মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৪৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

মুহররম মাস ও হিজরী ক্যালেন্ডারঃ

পথিক রাসেল

মুহররম মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্যঃ
মুহররম মাস, হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস। এ’বছর মুহররম মাসের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে হিজরী ১৪৩২ সাল।
ইংরেজী বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতো হিজরী ক্যালেন্ডারেও বারটি (১২) মাস রয়েছে। আল্লাহ পাক এই বার মাসের মধ্যে চারটি (৪) মাসকে আলাদা করে নিয়েছেন, ‘পবিত্র’ বা ‘নিষিদ্ধ’ হিসেবে। এই সব মাসে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধ শুরু করা নিষেধ, যদিও কেউ মুসলমানদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে তা প্রতিহত করার পূর্ণ অধিকারই নয়, বরং দায়িত্বও রয়েছে। চারটি নিষিদ্ধ মাস সম্পর্কে আল্লাহ পাক পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ করেন এভাবেঃ

إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْراً فِي كِتَـبِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَوَت وَالاٌّرْضَ مِنْهَآ أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلاَ تَظْلِمُواْ فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ

“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।...” (সূরা আল-তাওবাহঃ ৩৬)

বিখ্যাত তাফসীর ইবনে কাসীরে ইমাম বুখারী ও মুসলিম এর সূত্র ধরে সাহাবী আবু বকর (রাদিঃ) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষনে তাঁর খোৎবায় চারটি নিষিদ্ধ মাসের উল্লেখ করেনঃ

السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا مِنْهَا أَرْبَعُةٌ حُرُمٌ، ثَلَاثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو الْقَعْدَةِ وَذُو الْحِجَّةِ وَالْمُحَرَّمُ وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَان

“বছরের বারটি মাস আছে, যার মধ্যে চারটি ‘নিষিদ্ধ’; এর মধ্যে তিনটি ধারাবাহিক (বা ক্রমানুসারে থাকে)ঃ জ্বিল-ক্বা’দাহ, জ্বিল-হিজ্বাহ, মুহাররাম, এবং (অন্যটি) রজব, যা মুদার (গোত্র পালন করে থাকে, যা) জুমাদা (আখির) এবং শা’বান মাসের মধ্যবর্তী মাস”। [ভাবানুবাদ]
এখন মুহাররম মাসের কথায় আসা যাক। ‘মুহাররাম’ (পবিত্র, বা নিষিদ্ধ) নামে এই মাসকে অভিহিত করার কারন হলো, এই মাসে কোন প্রকার যুদ্ধ বিগ্রহ শুরু করা নিষিদ্ধ। ঠিক অনুরুপ ভাবে এই মাসে পাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকার জন্যও একে মুহাররাম বলা হয়।

ইসলামপূর্ব জাহেলী যূগ থেকেই এই বারো মাস প্রচলিত ছিলো। কিন্তু একেক গোত্র এই বারো মাসকে একেক নামে চিহ্নিত করতো। যার কারণেই হাদীসে রাসূল (সঃ) রজব মাসকে ‘মুদার’ এর রজব বলেছেন, এবং তা আরো স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য জুমাদাল আখীর ও শা’বান মাসের মধ্যবর্তী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ইসলামপূর্ব জাহেলী যূগেও চারটি মাসকে তারা নিষিদ্ধ হিসেবে ধরতো, যাতে তারা যুদ্ধ করতোনা। অনেক গোত্রই অনেক সময় নিজেদের সুবিধা মত এই চারটি মাস নির্দিষ্ট থাকা সত্বেও অন্য মাসের বদলে তা পালন করতো। যেমন যদি দেখা যায় জ্বিল-হজ্ব মাসে অন্য কোনো গোত্রের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে তাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন জ্বিল-হজ্বের বদলে রমজান বা অন্য কোনো মাসকে নিষিদ্ধ হিসেবে পালন করতো। এই মাসকে ‘মুহাররাম’ নামে চিহ্নিত করার অন্য একটি উদ্দেশ্য হলো যাতে তা জাহিলী যূগের মতো রদবদল না করে সবসময়ই ‘নিষিদ্ধ’ মাসগুলুর মধ্যেই গননা করা হয়। (তাফসীর ইবনে কাসীর)

অনেক মুফাসসিরীনগণ মনে করেন, আল্লাহ’র বানী “সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না” (সূরা আত-তাওবাহঃ ৩৬) দ্বারা মুসলমানদের প্রতি এই (নিষিদ্ধ চারটি) মাসগুলোতে শুধু যুদ্ধই নই, যেভাবে আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো, বরং পাপ কাজ করা থেকেও বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। হজরত আলী বিন আবি তালহা ইবনে আব্বাস (রাদিঃ) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ পাক চারটি মাসকে আলাদা করে বেছে নিয়েছেন, যার মর্যাদা আল্লাহ’র কাছে অনেক উপরে। স্বভাবতঃই এই মাসগুলোতে পাপ কাজ করলে যেমন অন্য মাসের তুলনায় গুনাহ বেশি হবে, পূন্য কাজের জন্যও তুলনামূলকভাবে বেশি সাওয়াব হবে।

হজরত ক্বাতাদাহও অনুরুপভাবে বর্ণনা করেন, এই (নিষিদ্ধ চারটি) মাসে কোন ধরণের যুলুম করা, পাপ কাজ করা অন্য যে কোনো মাসে কোনো কবীরা গুনাহ করার চেয়েও বেশি মারাত্মক। (তাফসীর ইবনে কাসীর)

হিজরী ক্যালেন্ডারের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যঃ
হিজরী ক্যালেন্ডার অন্য যে কোনো ক্যালেন্ডারের মতো নই, বরং তা থেকে অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্ট। খুবই সংক্ষেপে তা নিচে তুলে ধরা হলোঃ
1. হিজরী ক্যালেন্ডার কোনো মানুষের জন্ম বা মৃত্যুকে উপলক্ষ করে শুরু হয়নি। বরং তার শুরু হয়েছে নবীজী ও মুসলমানদের নিজের প্রিয় মাতৃভূমীর মায়া ত্যাগ করার মতো ত্যাগ ও তিতীক্ষার চরম পরাকাষ্ঠা দেখানোর মধ্য দিয়ে। তাই হিজরী ক্যালেন্ডারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তা আমাদেরকে ত্যাগ ও তিতীক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় বার বার, কোন মানুষের জন্ম মৃত্যু নয়।

2. ইসলামী ক্যালেন্ডার বা হিজরী ক্যালেন্ডারের শুরু যেমন ত্যাগ তিতীক্ষার মাধ্যমে, ঠিক তেমনি শেষও হয় (হজ্বের) ত্যাগ তিতীক্ষার মাধ্যমে। যেন বার বার আমাদেরকে আমাদের উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে!

3. হিজরী ক্যালেন্ডারের গণনা নির্ভর করে চাঁদের আবর্তন বিবর্তনের উপর। চাঁদের আবর্তন ও বিবর্তনে সদা সচেতনতা ও গূঢ় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। নিছক সূর্যের মতো উদিত হওয়া ও অস্ত যাওয়ার মধ্যেই চাঁদ সীমিত নয়। শুধু তাই নয়, চাঁদের উপরেই নির্ভর করে পৃথিবীর অনেক প্রাকৃতিক গতি বিধি, যেমন সাগরের জোয়ার ভাটা। মানুষ, পশুপাখি, উদ্ভিদরাজী ইত্যাদি অনেক কিছুই লুনার সাইকেলে অবর্তিত হয়ে থাকে।

4. হিজরী ক্যালেন্ডার চন্দ্রবর্ষ নির্ভর হওয়ায় এই ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন মাস সৌর ক্যালেন্ডারের বিভিন্ন মাসের সাথে যুগ যুগ পরে একই সময়ে এসে মিলিত হয়। অর্থাৎ হিজরী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোজার মাস সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোনো মাসে হয়ে থাকে না। যার কারণে আমাদেরকে সৌর বর্ষের বিভিন্ন মাসে ও বিভিন্ন ঋতুতে একই রোজা পালন করতে হয়। এটাই প্রমাণ করে যে মুসলমানদেরকে সকল মাসের সকল ঋতুর সকল উৎসবকে সাদরে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে। ঈদ কেবল শীতেই নয়, গরমেও ঈদের উৎসবের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।

5. হিজরী ক্যালেন্ডার এর শুরু হয় ওমর (রাঃ) এর শাসনকাল থেকে। কিন্তু হিজরী ক্যালেন্ডারের মাসগুলো আরবদের কাছে আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। এ থেকে বুঝা যায়, ইসলাম কোনো গদবাঁধা নিয়মের সমষ্টি নয়। ইসলাম ধর্ম যেমন গতিশীল, তেমন প্রগতিশীল। ওমর (রাঃ) এর ইজতিহাদের ফসল হিসেবেই এই ক্যালেন্ডারের আবির্ভাব, যার মাধ্যমে নতুনত্বকে স্বাগত জানানো হয়েছে। আরেকটা বিষয় স্পষ্ট হয়, ইসলামের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয় এমন যে কোনো কিছুই ইসলামের সৌন্দর্য দিয়ে আবৃত করে ইসলাম তাকে গ্রহণ করে। যেমন আরব জাহেলিয়াতের মাসগুলোকেই ইসলামী ক্যালেন্ডারে সংযুক্ত করা হয়েছে। বরং এই মাসগুলোকে আরো পুর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েই এই ক্যালেন্ডারের সূচনা।
চলুন সবাই মিলে এই নতুন হিজরী সনে আমরা আরো ত্যাগ ও তিতীক্ষার শিক্ষা বাস্তবায়ন করি আমাদের জীবনে! সবার জন্য হিজরী শুভেচ্ছা!!
http://www.sonarbangladesh.com/articles/PothikRasel
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
গাজীপুর সদর, গাজীপুর। থেকে এস,এম, মোকাররম হুসাইন তুহিন লিখেছেন, ১৭ ডিসেম্বর ২০১০; সকাল ১০:৫৬
লেখাটি আমার পছন্দ হয়েছে। যেহেতু হিজরী সনের ইতিহাস ঘাটলে ত্যাগ ও তিতীক্ষার বিষয় জানা যায়, আর ত্যাগের চেয়ে মহৎ গুন অন্য কিছু হতে পারে না , সুতরাং আমরা যদি এই ত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তাহলে ইহাই আমাদের জীবনে সুখ সমৃদ্বি বয়ে নিয়ে আসবে
43442
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy