মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৪০ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
১৬ই মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবসঃ সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত (১৯/০৫/২০১২)
নীল-স্বর্ণ স্রোতস্বিনী যুদ্ধ হবে (১২/০৫/২০১২)
দেশ শাসনে জাতীয়তাবাদের টুলসঃ বাংগালি, বাংলাদেশী, মুসলিম ও হিন্দু (০৫/০৫/২০১২)
নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও স্বাধীনতার প্রত্যয় নির্মাণে ধর্মের ভূমিকা (২৮/০৪/২০১২)
দেশ শাসনে ধর্মীয় দ্বৈত-স্বত্তাবাদঃ বিভ্রান্তির কবলে বাংলাদেশ (১৪/০৪/২০১২)
“জয় বাংলা” জয়োধ্বনির জন্ম ইতিহাস (২৪/০৩/২০১২)
ভূমিজ সন্তান বাংগালি মুসলমান ও বহির্বঙ্গীয় মুসলমান: মেজবান ও মেহমান তত্ত্ব (১৭/০৩/২০১২)
মওলানা ভাসানী ছিলেন অসম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক (১০/০৩/২০১২)
মসজিদ মিনার ও শহীদ মিনারঃ বাংগালি মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক (২৫/০২/২০১২)
বাংগালি, বাংলাভাষা, জাতি-স্বত্তা ও জাতীয়তাবাদঃ বিভ্রান্তির কবলে বাংলাদেশ (১৮/০২/২০১২)
বাংলা ভাষা ও বাংগালি জাতীয়তাবাদঃ “বন্দে মাতরম” ও “জয় বাংলা” (২৮/০১/২০১২)
আধ্যাত্মিক বাংগালি জাতীয়তাবাদ ও আধ্যাত্মিক হিন্দু জাতীয়তাবাদ (২৪/১২/২০১১)
দুধ ও ঘোলের পার্থক্য তত্ত্ব: বাংগালি ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ইতিকথা (১৮/১২/২০১১)
'সাইড নিতেই হবে' : 'ওরা কি এখনো আমার জন্য রেখে দিয়েছে'? (১০/১২/২০১১)
ঢাকা শহর ভাগঃ ভাগাভাগির ভূবন-দর্শন (০৩/১২/২০১১)
মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীঃ মহান জাতীয় নেতা (২০/১১/২০১১)
ন্যাড়া হেইক্কার দেশ-বাংলাদেশ: বাংগালির ধর্ম-বিপ্লব (১৩/১১/২০১১)
পদাংক অনুসরণের রাজনীতি: সামনে এগুতে পিছনে তাকানো (৩০/১০/২০১১)
বিতর্কঃ জাতীয় ঐক্যে ফাটল আছে বনাম সমঝোতা নাই (০১/১০/২০১১)
হাসিনা-খালেদার প্রশংসা পত্র ও বাংলাদেশের জন্য বহুত্ববাদ (১৭/০৯/২০১১)
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: বিভ্রান্তির কবলে বাংলাদেশ (০৪/০৯/২০১১)
দেশ শাসনের টুলবক্সঃ আওয়ামী শাসকগন কি তা হারিয়ে ফেলেছেন? (০৬/০৮/২০১১)
প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্নঃ শিখড় ছিন্নতার শয়তানী কর্ম (৩০/০৭/২০১১)
নারী অধীনতার ভুবন তত্ত্বঃ বাংলাদেশ কি অধীনতার কবলে? (২৩/০৭/২০১১)
বিতর্কঃ বাংলাদেশ বনাম বাংগালিস্থানঃ ধর্মনিরপেক্ষতার শেষকৃত্য (০৯/০৭/২০১১)
সংবিধানে রাষ্ট্র-ধর্ম ইসলামঃ ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’র বর্ডার গার্ড (২৫/০৬/২০১১)
বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম (১১/০৬/২০১১)
জাতীয়তাবাদের রাজনীতিঃ স্থানিক, ধর্মীয় ও নৃজাতিক (২৮/০৫/২০১১)
জাতীয়তাবাদের রাজনীতিঃ স্থানিক, ধর্মীয় ও নৃজাতিক (২১/০৫/২০১১)
মা, পরিবার ও বাংলাদেশ (০৭/০৫/২০১১)
আগের লেখা
103


১৬ই মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবসঃ সংগ্রামের ইতিহাস মুছে ফেলার চক্রান্ত

নুর মোহাম্মদ কাজী

১৬ই মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের ১৬ই ও ১৭ই মে গংগা নদীর পানির ন্যায্য হিস্‌সার দাবীতে মহান জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানী রাজশাহী শহর থেকে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লক্ষাধিক বাংগালির এক মহামিছিলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৬ সালের এ সময়টি আমাদের জাতীয় জীবনে এক মহাদুর্যোঘন মুহূর্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের আগষ্ট মাসে মুক্তিযুদ্ধের সরকার প্রধান বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হবার পর এক চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে দেশ ও জাতির ভাগ্য ঝুলছিল। এ সময় একদিকে কাদের সিদ্দিকী ভারতের সহযোগীতায় বাংলাদেশ সীমান্তে আক্রমন পরিচালনা করছিলেন, অপরদিকে ভারত আন্তর্জাতিক সকল নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে ফারাক্কায় গংগা নদীর পানি এক তরফা প্রত্যাহার করে পদ্মা নদী শুকিয়ে ফেলছিল। বাংলাদেশে পানির জন্য হাহাকার উঠেছিল। জাতির এ দুর্দিনে ৯৬ বছর বয়সেও মওলানা ভাসানী বার্ধক্যের জ্বরাজীর্ণতাকে উপেক্ষা করে আগ্রাসী শক্তির চক্রান্ত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এদিন তিনি ফারাক্কা অভিমুখে লক্ষাধিক বাংগালির লংমার্চে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানীর ডাকে সে দিন দলমত নির্বিশেষে সকলেই এ মহামিছিলে অংশ গ্রহণ করে ছিলেন। এর ফলে ফারাক্কা সমস্যা জাতি সংঘে উত্থাপিত হয়েছিল। আগ্রাসী শক্তি পিছে হটতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ আপাততঃ রক্ষা পেয়েছিল। সে থেকে বাংলাদেশ আজো টিকে আছে। টিকে আছে বলেই তো নানা জাতের সরকার পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আসছেন এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে সরকারী দল ও বিরোধী দল হিসেবে খেলছেন। এরা ফারাক্কা লংমার্চের ফলে অর্জিত স্বাধীনতার বেনিফিসিয়ারিজ। এখন আমাদের প্রশ্ন বাংলাদেশের এ রাজনীতির শক্তিবলয় এ দিবসটিকে কেন পালন করছেন না? তবে কি এরা বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে ফারাক্কা লং মার্চের ইতিহাসকে মুছে দিতে চান? এ প্রবন্ধে আমরা এ প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ স্মরণ ও নদীর পানির ন্যার্য হিস্‌সা প্রাপ্তির আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা আজ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান আন্দোলন। আমরা ফারাক্কা বাঁধ বিরোধী আন্দোলনকে বিশ্ব পরিবেশবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য গত ৩৬ বছর ধরে দেশে বিদেশে কাজ করছি। ফারাক্কা লংমার্চ সংগঠিত করতে গিয়ে আমি মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সান্নিধ্যলাভে সক্ষম হয়েছিলাম। হুজুর আমাকে ফারাক্কা লংমার্চ জাতীয় কমিটির সদস্য ও লংমার্চ পরিচালনা ছাত্র-কমিটির আহবায়কের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মনে পড়ে ফারাক্কা মিছিলের পর এক বার সন্তোষে গেলে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বা’জান মনে রাখিও, ফারাক্কাসহ নদীর পানির উপরই বাংগালি জাতির অস্তিত্ব ও জীবন-মরণ নির্ভর করে। নদীর পানির জন্য আন্দোলন অব্যাহত রাখতে ভুলিও না”। মহান নেতার কদমবুচি করে সন্তোষ থেকে ফিরে এসেছিলাম। এর অল্প কিছুদিন পর ১৯৭৬ সালের ১৭ই নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেক হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। বাংগালি জাতি তার ইন্তেকালে পিতৃশোক কাতর হয়েছিল। দেশব্যাপী হাজারো মানুষের কান্নার রোল উঠেছিল। আমার মনে পড়ে হাসপাতালে তাঁর বেডের পাশে দাঁড়িয়ে আমি চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। সেদিনই শপথ নিয়েছিলাম যে কোন মূল্যেই হউক তাঁর আদেশ পালন করবো।

মওলানা ভাসানী জাতীয় স্মৃতি পরিষদের উদ্যোগে আমরা ১৯৮৫ সালে মহান নেতার জন্মশত বার্ষিকী পালনের কর্মসূচী পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভাসানী ন্যাপের সিনিয়র নেতা মরহুম এডভোকেট মুজিবুর রহমান এ সংগঠনের সভাপতি ও আমি ছিলাম এর সাধারণ সম্পাদক। জন্মশত বার্ষিকীর বছরব্যাপী কর্মসূচীর অন্যতম ছিল ১৬ই মে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস পালন। সে থেকে এ দিবসটি ফারাক্কা দিবস হিসেবে যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে আমরা পালন করছি। ফারাক্কা লং মার্চ পরিচালনা থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ১৬ বছর স্বদেশে এবং পরবর্তী ২০ বছর প্রবাসে আমি এ আন্দোলনকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছি। ফারাক্কা ইস্যু নিয়ে আমি দেশত্যাগী হয়েছি। ১৯৮৪ সালে চীন সফর করেছি। ১৯৯৩ সালে বিশ্ব পরিবেশ সম্মেলনে ফারাক্কা ইস্যুটি সম্পৃক্ত করার দাবী জানানোর জন্য আমি জাতিসংঘ ও আমেরিকার স্ট্যাট ডিপার্টমেন্টে গিয়েছি। জাতিসংঘের সেক্রেটারী জেনারল ও মানবাধিকার সংস্থা প্রধানের নিকট বাংলাদেশের পাঁচ হাজার প্রতিবাদী মানুষের সহিসম্বলিত স্মারকলিপি প্রদান করেছি। এ ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে আমার জীবনে আজ যেটা সবচাইতে বড় বিস্ময় হিসেবে দেখা দিয়েছে তা হলো ক্ষমতার জন্য কেন কতিপয় মানুষ জাতির অস্তিত্বের বিপরীতে যায়? ফারাক্কা বাঁধ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে নিজেকে আজ বড় একা মনে হয়। আজ মনে পড়ছে কি কষ্ট সহ্য করেই না ৯৬ বছর বয়সেও মহান নেতা মওলানা ভাসানী ফারাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

বাংগালি জাতিকে নিজ নদীর মিঠা পানির জন্য অন্যের সাথে লড়াই করতে হবে। ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংগালি জাতি যে আজ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এ বিষয়টি আজ সারাবিশ্বে জানাজানি হয়ে গেছে। ফারাক্কা বাঁধ যে এক পরিবেশ বিনাশী বাঁধ এ বিশ্বের সবাই জানে। বাংলাদেশের জন-প্রাণী বিনাশী এ এক মহা মরনফাঁদ। এ বাঁধ শুধু বাংলাদেশ নয়, পশ্চিমবংগ ও সেভেন সিস্টারসসহ এ অঞ্চলের সকল প্রানীকূল ও পরিবেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মহান নেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে ফারাক্কা লং মার্চ পরিচালনার পর আমরা এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য আমাদের তারুণ্য ও যৌবনের সকল শক্তি প্রয়োগ করেছি। এ কারণে পানি আগ্রাসী ভারত আজ নৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গড়ে উঠা এ নৈতিক প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে ফেলার জন্য গত কয়েক বছর ধরে ভারত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের ইস্যু দাঁড় করিয়েছে। আগ্রাসী শক্তির বাংলাদেশী তাবেদাররা এ ব্যাপারে খুবই তৎপরতা দেখাচ্ছে। তথাকথিত টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ বন্ধের জন্য লম্প-জম্প আন্দোলন করছে। অথচ তারা ফারাক্কা লংমার্চ দিবস পালন করছে না। আমরা অপার বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম দিল্লী থেকে ঘুরে এসে সাবেক প্রেসিডেন্ট হো মো এরশাদ টিপাইমুখ বাঁধ ভেংগে ফেলার যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। আমরা ভাবলাম এ যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তিনি জেনারেলেসীমু হবেন! তিনি তো ফারাক্কার ব্যাপারে কোন কথা বলছেন না? তার ক্ষমতাসীন জোট বলছে না। বিরোধী জোট বলছে না।

বাংলাদেশের নদীসমুহের মিঠা পানি আজ লুন্ঠিত হচ্ছে। এ মিঠা পানির অপর নাম নীল-স্বর্ণ (Blue Gold)। বিশ্বব্যাপী এখন আধিপত্যবাদী শক্তি এ নীল-স্বর্ণ দখলের জন্য পাগল হয়ে উঠেছে। মিঠাপানির দেশ বাংলাদেশ তারই শিকার। বাংলাদেশের মিঠা পানির আজ বড় অভাব। ভারত আমাদের মিঠা পানি চুষে নিয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কার প্রতিক্রিয়ায় মাটির নীচের পানির স্তরে আর্সেনিক সৃষ্টি হয়েছে। টিউবওয়েলের পানি খেলেই শরীরের পঁচন রোগ ধরে। গ্রামে গঞ্জে এরোগে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে।

আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম ফারাক্কা লংমার্চ সংগঠিত হওয়ায় যারা এর বেনিফিসিয়ারিজ তারা কেন বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছেন না। ১৯৭৫ সালে বংগবন্ধু নিহত হবার পর যারা বাংলাদেশে নয়া ক্ষমতার বিন্যাস করেছিলেন, তারা কেন তাঁকে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিপক্ষ হিসেব দাঁড় করিয়ে ছিলেন। তারা কি বলেন নাই যে, “শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে দেশ ভারতের করদ রাজ্য হবে”। কেন জনাব কাদের সিদ্দিকী শেখ মুজিব হত্যার প্রতিশোধ নেবার জন্য সীমান্তের অপাড় গিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করেছিলেন। সে সময় বিশৃংখল করে দেয়া সেনাবাহিনী ভারতের মদদপুষ্ট কাদেরীয়া বাহিনীকে পরাস্ত করতে পারতো কি? তাই তো ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী-জনতা একাট্টা হয়ে বিপ্লব করেছিল। এ দিন ঢাকার রাজপথে শ্লোগান উঠেছিল “যুগ যুগ জিও তুমি- মওলানা ভাসানী”। মওলানা ভাসানীই সে সময়ে বাংগালি জাতির একমাত্র জীবিত জাতীয় নেতা, জাতির শেষ ভরসা স্থল। আমি এ সময় অনেক জেনারেলকে ঢাকায় পি জি হাসপাতালে মওলানা ভাসানীর পদমুলে বসে থাকতে দেখেছি। মওলানা ভাসানী সে সময় অসুস্থ শরীর নিয়ে বাংলাদেশের সীমান্ত সফর করেছিলেন। সীমান্তে বিশাল বিশাল জনসভা করেছিলেন। আমরা জানি কাদের সিদ্দিকী তার মনোমন্দিরে মওলানা ভাসানীকে সর্বোচ্চ গুরু হিসেবে মানতেন। মওলানা ভাসানীর সীমান্ত সফর কাদের সিদ্দিকীর মোটা মাথায় কিছু হলেও চিন্তা ঢুকেছিল যে, সীমান্ত হামলার মত কাজটি বাংগালি জাতির অস্তিত্বের বিরোধী। এর মধ্যেই মওলানা ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে ফারাক্কা মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী এ মিছিল না করলে বাংলাদেশের বিশৃংখল সেনাবাহিনী সীমান্তে হামলাকারী কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর কাছে সহজেই পরাজিত হত। আমাদের প্রিয় কাদের ভাই হতেন বাংলাদেশে দিল্লীর বিশ্বস্ত সুবেদার। আর দেশ হয়ে যেত দিল্লীর করতলগত।

এখানে উল্লেখ্য যে, বংগবন্ধু ভারতের অনুরোধে মূলচুক্তি স্বাক্ষরের আগে ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের লিংক ক্যানেল চালুর অনুমোদন দেন। এটা সত্য ছিল যে, তিনি যদি ১৯৭৬ সালে জীবিত থাকতেন এবং দেখতেন যে, গোয়ালন্দের কাছে পদ্মা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে, হয়তো বা এমনও হতে পারতো যে, আমরা দেখছি, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিব হাত ধরাধরি করে ফারাক্কা লংমার্চের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা ফারাক্কা লংমার্চকে সফল করে তোলার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমান ও তৎকালীন নৌবাহিনী চীফ এম এইচ খানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। এরা দু’জন ফারাক্কা ইস্যুকে জাতিসংঘে নিয়ে তুলেছিলেন। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে নিহত হলেন। এভাবে দেখা যায় যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য যারা প্রত্যক্ষ লড়াই করেছিলেন’ তাদেরকে এক অদৃশ্যহস্ত এক এক করে নিদন করছে অথবা ক্ষমতার রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে হটিয়ে দিচ্ছে। আবার এ অদৃশ্য হস্তই ক্ষমতার নুতন বলয় নির্মাণ করে দিচ্ছে।

দুনিয়াব্যাপী ক্ষমতার বিভাজন এক নতুনরূপ নিচ্ছে। আজকের দুনিয়ায় ৯৯% শতাংশ মানুষকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মাত্র ১% শতাংশ বর্ণবাদীকে তৈরী করা হচ্ছে। শতাংশের হিসেবে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে শাসন করার জন্য মাত্র ১৬ লাখ বর্ণবাদী মানুষ দরকার। অদৃশ্য হস্ত এ শাসক শ্রেণী নির্মাণ করছে। এ শাসক শ্রেণী পাচ্ছেন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগীতা। এ প্রেক্ষাপটে ফারাক্কা লংমার্চ দিবস পালনের ক্ষেত্রে এ শাসক শ্রেণীর আচরণ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। বাংলাদেশে ক্ষমতার খেলায় লিপ্ত ১% শতাংশ শাসক শ্রেণী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনা। এরা তাদের সহযোগী। এরা ক্ষমতার লড়াইয়ে বর্ণবাদীদের শক্তির মদদকামী। এরা ক্ষমতায় যাবার জন্য বর্ণবাদী প্রভুদের ইচ্ছার কীর্তন করে। প্রভুদের ইচ্ছা মাপিক গণ-বিভ্রান্তির নানা কর্মসূচী পালন করে। আধিপত্যকে আড়াল করার জন্য দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ঘুম, খুন নিয়ে আন্দোলন করে। সংসদকে অকার্যকর করে রাখে।

উদাহরণ স্বরূপ লক্ষ্য করুন টিপাইমুখ বাঁধ ইস্যু। বিভ্রান্তির এক ফেলা জাল হলো টিপাইমুখ বাঁধ। ফারাক্কা সমস্যাকে আড়াল করার জন্য টিপাইমুখ বাঁধ এক পাতানো খেলা। মিডিয়ার পেটের ক্ষুধা মিটানোর এ এক আগ্রাসী খেলা। এ খেলায় ফারাক্কা সমস্যাকে এক প্রকার আড়াল করে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষমতা চক্রের এ নিয়ে তেমন কোন মাথা ব্যথা নেই। শুধু প্রভুর ইচ্ছায় যথাযথভাবে গা হেলান দিয়ে থাকলেই হলো। দেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশার চাইতে প্রভুদের লুণ্ঠনকে আড়াল করার কর্মসূচীই এদের কাছে বড় বেশী প্রয়োজনীয় বিষয়। প্রভুদের ইচ্ছা পূরণের জন্য এরা গড়ে তুলেছে এক তাবেদারী রাষ্ট্র কাঠামো।

পরিশেষে এ কথা বলতে চাই যে, বাংগালি জাতির দূর অতীতের বহু সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণবাদীরা মুছে ফেলেছে অথবা বিকৃত করে ফেলেছে। কিন্তু নিকট অতীতের সংগ্রামগুলোকে এমনভাবে গায়েব করে দেবে এটা ভাবতেও আমাদের কষ্ট হয়। আর্য আক্রমনকারীরা বাংলাদেশকে চিহ্নিত করে ছিল “দুর্ধর্ষ অনার্য আবাস” হিসেবে। আর্য বংশধারার বর্ণবাদীরা ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে এ “দুর্ধর্ষ অনার্য আবাস”কে জনশূন্য করে তোলার জন্য। আধিপত্যবাদী ভারত বিগত ৩৮ বছর ধরে গংগা নদীসহ বাংলাদেশের ৫৪টি নদীর পানি চুষে নিয়ে “হাজারো সালকা বদলা” নিচ্ছে। যারা বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজনীতি করেন তারা কোন না কোন ক্ষমতার বলয় ভুক্ত। তাদেরকে বুঝতে হবে, বাংগালি জাতির শত্রু যেমন আছ, তেমনি মিত্রও আছে। বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের শত্রু যেমন আছে, তেমনি মিত্রও আছে। বিগত আড়াই হাজার বছর ধরে বাংগালি জাতির শত্রু হলো বহির্বংগীয় আক্রমনকারীরা। আক্রমনকারীরা সব সময়ই ছিল বর্ণবাদী-হয় হিন্দু বর্ণবাদী ও নয় মুসলিম বর্ণবাদী। আমাদের পুর্বপুরুষরা বীরত্বের সাথে বর্ণবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। ফারাক্কা বাঁধ বাংগালি জাতিকে নিঃশেষ করে দেবার বর্ণবাদীদের সর্বশেষ অস্ত্র। এ অস্ত্র দিয়ে বর্ণবাদীরা বাংগালি জাতিকে চিরতরে বিনাশ করে দিতে চায়। এ চলমান ইতিহাস (History of present time) ভুলে গেলে চলবে না।

Executive Director
Project profamily
http://www.sonarbangladesh.com/articles/NurMohammadKazi
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
Biswanath. থেকে Deshi Dalal লিখেছেন, ২০ মে ২০১২; সকাল ০৯:০৮
Bangladesh needs a valiant,patriotic and legendary leader like Moulana Bhashani.If no such leadership exist to day at least someone should come up following his courage, patriotism, far sight and vision,unite and organise mass uprising against the water aggression of neo imperialist India.One such fighter is Mr.Ilias Ali,who was very vocal and very successfully organised the mass movement in Sylhet against Tipaimukh and the invasion of Bangladeshi land by India.India and its Bangladeshi agents were scared of his leadership,so they orchestrated his disappearance.We don't know his fate,we fervently ask Allah SWT The Almighty,save and protect him from the enemies of Bangladesh.and kindly bring him back to his family particularly his old mother,wife and children.
84547
india থেকে dirtroad লিখেছেন, ২০ মে ২০১২; সকাল ১১:৩৩
Did not understand how Farakka was supposed ti impact NE states? The Assam rivers are completely different river system and farakka is much more downstream to those.

Also there is a sad attempt to put up Kader Siddiqui as a traitor and antagonist to Bhasani. The National liberation Army of Kader Siddiqui never had any chance of success. Kader Sidiqqui knew it very well too..it was only a reaction to Mujib's killing. They were supplied very clandestinely by RAW and BSF more from earlier contacts. They away had a very precarious existence and were mostly populated by Hindus. At no point in time they cloud rise to be a national threat. Its sad that even in death Maulna needs to be bibliographically vindicated as a national savior. This is not the right approach to history but to penny novels.
84549
ঢাকা উত্তর থেকে থেকে শিশির ভেজা ভোর লিখেছেন, ২১ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:২২
আগের মত নেতাদের আর এখন পাওয়া দুস্কর। এখন সবাই দেশ থেকে নেতাদের দিকে বেশী নজর দিয়েছে।
84627
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy