স্রষ্টার অস্তিত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়ার সাধ্য আমার নেই। নিজেকে নাস্তিক ভেবে এবং তা প্রচার করে যারা আনন্দ কিংবা গর্ব বোধ করেন, তাদের সমকক্ষ আমি কখনো হতে পারব না এবং সে জন্যে কোনোরকম দুঃখবোধও আমার মধ্যে নেই। আমার এক বন্ধু একদিন খুব গর্ব করে জানাল স্রষ্টায় তার অনাস্থার কথা। সে আরো বলল, শিগগিরই সে একজন তাত্ত্বিকের কাছে যাবে এ-ব্যাপারে আরো বিশদ ব্যাখ্যা পেতে।
তার কথা শুনে সংস্কারবশে প্রথমে আমি চমকে উঠেছিলাম, তর্ক করতে যাচ্ছিলাম ওর সঙ্গে। কিন্তু পর মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পাল্টে বললাম, ‘তাত্ত্বিকদের কাছে যাবে, ভালো কথা। কিন্তু কোন ধরনের তাত্ত্বিকের কাছে? আস্তিকের নাকি নাস্তিকের? তবে আমার পরামর্শ হলো, এ-ব্যাপারে তাত্ত্বিকদের কাছে যাওয়ার চেয়ে নিজের ওপর নির্ভর করাই ভালো। সময়ই সব কিছুর সুন্দর জবাব দেবে। আর কোনো তাত্ত্বিকই নিরপেক্ষ জবাব দিতে পারবে বলে মনে হয় না।’
ব্যক্তিগতভাবে আমি স্রষ্টায় বিশ্বাসী। স্রষ্টাকে আমার খুব প্রয়োজন। স্রষ্টা নেই, এমন চিন্তা হয়তো আমাকে কিছু অনুষ্ঠান পালনের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি লাভের স্বস্তি দান করতে পারে, কিন্তু সে-স্বস্তিটাই আমার মতে, জীবনের মোক্ষ নয়। মানব জীবনে মোক্ষ কোনো অবিসংবাদিত বিষয় বা বস্তু নয়। কে কিসে আনন্দ পায়, আর কার কোথায় দুঃখ, তা প্রত্যেকের নিজের ব্যাপার। মানুষের মোটা চাহিদাগুলো মেটার পরেই মানুষের ক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না। আসলে মানুষের নিজস্ব চিন্তার স্বস্তিই তার মোক্ষ।
আমার কাছে মোটা চাহিদা পূরণের জন্যে চুপি চুপি স্রষ্টাকে অনুরোধ করার ব্যাপারটাকে অসাধুতার নামান্তর বলেই মনে হয়। স্রষ্টাকে এতে করে বরং অপমানই করা হয়। স্রষ্টা কি মজুদদার? তিনি কি পুঁজিপতি? কেবল প্রশংসা আর প্রার্থনার বিনিময়েই তার সৃষ্টির কাছে তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করেন? কী করেন তিনি অত প্রশংসা আর প্রার্থনার মুদ্রায় ঝুলি পূর্ণ করে? তার মহিমা কি শুধুই মানুষের প্রশংসা আর প্রার্থনার মুখাপেক্ষী? তাহলে তো স্রষ্টা খুব স্থুল! লম্বা পাঞ্জাবি আর খাটো পাজামা পরা, আরবি বর্ণমালা পড়তে জানা, উম্মি জনগণের কাছে সালাম পেতে অভ্যস্ত, স্থুলোদর-মেদবহুল ঘাড় ও শ্লোকসর্বস্ব মৌলবির মতই তার কাজ-কারবার। আমাদের পার্থিব মৌলবিরা উত্তম ভোজনশেষে সদক্ষিণা বিদায়ের নিশ্চয়তা পেলেই কেবল দু’হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। স্রষ্টাও কি প্রশংসা আর প্রার্থনার ঘুষ ছাড়া তার সৃষ্টির দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেন না?
কিন্তু প্রকৃত স্রষ্টা, যিনি আমার সত্যিকারের স্রষ্টা, তাকে আমি আনুষ্ঠানিকতার জালে আবদ্ধ করতে চাই না। তাকে আমার খুব প্রয়োজন, আমার আনন্দের মুহূর্তে, বিমুগ্ধ মুহূর্তে, ক্রোধ-ঘৃণা-প্রতিবাদ আর প্রেমের মুহূর্তে আমার সে-স্রষ্টাকে দরকার, যাকে আমি নিঃসঙ্কোচে আমার সব কথা খুলে বলতে পারি। আমার সফলতায়, ব্যর্থতায়, সবলতায়, দুর্বলতায়, বিপ্লুতায়, সংকল্পতায় যার অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারি।
এখন সে-স্রষ্টা কোথায়? আকাশে, বাতাসে, সমুদ্রে, পাহাড়ে, সজনে, বিজনে? কোথায়? আমার ভেতর থেকে কোনো যুক্তি নয়- বিশ্বাসই তার উত্তর যোগায়। স্রষ্টা আমার বিশ্বাসে।
প্রশু তুলেছিলাম, স্রস্টা কি প্রশংসা আর প্রার্থনার ঘুষ ছাড়া তার সৃষ্টির দায়-দায়িত্ব বহন করেন না?
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্ট্রান-মুসলিম ধর্মজীবীদের মতে, করেন না। স্রষ্টা তার সৃষ্টি মানুষকে জোড়হস্ত আর নতমস্তক দেখতে চান নিয়মিত। তার ব্যত্যয় ঘটতে পারবে না, ঘটলে অপরাধ। এ-অপরাধের শাস্তি পরকালে, অপার্থিব লোকে। আর অপরাধ না হলে পুরস্কার। সেটাও এখন নয় পরে, মৃত্যুর পরে। ব্যস, এতেই স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ক নির্ণীত হয়ে গেল? একদম সরল সমীকরণ: মানুষ + (জোড়হস্ত + নতমস্তক)= ঈশ্বর-সন্তুষ্টি এবং মানুষ-(জোড়হস্ত + নতমস্তক)= ঈশ্বর-অসন্তুষ্টি। কিন্তু আমার বিশ্বাস অত মোটা আর সহজ সমাধান পেতে আগ্রহী নয়।
আমার বিশ্বাস আমার স্রষ্টা। আমি নির্মিত নই, সৃষ্ট। আমার নির্মাতা নেই, আমার স্রষ্টা আছেন। নির্মাণ পরিকল্পিত, সূত্রাবলম্বী; সৃষ্টিও পরিকল্পিত, তবে স্রেফ সূত্রাশ্রয়ী নয়। নির্মাণ সাদামাটা, সৃষ্টি রহস্যাবৃত। এ-রহস্য অপরিসীম। এ-রহস্যময়তা স্রষ্টাকে ছেড়ে সৃষ্টিতেও পরিব্যাপ্ত। রহস্যময়তা নেই বলেই নির্মিত নির্মাতাকে উদ্ঘাটন করতে পারে না, কিন্তু যা সৃষ্ট, তা স্রষ্টাকেও সম্মান করে; তার প্রভাবে স্রষ্টাও প্রভাবিত হন।
নির্মাতা দৃশ্যমান, স্রষ্টাও কি দৃশ্যমান? রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’- তখন রবীন্দ্রনাথকে দেখতে আমাদের অসুবিধে হয় না। কারণ তখন তিনি শুধুই রবীন্দ্রনাথ। ছোট নদীতে তখন তিনি আমাদের মতই কেবল বৈশাখ মাসে হাঁটুজল দেখেন এবং তার খবর শুনিয়ে দেন সবাইকে। কিন্তু এ চেনা রবীন্দ্রনাথ তখনই অচেনা অদৃশ্য হয়ে যান, যখন তিনি বলেন, ‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি।’ কারণ মেঘ আমরাও দেখি, মেঘের কোলে রোদও আমরা দেখি- কিন্তু সে রোদ যে আবার হাসে, তা আমরা দেখি না। কিন্তু সে হাসিটাই রহস্যময়তা এবং সে- রহস্যময়তাকে ধারণ করেই ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ, ছোট নদীর বৈশাখ মাসের অবস্থার খবরপ্রদানকারী রবীন্দ্রনাথ কবি হয়ে ওঠেন।
এখন কবির সাথে কবিতার সম্পর্ক কী? কবি কখন লেখেন কবিতা আর কখন তিনি পদ্যকার? কবি তার লেখা পদ্য বোঝেন, কিন্তু কবি কি বোঝেন তার লেখা কবিতা? একটা কবিতা লিখে কবি যখন তার পাঠক হন, তখন তার জন্যেও অপেক্ষা করে আবিস্কারের আনন্দ। যে-উপলব্ধিতে তিনি কবিতা লিখেছেন, লেখা হয়ে যাবার পর কবিতা তার সে- উপলব্ধিকে ভিন্নতর উপলব্ধির দিকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই তো বনলতা সেন জীবনানন্দের মানসচেতনায় কখনো সুচেতনা, কখনো সুরঞ্জনা- এবং বনলতা সেনের আত্মা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে অরুণিমা সান্যাল হয়, শেফালিকা বোসের শরীরে প্রবিদ্ধ হয়। সোজা কথায়, কোনো মহৎ শিল্পীর কাছে তার সৃষ্টি একক সূত্রে আবদ্ধ থাকে না পদ্যের মত, গল্পের মত; কালিক-স্তানিক ব্যবধানে ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন সূত্রে উপলব্ধ হয়। এবং বলাই বাহুল্য, এতেই কবি এবং কবিতার মহত্ব।
আমি যদি আমার স্রষ্টাকে মহৎ কবি আর আমাকে ধরে নিই মহৎ কবিতা হিসেবে, তখনই আমার প্রার্থনা আর শ্লোকাবৃত্তি অর্থবহ এবং প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে কবিতার বাহ্যিক কারুকাজ হিসেবে। তখন যদি স্রষ্টা আমাকে প্রশ্ন করেন, বলো, তোমার প্রভূর কোন দানকে তুমি অস্বীকার করবে, হে মানুষ? আমি তার উত্তরে বলবো, একটি দানকে কোনো মতেই আমি অস্বীকার করি না। সেটা হলো আমার হৃদয়। কারণ, আমার হৃদয়কে তুমি সৌন্দর্য ধারণ করার শক্তি দিয়েছো এবং সৌন্দর্যই সততা। এবং সৌন্দর্য কি অবশ্যই বিমূর্ত নয়? আমার বিশ্বাস তাই।