|
বিশ্বায়ন, অনুকরণপ্রিয়তা ও উদাসীনতায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি
মুতাসিম বিল্লাহ নাসির |
|
যান্ত্রিকতার করালগ্রাসে পল্লী জীবনের অধ্যায় আজ সমাপ্তির পথে। জীবন সন্ধিক্ষণের সরলতর জীবন থেকে মানুষ আজ কপটতার সাথে তার জীবন নির্বাহ করছে আজ সরলতার জীবনের উৎসব পার্বণ থেকে বেরিয়ে সবাই ভিনদেশী অপসংস্কৃতির চর্চায় অশ্লীল বেহায়াপনা কাজে জীবনকে বিকিয়ে দিচ্ছে। ছেলে বেলার কাহিনী স্মৃতি চারণ করলে সেই গ্রাম্য পল্লী নস্টালজিক কাহিনীতে আমরা যেমন আর ফিরে যেতে পারছিনা, তেমনি আক্ষেপের বিষয় হলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ও যেন সেই পরিবেশ পাবে তার বিন্দু মাত্র সম্ভাবনাও ক্ষীণ।
মনে পড়ে ছোটবেলার দিনগুলোর কথা আগে শুনতাম বড়দের কাছে ‘ছোটবেলা অনেক সুন্দর জীবন কিন্তু সেটা বুঝা যায় যখন আর ছোট বেলা থাকেনা।’ হয়ত এখন সেই কথা বিশ্বাস করতে কারো বিন্দু মাত্র চিন্তার উদ্রেক হওয়ার কথা নয়। এই তো সেদিন কার কথা শীতের সকালে খেজুরের রস আর রসের পিঠা কে বেশি খাবে তা নিয়ে রীতিমত শুরু হয়ে যেত ‘জোর যার মুল্লূক তার’ এই নীতিতে ভাইবোন দের মধ্যে খাওয়া দাওয়ার প্রতিযোগিতা। সে সময়ের কাজের মধ্যে প্রধান কাজ ছিল খাওয়া দাওয়া ও খেলাধুলা করা। যদিও এখন ‘ধুলা’ কথাটি শুনলে বর্তমান সময়ের মা-বাবারা লাক্স, মেরিল ব্র্যান্ডের সাবান নিয়ে তৈরী থাকে তার সন্তানকে জীবাণূমুক্ত রাখার জন্য। কিন্তু সে সময়ের মায়েদের কাছে দেশের মাটিও সোনার চাইতে খাটি ছিল তাই হয়ত আপন মনে মাটির সাথে মিশতে দিত তাই হয়ত আমরা মাটিতেই বেশি সময় পার করে দিতাম। হয়ত কারো ইট দালানের পাকা বাড়ি ছিলনা কিন্তু ঐ বাবুই পাখির সেই বাসার মত প্রত্যেকের বাসায় আদরের কমতি ছিলনা। ছিলনা না পাওয়ার বেদনা সবাই যেন মুচির চরিত্রের মতো আনন্দে গুনগুনিয়ে ভাটিয়ালি, জারী শারী গানে দিন পার করে দিতেন। আজ যেমন বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নত হয়েছে এ কথা যেমন সত্য তেমনি ভাবে এ কথা ও বলা অপ্রাসঙ্গিক যে ইটের তৈরী পাকা বাড়িতে থেকে, পাশের রুমের কারো সাথে কুশল বিনিময় হয়না। কারণ এটা হয়ত আমাদের ধার করা বর্তমান সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু বাংলার আবহমান সংস্কৃতির সেই কুড়ে ঘরের বৈশিষ্ট্য ছিল এইযে সেখানে যারা বসবাস করত সেই এলাকার সবাই সবার সুখে সবাই সুখী ছিল। সবার দুঃখে সবে দুঃখী ছিল সেই সময়ে হয়ত উন্নত প্রযুক্তি ছিলনা কিন্তু অনুন্নত প্রযুক্তি নিয়ে সবাই এগিয়ে আসত প্রতিবেশীর কল্যানণ সাধনে আজকে যেমন আমরা দেখি দুটি শিশু টিভি দেখার জন্য পাশের বাড়িতে গেল কিন্তু সেখান থেকে পরক্ষণে প্রতিবেশী বন্ধুটি জানালা বন্ধ করে দিল অবশেষে কনকা টিভির ছোঁয়ায় কারো বাসায় নয় একলা চলো নীতিতে ঘরে বসে টিভি দেখা শুরু হলো কিন্তু সে সময়ে অবস্থা ছিল “সবার সুখে হাসব আমি কাদব সবার দুঃখে নিজের খাবার বিলিয়ে দেব অনাহারের মুখে”।
আজকের প্রযুক্তির কল্যাণে যেমন ঘরে বসে সুডুকু খেলাও বুদ্ধি বাড়াও কিন্তু সে সময় সুডুকু খেলা ছিলনা কিন্তু সে সময়ের কথা ছিল ‘পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই একসাথে খেলি আর পাটশালা যাই’। আজকে আমাদের যখন দেশ তোমাকে কি দিয়েছে, মা তোমাকে কি দিয়েছে বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষা দেয়, কিন্তু সে সময়ে বিজ্ঞাপনের মত অবস্থা বর্তমান ছিলনা কিন্তু ছিলনা শিক্ষার ঘাটতি, সে সময়ে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ‘আমাদের দেশ খানি মায়ের সমান, আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ’ আজ যেমন আমাদের বলা হয় আসুন আমরা প্রতিদিন একবার বলি আমি আমার দেশকে ভালোবাসি সে সময়ে চমক লাগানো সস্তা শ্লোগান তৈরীর ফ্যাক্টরী ছিলনা কিন্তু নিষ্পাপ শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’। আজ সেই স্মৃতি বিজরিত গ্রাম থেকে মুছে দেওয়া হচ্ছে নস্টালজিক অধ্যায় সমূহ। এখন সন্ধ্যার পরে যখন ঘুমাতে যাওয়ার সময় হয় তখন হয়ত শিশুরা ঠাকুমার ঝুলি, টম জেরী ছাড়া ঘুমাতে পারেনা তখন মায়েরা ঘুম পাড়াতো ঘুম পাড়ানো মাসি পিসি মোদের বাড়ি এসো, ধান ফুরালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে' নানা রকম ছড়া ও রকমারী কিসসা কাহিনী দিয়ে। কিসসা কাহিনী ছাড়া ঘুম হত এমন দিন হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবেনা। নানা বাড়ি, দাদা বাড়ি যাওয়ার আনন্দ ও চলে আসার বেদনা স্মৃতি চারণ করলে এখনও বা কারো চোখে জল ছলছল করবে তা বিচিত্র কিছু নয়। নানা নানুর বর্ণায়িত ভূতের গল্পের কথা মনে পড়লে এখনো যেন গা সিউরে উঠে।
সে সময়ের গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় খেলাধূলার মধ্যে ছিল পুতুল-পুতুল,ড্যাং, লুটলুট, মার্বেল, ছিপুড়ি, পাতা ছিট, কুককুক, গাছ মগা, গোশত-গোশত গোল্লাছুট, চোর পুলিশ চারামারি, ইন্টার ইন্টার সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক নামে হরেক রকমের খেলা। ছিল বিভিন্ন রকমের মাটির খেলা এর মধ্যে একটি খেলা ছিল কাদাঁ ফুটানো। পোড়া মাটি দিয়ে হলুদ মরিচ ও গাছের বিভিন্ন পাতা দিয়ে তৈরী করা হতো টাকা ও তরী তরকারী সারাদিন খেলা ধূলায় সকলে মিলে মিশে একাকার গোসল করতে গিয়ে ও ছিল লুটলুট খেলা। অঞ্চল ভেদে নাম ভিন্ন হতে পারে। সব পাড়া পড়শী বন্ধুরা এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বড় হবার কারণে কারো মনে কোন ধনী গরীব ভেদাভেদ ছিলনা। কিন্তু আজকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ব্রয়লার মুরগীর মতো বন্দী খাচায় উন্নত মানের খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করে চেহারা আগের চেয়ে অনেক সুন্দর বানিয়েছে কিন্তু তা যেন মাকাল ফলের ন্যায় অন্তসার শূন্য। আজকে যেমন টাকার পিছনে আকর্ষণটা ছোটকাল থেকেই শিক্ষা নিতে কেউ ভূল করেনা কিন্তু সে সময়ে সরল মনে তেমন টাকার চিন্তা ছিলনা তাই হয়ত এক টাকা দামের ঘুরির সুতা কেটে গেলে সেই ঘুড়ি নেয়ার জন্য মাইলকে মাইল দৌড়াতে কারো কোন হিসাব নিকাশ ছিলনা। আজকে হয়ত প্রজন্মকে তার টি-শার্টে অঙ্কিত ঘুড়ি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। সেই আবহমান বাংলার কুড়েঘরে যারা বেড়াতে আসত বা পাড়া প্রতিবেশী আসত তারা হয়ত বর্তমান সময়ের ম্যাগী নুডুলস দ্বারা আপ্যায়িত হতনা, কিন্তু যে নাস্তা দ্বারা আপ্যায়িত হত তাতে যে প্রকৃতির মায়াবী আদর জড়ানো ছিল কিন্তু কৃত্রিম ম্যাগী নুডুলসে সেই আদর পাওয়া যাবেনা। তাই সেই পরিবেশ সবাইকে ভালবাসতে শিক্ষা দিত কিন্তু আজকে আমাদের যান্ত্রিক সভ্যতা ভীনদেশী আকাশ অপসংস্কৃতির ছোবলের বিষবাস্পে আমরা আমাদের সরল সাবলিল সংস্কৃতি ভুলে নামে বেনামে বিভিন্ন দিবস পালন করছি কিন্তু তা যেন অন্তসারশূন্য তা যেন আমাদের মা মাটি দেশের খোরাক মিটাতে পারছেনা তাই বিলুপ্তির পথে তাই আজকে শুধু হাটতলা বটতলা।
লেখকঃ সাংবাদিক ও ছাত্র, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ৩৩২, মওলানা ভাসানী হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার ঢাকা। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/MutasimBillahNasir |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
সাংবাদিক ও ছাত্র, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, মওলানা ভাসানী হল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাভার, ঢাকা।
|
|