মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৪০ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
দেখা হল অবেলায় (০৫/০৫/২০১২)
সুন্দরের পথে চলা (গল্প) (৩১/০৩/২০১২)
জ্যোৎস্নালোকিত হৃদয় (গল্প) (১০/০৩/২০১২)
যে দাগ যায় না মোছা (গল্প) (২৮/০১/২০১২)
এক চিলতে রোদ্দুর (৩১/১২/২০১১)
মোহনার দেখা পেলনা যে নদী (শেষ পর্ব) (৩০/১০/২০১১)
মোহনার দেখা পেলনা যে নদী (পর্ব-১) (১৫/১০/২০১১)
জীবনের গল্প (১০/০৯/২০১১)
রাতের জঠরে জন্ম নেয়া কষ্টরা (১৩/০৮/২০১১)
লাল বুবি (গল্প) (১৮/০৬/২০১১)
শ্রাবণ মেঘে ফাগুনের পূর্বাভাস (গল্প) (২৩/০৪/২০১১)
প্রভাতেই গোধূলির কান্না (২৬/০৩/২০১১)
শীতার্ত মানুষদের জন্য প্রবাস হতে এক মুঠো উষ্ণতা (২২/০১/২০১১)
সময়ের চোরাবালি (০১/০১/২০১১)
পরাজিত জীবন (০৪/১২/২০১০)
কেন যুব সমাজের এই আত্মহনন প্রবণতা (১৩/১১/২০১০)
সোনার বাংলাদেশে কয়েকদিন (শেষ পর্ব) (৩০/১০/২০১০)
সোনার বাংলাদেশে কয়েক দিন-১ (২৩/১০/২০১০)
পুলসিরাতের ট্রেইন: পর্ব-২ (০৯/০৯/২০১০)
পুলসিরাতের ট্রেইনঃ পর্ব-১ (০৪/০৯/২০১০)
আরব দেশে মাহে রমযান (১৪/০৮/২০১০)
বেদনার নীলে স্নাত বাংলাদেশ (৩১/০৭/২০১০)
যে ফুল ঝরে গেল অবেলায় (০৩/০৭/২০১০)
ভুলের অপচ্ছায়া (গল্প) (০৫/০৬/২০১০)
অনন্ত কল্যাণের প্রত্যাশায় (২২/০৫/২০১০)
আলেয়ার পিছু পিছু (গল্প) (১৪/০৪/২০১০)
অমীমাংসিত প্রশ্ন (গল্প) (১৩/০২/২০১০)
যে স্মৃতি শুধুই যাতনার (০১/০১/২০১০)
গোলাপ ঝরার দিন (গল্প) (১৫/১১/২০০৯)
আগের লেখা
394


দেখা হল অবেলায়

নূর আয়েশা সিদ্দিকা

আঁধারের নেকাব ঠেলে পৃথিবীটা জাগছে ধীরে ধীরে। আলোর প্রদীপ হাতে আকাশের বুকে জ্বলে উঠেছে সূর্যটা। অকলঙ্ক নীল আকাশটা গায়ে কাঁচা হলুদ রোদ মেখে স্নান সেরেছে ইতিমধ্যেই। এক বুক নোনা অশ্রুরাশি নিয়ে এক দীর্ঘ রজনীর অধীর প্রতীক্ষার অবসান হল সাগরের। মুক্ত পৃথিবীর অবারিত আলোয় চোখে চোখে সেতু বন্ধন হল নীল আকাশ আর সাগর জলের। তাই অজস্র রোদের কুচি ভালোবাসার পরশ নিয়ে আছড়ে পড়লো সাগর বুকে। এক ঝাঁক টিয়া ওদের তীক্ষ স্বরের শিস বাজাতেই ঢেউয়ের লাজুক দুলুনিতে দুলে উঠল সাগরের বিশাল জলধি।

আর সব দর্শনার্থীদের মত কণাও বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিল একটি নবাগত দিনের প্রারম্ভিকা। মাত্র গতরাতেই ওরা স্বপরিবারে কক্সবাজার এসে পৌঁছেছে। খুব ভোরে সূর্যোদয় দেখবে বলে তাই ওরা জড়ো হয়েছে সাগর সৈকতে।
হঠাৎ কণাকে বিস্মিত করে দিয়ে একটি মেয়ে এসে বলল- আরে কণা আপু যে! কেমন আছো?
অপরিচিত একটি মেয়ের এই সহজ সম্ভাষনে কণা একই সঙ্গে এতটা বিস্মিত ও হতবাক হলো যে চট করে ওর মুখে কোন উত্তর যোগালো না।
মেয়েটি আগের মতই উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল- তোমার পরীক্ষা ভালো হয়েছে তো?
ঠিক এমন সময় একজন মধ্যবয়সী মহিলা এগিয়ে এলেন। চোখে মুখে বেশ আভিজাত্যের ছাপ। ভদ্রমহিলা মেয়েটিকে লক্ষ্য করে বললেন- তৃণা, তুমি এখানে? আর আমি সেই কখন হতে তোমাকে খুঁজছি।
মেয়েটি মহিলাটির হাত ধরে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল- মাম্মি দেখ। কে এসেছে?
মেয়ের কথায় কণার দিকে চোখ পড়তেই মহিলার চেহারায় আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। তিনি মায়াবী গলায় বললেন- কণা! তুমি? ভালো আছ তো মামাণি?

অপরিচিত মহিলার গলায় নিজের নাম শুনে কণা আবারো চমকে উঠলো। বিস্ময়ভরা স্বরে বলল- আপনি আমাকে চেনেন?
ঠিক তক্ষুনি এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এগিয়ে এসে ভদ্র মহিলাকে লক্ষ্য করে বললেন- জাকিয়া, তোমরা আজ এত দেরী করছো কেন?
মহিলা বৃদ্ধের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল- বাবা, চিনতে পেরেছো? ও কণা। বৃদ্ধ চমকে উঠে ভ্রু কুঁচকে বেশ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে কণার দিকে তাকালেন। এমন সময় একটি সুদর্শন যুবককে দেখে তৃণা নামের মেয়েটি এগিয়ে গিয়ে বলল- ভাইয়া দেখ। কণা আপু। নামটি শুনতেই যুবকটির মুখে একটি উপেক্ষার ভাব ফুটে উঠলো। ও এক ঝলক কণার দিকে দৃষ্টি ছুড়েই সরিয়ে নিল। এরপর তৃণার দিকে তাকিয়ে বলল- ড্যডি সেই কখন হতে অপেক্ষা করছেন। এক্ষুনি এস।

তখন বৃদ্ধও তাকে সমর্থন করে বললেন- হ্যাঁ, জাকিয়া এক্ষুনি চল। তিনি একরকম জোর করেই মহিলার হাত ধরে নিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় মহিলার ছলছল চোখ দুটি কণার দৃষ্টি এড়াল না। কণা ওদের গমন পথের দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো। ও বেশ বুঝতে পারল একটু আগে দেখা পরিবারটি ওর কাছে অপরিচিত হলে ও ওদের কাছে কণা অপরিচিত নয়। কণা অবাক হয়ে ভাবলো ওরা কে হতে পারে? কি করে ওরা কণাকে চিনতে পারল? আর একটি বিষয় কণাকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলল। তা হল বৃদ্ধ আর যুবকটির আচরণ। বৃদ্ধের চেহারায় ছিল বেশ অপ্রস্তুত একটি ভাব। আর যুবকটির চেহারায় স্পষ্ট একটি উপেক্ষার ভাব। সেই সাথে দৃষ্টিতে ঘৃণা ও ছিলো কি?

কক্সবাজার থাকাকালীন সাগর সৈকতে আরো দু 'একবার তৃণার সাথে কণার দেখা হল। মেয়েটি প্রতিবারই ওকে দেখে আন্তরিক ভঙ্গিতে দূর হতে হাত নাড়ল। কিন্তু আগের মত আর কাছে এগিয়ে এল না। ওর চেহারায় একই সাথে আনন্দ ও ভয়ের একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া কণার চোখ এড়ালনা।
ঢাকায় ফিরেও কণার অস্বস্তি দূর হল না। অচেনা ঐ পরিবারটির অদ্ভুত আচরণ ঘুরে ফিরে মনের মাঝে প্রতিফলিত হতে লাগল। মা'কে জিজ্ঞেস করে ও কোন সন্তোষজনক জবাব কণা পেল না।

একদিন বিকেলে বান্ধবীর বাসা হতে ফিরছিল কণা। এমন সময় সৈকতে দেখা বৃদ্ধটিকে ওদের বাসার গলি হতে বেরিয়ে যেতে দেখল। ও বাসায় এসে মা'কে ব্যাপারটা জানালো। কিন্তু ওর মা রেহানা বেগম এ বিষয়ে অজ্ঞতার ভাব দেখালেন। এরপর ও কণাকে এ ব্যাপারে ভাবতে দেখে বললেন- এ নিয়ে এত চিন্তা করার কি আছে? নিশ্চয় এ পাড়ায় উনার পরিচিত কেউ থাকেন। কিন্তু কণার কেন যেন মনে হল মা কিছু লুকোচ্ছেন নাতো?

এর প্রায় সপ্তাহ তিনেক পর একদিন কোচিং হতে ঘরে ফিরছিলো কণা। এমন সময় বাসার বাইরে অপেক্ষমান সাদা কারটি দেখে কণা থমকে গেল। আত্নীয় স্বজনের মধ্যে কারো কাছে এ ধরণের গাড়ি কখনো দেখেছে কণার মনে পড়ল না। ও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরে না ঢুকে দরজার আড়ালে দাঁড়ালো। এমন সময় ভেতর হতে ওর মায়ের গলা ভেসে এল- দেখুন হায়দার সাহের। আপনার বোধহয় এভাবে ঘন ঘন আসা ঠিক হচ্ছেনা। সেদিন কক্সবাজারে আপনাদের সাথে ওভাবে দেখা হওয়ার পর হতে কণা কিছু একটা সন্দেহ করছে। আমাকে কয়েকবার প্রশ্ন ও করেছে। কিন্তু আমি ব্যাপারটি এড়িয়ে গেছি।

ভেতর হতে তখন পুরুষ কন্ঠের আওয়াজ শোনা গেলা- হ্যাঁ আমি ও বুঝতে পারছি। সেদিন ওভাবে না দেখা হলেই ভালো হত। আমি জাকিয়া আর তৃণাকেও অনেক বুঝিয়েছি। এ ধরনের কথাবার্তা কণার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। আসলে সামনা সামনি কণাকে ওভাবে দেখার পর ওরা দু'জনই বেশ ইমোশোনাল হয়ে পড়েছিল।

-জ্বি আপনি ঠিকই বলেছেন হায়দার সাহেব। আপনি আমার হাজব্যন্ডের সাথে এরপর হতে ওর অফিসে দেখা করলেই বেশী ভালো হবে।
এরপর সম্মতিসূচক গলায় দ্বিতীয় পক্ষ বললেন- আচ্ছা। আমি না হয় শাহেদের সাথে ওর অফিসেই দেখা করব। তবে খেয়াল রেখ। কণার যেন লিখা পড়ায় কোন সমস্যা না হয়। যত টাকা লাগে আমি দেব। তুমি টাকা পয়সার ব্যাপারে চিন্তা করোনা। আমি আজ তাহলে উঠি। লোকটি উঠার উদ্যোগ নিতেই কণা তার আগে পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে। ও পাশের বাড়ির সীমাদের বাসায় ঢুকে পড়ে। একটু পর ওদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অবাক চোখে দেখে হায়দার সাহেব নামের ব্যক্তিটি আর কেউ নন। স্বয়ং কক্সবাজারে দেখা সেই অচেনা বৃদ্ধটি।
কণার মনের মাঝে তোলপাড় শুরু হয়। ওর বারবার মনে হয় সাগরের নীল ঢেউ কি বেদনার নীল হয়ে ওর জীবনটা আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলল?

রাতে ওকে বারান্দায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইমতিয়াজ এগিয়ে আসে- কিরে কণা? আজকাল কি ভাবছিস এত? তুই তো দেখি বড় ধরনের চিন্তাবিদ হয়ে যাচ্ছিস। বলতে বলতে ইমতিয়াজ নিজের রসিকতায় নিজেই হো হো করে হেসে উঠে।
কণা ভাইয়ের রসিকতায়, মুখে শুকনো হাসি টেনে বলে- না, ভাইয়া। কে বলল তোকে আমি ভাবছি?
ইমতিয়াজ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে- টেনশন করিসনা। তোর তো মেডিকেলে পড়ার খুব শখ। আব্বু বলেছেন যদি কোন কারনে তুই সরকারী মেডিকেলে না টিকিস। তবে তোকে প্রাইভেট মেডিকেলে হলেও ভর্তি করে দেবেন।
ভাইয়ের কথায় কণা চমকে উঠে বলে- কেন ভাইয়া? তুই ওতো কম ভালো স্টুডেন্ট না। তোর ওতো মেডিকেলে পড়ার খুব শখ ছিল। কই তোকে তো প্রাইভেটে পড়াতে চায়নি আব্বু?

ইমতিয়াজ বলে- আরে আমার কথা ছাড়। আমি আর তুই কি এক? তুই তো আলাদা।
কণা পাল্টা জানতে চায়- কেন ভাইয়া ? আমি আলাদা কেন? আমি কি তোর বোন নই? ওর কথার ভঙ্গিতে ইমতিয়াজ ভীষন ভাবে চমকে উঠে।
এরপর চট করে নিজকে সামলে নিয়ে বলে- কি হয়েছে তোর বলতো? কি সব আজে বাজে বকছিস তুই?
এরও মাস খানেক পর একদিন কণা কোচিং শেষে ঘরে ফিরলো। একটু পর রেহেনা বেগম ডেকে বললেন- দেখতো কণা ড্রেস গুলো তোর পছন্দ হয় কিনা?

কণা মায়ের হাতের প্যকেটটি খুলে অবাক গলায় বলে - আম্মু, এ যে অনেক দামী ড্রেস!
মিসেস রেহানা বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন- তুই তো প্রায় প্রতিদিনই কোচিং এর জন্য বের হচ্ছিস। তাই ভাবলাম তোর ভালো কয়েকটি ড্রেস দরকার।
ওদের মধ্যবিত্তের সংসারে মাসের মাঝখানে এত টাকা মায়ের হাতে এল কি করে? কণার মনের মাঝে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। কিন্তু ও সে কথা চেপে গিয়ে বলে- আম্মু, এই ৪টি ড্রেসই কি আমার জন্য?
মিসেস রেহানা স্বস্নেহে বলেন- হ্যঁ।

কণা তখন বলল- কিন্তু আম্মু উষাকে বাদ দিয়ে তুমি শুধু আমার জন্যই এতগুলো ড্রেস কিনলে? এটা কেমন হল? ও জানলে তো মন খারাপ করবে। তাছাড়া তুমি তো সব সময় আমাদের দু'বোনের জন্য এক সাথেই ড্রেস কিন।
কণার এ কথায় রেহানা বেগমের মুখের হাসি হাসি ভাবটা বদলে গেল নিমিষেই। তিনি বেশ থতমত খেয়ে গেলেন।
মায়ের চেহারার এই পরিবর্তন কণার নজর এড়াল না। তাই ও মা'কে বলল- আম্মু, এত দামী ড্রেস পরতে আমার ভালো লাগেনা। আমার সাধারণ পোষাকই পরতে ভালো লাগে। এক কাজ কর। তুমি এগুলো ফিরিয়ে দিয়ে এস। আমি এগুলো পরবো না।
মায়ের সামনে হতে সরে যেতে যেতে কণার মনে হল অজানা কিছু যেন ক্রমশ ওকে চারপাশ হতে বেঁধে ফেলছে। ওর চোখটা জলে ভরে গেল। জীবনের এতটা বেলা পেরিয়ে না জানি কি অজানা কিছু আজ ওর পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। কি উৎ পেতে আছে ওর সামনের দিনগুলোয়। নিজকে খুব অসহায় মনে হল ওর। সেদিনের পর হতে ওর অপ্রকাশিত অশ্রুরা বেদনার মেঘ হয়ে নিত্য আনাগোনা শুরু করলো মনের আকাশে।

একদিন ফটোকপির জন্য দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কণা। হঠাৎ চোখে পড়ল সৈকতে দেখা সেই যুবকটি। কারো সাথে মোবাইলে কথা বলছে। কণা কোন কিছু চিন্তা ভাবনা না করেই দৌড়ে গিয়ে ডাকলো- এই যে শুনুন। এই যে।
যুবকটি ডাক শুনে পেছনে ফিরতেই কণার উপর দৃষ্টি পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই ওর মুখের ভাবটি বেশ কঠোর হয়ে উঠল।
কণা তা না বুঝার ভান করে বলল- আমি কণা। সেই যে কক্সবাজার সৈকতে..........

কণাকে বাকী কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে যুবকটি কঠোর গলায় বলল- আপনাকে আমি চিনিনা। অযথা ডিস্টার্ব করবেন না প্লিজ।
এই বলে জবাবের অপেক্ষা না করে যুবকটি হনহন করে গাড়ি পার্কিং এর দিকে চলে গেল। ক্ষোভে অপমানে কণার চোখে পানি এসে গেল।
দেখতে দেখতে কণার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার রেজাল্ট বের হল। গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে কণা। বাবা মা পরিবারের সবাই অনেক খুশী। ওর কলেজের শিক্ষকরা ও বেশ আনন্দিত কণার এ রেজাল্টে। রেজাল্ট প্রকাশের পর দিন ওর বড় ভাই ইমতিয়াজ ওকে ডেকে বলল- এই কণা দেখে যা। তোর জন্য বড় রকমের সারপ্রাইজ আছে।

কণা বড় ভাইয়ের হাতে কালারিং মোড়কে ঢাকা বড় সড় প্যাকেটটি দেখে শিশুর মত ভঙ্গিতে বলে- ওটা কিরে ভাইয়া? দেখি খোল না।
ইমতিয়াজ প্যাকেটটি ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে- নে, তোর গিফট। তুই খোল। কণা প্যাকেটের সম্পূর্ণ কভারটি খোলার পর বিস্ময়ে ওর চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে উঠে- ভাইয়া, এটা তো ল্যাপটপ!
ইমতিয়াজ বলে- হ্যাঁ ল্যাপটপ। তুই এত ভালো রেজাল্ট করেছিস। তাই আব্বু নিয়ে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে কণার মুখের হাসিটা উবে যায়। ও বলে- মাসের এই সময় এত গুলো টাকা দিয়ে ল্যাপটপ? ওর মনের ঘরে ভাবনার মেঘ জমাট বাঁধতে শুরু করে। কণা মুখটি কঠোর করে বলে- ভাইয়া আমার ল্যাপটপের প্রয়োজন নেই। এটা তুই রেখে দে।
অন্যের করুণা নির্ভর হয়ে বেঁচে থাকাটা ওর কাছে ভীষণ অপমানের মনে হল। চোখের কোণে জমা হওয়া অশ্রু লুকাতে ও তাড়াতাড়ি জানালার কাছে সরে যায়।

বোনের এই হঠাৎ পরিবর্তন ইমতিয়াজের নজর এড়ালো না। ও কণার মাথায় হাত রেখে বলল- আজকাল তোর কি হয়েছে বলতো? আগের মত দুষ্টমি করিস না। হাসিস না। কণা জলভরা চোখে ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকে । এরপর ধীরে ধীরে বলে- ভাইয়া আমার খুব ছোটবেলাকার কোন স্মৃতি কি তোর মনে পড়ে?

ইমতিয়াজ তখন বাগানের দিকে ইশারা করে বলে - ওই যে বকুল গাছের সাথে বাঁধা দোলনাটা আছেনা। একদিন আম্মু তোকে দুধ খাইয়ে দিয়ে রান্না করছিলেন। আর আমি তখন তোকে নিয়ে চুপি চুপি ওই দোলনায় চড়ে বসেছি। হঠাৎ ' তাল সামলাতে না পেরে নীচে পড়ে গেলাম। আর আমার থুতনিটা কেটে গেল। ভাগ্যিস তখনো তুই আমার কোলের মাঝেই ধরা ছিলি। তখন মনে হয় তোর বয়স ৭/৮ মাসের মত ছিল।

কণা এই একই ঘটনা এর আগে ও কয়েকবার ভাইয়ের মুখে শুনেছে। কিন্তু আজ গভীর চোখে তাকিয়ে ভাইয়ের থুতনির কাটা দাগটি দেখে । আগে যে ঘটনা শুনে ভাইয়ের প্রতি মনটা সমবেদনায় ভরে উঠতো। আজ কিন্তু তা ভিন্ন মনোভাব জাগাল। ওই কাটা দাগটির দিকে তাকিয়ে নিজের অজ্ঞাত অতীতের স্মৃতি খুঁজে পেয়ে খানিকটা হলেও স্বস্তিবোধ হল ওর। এ যেন ডুবন্তু নাবিকের খড়কুটো আঁকড়ে বেঁচে থাকার চেষ্টার মতই। কণা আসলে প্রতি মুহুর্তেই অনুভব করছে ওর মনের মাঝে এক আগ্রাসী শূন্যতা ঠাঁই করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। নিজের অজানা অতীতকে নিয়ে হাজারো চিন্তা এসে ঘিরে ধরে ওকে। অনুকম্পা কিংবা দয়া সে কারো কাছেই চায়নি কখনো। তবে আজ কেন অপরিচিত কারো করুনার পাত্রী হয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হবে? প্রশ্ন ভারাক্রান্ত মনটায় ভেসে উঠে একটি ঘৃণা মিশ্রিত কঠোর মুখের রেখা। কণা ভাবতে থাকে। কারো না কারো কাছে যে এর জবাব তাকে খুঁজে নিতেই হবে।

কণার অজানা জবাব খুঁজে পেতে আবারো একদিন দেখা হয়ে যায় সেই যুবকের সাথে। কণা পেছন হতে ডেকে উঠে- এই যে শুনতে পাচ্ছেন?
কণার কন্ঠস্বর কানে যেতেই যুবকটি থমকে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বলে - আপনি আবারো আমার পিছু নিয়েছেন?
যুবকটির ঝাঁঝালো গলা শুনে কণা থমমত খেয়ে যায়। তাই নিজকে একটু সামলে নিয়ে বলে- আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।
যুবকটি অনমনীয় ভঙ্গিতে বলে - কিন্তু আপনার সাথে আমার কোন কথা নেই। কণা মরীয়া গলায় বলে- আমি আপনাকে.....
যুবকটি এবার কিছুটা চড়া গলায় বলে- কি ভেবেছেন আপনি? আপনি আমাকে ভালোবাসেন এ কথা বললেই কি আমি আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত বিয়েতে রাজি হয়ে যাবো?
কণা অবাক গলায় বলে - ছি এসব আপনি কি বলছেন?

যুবকটি বলল- হ্যাঁ ঠিকই বলছি। আমি আমার বাবা এহসান চৌধুরীর মত অত বোকা নই। আমার বাবার সম্পত্তির লোভে আপনার মা জাকিয়া সুলতানা আমার বাবাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু আমি সাজিদ চৌধুরী। আমাকে বোকা বানানো অত সোজা নয়। যতই ন্যাকামি করুন। আর না জানার ভান করুন। আমি এখন ক্লিয়ারলি বুঝতে পারছি কক্সবাজারে আপনার সাথে আমার দেখা হওয়াটা মোটেও আকস্মিক কোন ঘটনা ছিল না। এসবের পেছনে আপনার মা জাকিয়া সুলতানার হাত ছিলো। বিদেশ ফেরত উচ্চ শিক্ষিত পাত্র। সেই সাথে আমার মৃত মায়ের অগাধ সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী আমি। এত কিছুর লোভ তো আপনার মত অর্ডিনারি একটি মেয়ের জন্য সংবরণ করা চাট্টিখানি কথা নয়।

কথাগুলো শুনতে শুনতে লজ্জায় অপমানে কণার মুখটি লাল হয়ে ওঠে। ও অসহায় গলায় বলে -প্লিজ আপনি থামুন। প্লিজ। আপনি বোধহয় ভুল করছেন।
সাজিদ এবার কঠোর গলায় বলে- ভুল আমি নই । আপনারা করছেন। অত সুন্দর চেহারার আড়ালে এত নীচ আর লোভী মনোভাব কি করে লুকিয়ে রাখেন আপনারা। ছি ছি। আই হেট য্যু। আপনার যদি ন্যুনতম আত্নসম্মান বোধ থেকে থাকে তাহলে আর কোন দিন আমার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করবেন না।
লজ্জায় অপমানে কণার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। চোখ ফেটে বেরিয়ে আসা অশ্রু চাপতে কণা তাই ওড়নার আঁচল দিয়ে মুখ চেপে দৌড়ে সামনে চলে যায়।

সাজিদ এগিয়ে গিয়ে চাবি দিয়ে গাড়ির ডোর খুলে। এরপর ড্রাইভিং সিটে যেয়ে বসতেই মোবাইলে বন্ধু আবীরের কল আসে। কলটি রিসিভ করে কথা বলেতে বলতে সাজিদের প্রায় ১৫/২০ মিনিট লেগে যায়। এরপর এক সময় গাড়ি ষ্টাট দেয় ও। প্রায় ২০/৩০ হাত এগিয়ে আসতেই দেখে রাস্তার মাঝখানে একটি বড় ধরনের জটলা। বাধ্য হয়ে ওকে গাড়ি স্লো করতে হয়। তখন ওকে দেখে ভিড়ের মধ্য হতে একজন পথচারী দৌড়ে আসে। অনুরোধের স্বরে বলে - ভাই কিছুক্ষণ আগে এখানে একটি এক্সিডেন্ট হয়েছে। বেশ মারাত্মক এক্সিডেন্ট। যদি আপনার গাড়িতে একটু হসপিটালে নেবার ব্যবস্থা করে দিতেন।

সাজিদ বিরক্ত গলায় বলে- না না। আমার জরুরী কাজ আছে। আপনারা এম্বুলেন্স কল করুন। আর একটি সামান্য এক্সিডেন্টের অজুহাতে এতবড় রাস্তা পুরো ব্লক করে রেখেছেন। এটা তো ঠিক নয়। এজন্যই এ জাতির কিছু হলনা।
পথচারীটি আগের মত বিনয়ী গলায় বলল- আমরা এম্বুলেন্স কল করেছি। কিন্তু এখনো এসে পৌঁছায়নি। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। মাথার একপাশ পুরো থেঁতলে গেছে কিনা। ভাই, যদি একটু ফেভার করেন তবে সময় মত হসপিটালে পৌঁছানো গেলে হয়তো রোগীকে বাঁচানো যেত। প্লিজ।
সাজিদের মনটা এবার একটু নরম হল। বলল- চলুন তো দেখি । কি অবস্থা। গাড়ি বন্ধ করে ও লোকটির সাথে ভিড়ের মধ্যে প্রবেশ করল। কিন্তু একি! বিশাল রক্ত স্রোতের মাঝে ছটফট করতে থাকা মুখটির দিকে চোখ পড়তেই সাজিদ চমকে ওঠে ভীষণ ভাবে। ও দৌড়ে গিয়ে রক্তের মাঝেই হাঁটু গেড়ে বসে ডাকতে থাকে- কণা, এই কণা । শুনতে পাচ্ছেন আমি সাজিদ।
কণা চোখ খুলে তাকায় ধীরে ধীরে। এরপর বলে -আপনি?
সাজিদ ওকে ওঠানোর উদ্যেগ নিতেই কণা করুন গলায় বলে- আমাকে আপনি ক্ষমা করে দিন। প্লিজ। আমি নিজের অজান্তেই আপনাকে কষ্ট দিয়েছি।
সাজিদ বাঁধা দিয়ে বলে - ওসব কথা এখন থাক কণা।

কণা বিভ্রন্তির জোয়ারে আটকানো গলায় বলে- না, আমাকে শেষ করতে দিন। কক্সবাজারে ওভাবে আপনাদের সাথে দেখা হওয়ার পর হতে নিজের সম্পর্কে বেশ কিছু অজানা প্রশ্ন সারাক্ষণ আমার মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু কারো কাছেই আমি এর সঠিক জবাব পাচ্ছিলাম না। তাই বার বার আপনাকে বিরক্ত করেছি। গত কয়েকটি মাস নিজের সাথে নিজে ক্রমাগত যুদ্ধ করে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমি কে? কি আমার আসল পরিচয়? নিজের জন্ম নিয়ে অপ্রকাশিত গ্লানির অনুভব সব সময় আমাকে কুঁরে কুঁরে খাচ্ছিল। আপনার সাথে কথা বলে মনে হল আপনি আমার সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন। সবটা শোনার সুযোগ আমার হয়তো আর হবেনা। শুধু আমি যাবার আগে এটুকু জেনে যেতে চাই আমি এই পৃথিবীর কাছে অবাঞ্চিত কেউ নইতো?

এহেন পরিস্থিতিতে কণার প্রশ্নটা বেসুরে মনে হলে ও এর মাঝে নিজের দ্বিধাবিভক্ত অস্তিত্ব সম্পর্কে জানার এক হৃদয়স্পর্শী কাতরতা লুকিয়ে ছিল।
সাজিদ ওর অজ্ঞতার ধরণে মনে মনে বেশ অবাক হলে ও মুখে বলে- না, না। আপনি অবাঞ্চিত কেউ হতে যাবেন কেন? আমার স্টেপ মাদার জাকিয়া সুলতানা আপনার মা।
নিজের নিষ্কলুষ অতীত জানার আনন্দে কণার চোখ বেয়ে অশ্রুরা ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে ওর রক্তভেজা গাল বেয়ে। ও ক্ষীণ গলায় বলে- ব্যস। গত কয়েকমাস ধরে শুধু আমি এই প্রশ্নেরই জবাব খুঁজে বেড়িয়েছি। আমি আর কিছু ...........। হঠাৎ প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট শুরু হওয়ায় কণার বাকী কথা গুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়। ওর অশ্রুজড়ানো কন্ঠস্বরটি যেন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। একই সময় এম্বুলেন্সটি ও এসে পৌঁছে। কণাকে উঠিয়ে নিয়েএক সময় এম্বুলেন্সটি চলতে শুরু করে। সাজিদ ও কাঁপা কাঁপা হাতে ড্রাইভ করে এম্বুলেন্সটি ফলো করে।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরন ও মাথার মারাত্নক আঘাতের কারণে কণাকে সঙ্গে সঙ্গেই ও.টি তে নিয়ে যাওয়া হয়। খবর শুনে জাকিয়া সুলতানা, হায়দার সাহেব, তৃণা সবাই হসপিটালে ছুটে আসে। এদিকে শাহেদ সাহেব, রেহানা বেগম সহ পরিবারের অন্যরা ও এসে ভিড় জমায় হসপিটালে।

সবাই বেশ মুষঢ়ে পড়েছে আকস্মিক এই ঘটনায়। জাকিয়া সুলতানা বৃদ্ধ হায়দার সাহেবকে জড়িয়ে ধরে কান্নারত গলায় বললেন- বাবা, একি হয়ে গেল? আমার কণার একি হয়ে গেল?
সাজিদের মনের ভেতর কণার শেষ মুহুর্তের কথা গুলো নানা প্রশ্নের ভিড় জমাচ্ছিলো। তাই ও এগিয়ে এসে জাকিয়া সুলতানাকে সংকোচ জড়িত গলায় বলল- মা, কিছু মনে করবেন না। কণা কি জানতো না আপনিই ওর মা?
সাজিদের মুখ হতে মা ডাক শোনার পর জাকিয়া সুলতানা ধাতস্থ হতে একটু সময় নেন। এরপর কান্না জড়ানো গলায় বলেন-আজ এতগুলো বছর আমি তোমার মুখ হতে মা ডাক শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। আজ যখন ডাকলেই তখন আমার কণা জীবন মুত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। না বাবা। কণা আমার সম্পকে কিছুই জানতো না।
সাজিদ বিস্মিত গলায় বলে -এ কি বলছেন আপনি?

জাকিয়া সুলতানা তখন ধীরে ধীরে বললেন- কণার জন্মের দু'মাসের মাথায় ওর বাবার সাথে আমার ডির্ভোস হয়ে গেল। আর এদিকে তোমাকে ৪ বছরের রেখে তোমার মা ও মারা গেলেন। তখন তোমার বাবার সাথে আমার বিয়ে হলো। তোমাদের পারিবারিক কিছু সমস্যার কারনে আমি আমার শিশু সন্তানটিকে আমার বাবার বাড়িতেই ছেড়ে আসতে বাধ্য হলাম। এদিকে তখন আমার বাবার অফিস এমপ্লয়ী শাহেদ সাহেবের স্ত্রী তার নবজাতক কন্যা সন্তানটিকে হারিয়ে মানসিক ভাবে অপ্রকৃতস্থের মত হয়ে পড়ছিলেন। তখন সব দিক ভেবে আমার বাবা কণাকে ওদের হাতে তুলে দিলেন। আর আমি আমার ছোট শিশুটিকে ছেড়ে আসার কষ্ট ভুলতে তোমাকে বুকে তুলে নিলাম। নিজের সমস্ত মাতৃ স্নেহ উজাড় করে তোমাকে প্রতিপালন করতে লাগলাম। কণার জন্য আমার বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখা কষ্ট বোধ আর তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা দেখে তোমার বাবা কথা দিয়েছিলেন কণা কে তোমার বউ করে আবার আমার বুকে ফিরিয়ে দেবেন। আমি এতটা বছর সেই আশাতেই বুক বেঁধে ছিলাম। তাই কখনো কণার মুখোমুখি হইনি। ভেবেছিলাম তোমদের বিয়ের পর ওকে সব খুলে বলবো। জাকিয়া সুলতানা আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন।

মমতাময়ী এই নারীর দিকে তাকিয়ে সাজিদের নিজকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। ইস না জেনে না বুঝে কত অপমানই না করেছে তাকে। অথচ আজ বুঝতে পারছে মায়ের আকুতি ছাড়া তার হৃদয়ে যে অন্য কোন কিছুর অস্তিত্বই ছিলনা। সাজিদের বুকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়। কণার শেষ কথা গুলো ও বার বার মনে পড়ে। সাজিদ বুঝতে পারে ও না জেনে অন্যায় ভাবে কণাকে আঘাত করেছে। যে মেয়েটি নিজেই নিজকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছিলো। যার আত্মশ্লাঘা ছিলো অনেক, নিজেরই বিরুদ্ধে। তাকে অযথা মিথ্যে সন্দেহের বশবর্তী হয়ে ঘৃণা আর বিদ্রুপবানে ও নিজের অজান্তেই আজ এই অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কণার নিষ্পাপ রক্তভেজা মুখ আর অশ্রুময় চোখ দুটি সাজিদের চোখে বার বার ভাসতে থাকে। ওএই প্রথম উপলব্ধি করে এতটা সারল্য আর এতটা কোমলতার মিশেল ভরা মুখাবয়ব এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। সাজিদের নোঙ্গরহীন মনটা যেন এতদিনে বিদ্যুৎ চমকের মত করেই সুন্দরতম বন্দরের খোঁজ পেয়ে গেল। সাজিদ সিদ্ধান্ত নেয় কণার জ্ঞান ফিরলে ক্ষমা চাইবে ও।

প্রায় ঘন্টা তিনেক পর ডাক্তার মুহিত অপারেশন থিয়েটার হতে বেরিয়ে এসে বললেন- দেখুন, আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। কিন্তু মাথার একপাশের স্কাল এত মারাত্নক ভাবে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে যে আমাদের কিছু করার ছিলনা। আমি দুঃখিত। পেশেন্টকে আমারা বাঁচাতে পারিনি। অপেক্ষমান স্বজনদের মাঝে নতুন করে কান্নার রোল উঠে।

সাজিদ অস্পষ্ট গলায় বলে - না না। এ হতে পারেনা। কণা, তুমি আমাকে অন্তত একটি বার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ দাও। কণা আমি.... আমিই তোমকে খুন করেছি। সাজিদের চোখ অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে অসে। এক সময় সাজিদ অশ্রুভরা চোখে তাকায় হসপিটালের চলার পথটির দিকে। যেখানে পথচারীদের অবহেলায় নির্মম ভাবে লুটিয়ে পড়ে আছে থেঁতলে যাওয়া কিছু কাঠ গোলাপ। সাজিদের মনে হল, ওর নিজের অযাচিত সন্দেহ আর নিষ্ঠুর আচরণের জন্য কণার সুন্দর জীবনটা ওতো এমনি করে পিষ্টে গেল।

এতবড় একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর ওর মনে হল জীবনটা যেন খুব দ্রতই বদলে গেল। ক্ষণিকের প্রাপ্তিটা অনন্ত কালের জন্য অপ্রাপ্তিতের আঁধারে ঢেকে গেল। সাজিদের বুকের চাতালে রাশি রাশি শূণ্যতা এসে জমাট বাঁধতে শুরু করলো সাইবেরিয়ার বরফ খন্ডের মতই। ও ভাবলো একটি নিষ্পাপ হৃদয়ে আঘাতের দায়ভার আর ক্ষণিকের ভালোলাগাকে সঙ্গী করে জীবনের বাকী দিনগুলো সহজেই কাটিয়ে দেয়া যাবে একাকী। কণার এই অনিবারনীয় অভিমানী আত্নগোপন যে সারা জীবনের জন্যই নিঃস্ব করে দিয়ে গেল সাজিদকে।

(সমাপ্ত)
http://www.sonarbangladesh.com/articles/NurAyeshaSiddiqa
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে এস, এম, ইমদাদুল ইসলাম লিখেছেন, ০৬ মে ২০১২; সকাল ০৫:৪৪
অসাধারণ ! অসাধারণ ! এবং অসাধারণ ! কী বলব, একটানে পড়ে ফেললাম । কোথাও বিরতি টানার সময় পেলাম না। এরকম আরো সুন্দর সুন্দর গল্প চাই।
83853
াা থেকে ইবনে হাসেম লিখেছেন, ০৬ মে ২০১২; সকাল ১০:৫৬
এক কথায় লা জবাব। আল্লাহ তুমি আমার আপামনির এ লিখনী শক্তিকে দিশাহীন এ জাতির পথ প্রদর্শক হিসেবে ক্ববুল করে নাও। আমিন
83860
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আব্দুল্লাহ আল মাসুদ লিখেছেন, ০৬ মে ২০১২; রাত ১১:১৫
আপু, অসাধারণ লিখেছেন। সোনার বাংলাদেশের লেখক ও পাঠক হিসেবে আমার পড়া সেরা গল্প। জানি না কারো বাস্তব জীবনের সাথে মিল আছে কিনা। তবে আমাদের সমাজে এধরনের অনেক ঘটনা আছে।
83905
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৭ মে ২০১২; দুপুর ০১:৪৯
ভাই এস,এম,ইমদাদুল ইসলাম অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য। শুভ কামনা রইলো।
83927
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৭ মে ২০১২; দুপুর ০১:৫১
ইবনে হাসেম ভাই অনেক শুকরিয়া আপনার নেক দোয়ার জন্য। ভালো থাকুন। শুভ কামনা রইলো।
83928
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৭ মে ২০১২; দুপুর ০১:৫৮
ভাই আব্দুল্লাহ আল মাসুদ, লিখাটি আপনার ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো। আসলে নিজের কল্পনার জগতে সৃষ্ট একটি জীবনকে যখন কষ্ট সুখের মোড়কে গেঁথে কলমের ডগায় তুলে নিই তখন নিজের কাছেই কেমন যেন ঠেকে। পাঠকের ভালোলাগার অনুভূতি না পাওয়া পর্যন্ত সে সৃষ্টি যেন অপূর্ণই থেকে যায়। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে লিখাটি ভালো লাগার জন্য। না বাস্তব কোন জীবনের কথা ভেবে লিখা হয়নি। তবে সমস্যা গুলো তো আজ আমাদের সমাজের প্রতিদিনকার চিত্র। শুভ কামনা রইলো।
83929
ঢাকা থেকে জয় লিখেছেন, ০৭ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৫৪
মাশাল্লাহ জাজাকাল্লা খায়রান। অনেক সুন্দর হয়েছে। লেখার হাত বেশ পোক্ত বোঝা গেল।
83944
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৮ মে ২০১২; দুপুর ০২:০৫
ভাই জয়, মনে হচ্ছে সবার ভালোবাসাটা এত বেশী পেয়ে যাচ্ছি যা পাওয়ার যোগ্যতা এখনো এই ক্ষুদ্র লেখিকার তৈরী হয়নি। মহান আল্লাহ যেন আপনাদের ভালোলাগার পথ ধরে সুন্দর কিছু বির্নিমানের যোগ্যতা আমাকে দান করেন। অনেক শুভ কামনা রইলো।
83980
নারায়নগন্জ থেকে মাহবুব লিখেছেন, ০৮ মে ২০১২; বিকেল ০৪:১৩
ভীষন ভাল লাগলো। এমন সুনিপুন বর্ণনা ও গল্পের রহস্যময়তা- শুরু থেকে শেষে নিয়ে যায় এক টানে। শেষ করতেই উপলব্ধি করলাম- চেখের কোনে নোনা জলের উপস্থিতি।চট্টগ্রামেই বেড়ে ওঠা আমার, সেই কারণেই বোধ করি আরো বেশী মিশে যাওয়া- এ গল্পের সাথে।
অনুরোধ রইলো, থেমে যাবেন না। হয়তো এখন থেকে আপনার লিখা খুজে বেড়াবো ব্লগের পাতায়...। আশা করি আমাদের নিরাশ করবেন না।
83985
১০
বাংলাদেশ থেকে আব্ু সাইফ লিখেছেন, ০৮ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৪৪
আপনি খুবই ভালোমানুষ হলেও আপনার কলম খুব নিষ্ঠুর; কণাকে না মারলেও তো চলতো!
একটা উপন্যাসে হাত দেন না! বাজারে প্রচলিত ঐ সব পানসে গুলোর চেয়ে হাজারগুণ বেশী পাঠক পাবেন তা জোর গলায় বলতে পারি!
83991
১১
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৯ মে ২০১২; দুপুর ০৩:৪১
ভাই মাহবুব,অনেক শুকরিয়া আপনার ভালোলাগার সুন্দর অনুভূতি প্রকাশের জন্য। শুভ কামনা রইলো।
84032
১২
জেদ্দা,সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ০৯ মে ২০১২; দুপুর ০৩:৪৩
ভাই আবু সাইফ, অনেক ধন্যবাদ সুন্দর পরামর্শের জন্য। সঙ্গে থাকুন। শুভ কামনা রইলো।
84034
১৩
Jeddah, KSA থেকে Masud Rana লিখেছেন, ১৩ মে ২০১২; বিকেল ০৪:৪০
I wish all the best writer of this small story. Her writing really heart touching and I always enjoy. Please keep it up and day will come to recognize widely.
84215
১৪
chittagong থেকে মাহ্ মুদুল হাসান ইতু লিখেছেন, ১৬ মে ২০১২; সকাল ০৯:১১
assalamualaikum....Aunty.Ending was so sad.....But An enjoyable story like every of your other stories.... All the best to writter..And All of our familly member read the story at one time...hahah..
84346
১৫
Jeddah থেকে Noor Ayesha Siddiqa লিখেছেন, ১৬ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৭:২৮
Thanks Br. Masud Rana for you wish and nice comment.
84376
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
নূর আয়েশা সিদ্দিকা ইসলামের ইতিহাস ওসংস্কৃতি বিভাগে চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগী লাভ করেন। স্কুল জীবন হতে তিনি লেখালিখির সাথে জড়িত। সামাজিক অসঙ্গতি গুলো যখনই অনুভুতিকে আহত করেছে তখনই তিনি তার ক্ষুদ্র লেখনির মাধ্যমে সচেতন বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ার চেষ্টা করেছেন। এ পর্যন্ত পূর্বকোণ, কর্ণফুলী, ইনকিলাব, যায়যায়দিন, সোনার বাংলা, ঢাকা ডাইজেস্ট সহ বেশ কিছু সাময়িকীতে তার বেশ কিছু গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে । গত দশ বছর যাবত তিনি জেদ্দায় বসবাস করছেন ।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy