মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৩৬ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

যানজট নিরসন কমিটি (কাল্পনিক উপাখ্যান)

নিরীহ পাবলিক

আলোচনা জমে উঠেছে। কেউ কারো প্রস্তাব মানতে রাজী নন, সেটাই স্বাভাবিক। কারন যারা আলোচনা করছেন তারা সবাই বিজ্ঞ ব্যক্তি। সবাই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। সবাই ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজকে তারা এক টেবিলে বসেছেন দেশের একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়কে সামনে রেখে।ঢাকা শহরের তীব্র যানজট সমস্যার কারন ও সমাধান বের করার জন্য দেশের বিজ্ঞ মন্ত্রী মহোদয়দের নিয়ে একটা বিশেষ মিটিং ডাকা হয়েছে। বিশেষত যেসব মন্ত্রী মহোদয়রা ইতিপুর্বে দেশের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে নানান ভাবে সমাধান দিয়ে সরকার কে সহযোগীতা করেছেন তারাই এই বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন।সভাপতিত্ত্ব করছেন যোগাযোগ মন্ত্রী। বিজ্ঞ মন্ত্রী মহোদয়দের এই আলোচনা অনুষ্ঠান নিয়ে সরকারী পর্যায়ে ও সুশীল সমাজের মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবার আশা এইবার একটা কার্যকর সমাধান বের হয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে ঘোষনা করেছেন এই বিশেষ কমিটির সভা থেকে যেই সিদ্ধান্ত আসবে সেটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।
এখন সভাপতি সাহেব মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনছেন আর কতগুলো পত্রিকার পাতা উল্টাচ্ছেন। বিভিন্ন পত্রিকার যানজট সর্ম্পকিত রিপোর্ট গুলো দেখছেন তিনি।

সভাপতির স্বাগত ভাষনের পর বক্তব্য শুরু করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী, “দেশের পরিবহন সেক্টর টা এখনো মূলত অশিক্ষিত লোকদের নিয়ন্ত্রনে রয়ে গেছে। ট্রাফিক সমস্যার এটা একটা বড় কারন। ড্রাইভার, হেল্পাররা কি ভাষায় গালাগালি করে তা কি শুনেছেন?...ওহ মাই গড। এরা না বুঝে ট্রাফিক সিস্টেম, না আছে কান্ডজ্ঞান। এদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে...।” শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার সাথে সাথে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী বললেন, “ড্রাইভার ও হেল্পাররা লাইসেন্স পাওয়ার আগে যে কোর্স সম্পন্ন করে সেখানে সাবজেক্ট হিসেবে ‘ললিত কলা’ যোগ করা যায়। এতে তাদের মন মানসে সুস্থ চিন্তা-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে।”
এর পর পরই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী শুরু করলেন, “শুধু ড্রাইভার, হেল্পারদের শিক্ষা দিয়ে লাভ নেই। পাবলিকের ও শিক্ষার প্রয়োজন আছে। বেশীর ভাগ পাবলিকই তো রাস্তায় চলাচলের নিয়ম কানুন জানে না। আমার মনে হয় প্রাথমিক শিক্ষার বইতে ট্রাফিক সিস্টেম ও রাস্তায় চলাচলের বৈজ্ঞানিক নিয়ম কানুনের উপর আলাদা একটা চ্যাপ্টার থাকা উচিত...।”

এরপর সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন “আপা, আপনার মনে হয় কিছু বলার আছে এই বিষয়ে?”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খেঁকিয়ে উঠলেন “কোথায় যানজট? আমিতো রাস্তায় বের হলে দেখি পুরো রাস্তা ফাঁকা। পত্রিকায় যেগুলো আসে ওইসব কোনো ঘটনাই না। ওই রকম অল্প সল্প জ্যাম হতেই পারে। ...”
দীর্ঘ সময় আলোচনা, তর্ক বিতর্ক শেষে সভার সিদ্ধান্ত সংবাদ সম্মেলন এর মাধ্যমে জানানো হলো। সভাপতি বলিষ্ঠ কন্ঠে ঘোষনা করলেন,

“বিগত এনালগ সরকারের সময়ে রেখে যাওয়া ঢাকা শহরের দুর্বিষহ যানজট সম্পূর্ন নিরসনের জন্য আমাদের ডিজিটাল সরকার বদ্ধপরিকর। এই বিষয়ে পাতাল পথ, আকাশ পথ, পানিপথ নির্মান সহ দীর্ঘমেয়াদী বিস্তর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে এই সমস্যার তীব্রতার কথা বিবেচনা করে আমাদের বিশেষ কমিটি স্বল্পতম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করছে। আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের প্রধান সমস্যা রাস্তা গুলো খুবই সরু। তাই শীঘ্রই ভি আই পি সড়ক গুলোর দুই পাশে এক হাত করে রাস্তার প্রশস্ততা বাড়ানোর প্রস্তাব করছি, সেই সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমানে বাড়ানোর ও প্রস্তাব করছি......।” সবশেষে তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পূনর্ব্যক্ত করেন।
মহাউত্সাহে রাস্তায় খোঁড়াখুড়ি শুরু হলো। রাস্তার পাশের ফুটপাত, দোকানপাট ভেঙ্গে ভি আই পি সড়ক গুলোর প্রস্ত দুইহাত করে বাড়ানো হলো। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ দেয়া হলো।

তিন মাস পর আবার কমিটির মিটিং বসলো। যানজট সমস্যার সমাধান হয়নি, যানজট আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। নতুন সমাধান দরকার।
যথারীতি সভাপতি হলেন যোগাযোগ মন্ত্রী। এবারও তার সামনে কিছু পত্রিকা। যানজট নিয়ে বুদ্ধিজীবিদের মতামত পড়ছেন তিনি। মন্ত্রীদের মিটিং নিয়ে এর মধ্যে যেসব আলোচনা সমালোচনা হয়েছে সেগুলোও পড়ছেন। একজন লিখেছেন রাস্তায় সিগন্যাল লাইট গুলো যে জ্বলে না, যেগুলো জ্বলে সেগুলোরও যে টাইমিং এর ঠিক নেই এই বিষয়গুলো মন্ত্রীমহোদয়রা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। কয়েকটি নারী সংগঠন ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরোধীতা করেছে। কারন নিয়োগপ্রাপ্তরা সবাই পূরুষ। সংগঠনের নেত্রীবৃন্দ অনতিবিলম্বে ট্রাফিক পুলিশ সহ উক্ত বিভাগের সব পর্যায়ে শতকরা কমপক্ষে পঞ্চাশ ভাগ নারী নিয়োগের জোরালো দাবী জানিয়েছে। ডিজিটাল সরকারের মন্ত্রীদের চিন্তা ভাবনা এখনো মধ্যযুগীয় রয়ে গেছে বলে তারা এর তীব্র সমালোচনা করেন। নারী সংগঠনগুলোর এই বক্তব্যকে অকুন্ঠ সমর্থন জানিয়ে সব কিছু বদলে দিতে চায় এরকম একটি পত্রিকা সম্পাদকীয় ছেপেছে। সম্পাদকের ভাষায় চলমান সমাজব্যবস্থাকে বদলে দেয়ার জন্য নারী ট্রাফিক পুলিশ নিয়োগ একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। এই পত্রিকার ইংরেজী সহোদর পত্রিকাটিও বিশেষ কলাম ছাপিয়ে এর প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছে, “…this valorous decision may rightly demonstrate the government tribune of equal rights …..and it would be a sobering indication of ‘making change’ that the present government has been vociferously committed to………let the wind of change flow and blow through everywhere, from our very homes to our every city square….”

আরেকজন প্রবাসী বুদ্ধিজীবি দেশের এমন গুরুত্ত্বপূর্ন বিষয় নিয়ে মন্ত্রীবর্গের এমন অগভীর ও অন্তর্দৃষ্টিহীন মতামতের সমালোচনা করেছেন। এই বুদ্ধিজীবি প্রবাসী হলেও সম্প্রতি দেশে এসেছেন, এসে যথারীতি সরকারের শুভাকাংক্ষী হিসেবে সব বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। এই বুদ্ধিজীবির বক্তব্য হচ্ছে, বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ক্যান্টনমেন্ট এর বাড়ী থেকে বের না করা পর্যন্ত ঢাকা শহরের যানজট সমস্যার কোনো সমাধান আদৌ সম্ভব নয়। তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে, বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে টেলিফোনে পাওয়া তথ্যসূত্রের আলোকে তার বক্তব্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সভাপতি মনোযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা পড়ছেন।

মন্ত্রীরা আলোচনা শুরু করেছেন। এর আগের আলোচনায় বানিজ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকতে পারেন নি। এবার তিনিও আছেন। তিনিই আজকে প্রথমে আলোচনা শুরু করলেন, “ঢাকা শহরের যানজটের সাথে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। জঙ্গিরা পরিকল্পিতভাবেই...।”
তার বক্তব্যের পর আইন মন্ত্রী আলোচনা শুরু করলেন, “ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য যুগোপযুগী আইন দরকার। কঠোর আইন করে রোড সিগন্যাল ও বোর্ড সিগন্যাল গুলো ড্রাইভারদের মানতে বাধ্য করা উচিত। ট্রাফিক পুলিশ ...”
এরপর তথ্যমন্ত্রী শুরু করলেন, “রাস্তায় মোড়ে মোড়ে সি সি ক্যামেরা বসানো উচিত। ক্যামেরায় ধরা পড়ার সাথে সাথে আইন ভংগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের দরকারই নেই। এরা ঘুষ খায় বলেই এসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া হাত পা তুলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করার দিন এখন আর আছে নাকি?...”

দীর্ঘ আলোচনার পর গৃহিত সিদ্ধান্ত জানানো হলো, “রাস্তায় ট্রাফিক লাইটিং সিস্টেম ঢেলে সাজাতে হবে। নতুন লাইট লাগাতে হবে। স্পীড লিমিট নির্দেশক বসাতে হবে। একটি কার্যকর লাইটিং সিস্টেমের মাধ্যমে যানজট কমিয়ে আনা সম্ভব...। এছাড়া একদিন পরীক্ষামুলক ভাবে ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াই শুধুমাত্র বোর্ড ও রোড সিগন্যাল গুলোর সাহায্যে ট্রাফিক কন্ট্রোল করে এর কার্যকারীতা দেখতে হবে...।”...পরিশেষে জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সর্বাত্নক প্রচেষ্টার কথা পূনর্ব্যক্ত করা হলো।
রাস্তায় লাইট বসানোর জন্য টেন্ডার ডাকা হলো, সেই টেন্ডার নিয়ে টেন্ডারবাজি হলো। টেন্ডার নিয়ে দুই মন্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য হলো, প্রথমবারের ডাকা টেন্ডারে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকায় দিতীয় বার টেন্ডার ডাকা হলো। এবারো স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠল কিন্তু সময়ের অভাবে কর্তৃপক্ষ এবারের অভিযোগ আমলে আনল না। অবশেষে রাস্তায় রাস্তায় নতুন লাইট লাগানো হলো, পুরো ঢাকা শহর লাল, হলুদ, সবুজ বাতিতে ঝলমল করতে থাকলো। সি সি ক্যামেরা বসানো হলো মোড়ে মোড়ে।
যানজট এখনো কমেনি। কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী একদিন পরীক্ষামুলক ভাবে শুধু ট্রাফিক লাইটের মাধ্যমে যান বাহন নিয়ন্ত্রন করা হয়েছিল। ঐদিন সারা ঢাকা শহরে ভয়াবহ যানজট লেগে গেলো।
তিন মাস পর আবারো মিটিং বসলো।

অর্থমন্ত্রী বললেন, “ঢাকা শহর শুরতেই গড়ে উঠেছে কিছু অলি গলি নিয়ে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠার জন্য এই শহর জন্ম থেকেই যানজট লাগার জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে...।” তিনি সমস্যার সমাধানের জন্য বিদেশী পরামর্শক নিয়োগ দেয়ার আহবান জানান। কোন দেশ থেকে পরামর্শক আনা যায় সেটা নিয়ে সংসদে উন্মুক্ত আলোচনা হতে পারে, তার নিজের পছন্দ সুইজারল্যান্ড।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন “ভারত কে ট্রানজিট দেয়ার জন্য দেশের পূর্বাঞ্চলে যে ট্রানজিট হাইওয়ে নির্মান করার প্রস্তাব রয়েছে তার সাথে সংযোগ করে দেশের পূর্ব ও দক্ষিন পূর্বাঞ্চলের জন্য এক্সপ্রেস ওয়ে নির্মান করে ঢাকার অভ্যন্তরে যানবাহনের চাপ কমানোর বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।” এই প্রেক্ষিতে তিনি যতদ্রুত সম্ভব ট্রানজিট চুক্তি বাস্তবায়নের উপর তাগিদ দেন।
যাহোক, এবারের আলোচনা, তর্ক বিতর্ক আরো দীর্ঘ হলো। সবশেষে দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান হিসেবে অফিস ও স্কুল কলেজের টাইমিং পরিবর্তনের কথা বলা হলো। স্কুল কলেজ শুরু হবে সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে, সরকারী অফিস শুরু হবে সকাল ঠিক নয়টায়, ব্যাংক, বীমার বেসরকারী অফিসগুলো শুরু হবে সকাল দশ টায়। এভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরীর অফিসগুলোর জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য আলাদা আলাদা সময় ঠিক করে দেয়া হলো। এতেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হলো না, আগে দিনের কোনো কোনো সময় রাস্তাঘাটে জ্যাম কিছুটা কম থাকলেও এখন ভোর থেকে রাত প্রায় বারোটা পর্যন্ত সারাক্ষনই জ্যাম লেগে থাকছে।
এক মাসের মধ্যে আবার মিটিং বসলো। তবে এখন আর এই মিটিং নিয়ে কারো বেশি আগ্রহ নেই। অনেক মন্ত্রী অনুপস্থিত। যারা উপস্থিত ছিলেন তারা আলোচনা করে নতুন প্রস্তাব দিলেন, “সাপ্তাহিক ছুটির দিন বিভিন্ন অফিসের জন্য, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিভিন্ন হতে হবে।” তাই করা হলো।

ফলাফল হলো আগে সপ্তাহে ২/১ দিন রাস্তা ঘাট ফাঁকা থাকত, এখন সপ্তাহের সাত দিনই ব্যাপক যানজট লেগে থাকলো।
দুই মাস পর আবার মিটিং বসলো। মিটিং এর সভাপতি যোগাযোগ মন্ত্রী আজকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। আজকেও তার সামনে বেশকিছু পত্রিকা। তবে যানজট নিয়ে পত্রিকা গুলো আর আগের মতো মাতামাতি করছে না। মন্ত্রী পর্যায়ের এই মিটিং নিয়ে সমালোচনাও কমে এসেছে। চাঁদাবাজীর কারনে প্রায় সময় বিভিন্ন রুটের বাস কোম্পানী গুলো ধর্মঘট ডাকছে। এতে জ্যাম কিছুটা হলেও কমে এসেছে। আশ্চর্য! এই ধরনের একটা সামাধান তাদের কারো মাথায় আসেনি। তিনি মনে মনে যারা চাঁদাবাজীর সাথে যুক্ত তাদের ধন্যবাদ দিলেন। পত্রিকা গুলো এখন চাঁদাবাজীর খবর নিয়ে ব্যস্ত। এছাড়া বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়েও আলোচনা সামনে চলে এসেছে। অনেকেই এটাকে হেডলাইন নিউজ করছে। একটা সরকার বিরোধী পত্রিকা হেডলাইনে লিখেছে, “এখন আর বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে।” তার একটু রাগ হলো, ব্যাটারা একটা কিছু পেলেই ফাজলামো শুরু করে দেয়। আরে তোদের সরকারের সময়ে কি বিদ্যুৎ এর চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলো? তবে বিদ্যুৎ সমস্যাটা সামনে চলে আসাতে তিনি খুশী। এতে করে তার মিটিং এর উপর থেকে ব্যাটাগুলোর নজর সরেছে। তার উপর ইদানিং সংসদেও তুমুল উত্তপ্ত আলোচনা হচ্ছে। সবার নজর এখন সেদিকে, লোকজন জ্যামে বসে বসে এসব খবর পড়ে পড়ে বেশ মজাও পাচ্ছে মনে হয়। যানজট সহনীয় হয়ে উঠছে। সভাপতি মনযোগ দিয়ে অন্যান্য খবর পড়ছেন।

মন্ত্রীরা ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু করেছেন।
একজন মন্ত্রী বলছেন “ট্রাফিক পুলিশদের ঘুষ খাওয়া বন্ধ করতে হবে। ওদের বেতন ভাতা বাড়ানো উচিত...” আরেকজন মন্ত্রী বলছেন, “বেতন বাড়ালেও লাভ নেই। ঘুষ যে খাওয়ার সে বেতন বাড়ালেও খাবে।...”
পানি সম্পদ মন্ত্রী বললেন, “ওদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। এরজন্য পোষাক পরিবর্তন করা যেতে পারে। নতুন পোষাকে ওদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটতে পারে, তাতে ঘুষ খাওয়ার প্রবনতা কমতে পারে।” এরপর তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর প্রস্তাবিত ড্রাইভার, হেল্পারদের জন্য ‘ললিত কলা’ কে, সাবজেক্ট হিসবে ট্রাফিক পুলিশদের ট্রেনিং কোর্সেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী এতে খুব উৎসাহিত হয়ে বললেন, “ব্রতচারী নৃত্য শেখা বাধ্যতামুলক করা যেতে পারে।।”
পূর্তমন্ত্রী বললেন, “পোষাক পরিবর্তনের বিষয়টা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। এটা কতোটা কার্যকর হবে তা হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরো ভালো বলতে পারবেন, তিনি ডাক্তার মানুষ।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বললেন, “এটা তো আসলে সাইকোলজীর বিষয়। আমার পড়াশোনা অর্থোপেডিক্সে।...”
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বললেন, “ঢাকা শহরে গাড়ীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। আর যেন না বাড়ে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আইন করে গাড়ী কেনা নিষিদ্ধ করতে হবে।”
শিল্পমন্ত্রী বললেন, “ঢালাও ভাবে গাড়ী কেনা নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন পদের ব্যক্তিদের এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখতে হবে।”
সভাপতি মন্ত্রীদের আলোচনা তেমন ভাবে শুনছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি এখন মনযোগ দিয়ে পত্রিকায় কৌতুক পড়ছেন। এক রাজার দেশে একবার মুরগীর মড়ক লাগল। প্রচুর মুরগী মারা যাচ্ছে। রাজার মন্ত্রী উজীররা সবাই রাজার কাছে গেলো এর একটা বিহীত করার জন্য।
রাজা ঘটনা শুনে অনেকক্ষন ভাবলেন।
তারপর বললেন, “তোমরা সব গুলো মুরগীর চারপাশে বৃত্তাকার ছক এঁকে দাও।”
যেই কথা সেই কাজ। দেশের সব মুরগীর চারপাশে বৃত্ত আঁকা হলো। তবু মুরগীগুলোকে বাঁচানো যাচ্ছে না। এখনো ব্যাপক হারে মুরগী মারা যাচ্ছে। সবাই আবার রাজার কাছে ছুটে গেলো।

“মহাশয়, বৃত্ত আঁকাতে তো কাজ হচ্ছে না। এখনো মুরগীগুলো আগের মতোই মারা যাচ্ছে।”
রাজা অনেকক্ষন চিন্তা করে বললেন, “তোমরা ভেবো না। যাও এইবার মুরগীগুলোর চারপাশে চতুর্ভুজ এঁকে দাও।” রাজ্যের সব মুরগীর চারপাশে এবার চতুর্ভুজ এঁকে দেয়া হলো। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। রাজ্যের অর্ধেকের বেশী মুরগী মরে গেলো। সবাই আবার ছুটলো রাজার কাছে।
“মহাশয়, এখনও মুরগীর মড়ক থামে নি। মুরগী আমাদের রাজ্যের অনেক বড় সম্পদ। এভাবে সব মুরগী মারা পড়লে প্রজারা খুব বিপদে পড়বে।”
রাজা অনেকক্ষন চিন্তা করে বললেন, “সব মুরগীর চারপাশে এবার ত্রিভুজ এঁকে দাও।”
ত্রিভুজ এঁকে দেয়া হলো। তাতেও কাজ হলো না। ক্রমে সব মুরগীই মারা গেলো।
সবাই অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রাজার কাছে এসে জানালো,
“মহাশয়, রাজ্যের সব মুরগীই মারা গেছে।”

রাজা খুব ব্যাকুল ভাবে বললেন, “হায় হায়! বল কি! সব মুরগী মারা গেছে?? ইস্! আমার মাথায় আরো কতো বুদ্ধি ছিলো!!”
কৌতুক পড়ে মন্ত্রী-সভাপতি হো হো করে হেসে উঠলেন। মজার কৌতুক। তিনি সবাইকে কৌতুকটা পড়ে শোনালেন। সবাই মজা পেলো। অনেকক্ষন হো হো, হা হা, হি হি হাসি চললো। একজন বললেন, “আগের দিনের রাজা বাদশা গুলো খুবই মুর্খ ছিলো।”
আরেকজন বললেন, “ভাগ্যিস ঐ এনালগ সময়ে জন্মাইনি। এমন বুদ্ধির যে রাজা তার মন্ত্রী প্রজাদের যে কি দশা তা বুঝাই যাচ্ছে।”
যাহোক বেশ কিছুক্ষন পর আলোচনা আবার শুরু হয়েছে। একজন মন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন “পথচারীদের যত্রতত্র রাস্তা পার হওয়াটা যানজট সৃষ্টির একটা বড় কারন। এজন্য রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারের উপর গ্রিল দেয়া দরকার...।”
সভাপতি কৌতুকের কথা মনে করে এখনো মৃদুভাবে হাসছেন। তিনি আলোচনায় মনযোগ দেয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি খেয়াল করলেন এখন তর্ক হচ্ছে গ্রিল নিয়ে। গ্রিলের মাথা চোখা হবে নাকি ভোঁতা হবে এটা নিয়ে দুইজন মন্ত্রী নিজ নিজ পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। যানজট নিয়ে আলোচনার মধ্যে গ্রিল ঢুকল কিভাবে তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না। তিনি আরো মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলেন। আলোচনা চলতে থাকল।।

লেখকঃ ইমেইল, nirihopublic@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/NirihoPublic
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
মালেয়শিয়া থেকে মাসুদ মোশাররফ লিখেছেন, ০৫ জুন ২০১০; রাত ১১:৪৬
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এ রকম রসাত্বক ও আমাদের মন্ত্রীদের উদ্ভট!!!!! মানষিকতা সুন্দর করে তুলে ধরার জন্য।
21422
BD থেকে অারিফ লিখেছেন, ০৭ জুন ২০১০; দুপুর ০১:২০
সাবাস, অনেক ধন্যবাদ লেখককে। খুব চমৎকার ভাবে আমাদের দেশের Minister দের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।
21732
ইউ কে থেকে ব্যকরন লিখেছেন, ১৫ জুন ২০১০; রাত ১০:২৭
Nice one! Funny and very much realistic!!!! Thanks...carry on.
23001
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy