যবলীর ভিত্তি”। পঞ্চদশ সংশোধনীতে এ বিধান গুলো সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে ইতিহাসের ব্যর্থ মতবাদ “সমাজতন্ত্র” কে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
* স্ব-বিরোধীতা:
সংশোধীত সংবিধানে প্রতিস্থাপিত ১২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “ধর্মনিরপেতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা”। ধর্ম নিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য (ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, (খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান, (গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার, (ঘ) কোন বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার নিপীড়ন বিলোপ করা হইবে। অনুচ্ছেদ;-১০ অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসাবে স্বীকৃত। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে বজায় রাখা (অনুচ্ছেদ ২ক) চরম স্ব-বিরোধী ও দূরভিসন্ধিমূলক।
* ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধের পথ সুগম:
সংশোধিত সংবিধানের ১২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য তরবারির ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে। মূলত ১৯৭২ সালে সংবিধান এই অনুচ্ছেদের আলোকে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
* সংবিধানের মাধ্যমে জনগনের মত প্রকাশে স্বাধীনতা হরণ:
ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতায় এসে যেন মৌলিক বিষয় গুলো পরিবর্তন বা সংশোধনী আনতে না পারে সে জন্য অনুচ্ছেদ ৭(ক) এ বলা হয়েছে- “কোন ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোন অসাংবিধানিক পন্থায় (ক) এই সংবিধান বা ইহার অনুচ্ছেদ রদ, বাতিল বা স্থগিত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে কিংবা (খ) এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে তাহার এই কাজ রাষ্ট্রদ্রোহীতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে দোষী হইবেন।” কিন্তু এখানে মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা নেই। হাত-পা বেঁধে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে।
* বাঙ্গালী জাতিসত্বা চাপিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল সৃষ্টিতে সুযোগ দান:
পঞ্চদশ সংশোধনীতে নতুন অনুচ্ছেদ ৬(২) প্রতিস্থাপন করে বলা হয়েছে- “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে ‘বাঙ্গালী’ এবং নাগরিকত্ব “বাংলাদেশী” বলিয়া পরিচিত হইবেন।” এখন প্রশ্ন যে সকল ক্ষুদ্রগোষ্ঠি গুলো বাংলাদেশে বসবাস করছে তারা কি বাঙ্গালি হয়ে যাবে? সঙ্গত কারণেই এই বিতর্কিত ধারাটি নিয়ে পার্বত্য অঞ্চল অশান্ত হয়ে উঠেছে।
* নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অস্পষ্টতা:
তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির পর আগামী দশম সংসদ নির্বাচন কিভাবে হবে তাও সুস্পষ্ট নয় পঞ্চদশ সংশোধনীতে। আওয়ামীলীগের নেতা সুরঞ্জিত সেন এর মতে, বর্তমান সরকারের শেষ ৯০ দিন হবে অন্তর্বতীকালীন, তখন বর্তমান সরকারই অন্তবর্তীকালীন সরকার হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে। তবে তাহারা কোন নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। শুধু রুটিন ওয়ার্ক করা যাবে। তখন সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যাবতীয় সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার থাকবে কেবল নির্বাচন কমিশনের (ইসি), সুরঞ্জিত আরো বলেন, শেষ ৯০ দিন বর্তমান মন্ত্রীসভা থাকলেও মন্ত্রীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। অবশ্য এসবের কোন ব্যাখ্যা নেই পঞ্চদশ সংশোধনীতে। খোদ আওয়ামীলীগের কয়েকজন সংসদ সদস্য আলাপকালে বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়াটি পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুস্পষ্ট নয়। এখানে কতগুলো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেমন- বলা হচ্ছে সরকারের শেষ ৯০দিন হবে “অন্তর্বতী” কিন্তু সংশোধনীতে এই শব্দটি কোথাও উল্লেখ নেই। চলতি নবম জাতীয় সংসদের জন্য যারা সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তারা পাচঁ বছরের জন্য নির্বাচিত। যদি শেষ ৯০ দিন অন্তবর্তী হয়, তাহলে সরকারের কিংবা সংসদ সদস্যদের মেয়াদ ৪ বছর ২৭৫ দিন হবে? তারপর ঐ ৯০ দিন আসার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। একদিকে সংসদ থেকে যাবে অন্য দিকে সংসদ সদস্য হিসাবে তাদেরকে আবার নির্বাচন করতে হবে? তাহলে তারা এমপি হিসাবে কিভাবে জনগণের নিকট ভোট চাইবেন? অনেকের মতে, এই বিষয়গুলোতে যথেষ্ট গোজামিল রয়েছে।
* প্রচলিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল:
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের রায়ের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল জাতিকে এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ের দোহাই দিয়ে। আদালত গত ১০ মে ঘোষিত তার সংক্ষিপ্ত আদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে “প্রসপেক্টিভলি” বা ভবিষ্যতের জন্য অবৈধ ঘোষণা করে রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার খাতিরে এটি আরও দুই মেয়াদ (টার্ম) রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। অর্থাৎ আদালত আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কনডোন বা মার্জনা করেছেন। তাই আদালতের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা জনগণের চোখে ধুলা দেওয়ার শামিল।
সংবিধান বিশিষ্টজনের অভিমত
ড. কামাল হোসেন: সংবিধান প্রণেতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন, গণভোট ছাড়া সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। অথচ এ কাজটিই বেআইনিভাবেই করেছে সরকার। এটা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হতে পারে না। এইভাবে সংবিধান সংশোধন করা সংবিধানের মূলনীতির বিরুদ্ধে অপরাধ। সংবিধানের ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সরকার জনগণকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।
ব্যরিষ্টার রফিকুল হক: সাবেক এটর্নি জেনারেল ও খ্যাতিমান প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিষ্টার রফিকুল হক বলেছেন- ৭(ক) অনুচ্ছেদের কিছু অংশ দ্বারা সংবিধানের কোন অংশ রদ, রহিত বা স্থগিত করলে শাস্তির কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে যার প্রতি মানুষের সমর্থন নেই। এমন অনেকগুলো অনুচ্ছেদ সংযোজন ও পরিবর্তন করা হয়েছে যে গ্রহণ করার চেয়ে দেশের মানুষ সমালোচনাই বেশি করছে। অগ্রহণযোগ্য এই অনুচ্ছেদগুলোর বিষয়ে মানুষ যেন প্রশ্ন উত্থাপন করতে না পারে, সে জন্যই এই অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে। মূল কথা হচ্ছে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ সংশোধনী আনা হয়েছে বলেই এটাকে টেকসই করতে পৃথকভাবে এ অনুচ্ছেদটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সংবিধানের কোন বিধান সংশোধন করা যাবেনা তা আপনারা কোন আইনে পেলেন? সংসদ হচ্ছে সার্বভৌম। সংসদ সংবিধান সংশোধন ও সংযোজন করবে এটাই বিশ্বের স্বীকৃতি রীতি। একবার সংশোধন হলে পরবর্তীতে ঐ সংসদ সেটা আর সংশোধন ও পরিমার্জন করতে পারবে না এমন কোন বিধান পৃথিবীর কোথাও নেই।
অধ্যাপক আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, নতুন করে সংযোজিত ৭(ক) ও ৭(খ) সংবিধানের মূল কাঠামোর সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আনোয়ার হোসেন মামলায় রায়ে বলা হয়েছে সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭(ক) ও ৭(খ) নামে আরও দুটি অনুচ্ছেদের সংযোজনই হচ্ছে বেআইনী এবং সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থি। তিনি ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ কে অত্যান্ত বিপদজনক উল্লেখ করে বলেন, ৭(ক) এর একটি অংশ অসাংবিধানিক পন্থায় সংবিধান বা এর কোন অনুচ্ছেদ বাতিল ও স্থগিত করাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হিসাবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মূলত এই অংশের মাধ্যমে বাকশালীয় চেতনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিধানকে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধী দল ও ভিন্নমত দমন করার কাজে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। এটি সংবিধানের যে কোন অনুচ্ছেদ নিয়ে মুক্ত ও মননশীল চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতা এমনকি বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনার পথ বন্ধ করে দিতে পারে। পৃথিবীর কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের গণবিরোধী বিধান সংবিধানে নেই।
ড. শাহদীন মালিক: সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, সংশোধীত সংবিধান ছাপা হওয়ার আগেই সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বিরোধী দলীয় নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছেন। এ থেকে ৭(ক) অনুচ্ছেদের অপ্রয়োগের বিষয়ে একটা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আমার মনে হয় সংবিধানের এই ধরনের বিধান সংযোজনের অধিকার কারও নেই। সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তন করা যাবেনা এই ধরনের আইনও বিশ্বের কোথাও নেই।
খন্দকার মাহবুব হোসেন: সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, সংবিধানের কোন বিধান সংশোধন কিংবা বিয়োজন করা যাবেনা এ ধরনের কোন বিধান বিশ্বের কোন সভ্য দেশের সংবিধানে আছে বলে আমার জানা নেই। সংবিধান সংসদে রচিত হয়, আবার সংসদে সংশোধন ও সংযোজন হয়। বর্তমান সরকার উচ্চ আদালতের বিতর্কিত কিছু রায়ের বরাত দিয়ে ঢালাওভাবে সংবিধানের ৫০টির অধিক বিধান সংশোধন ও কিছু অনুচ্ছেদ সংযোজন করে। অথচ এই জন্য মতাসীন সরকার জনগণের কাছ থেকে কোন ম্যান্ডেট গ্রহণ করেনি। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার সংবিধানকে দলীয় ইশতেহারে পরিণত করেছে। (আমার দেশ ৮ই জুলাই)
বদিউল আলম মজুমদার: সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন- পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ভবিষ্যতের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে একটি পর্বত প্রমাণ বাধার সৃষ্টির করবে, যা আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত। ( প্রথম আলো ১১ জুলাই ২০১১)
মুন সিনেমা হল সংক্রান্ত মামলাকে কেন্দ্র করে আদালত পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলেও তা কোন অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। মূলত বিচার বিভাগকে নগ্ন দলীয়করণ করে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের পক্ষে রায় নিচ্ছে তারই ধারাবাহিকতার অংশ মাত্র। বাংলাদেশের রাজনীতির উচ্ছ্বিষ্ট বাম পরজীবি, ভারতের খোলসে আশ্রিত সুশীল সমাজের খানদানী সদস্যদের দ্বারা গঠিত সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এবং কচি-কাচার মেলা খ্যাতি পাওয়া মন্ত্রীপরিষদ দিয়ে সংশোধীত সংবিধানে জনআকাংখার প্রতিফলন ঘটবে এমনটি প্রত্যাশা করাই বোকামি। পঞ্চম সংশোধনীতে সরাসরি একাধিক ধারা -উপধারা সংযোজন, একাধিক ধারার অস্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং ৭(ক) ধারার মাধ্যামে নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করে তাদের বাকশালী চরিত্রকে নবপ্রজন্মের কাছে জীবন্ত করেছে মাত্র।
কেন সংবিধানে জনগনের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটেনি। অথচ আমাদের রয়েছে ঐতিহ্যিক ধারায় নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় শ্বাশত জীবন আদর্শ। এটা তো এই জনপদের, জনগণের নিজস্ব সম্পদ ও এক গৌরবময় ঐতিহ্য। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের স্বকীয় সংস্কৃতির ও আদর্শিক ঐতিহ্যের এ চেতনা চিহ্নিত করণে অনেকেই এ ভুল করেন। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা কোন ব্যক্তি কর্তৃক সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি হয়নি কোন দল কর্তৃক। এই চেতনা ধারণেও নেই কোন বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার। মক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের, সার্বজনীন। এ সুর জাতীয় চেতনার সুর”।
তাই স্বাধীনতার চেতনা যেমন নয় কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠি কিংবা দলের। দলের আদর্শ, নীতি সংবিধানের অন্তভুর্ক্ত করা দেশের জনগোষ্ঠির চাহিদা নয়।
লেখকঃ এম.এস.এস (সমাজতত্ত্ব), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়