মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:২১ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বাংলাদেশে গবেষণার হালচাল

মুনতাসির আলম

বিজ্ঞানের ছাত্র আমি, জীবনের লক্ষ্য বিজ্ঞান সাধনা যা দেশের সমস্যা সমাধানে কাজে আসবে। দেশের কাজে লাগবার সামর্থ অর্জনের জন্য নিজেকে গড়তে ব্যস্ত। সেই যুদ্ধে লড়তে লড়তে প্রায়ই দেখা হয় দেশের বিজ্ঞানের মহারথীদের সাথে। আমি জীব বিজ্ঞানের ছাত্র, বাংলাদেশে এই ক্ষেত্রে গবেষকদের মাঝে যারা প্রতিষ্টিত তাদের কারো কারো কাছাকাছি গেছি অথবা তাদের ব্যাপারে শুনেছি। তাদের গবেষণার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা আছে যার ভিত্তিতে খানিকটা বিশ্লেষণ করবার সাহস রাখি। এ জন্যই আমার আজকের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
আমাদের দেশে প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে গবেষণা হয়:
১. সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে।
২. কোন না কোন বিদেশী প্রোজেক্টের অর্থায়নে
৩. ডিগ্রি দেবার জন্য মাস্টার্স, এমফিল ও অল্প স্বল্প পিএইচডি ডিগ্রি উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত গবেষণা।

সরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা:
প্রথম থেকেই শুরু করি, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে। এসব প্রতিষ্ঠানে মূলত আমাদের গবেষকগন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করেন। সরকারি চাকরির সুবিধা পান, সরকারের খরচে বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। তাদের আমরা বিজ্ঞানী হিসেবে চিনি না। আমাদের কাছে তাদের পরিচয় উনি বিসিএসআইআর, পশু সম্পদ গবেষণা, বারি বা বিরি ইত্যাদিতে চাকরি করেন। দৈনন্দিন অফিস করা, সাইন-সিগনেচার করা ও মাস শেষে বেতন তোলাই এদের প্রধান কাজ। নতুন কিছু আবিস্কারের বা দেশে সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের প্রতি কোন প্রকার চাপও নেই। কারন, আমাদের নীতিনির্ধারকদের মাথায় একটাই চিন্তা ঘোরে তা হল এদেশে অর্থাভাবে ফলপ্রশু গবেষণা সম্ভব নয়, দরকার বিদেশী কনসাল্টেন্ট। এদের মাঝে কেউ কেউ দেশের জন্য কিছু না কিছু করবার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্বীকৃতির অভাবে অথবা নানামুখি চাপে তারা হয় হতাশ হয়ে পড়েন, নইলে এক পর্যায়ে বিদেশে পাড়ি জমান। দুই একজন টিকে থাকেন তারা তাদের ল্যাবরেটরি সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হন, তাদের অল্প কিছু অর্জনের খবর আমরা মাঝে মাঝে পেপারে পেয়ে থাকি। একটা তৃতীয় বিশ্বের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাপেক্ষে হয়ত তাদের অর্জন চোখে পড়বার মত, কিন্তু সামগ্রিক ভাবে দেশের জন্য তাদের অর্জন মূলত সমুদ্রের তীরে বালুকণা সম। যেমন, দুই একটা উচ্চ ফলনশীল ধান বা মাছে ফরমালিনের মাত্রা নির্ণয়ের কিট।
আমাদের দেশে বাজেটের মাত্র ০.০৩% (যতদূর আমার মনে আছে, ভুলও হতে পারে) গবেষণার জন্য বরাদ্দ। উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ে বদলি নিতে চান না কারন সেখানে পয়সার ঢল নামে না। যা কিছু আসে তা সচিব পর্যায় থেকে শুরু করে গবেষক পর্যায়ে একে একে শোষিত হয়। বাকি যা থাকে তার প্রথমত খরচ হয় প্রোযেক্টের ভবন, গাড়ি, এসি, টেবিল চেয়ার ও অন্যান্য আরামদায়ক আসবাব ইত্যাদি খাতে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রোজেক্ট শেষ হবার সাথে সাথে তার গাড়ি, এসি এগুলো গায়েব হয়ে যায়। তাছাড়া বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে মন্ত্রনালয় পর্যায়ে যে সব মূল নীতি নির্ধারক থাকেন তারা কেউই মূলত বিজ্ঞানী বা গবেষক নন। কিছু কিছু বিজ্ঞানের ছাত্র থাকলেও তাদের বিজ্ঞানী সত্তা বিসিএস পরীক্ষায় সফল হবার সাথে সাথেই লোপ পায়। এরা কিছুই বোঝে না মূলত। দূর্ণীতিবাজরা কিছু পয়সা পকেটে ভরেন, অন্যদিকে সৎ কর্মকর্তার সততা জ্ঞানের অভাবে কোন কাজে আসে না। বরং তাদের সততার ঠেলায় দীর্ঘসূত্রিতা সৃষ্টি হয়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা কিছু গবেষণা হয় তার ফল মূলত ল্যাবরেটরির বাইরে অচল। গবেষকদের বানিজ্যিক জ্ঞান শুন্যের কোঠায় থাকায় তারা এমন কিছু তৈরি করতে সক্ষম হন না যা বানিজ্যিক ভাবে সফল হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় উৎপাদন খরচ যা পড়ে তারচে ঐ জিনিস পার্শবর্তী দেশ ভারত হতে আমদানী করলে অনেক খরচ বেচে যায়। ফলশ্রুতিতে, যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে গবেষণায় ঢালা পয়সা আসলে পানিতে পড়ে। আমরা একবার এক scientific conference-এ অংশগ্রহণের জন্য ময়মনসিংহের Bangladesh Institute of Nuclear Agriculture বা BINA তে গিয়েছিলাম। সেখানে ঢুকবার পথে ডিসপ্লেতে তাদের গবেষণা লব্ধ কিছু ফসল রাখা ছিল। তা ওদের বিজ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা করলাম, এগুলো কি দেশের কৃষক মাঠে উৎপাদন করছে নাকি তাদের ল্যাবরেটরির বাইরে যায় নি। ওদের উত্তর ছিল, “এখনও কৃষকের থাকে যায় নাই, টমাটো পাঠানো হয়েছিল কিন্ত কৃষকরা উৎসাহি হয়নি“। এরপর কি হয়েছিল জানি না।
আরো হতাশার ব্যাপার হচ্ছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি হতে এসব প্রতিষ্ঠান হাজার মাইল দূরে থাকে। ইন্টারেটের ব্যবহার হচ্ছে গবেষকগনের বিদেশী উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশী প্রফেসরের যোগাযোগের জন্যে। বছর তিন চার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের কিছু বন্ধু বান্ধব একটা সংগঠন করেছিল। তা ওরা এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রন জানিয়েছিল বিসিএসআইআর এর চেয়ারম্যানকে। তিনি বিশিষ্ট ফার্মাসিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। স্যারের বক্তব্য শেষে তাকে নানা জন (সব আমাদের মত অনার্সের ছেলে মেয়ে) প্রশ্ন করছিল। আমি স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম, তার বিসিএসআইআর-এ কি জাতীয় গবেষণা হয় তা আমরা কোথা হতে জানতে পারি? উত্তরে আশা করেছিলাম স্যার তাদের ওয়েব সাইটের লিংক দিবেন। কিন্তু, তিনি বললেন তিনি একটা সুভেনির দিয়ে যাবেন, সেখান থেকে আমরা কিছু আইডিয়া পাব। হতাশ হয়ে, বাসায় এসে ইন্টারনেটে খুঁজে বিসিএসআইআরএর ওয়েব সাইটে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি সেই সাইট পাঁচ বছর ধরে আপডেট হয় না। চেয়ারম্যান স্যারের নাম গন্ধও নেই। এই হচ্ছে অবস্থা!!!
আমার কাছে যেটা সব চাইতে হাস্যকর মনে হয় তা হল এই সব গবেষণা প্রতিষ্টান স্থাপনের পেছনে উদ্দেশ্য। এগুলো এই জন্য তৈরি হয়েছে কারন দেশে গবেষণা প্রতিষ্ঠান না থাকলে ভাল দেখায় না। যেমন, কৃষি প্রধান দেশে একটা কৃষি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকবে না তা শুনতে ভাল লাগে না। তাই এসবের পেছনে পয়সা ঢালা। এদেশের উন্নতিতে কোন সদূরপ্রসারী প্লান নাই। যেদেশে সমস্যা চিহ্নিত করণের কোন উদ্যোগ নেই, সেখানে সমাধানের চেষ্টা আসলে সময় ও অর্থের অপচয়। একজন গবেষক নতুন কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে গেলে বুঝেন তাকে গবেষণার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কি নিয়ে তিনি গবেষণা করবেন? কেন করবেন? কার জন্য করবেন? সব চাইতে বড় কথা কি করে তিনি তার গবেষণার ফলাফল যার সমস্যা তার কাছে পৌছে দেবেন তার কোন খবর থাকে না!! আমরা মূলত বিদেশী লেখকের বই পড়ে গবেষক হই, সেসব বইতে বিদেশের সমস্যার কথাই থাকে। আমাদের মস্তিস্কও তাই ঐ সব সমস্যা সমাধানের জন্য গড়ে ওঠে। এর ফলাফল এই দাঁড়ায় যে গবেষক কিছু একটা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন যা তার ও তার বন্ধুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য কোন বিশেষ ফল বয়ে আনে না। আমাদের বিজ্ঞানীরা আমাদের জন্য যা করেন তা হচ্ছে এই দেশে হাজার হাজার বছর ধরে যে সব ফসল উৎপাদিত হয়ছে তা বাদ দিয়ে বিদেশী ফসলের সাথে ব্রিডিং করা নতুন উচ্চ ফলনশীল ফসল দেশে প্রচলন করা। আর তা না পারলে বিদেশী ফসল সরাসরি দেশে চালাবার চেষ্টা করা। এগুলো এদেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষতি করছে তা নিশ্চিত, নষ্ট হচ্ছে জমির উর্বরতা। তবে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন বিভাগ, বা বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট যতদূর শুনেছি ভালই কাজ করছে। যদিও বাস্তবতা জানি না। হাজারো প্রতিবন্ধকতার মাঝেও মাঝে মাঝে আশার আলো দেখা যায়।
এই হচ্ছে আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা। অনেকেই আমাকে নেগেটিভ মাইন্ডেড বলে মনে করে থাকেন। তবে আমি পজিটিভ চিন্তা করে স্বপনের জগতে বাস করবার চাইতে, নেগেটিভ চিন্তা করে সমস্যার সমাধানে মাথা খাটাতে আগ্রহি।

বিদেশী প্রোজেক্টের অর্থায়ণে গবেষণা:
বাংলাদেশে বিদেশী গবেষণা প্রোজেক্ট চলে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে। প্রতিষ্ঠান বলতে আমি শুধু দুই একটার নাম জানি। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে বিদেশী প্রোজেক্ট গুলো সাধারণত শিক্ষকরা আনে। বিদেশীরা এদেশে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান টাকা ঢালেন। যেহেতু তাদের টাকা ঢালবার পেছনে উদ্দেশ্য থাকে, বিধায় তারা মনিটরিং করেন এবং এর ফলে ভাল গবেষণাও হয়ে থাকে। কিন্তু এসবের ফলাফল বংলাদেশ কি পায়? মূলত পায় না!
প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশীরা এদেশে কেন গবেষণার জন্যে টাকা ঢালে? প্রথমত, বাংলাদেশ একটি ব-দ্বীপ অঞ্চল। এখানকার জীব বৈচিত্র অসাধারণ। এজন্য আমাদের দেশ জীব বিজ্ঞানীদের জন্য স্বর্গ। কয়েক বছর আগে এক জাপানি বিজ্ঞানী এসেছিলেন এদেশে। তার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের নদীতে একটি ব্যাক্টেরিয়া খোঁজা, যা জাপানে ফুড পয়জনিং করছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রোগ হচ্ছে জাপানে তুমি এখানে কেন ব্যাক্টেরিয়া খুজে বেড়াচ্ছ? তার উত্তর ছিল, এই দেশ ব্যাক্টেরিয়ার জন্য স্বর্গ, যা চাইব তাই পাওয়া যাবে তাই এসেছি”।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পৃথিবীর একটা অংশ। যারা সারা পৃথিবীতে শাসক করে বা করতে চায় তারা এদেশকে জানতেও চায়। আমরা প্রায়ই শুনি বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ব্যাপারে যথা সময়ে ফোরকাস্টিং করবার জন্য চারটি স্থানে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ভূমিকম্প নিরূপন যন্ত্র স্থাপন জরুরি। কিন্তু অর্থের অভাবে বাংলাদেশ সরকার এগুলো স্থাপন করতে পারছে না। কিন্তু একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেছিলেন, বাংলাদেশে ঐ যন্ত্র চারটি নয় পাঁচটি আছে। চারটি যথাস্থানেই আছে, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেখান থেকে ডাটা পায় না, কারন সেগুলো বিদেশী প্রোজেক্টের আওতায়। সেগুলো থেকে ডাটা সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিদেশে চলে যায়। বাংলাদেশে USGS (Unites states geological survey) অনেক জায়গায় কাজ করে। কিন্তু কেন? এরা কি আমাদেরকে আমাদের ডাটা দেবে? আমি জানি না!!
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে দেশী বিদেশী কোন প্রকার কার্যক্রমের উপরই সরকারি নিয়ন্ত্রন নাই বললেই চলে। এদেশে যেমন গরীব মানুষের অভাব নেই, সেই সাথে নেই আইন-আদালত। যে কোন ঔষুধ মাগনা বিতরণের নামে খুব সহজেই এদেশে ট্রায়াল করা সম্ভব। আমরা প্রায়ই দেখি বিদেশী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা কিছু এনজিও নানাস্থানে ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে। তারা যে শুধু ফ্রি ঔষুধ দেয় তাই না, নিয়মিত সপ্তাহান্তে রোগীর খবরও রাখে। আমরা এগুলো দেখে কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে যাই! কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এরা মানুষকে এনিমেল মডেল হিসেবে ব্যবহার করছে এবং নিয়মিত ডাটা কালেক্ট করছে। অথচ, আমরা এইসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের একুশে পদক দিতেও পিছপা হচ্ছি না!
কথা হচ্ছে এসব কাজে এদের সাহায্য করছে কারা? আমরা তো বিদেশীদের এইসব ক্ষেত্রে মাঠে কাজ করতে দেখি না। মূলত, এদের কর্মীরা হচ্ছেন বাংলাদেশেরই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা। এদের কেউ ডাক্তার, কেউ বায়োকেমিস্ট, কেউ মাইক্রোবায়োলজিস্ট অথবা কেউ পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্র। প্রশ্ন হচ্ছে কেন? আমার মতে কারণ দুইটি। এক, এদেশে দক্ষ বিজ্ঞানের ছাত্রের জন্য যথাযথ কর্মসংস্থানের সত্যিই অভাব রয়েছে। দুই, দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে গবেষণার যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা না থাকবার কারনে ছাত্র ছাত্রীরা তাদের মাস্টার্স, এমফিল বা পিএইচডির গবেষণার জন্য এই সব প্রতিষ্ঠানে মাগনা কাজ করে থাকেন। তাছাড়া, লেখাপড়া শেষে চাকরির একটা টোপ ফেলাই থাকে।
এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশ কি এসব থেকে একেবারেই কিছু পাচ্ছে না? যতটুকু পাচ্ছে তা হল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। এতে তাদের দক্ষতা বাড়ছে নিশ্চিত ভাবেই। কিন্তু, এই দক্ষ জনশক্তি কোথায়? এদের কি দেশে পাওয়া যাবে? উত্তর হচ্ছে না। এই দক্ষ জনশক্তি কাজ করছে আমেরিকা, জাপান বা উন্নত বিশ্বের কোন দেশের বিখ্যাত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত কোন গবেষকের ল্যাবরেটরিতে। সেখানে বাংলাদেশের সেই ছাত্রটি বিদেশীদের চাইতেও ভাল কাজ করছে এবং স্বস্থিতে স্বগর্বে প্রকাশ করছে যে বাংলাদেশীরা কারো চাইতে কম না। আমরাও পারি। কিন্তু, আমরা পারি কাদের জন্য? আমরা মূলত আমাদের জন্য পারি না, পারি ওদের জন্য। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এমনও বিভাগ রয়েছে যাদের পাশ করা প্রায় ৬০-৭০% ছাত্র-ছাত্রীরাই এখন বিদেশে গবেষনা কর্মকান্ডে নিয়োজিত।
বিদেশে অবস্থানরত আমাদের অনেক বিজ্ঞানীই গর্ব ভরে বলেন, তারা দেশে নিয়মিত রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন এবং দেশের প্রতি তাদের কর্তব্য পালন করছেন। তারা এদেশে রেমিটেন্স পাঠিয়েই বিজ্ঞানী হিসেবে আলাদা সম্মান দাবি করেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কুয়েত দুবাই বা মধ্যপ্রাচের অন্যান্য দেশে কর্মরত অদক্ষ শ্রমিক যার কিনা শরীরের শক্তিই সম্বল তার সাথে সেই বিজ্ঞানীর পার্থক্য কি থাকল!! দেশের মানুষের ট্যাক্সের টাকা বা মানুষকে ফকির সাজিয়ে বিদেশ থেকে আনা ভিক্ষার টাকা ঐ সব বিজ্ঞানী গড়বার জন্য ঢেলে কি লাভ হল?

ডিগ্রি দেবার জন্য মাস্টার্স, এমফিল ও অল্প স্বল্প পিএইচডি ডিগ্রি উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত গবেষণা:
সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা চালান শিক্ষকরা ও তা করে তাদের ছাত্রছাত্রীরা। কথা হচ্ছে, এসব গবেষণার ক্ষেত্র ও উদ্দেশ্য কি? কিছু অনিয়মের কথা বাদ দিলে আমাদের দেশে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলতে তাদেরই ধরা হয়, যারা অনার্স ও মাস্টার্সে খুব ভাল রেজাল্ট করেন। অনার্স পর্যায়ে ছাত্র ছাত্রীরা একেবারেই গবেষণার ধারে কাছে আসতে পারে না। মাস্টাসের একটি ভাল ছাত্র সেই ক্ষেত্রেই গবেষণা করে, যে ক্ষেত্রে তার সুপারভাইজর অভিজ্ঞ। অনেকে ভাবতে পারেন, সুপারভাইজর বাছাইয়ের সময় হয়ত ছাত্রটি তার আগ্রহের গবেষণা-ক্ষেত্রে যিনি অভিজ্ঞ তাকেই বেছে নেয়। সারা বিশ্বে এই ব্যাপারটা সত্য হলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশে একজন ছাত্র তার মাস্টার্স সুপারভাইজর বাছাইয়ের সময় যে সকল বিষয় দেখে তার মাঝে প্রধান প্রধান কারন গুলো অনেকটা নিম্নরূপ:
১. সুপারভাইজর কতটা প্রভাবশালী। প্রভাবের পরিমাপ করা হয় সুপারভাইজরের ফোনে চাকরি পাওয়া, তার হাত ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া, তার সুপারিশে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার্থে কত সহজে যাওয়া সম্ভব ইত্যাদি।
২. সুপারভাইজরের গবেষণার ফ্যাসিলিটিজ কিরূপ (তা যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন)। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর প্রতি বিভাগে দুই একটি ল্যাব মোটামুটি স্বয়ং সম্পূর্ণ থাকে। বিধায় ছাত্র ছাত্রীদের মূল টার্গেট থাকে ঐ সব সুপারভাইজর বেছে নেওয়া। যেমন ধরূন, কোন ছাত্রের ইমিউনলজি খুব ভাল লাগে, সে চায় ভবিষ্যতে এই ক্ষেত্রে কাজ করবার । কিন্তু সে যদি ডিপার্টমেন্টে এমন একজন সুপারভাইজর পায় যে কিনা বায়োটেকনলজির গবেষণা করেন, এবং তার ল্যাব স্বয়ং সম্পূর্ণ তখন সেই ছাত্রটি বায়োটেকনলজির ক্ষেত্রেই যাবে।
৩. সুপারভাইজর ছাত্রের ব্যাপারে কতটা অমনোযোগি। কিছু ছাত্রের মাস্টার্স করার উদ্দেশ্য থাকে শুধু একটা ডিগ্রির জন্য। বিধায় অহেতুক, ফলাফলহীন গবেষণার পেছনে সময় নষ্ট করবার চাইতে একজন নিস্তেজ সুপারভাইজরের অধীনে নামে মাত্র থিসিস করে যদি একটা সার্টিফিকেট পাওয়া যায় তবে ক্ষতি কি?
যেহেতু, আলোচনা আমরা গবেষণায় আগ্রহি ছাত্রটির দিকেই রাখব (যে কিনা শিক্ষক হবে) বিধায় খারাপ ছাত্রের কথা বাদ। তা সেই ভাল ছাত্রটি তার অনাগ্রহের বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষক হিসেবে ঢোকে। এরপর, সে স্কলারশীপ যোগাড় করে। পিএইচডির ক্ষেত্রে তার আগ্রহ থাকে কোন নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে ডাক পাওয়া যায়, সেখানেই সে উড়ে যায় এবং ডিগ্রি নিয়ে দেশে আসে (যদিও অনেকেই আসেন না)। দেশে ফিরে উক্ত শিক্ষক তার পিএইচডির ক্ষেত্রেই গবেষণা পরিচালনা করেন (বর্তমানে বাংলাদেশে ঐ সব গবেষণার দরকার থাকুক আর নাই থাকুক), তার ছাত্র-ছাত্রীদেরও সেই সবই করতে হয়।
এই সব গবেষণার সাথে দেশের সমস্যার কোন যোগসূত্র থাকে না। এগুলোর উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রি প্রদান ও নামে মাত্র রিসার্চ পেপার (গবেষণাপত্র) পাবলিশ করা। রিসার্চ পেপারগুলোর বেশির ভাগই আমাদের দেশী এবং এর এডিটর মূলত আমাদের শিক্ষকরা নিজেরাই হয়ে থাকেন। এ যেন নিজের ডায়েরীতে নিজে লেখার মত। একই ধরণের নামেমাত্র গবেষণা টাইটেল এদিক সেদিক করে বছরের পর বছর ধরে পাবলিশ হতে থাকে। এডিটর সাহেবের একাধিক পেপার পাবলিশ হয়। দেখা যায় একজনের (ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক) তুচ্ছ কোন গবেষণার পেপারে সংশ্লিষ্ট গবেষক ও তার সুপারভাইজরের প্রিয় কয়েকজনের নামই থাকে। তারা গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকুক আর নাই থাকুক। ছাত্রদের লাভ তারা সিভিকে সমৃদ্ধ করে অন্যদিকে শিক্ষকরা তাদের প্রোমোশনের পথ পরিস্কার করে। এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যাদের কোন ল্যাবরেটরি নেই, না আছে যোগ্য ছাত্র কিন্তু ওনাদের রিসার্চ পেপারের সংখ্যা প্রচুর। একবার ঢাবির এক অধ্যাপক ঠাট্টা করে বলেছিলেন, “ঢাবিতে অধ্যাপক হবার জন্য পাবলিশড্ পেপার দরকার, সেটা নেচারে (বিশ্বের অন্যতম নামকরা জার্ণাল) পাবলিশ হল নাকি ইত্তেফাকে তা বড় কথা নয়!!”
বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ গবেষণা শুধু থিসিস জমা দেওয়ার সাথেই শেষ হয়ে যায়। ঐ সব নিয়ে পরে আর কেউ মূলত কাজ করে না। করলেও একই কাজ করে এবং একই থিসিসের কপি-পেস্ট করে অনেকে। বিভিন্ন বিভাগের থিসিসগুলো ভাল করে ঘাটলে দেখা যাবে একই ভুল একই পাতায় বছরের পর বছর ধরে বিদ্যমান। এর একমাত্র কারন কপি-পেস্ট।
আমাদের প্রিয় শিক্ষকরা তাদের অক্ষমতা গুলোকে সম্পদের অপ্রতুলতা দিয়ে ঢাকবার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমি আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি শুধু মাত্র শিক্ষদের অমনোযোগিতা ও অনাগ্রহের কারনে নামে মাত্র থিসিসের কাজ করতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা যে সব উপকরণের অপচয় করে শুধু তা দিয়েই অনেক অনেক ভাল গবেষণা সম্ভব, যা কিনা দেশের মানুষের সমস্যার উদ্ঘাটন বা সমাধান করতে পারবে।
এত সমস্যার মাঝেও এদেশে কিছু শিক্ষক আসলেই খুব ভাল গবেষণা করছেন, শুধু দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু, তাদের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। খোঁজ করলে দেখা যাবে, বিদেশে গবেষণা করে বাংলাদেশের যারা বিখ্যাত হয়েছেন তাদের বেশির ভাগই ঐ কয়েকজন শিক্ষক দ্বারা অনুপ্রাণিত। সেই অনুপ্রেরণা বিদেশে প্রতিষ্ঠিত সেই সব বিজ্ঞানীদের কবে যে দেশে ফিরে কাজ করতে আগ্রহি করে তুলবে তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো কয়েক বছর। হয়ত, একদিন তারা ফিরবেন তাদের জ্ঞানের আলো নিয়ে।
ই-মেইল: muntasir.alam@gmail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/MuntasirAlam
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy