মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:২৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

দুর্নীতি হয় পদ্ধতি ও ম্যাকানিজমের অভাবে

ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, এ.কে.এম রিয়াজুল হাসান, মোশাররফ হোসেন মুসা

এক. উত্তরবঙ্গের কিছু হাট-বাজারে ইঁদুর মারার বিষ বিক্রির জন্য হকাররা সুর করে বলে থাকে_ 'আপনার ঘরে ইঁদুর, বাইরে ইঁদুর। ছোট বড় ইঁদুরগুলো ঘরের মূল্যবান জামা-কাপড় কেটে-কুটে সাড়ে সর্বনাশ করে দিচ্ছে। মধ্যরাতে খাটের নিচের খট্ খট্ আওয়াজে আপনার মজার ঘুম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ইঁদুরের এসব জ্বালাতন থেকে বাঁচার জন্য আমার কাছ থেকে এখনই এক প্যাকেট ইঁদুর মারার ওষুধ নিয়ে যান। এ ওষুধ খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে ঘরের মেঝেতে ছিটিয়ে দিন। দেখবেন ইঁদুরগুলো পড়বে কি মরবে। এখন সিদ্ধান্ত নিন, ইঁদুরগুলো মারবেন না পুষে রাখবেন?'

দুই. একইভাবে জাতীয় পরিসরে দুর্নীতি আমাদের সব অর্জনকে নষ্ট করে দিচ্ছে, উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং নিত্যনতুন সন্ত্রাসের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিদিন এ নিয়ে সভা-সেমিনার হচ্ছে এবং পত্র-পত্রিকায় হাজারও প্রতিক্রিয়া লেখা হচ্ছে। উক্ত হকারের মতো আমাদেরও প্রশ্ন, 'প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার জন্য দুর্নীতিকে পুষে রাখব, না এটাকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে উপযুক্ত পদ্ধতি ও ম্যাকানিজম উদ্ভাবন করব?'

তিন. সম্প্রতি সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা উদ্ধারের পর দুর্নীতির প্রসঙ্গটি আবারও সামনে চলে আসে। যদিও পরবর্তীকালে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার কারণে রেলওয়ের নিয়োগ-সংক্রান্ত দুর্নীতির প্রসঙ্গটি কম গুরুত্ব পেতে শুরু করে। গত ১০ এপ্রিল পিলখানার উত্তর গেটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর এপিএসের গাড়ি থেকে টাকা উদ্ধারের পর এপিএস ও ড্রাইভার নিখোঁজ থাকেন। তখন কেউ কেউ বলেন, মন্ত্রীকে ফাঁসানোর জন্য ড্রাইভার এ নাটক সাজিয়েছে। জনৈক প্রবাসী লেখক উক্ত ড্রাইভারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'হুইসেল ব্লোওয়ার' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আরেক কলাম লেখক তার পূর্বপুরুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে কিভাবে শহীদ হয়েছেন সেটির বর্ণনা দিয়েছেন। কেউ বলেছেন, মন্ত্রীর অগোচরে এপিএসরা ঘুষ-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলেছেন, মন্ত্রী নিজেই এই দুর্নীতির জন্য দায়ী। দুর্নীতির কালো বিড়াল তার থলেতেই ছিল, সেটা এতদিন পর প্রমাণ হলো। জনৈক গবেষক বলছেন, কোনো বিশেষ পরিস্থিতে একজন মন্ত্রীর দুর্নীতির কারণেও একটি সরকারের পতন হতে পারে। তিনি উদাহরণ হিসেবে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের আমলে তৎকালীন যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের বাড়ি থেকে খুনের আসামি গ্রেফতারের ঘটনাটি তুলে ধরেন। যাই হোক, রেলওয়ের নিম্নপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লটারির ব্যবস্থা করলে দুর্নীতি দূর হতে পারে বলে আমাদের ধারণা। কারণ নিম্নপদে কাজের জন্য কোনো বিশেষ দক্ষতা, যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার দরকার হয় না, নির্দিষ্ট বয়সের যে কেউ প্রার্থী হতে পারে।

চার. আমরা লক্ষ্য করি, বড় কোনো দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশিত হলে সরকার ও বিরোধী দলও দুর্নীতির জন্য একে অপরকে দায়ী করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে থাকে। সাম্প্রতিককালে রেল মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ নিয়েও সেটি হচ্ছে। সবার জানা আছে, প্রতিটি সামরিক সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য 'ট্রুথ কমিশন' গঠন করা হয়। কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি কমিশনের কাছে ভুল স্বীকার করে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থদণ্ড দিয়ে দায়মুক্ত হয়। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ট্রুথ কমিশনকে বেআইনি ঘোষণা করলে আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজদের চাকরিচ্যুতির দাবি ওঠে। অর্থাৎ সবাই যা বলতে চেয়েছেন তা হলো_ 'ম্যাকানিজম বা পদ্ধতি ঠিকই আছে। কিছু অসৎ ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতায় দুর্নীতি সংঘটিত হচ্ছে।' এর বিপরীতে আমরা বারবার বলে আসছি, অলসতা ও স্বার্থপরতা মানুষের কমবেশি স্বভাবের অংশ। সমাজের জন্য ক্ষতিকর রিপুগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য উপযুক্ত শাসন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তারপরও রয়েছে আমাদের দীর্ঘকাল পরাধীন থাকার ইতিহাস। ইংল্যান্ড ও জাপানবাসী আমাদের মতো পরাধীন না থাকায় তারা আমাদের মতো 'রিঅ্যাকটিভ' মানসিকতা ধারণ করেন না। সেখানকার মানুষ অপেক্ষাকৃত নৈবর্্যক্তিক শাসন দ্বারা পরিচালিত হয়।

সেজন্য বলা হয়, স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক কর্মসূচি আর ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা দেশগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি এক হয় না। আবার উন্নত বিশ্বকে অনুকরণ করতে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে অবনতি ঘটার অনেক উদাহরণও রয়েছে। একই কারণে অনুন্নত দেশের দুর্নীতি দমন করার জন্য উপযুক্ত ম্যাকানিজমের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এখানে ম্যাকানিজম প্রয়োগ করে সফলতা পাওয়ার দু'একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট বুথে সিসিটিভি স্থাপন করার পর থেকে টিকিট কালোবাজারিরা উধাও হয়ে যায়। এর আগে সরকারের দুর্নীতিগ্রস্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপন করা হলে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে বর্তমানে গ্যাসের অপচয় রোধ করতে মিটার সংযুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। যদিও ইংল্যান্ডে এ পদ্ধতি প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে চালু হয়। অন্যদিকে আমাদের শাসন পদ্ধতি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। আর স্থানীয় সরকারগুলো তার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। এ স্থানীয় ইউনিটগুলো জনগণের নিকটবর্তী ও একক কর্তৃপক্ষ না হওয়ার কারণে দুর্নীতি প্রতিরোধে সেগুলো যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তাছাড়া তৃণমূলে জনগণ ক্ষমতায়িত না হওয়ায় তাদের মাঝে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মালিকানাবোধ জাগ্রত হতে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকা জোরালো হচ্ছে না।

পাঁচ. বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের দুর্নীতির খবর মাঝে-মধ্যেই ছাপা হতে দেখা যায়। সাধারণত কোনো একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়। তাদের নির্দিষ্ট অফিসও রয়েছে। দুর্নীতি করতে হলে তাদের অফিসের কাগজপত্র ঠিক রেখে করতে হয়। অন্যদিকে একজন এমপির নির্দিষ্ট কোনো অফিস থাকে না। তিনি জাতীয় কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজগুলো সরাসরি সম্পাদন করার জন্য নির্বাচিত হন না। এদেশে ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের প্রয়োগ নেই। সে জন্য স্থানীয় সরকারে কোনো দুর্নীতি হলে এমপিকে দোষী সাব্যস্ত করা কষ্টকর হয়। তবে আমাদের কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থায় এমপিদের ক্ষমতা অপরিসীম এবং তাদের জন্য জাতীয় কাজ নির্দিষ্ট নেই। তারা জাতীয় ও স্থানীয় উভয় কাজ একাই সম্পাদন করার বিষয়টি মাথায় নিয়ে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। একইভাবে স্থানীয় কাজগুলো স্থানীয় সরকারের জন্য নির্দিষ্ট নেই। তাই স্থানীয় সরকারে কোনো দুর্নীতি হলে স্থানীয় এমপি ও স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি একে অপরকে দোষারোপ করে দায়মুক্ত থাকার চেষ্টা করেন।

ছয়. সিডিএলজি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, দুই প্রকারের সরকারব্যবস্থার অধীনে জাতীয় কাজ ও স্থানীয় কাজ পৃথক করে দিতে হবে। অর্থাৎ পররাষ্ট্র, মুদ্রা, বাণিজ্য, সমগ্র দেশের নিরাপত্তাসহ জাতীয় কাজগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। আর অবশিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করবে স্থানীয় সরকার। সে সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সমন্বিত স্তরবিন্যাস করে গ্রামীণ স্থানীয় সরকারের কাজ, গ্রামীণ-নগরীয় সরকারের কাজ ও নগরীয় সরকারের কাজ ইত্যাদি কোন ইউনিট কোনটি সম্পন্ন করবে তা নির্দিষ্ট করতে হবে। তেমনি স্থানীয় সরকারে ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের প্রয়োগসহ স্থানীয় ন্যায়পাল সৃষ্টিও উপযুক্ত ম্যাকানিজম হতে পারে। এখানে একটি স্থানীয় ইউনিট হিসেবে 'নগর সরকার' পদ্ধতিটি কিঞ্চিত ব্যাখ্যা করা প্রাসঙ্গিক হবে। নগর প্রশাসন, নগর সংসদ ও নগর আদালত মিলিয়ে 'নগর সরকার' গঠিত হবে। নগর সংসদে নগরকেন্দ্রিক যাবতীয় সমস্যা আলোচিত হবে। নগর সংসদে গৃহীত ও পাসকৃত প্রস্তাবাবলী 'নগর প্রশাসন' বাস্তবায়ন করবে। কাউন্সিলররা নগর সংসদের সদস্য হবেন এবং মেয়র নগর প্রশাসনের প্রধান হবেন। নগর আদালত নগরে সংঘটিত ছোট ও মাঝারি অপরাধের বিচার সম্পন্ন করবেন।

মনোনীত কিংবা নির্বাচিত ব্যক্তিরা নগর আদালতের বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন। নগর সরকারের এই তিন বিভাগের বাইরে একজন নগর ন্যায়পাল থাকবেন। তিনি উল্লেখিত তিন বিভাগের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারবেন। একই পদ্ধতি অন্যান্য স্থানীয় ইউনিটগুলোতেও স্থাপন করা সম্ভব হলে জনগণ ব্যাপকভাবে ক্ষমতায়িত হয়ে যাবে। তখন দুর্নীতি হলে বর্তমানের মতো শুধু সরকারকে দায়ী করার কোনো সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ তখন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়_ এ দুই প্রকার সরকার পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতার ম্যাকানিজম প্রতিষ্ঠিত হবে_ যার দরুন প্রতিটি নাগরিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠবেন।

লেখক : চেয়ারম্যান, জানিপপ; সহ-লেখক
: ড. একেএম, রিয়াজুল হাসান বিসিএস শিক্ষা ও মোশাররফ হোসেন মুসা, সদস্য, সিডিএলজি।
ই-মেইল-janipop1995@gmail.com
(সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন,১০/০৫/১২)
http://www.sonarbangladesh.com/articles/NazmulAhsan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy