|
নারী-নর নিগ্রহ-নির্যাতন: মানব সৃষ্ট মহামারী নির্মূল হোক নৈতিকতায়
প্রফেসর ড. এম. সাজেদুল করিম |
|
একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবী নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি,বিপর্যয়ের সাথে লড়াই করে অগ্রসর হচ্ছে। অজানা নতুন কিংবা পুরাতন রোগ, মহামারী প্রতিরোধ আজ এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ এবং সর্বদা উদ্বিগ্ন,উৎকন্ঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভীত,সন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্য দিয়েই মানব সভ্যতাকে টিকে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হচ্ছে। আশার কথা,বিশ্বে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি হয়েছে, গুণী চিকিৎসকের সংখ্যাও যথেষ্ট বেড়েছে,অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিও আবিস্কৃত হয়েছে এবং আগামীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের আরোও সমৃদ্ধ হবার উজ্জল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফলে, বিত্তশালীদের নিজ দেশের কিংবা উন্নত দেশের ব্যায়বহুল চিকিৎসা নিয়ে পূর্ণ সুস্থ হওয়ার কিংবা বেশ কিছুদিন সুস্থ হয়ে বেচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনুন্নত,উন্নয়নশীল সকল রাষ্ট্রের দরিদ্র জনগণ অন্ন্নোপায় হয়ে এখনও নিয়তি নির্ভরশীল। আমাদের দেশে গরীব,নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে রয়েছে আধুনিক উন্নত চিকিৎসা। আর অর্ধ খেয়ে,না খেয়ে রাত কাটিয়ে সকালবেলা উঠে দুবেলা খাবার যোগানোর দু:শ্চিন্তা নিয়ে যাদের নিত্য ঘর থেকে বের হতে হয়,তাদের রোগ ব্যাধিতে উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞান বর্তমানে নির্বাক,উপরওয়ালা একমাত্র ভরসা। কবে সার্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি হবে,সহায় সম্বলহীন ভুখা-নাঙ্গাদের ছোট খাটো অসুখের চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিৎ হবে,অবেলা/ অকালে বিনা চিকিৎসায় কেউ মরবে না। এমন অপূর্ব মুহূর্তের অপেক্ষায় আরও কতকাল প্রহর গুনতে হবে জানা নেই।
আমাদের প্রিয় দেশ নানা চরিত্রের আগ্রাসীদের কোপ দৃষ্টিতে পড়েছে। অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক আগ্রাসনের সাথে যুক্ত হয়েছে বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন,তথ্যপ্রযুক্তির আগ্রাসন। ইত:মধ্যে অনুন্নত,উন্নয়নশীল সকল দেশে উন্নত দেশ গুলির মিশ্র ও দিগম্বর সংস্কৃতির যথেষ্ট আমদানী হয়েছে এবং যার প্রভাব,কার্যকারীতা সর্বত্রই একই ধরনের। সারম্বরে বলা যায় মুক্তবাজার অর্থনীতির চেয়ে আমাদের দেশ অনেক বেশি উন্মুক্ত এবং উদার তথ্য প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির বেলায়। বর্তমানে সেল ফোনের গণব্যবহার থেকে বিন্দুতুল্য অনুমান করা যায়না যে এখনও এ দেশ অতি গরীব,শিক্ষার হার উল্লেখ করার মত হয়নি। তেমনিভাবে,বিদেশী শিল্পীদের এনে আয়োজিত বাণিজ্য কনসার্ট এবং সেসব কনসার্টে হাজার হাজার টাকার টিকিট সংগ্রহে সংগীত পিয়াসুদের উপচে পড়া ভীড় একই অবস্থা প্রদর্শন করে এবং তা দেখে বোঝার কোন উপায় নেই এদেশে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি কখনও ছিল বা এখনও আছে। স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং সেসব চ্যানেলের অনুষ্ঠানাদি,ফ্যাশান,নিষিদ্ধ মাদকের ব্যাবহার,এ রকম অনেক কিছু থেকে সহজে প্রতীয়মান হয় স্মার্ট,সভ্য,অগ্রগামী হওয়ার দোহাই দিয়ে আমাদের জাতীয় রুচির কতটা পরিবর্তন হয়েছে এবং কতখানি নিজস্বতা হারিয়েছি। যুগের সাথে তাল মেলানোর বাহানায়,সময়োপযোগী করার কামনায় নিজেদেরটুকু বিসর্জনে কিংবা পরিহার করায় অভ্যস্ত হয়ে পরছি আমরা। নিজস্ব সাহিত্য, সংস্কৃতি,কৃষ্টি রক্ষা করার মানষিকতা তীক্ষ ও জোড়ালো না হলে বলিষ্ঠ জাতীয় চেতনা আশা করা যায়না এমন বোধ শক্তিও আজ দুর্বল।
আমাদের সমাজ প্রচলিত রীতি নীতি,ধর্মীয় অনুশাসন বেষ্টিত এক শৃঙ্খল সামাজিক ব্যবস্থা এবং যার সুবাদে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির,পারস্পরিক সৌহার্দ্য-শ্রদ্ধাপূর্ণ জাতি হিসাবে বিশ্বব্যাপী আমাদের পরিচিতি ছিল বা এখনও কিছুটা আছে। আতিথিপরায়নতা,নির্মল-নির্ভেজাল সহানুভূতি এখনও যতটুকু এ সমাজে আছে তাঁ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। স্থিতিশীল সামাজিক ব্যবস্থার কারণেই, আইন কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার স্পর্শ ছাড়াই সাধারণ মানুষের মধ্যে হানাহানী, মারামারী,খুনা খুনী,রেষা রেষি অনেক অনেক কম হতো বা হয়ে থাকে। আদর্শিক এবং গোষ্ঠী চেতনায় হীন স্বার্থ চরিতার্থের নিমিত্তে সংঘঠিত অনাকাংখিত ঘটনা ছাড়া অমানবীয় ও বর্বর ঘটনা নেই বললে চলে। এদেশের সাধারন মানুষ (গুটি কয়েক স্বার্থান্ধ ব্যতিত) চারিত্রিক ও মানসিক ভাবে সৎ এবং নির্লোভ বলেই অদ্যাবধী দাঙ্গা, লুটতরাজ,শ্রেণী দ্বন্দ্ব থেকে সমাজ নিরাপদে আছে। দুর্নীতিতে বার বার চ্যাম্পিয়ান হলেও এ দেশের শতকরা ৯৯ ভাগেরও বেশি মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত নন। তবে তাঁরা গুটি কয়েকের দুর্নীতিতে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং অধিকার বঞ্চিত। আধুনিকতার লেবাছে নির্বিঘেœ অনুপ্রবেশকারী ভীনদেশীয় অপসংস্কৃতি বরণ করে নেয়ায়, কলিযুগের হালচাল গণ্য করে তাতে শতভাগ অনুশীলনকারী/ অভ্যস্থ হওয়ায় আজ দেশে ভয়াবহ শান্তি বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। যা প্রাকৃতিক ও জলবায়ু বিপর্যয়ের চেয়েও মারাত্বক অসভ্য-বিভিষিকাময়,শান্তি শূন্য সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার। এরই মধ্যে আমাদের দেশ এক অসহনীয় পরিস্থিতির মুখামুখি হয়েছে, ভীনদেশীয় সামাজিক চিত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে আমাদের সমাজ চিত্র। নারী-নর নিগ্রহ,নির্যাতন অন্যান্য সকল (অনুন্নত, উন্নয়নশীল, উন্নত) দেশের মত আমাদের দেশেও মানব সৃষ্ট মহামারীর মত বিস্তৃত হয়েছে।
সম্প্রতি আমেরিকা, বৃটেন, কানাডা, জাতিসংঘ, আইসিডিআরবি (বাংলাদেশ) কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা রিপোর্ট সমূহ পর্যালোচনা করলে দেশের বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যৎ চিত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ইত:মধ্যে জাতিসংঘ পারিবারিক নির্যাতন, নারী-পুরুষ কলহ, ধর্ষণকে নীরব মহামারী হিসাবে চিহ্নিত করে তাঁর ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। প্রকাশিত আন্তর্জাতিক,জাতীয় গবেষণা ফলাফলের (তথ্যের) ছক-১, ২, ৩ থেকে অনুমিত ভয়াবহ পরিস্থিতির ধারণা পাওয়া যাবে।
ছক-১: নিগ্রহ, নির্যাতন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তথ্য
নির্যাতনের ধরন নির্যাতনের স্বীকার তথ্য সুত্র
বর্তমান বা প্রক্তন সঙ্গী দ্বারা শারিরিক নির্যাতন ২৬.২%
নারী
১
পারিবারিক নির্যাতনের স্বীকার ২৫% নারী ২
স্বামী/ সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা হত্যা ৩০% নারী ৩
স্বামী/ সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা শারিরিক নির্যাতন ৩৩% নারী ৪
স্বামী/ সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা হুমকি প্রদান ৪০% নারী ৪
স্বামী/ সঙ্গী (প্রাক্তন) দ্বারা পুণ: পুণ: শারিরিক নির্যাতন ৬৪% নারী ৫
স্বামী/ সঙ্গী (প্রাক্তন) দ্বারা শারিরিক নির্যাতন ৫০% তালাক প্রাপ্ত নারী ৫
স্বামী/ সঙ্গী (বর্তমান) দ্বারা নির্যাতন ১১% নারী ৫
স্বামী/ সঙ্গী (বর্তমান) দ্বারা জোর পূর্বক যৌন নিপীড়ন ৩-৪% নারী ৫
স্বামী/ সঙ্গী (প্রাক্তন) দ্বারা জোর পূর্বক যৌন নিপীড়ন ১৬% নারী ৫
ছক-২: যৌন নির্যাতন, বলাতকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক তথ্য
প্রতি ৩ জনে ১ জন নারী কোন না কোন ভাবে বলাতকার হয় এবং যার মধ্যে
তথ্য সুত্র
৬০% নারী একাধিকবার বলাতকার হয়
২
৮১% বলাতকার হয় পরিচিত দ্বারা
৩৩% জোর পূর্বক যৌনাচারের স্বীকার
৪৯% অপ্রাপ্ত বয়সের বা কিশোরী মেয়ে জোর পূর্বক যৌনাচারের শিকার ৪
২৫% নারী অপরিচিত দ্বারা যৌন নির্যাতনের স্বীকার ৫
ছক-৩: যুক্ত রাজ্যে পারিবারিক নির্যাতন কলহে হত্যাচিত্র (তথ্যঃ Flood-Page & Taylor (2003)
সাল স্বামী/সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা নারী হত্যা স্ত্রী/সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা নর হত্যা
১৯৮৭ মোট নারী হত্যার ৩৪% মোট নর হত্যার ৮%
১৯৯২ মোট নারী হত্যার ৪৫% মোট নর হত্যার ৯%
১৯৯৭ মোট নারী হত্যার ৪৬% মোট নর হত্যার ৮%
২০০২ মোট নারী হত্যার ৪৬% মোট নর হত্যার ৫%
সম্প্রতি,আইসিডিডিআরবি এবং জাতিসংঘ তাদের সার্ভে রিপোর্টে বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতন, নিগ্রহের চিত্র তুলে ধরে শংকা প্রকাশ করেছে। পৃথিবী জুড়ে ১৩০০০ ধরনের পারিবারিক নির্যাতন, নিগ্রহ চিহ্নিত হয়েছে এবং তাঁর মধ্যে মাত্র কয়েক ধরনের নিগ্রহ,নির্যাতন আমাদের দেশে চিহ্নিত হলেও নিগৃহিতের, নির্যাতিতের সংখ্যা কোন দেশের চেয়ে কম নয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য চিত্র থেকে ঐসব সার্ভে রিপোর্টের যথার্থতা পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে নারী-নর নির্যাতন, নিগ্রহের অপরিবর্তনীয় প্রবৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেলেও কোন কোন ক্ষেত্রে আবার তা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সে সব ক্ষেত্রের মধ্যে রেপ এবং পরবর্তীতে গণরেপ বা হত্যা, পারিবারিক নির্যাতনে সেপারেশন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় বলাৎকার, জোরপূর্বক যৌনাচার, শারিরিক ও মানসিক নির্যাতন ক্রমশ: বেড়েছে এবং অতি সামান্য কমেছে সঙ্গী (বর্তমান,প্রাক্তন) দ্বারা নারী হত্যা, যেমন ১৯৭৬-২০০০ ব্যপি এধরনের হত্যা ৩৪.৯% -৩৩.৫% দেখানো হয়েছে। একই রিপোর্টে ১৯৯০ ও তৎপরবর্তীতে সঙ্গী (বর্তমান, প্রাক্তন) দ্বারা নরহত্যার স্থিতি হার ৪% দেখানো হয়েছে। একই চিত্র পাওয়া যায় কানাডা,ইউকে,অস্ট্রেলিয়া সহ সকল উন্নত দেশে। নির্যাতন, নিগ্রহের হার বৃদ্ধি কিংবা নারী-নর হত্যার স্থিতিহার গবেষকদেরকে অনেক বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা এ ধরনের অপরাধ বাড়লে সমাজের দু:শ্চিন্তা যেমন বাড়ে তেমনই অপরাধের স্থিতিহার সমাজের আতংক বাড়িয়ে দেয়। আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে অপরাধ হার স্থিতিতে থাকলে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং নতুন পদ্ধতি,কলা কৌশল উদ্ভাবন করে তা প্রয়োগ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ফলে, আনুষঙ্গিক ব্যয় বৃদ্ধি পায় অনেক গুণে। সবচেয়ে বড় কথা নারী ও নরের পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, হ্রাস পায় বলে গোপনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অনেক বেড়ে যায়,পারিবারিক বন্ধন দুর্বল এবং সমাজ বিশৃংখল হয়। আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান (Domestic violence statistics 2010, search) ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং তা থেকে সারাবিশ্বে মানবসৃষ্ট এ মহামারীর একই ধরনের ভয়ংকর অবস্থা লক্ষ করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে এই মহামারীর প্রোকোপে নির্ধারিত এবং ব্যয়িত অর্থের ছক-৪ থেকে একটি পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাবে এবং যা অন্যান্য (উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত) দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থা বুঝতে ও করণীয় নির্ধারণের সঠিক ধারণা পেতে সাহায্য করবে। ঐ ছক থেকে এই মহামারী প্রতিরোধে দেশগুলির আর্থিক সামর্থ সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। অতি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে ভারতে প্রতি ৩ জন মহিলার মধ্যে ২ জন কোন না কোন ভাবে নির্যাতন, নিগ্রহের শিকার এবং এ হার পৃথিবীর যে কোন দেশের তুলনায় বেশি বৈ কম নয়। যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতন বৃদ্ধির হার দেখে বিষ্মিত ভারত ও জাতিসংঘ। বিশেষজ্ঞ মহল ইত:মধ্যে প্রকাশিত নির্যাতন, নিগ্রহ তথ্য পর্যবেক্ষণ পূর্বক সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষনসহ নানাবিধ সুপারিশ বাস্তবায়নের উপর গুরত্বারোপ করেছেন (Source: www.expressindia.com)। মোট কথা, গরীব, ধনী সব দেশেই আতংক বিরাজমান এবং নানাবিধ জাতীয় সমষ্যার মধ্যে এটি বড় সমস্যা।
ছক-৪: পারিবারিক ও যৌন নির্যাতন-নিগ্রহে ব্যায়িত অর্থ (Source: UNIFEM (2003)
দেশ অথবা অঞ্চল মোট আর্থিক ব্যায় (ডলার) বছর
সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলীয়া ১০০০ মিলিয়ন ১৯৯১
কানাডা ২৮০০ মিলিয়ন ১৯৯৫
ফিনল্যান্ড ৫৪ মিলিয়ন ১৯৯৮
নেদারল্যান্ড ৮০ মিলিয়ন ১৯৯৭
নিউজিল্যান্ড ৬২৫ মিলিয়ন ১৯৯৪
সুইজারল্যানড ২৯০ মিলিয়ন ১৯৯৮
আমেরিকা ৫৮০০ মিলিয়ন ২০০৩
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে পারিবারিক নির্যাতন, নিগ্রহের বৃদ্ধির হার অনুযায়ী বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বলে গবেষণা ফলাফলে দেখান হয়েছে (Source: www,allacademic.com/meta/p-nla-apa-recerch)। আইসিডিডিআরবি অনুরূপ স্থান নির্ধারণী মন্তব্য না করলেও নির্যাতন, নিগ্রহের সার্বিক ব্যাপকতা উল্লেখ করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র- পত্রিকায় লেখা ও অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে নির্যাতনের পাশবিকতা নিয়ে যা বিবেচনায় নেয়া অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায়, নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করবে এবং এক পর্যায়ে তাঁর ব্যাপকতা আমাদের সাধ্যের সকল সীমা ছাড়িয়ে যাবে, মৃত্যু ঘটবে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির, সর্বত্র জন্ম নেবে বিশৃঙ্খলার।
ছক-৫: বলাৎকার, গণবলাৎকার / হত্যা(Source: www.sonarbangladesh.com/print.php?id=1376)
জানুয়ারী- জুন, ২০০৯ (মাত্র ৬ মাসে)
ধর্ষণের স্বীকার ধর্ণণের পর গণ ধর্ষণ ধর্ষণের পর হত্যা
১৫৮ জন নারী ১৫৮ জনের মধ্যে ৬৮ জন ১৫৮ জনের মধ্যে ৫০ জন
১৮০ জন কিশোরী ১৮০ জনের মধ্যে ৫১ জন কিশেরী ১৮০ জনের মধ্যে ২২ জন কিশেরী
ছক-৬: ধর্ষণ ও তৎপরবর্তী লোমহর্ষক বর্বরোচিত কয়েকটি ঘটনা যা পত্রিকায় সন্ধাণী রিপোর্ট হিসাবে প্রকাশিত(হত্যা (Source: www.sonarbangladesh.com/print.php?id=1376)
ঘটনাকাল: সেপ্টেম্বর, ২০০৯ (মাত্র ১ মাসে)
ধর্ষণের স্বীকার ঘটনা স্থল ধর্ষণের পর যা করা হয়েছে
১১ বছরের কিশোরী ভিক্ষুক ৫ জন দ্বারা গণ ধর্ষণ সদর ঘাট ধর্ষণের পর অজ্ঞান অবস্থায় নির্জনে ফেলে রাখা
১ কিশোরী ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্রী অপহরণ ও পরে ধর্ষণ ধোবাউরা উপজেলা ময়মনসিংহ ধর্ষণের পর হত্যা করে মাটিতে পুতে রাখা
১ কিশোরী , স্পিনিং মিলের শ্রমিক বাড়িতে ফেরার পথে আটক ও পরে গণ ধর্ষণ পূর্বধলা উপজেলা, নেত্রকোনা গুরুতর অবস্থায় নির্মাণাধীন বাড়ীর ছাদে ফেলে রাখা
১ কিশোরী, স্কুলছাত্রী ধর্ষিত হয় পিরোজপুর ধর্ষক সহযোগীদের দ্বারা ভিডিও করে এবং তা সিডিআকারে বাজারজাত করে
১ কিশোরী ধর্ষিত হয় কেশবপুর, যশোর সহযোগীদের মাধ্যমে মোবাইলের ভিডিওতে ধর্ষণের চিত্রগ্রহণ করা হয়
১ কিশোরী, ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী গণধর্ষিত হয় কেশবপুর, যশোর মোবাইলের ভিডিওতে ধর্ষণের চিত্রগ্রহণ করা হয় এবং পরে সিডি আকারে বাজারে ছাড়া হয়
মানবাধিকার সংগঠন “অধিকার” তাঁর গবেষণা রিপোর্টে বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, যা দেখে শিহরিত হতে হয়। “অধিকার” এর সমর্থক ছক ৫ ও ৬ দ্বারা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, আমাদের দেশ পাশবিক নারী নিগ্রহ, নির্যাতনের মহামারীতে অনেক বেশি আক্রান্ত এবং যা কল্পনাতীত নির্মম বাস্তবতা। নির্ভরযোগ্য সকল প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় যৌতুক সংক্রান্ত পারিবারিক নির্যাতন-নিগ্রহের ব্যাপকতা ফুটে উঠেছে। গর্ভকালীন শারিরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন-নিগ্রহ বছর বছর বেড়ে চলেছে এবং এ কারণে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার বেড়ে গিয়েছে বলেও ঐসব গবেষণা ফলাফলে দেখানো হয়েছে। নির্যাতন-নিগ্রহের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছে এই অপরাধের সাথে বর্বর এসিড সন্ত্রাশ ও নারী-কিশোরী পাচারের সংযোজন হওয়ায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী আমাদের দেশে এসিড সন্ত্রাস অনেক বেড়েছে এবং এর ভিকটিম কেবলমাত্র নিরাপরাধ তরুণীরা। এ ছাড়াও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র দিনে দিনে সংগঠিত পন্থায় অধিক হারে নারী ও কিশোরী পাচার করছে এবং তাঁদেরকে অশ্লিল কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে। মানবতা ও পৌরষের রুপান্তর হচ্ছে বর্বর পশুত্বে।
বিশ্বের গুণী ও প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানী, গবেষকদের মতে দিনে দিনে নারীরা আবাসস্থলে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন এবং কর্মক্ষেত্রেও নানা ভাবে নিগ্রহ, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অন্যদিকে প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফলে দেখানো হয়েছে যে, নারীরাও তাদের দূর্বলতার ঘাটতি পূরণে আগ্নেয়াস্ত্র, চাকু, ছুরি, গরমপানি ইত্যাদি ব্যবহার করায় নর নির্যাতন ও হত্যা বেড়ে গিয়েছে। ইত:মধ্যে উন্নত অনেক দেশেই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে (Sourse:- internet: domestic violence against men, domestic violence report of the Dept. of Justice, USA)|
নিগ্রহ, নির্যাতনের শিকার নারী, নর দ্বারা শিশু হত্যাও সংঘঠিত হয় অনেক বেশি। এ বিষয়ে আমেরিকার জাষ্টিস ডিপার্টমেন্টের গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায় মোট শিশু হত্যার ৫৫% হত্যা হয়ে থাকে নির্যাতিত মা, বাবা দ্বারা (Source: A 1994 issue of the Justice Quarterly, Department of Justice, Bureau of Justice statistics publication catalog # NCJ 43498)|
বর্ণিত প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফল থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সারা বিশ্বব্যপি নির্যাতন, নিগ্রহের নীরব মহামারী নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ প্রকাশ এবং তা থেকে মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার আহবানে সাড়া দেয়া প্রতিটি মানব-মানবীর জন্য অত্যন্ত জরুরী ।
উপরোক্ত তথ্য সমূহ সামনে নিয়ে আসার কারণ একটিই আর তা হলো এই ভয়ংকর মহামারী মানবসৃষ্ট এবং তা থেকে পরিত্রাণ লাভ করা একান্তই বিশ্বমানবতার সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। আজ আমাদের সবাইকে গভীরভাবে ভাবতে হবে এই মানবতাবিনাশী মহামারীর উৎপত্তির উৎসস্থল এবং তার ব্যাপক বিস্তৃতির উপযোগী বিষয়সমূহকে নিয়ে। আমাদের দেশ তো বটেই সারা বিশ্বের মা-বাবা, অবিভাবক, জাগ্রত বিবেকের নর-নারী প্রতিটি মূহূর্ত তাদের আদরের পোষ্যদের নিয়ে দু:শ্চিন্তায়, দূর্ভাবনায় কালাতিপাত করছেন। পাশাপাশি সমাজ বিজ্ঞানী, সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সুশীলসমাজ নারী-নর নিগ্রহ, নির্যাতন ও তার নানামুখী কুপ্রভাব থেকে সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বকে বাচানোর নিরলস চেষ্টা করছেন। প্রণীত হয়েছে উপযোগী নতুন আইন, গঠিত হয়েছে অসংখ্য সংগঠন, তৈরী হয়েছে লাখে লাখে সেচ্ছাসেবক, গড়ে উঠেছে (উন্নত দেশ সমুহে) অগণিত আশ্রয়কেন্দ্র/ পরামর্শ কেন্দ্র। একই কারণে প্রত্যেক দেশেই নিয়মিত সভা-সেমিনার ও প্রকাশনাও উল্লেখযোগ্য, ব্যতিব্যস্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইলেট্রনিক মিডিয়া, গবেষণা ও সার্ভে চলমান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও জোরদার থেকে জোড়ালো হচ্ছে। মোটকথা বর্ণিত ব্যধি নিরোধে যা করণীয় বিবেচিত তাই সাধ্যমত করার চেষ্টা হচ্ছে। তারপরেও উন্নত, উন্নয়নশীল, অনুন্নত সকল দেশেই এই মহামারীর প্রকোপ ও ব্যাপকতা ক্রমবর্ধমান। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আক্রান্ত। উদ্বেগ, উতকন্ঠা পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন দূর্বল থেকে অতি দূর্বল করে ফেলছে। আর্থ-সামাজিক তথা রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সর্বত্র ঝুঁকিপুর্ণ হচ্ছে (ছক-৪)।
আমাদের প্রিয় দেশ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়ী। এদেশের প্রতিটি নাগরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির পারিবারিক বন্ধনে বেড়ে উঠে। অতি নগণ্য সংখ্যক স্বার্থান্ধ, বিপথগামী ব্যতিরেকে বিশাল জনগোষ্ঠী (যারা অতি সাধারণ বলে বিবেচিত) অত্যন্ত মহৎ মানবীয় গুণাবলীর অধিকারী। নৈতিকতার দিক বিবেচনায় সেই বৃহত জনগোষ্ঠীর অবস্থান বিশ্বব্যাপি অনেক সম্মানের, পরীক্ষিত সত্য। আর সে কারণেই বহি:র্বিশ্বে ধোকাবাজ, ধান্দাবাজ, ফন্দিবাজ, মতলববাজ অর্থাৎ যাবতীয়বাজ বলতে কেবলমাত্র ঐ নগণ্য সংখ্যার স্বার্থান্ধ, বিপথগামীদেরকে বোঝানো হত বা এখনও বোঝানো হয়। সেই দেশে পারিবারিক নারী-নর নির্যাতন, নিগ্রহ, বলাতকার, পাশবিকতা, হত্যাসহ লিঙ্গবৈষম্য ভিত্তিক যাবতীয় কলহ, বিবাদ ভয়াবহ পরিণতির এক বড় অশনিসংকেত। ইত:মধ্যে দেশে ও প্রবাসে (অশিক্ষিত, শিক্ষিত বাংলাদেশীদের বেলায়) বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে, পারস্পরিক প্রত্যাশা তো দুরের কথা ভরসা করার মানসিকতাও নষ্ট হওয়ার উপক্রম, সমাধানযোগ্য সমস্যাকে অসমাধানযোগ্য করার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার কুপ্রবৃত্তির পূজারী ও সর্মথকদের দ্রুত বংশবৃদ্ধি, অনেকটাই প্রয়োগহীন আমাদের দেশীয় কঠোর আইন, অপরাধ দমনের পক্ষালম্বন না করে অপরাধীর পক্ষে জোটবদ্ধ শক্তিশালী অবস্থান নেয়া ইত্যাদি কারণে আক্রান্ত আমাদের পরিবার, সমাজ তথা দেশ। ছোট একটা দেশ আমাদের অথচ দলীয় বিভেদ, আঞ্চলিক বিভেদ, মতাদর্শের বিভেদ, পেশার বিভেদ, ধনী- দরীদ্রের বিভেদ, আগ্রাসী পরাশক্তির মাউথপিসদের বিভেদসহ অগণিত বিভেদরেখা দ্বারা দীর্ঘদিন যাবত আমাদেরকে বিভক্ত করার অনন্ত চেষ্টা চলছে। তার সাথে বিশেষ এক শ্রেণীর চেষ্টায় সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে লিঙ্গ-বিভেদ এসে সকল বিভেদের রাণী হয়ে বসেছে। সব দেশেই বিভক্তকারীদের সংখ্যা নগণ্য, বক্তব্য শাণিত, সম্পদ-আহরণ লিপ্সা অসীম, উদ্দেশ্য অভিন্ন, একতা দৃঢ়, আরাম-আয়েশ এবং ভোগ-বিলাশ এক প্রকৃতির আর একতরফাভাবে দূর্ভোগের শিকার বিপুল জনগোষ্ঠী। কিন্তু, বর্ণিত মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয় কারোরই। কেবল মাত্র আর্থিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যাবে এই মহা ব্যধির আক্রান্তে যে কোন কম জনসংখ্যার দেশের ব্যয়িত অর্থও যদি আমাদেরকে ব্যয় করতে হয় তাহলে তা হবে আমাদের মোট জাতীয় বাজেটের চেয়ে অনেক অনেক গুণে বেশি। সে জন্যেই আমাদের পরিবার, সমাজ, দেশকে বাচাতে কালবিলম্ব না করে সকলকে একযোগে এই মহামারীর প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ প্রচে®টা চালাতে হবে, আন্তরকি হতে হবে বিশেষজ্ঞ মতামত ও সুপারিশ বাস্তবায়নে। এ জন্যে সুপারিশ সহ কিছু জরুরী করণীয় :
(ক) রাষ্ট্রের অবশ্য করণীয়
১. ইভটিজিং, পর্ণোগ্রাফী, নারী ও শিশু পাচার, এসিড-সন্ত্রাস সংক্রান্ত সকল আইন প্রয়োগ করতে হবে যথাযথ এবং একই সাথে এ ধরনের অপরাধীদের জিরো টলারেন্স নিশ্চিৎ করতে রাষ্ট্রের প্রতিস্তরেই জাগরণ ঘটাতে হবে, প্রত্যেক নাগরিককে মানবতার গর্বিত সৈনিক হিসাবে গড়ে উঠার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
২. নির্যাতন, নিগ্রহকারীর শাস্তি নিরপেক্ষতার সাথে নির্ধারিত, কার্যকর ও প্রদর্শিত হতে হবে এবং এর যে কোন পর্যায়ের বাধাদানকারীকেও শাস্তির আওতায় নিতে হবে। মোটকথা, নির্যাতক বয়কট এবং নির্যাতিতের, নিগ্রহীতের পক্ষালম্বন হতে হবে রাষ্ট্রীয় ভাবেই।
৩. নারী-নর নির্যাতন, নিগ্রহ যে সমস্ত উপাদানের কারণে বেড়ে যায় তা নির্মূলের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এ অপরাধমুক্ত সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য নৈতিকতাসমৃদ্ধ প্রজন্ম তৈরীর কার্যকর, টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. রাষ্ট্রকে লিঙ্গবৈষম্যের উর্দ্ধে উঠে মেনে নিতে হবে যে, কোন আইন কোন পক্ষকে সুবিধা প্রদান করার জন্য সোনালী আইন এবং অন্যপক্ষকে বঞ্চিত করার জন্য কালোআইন হতে পারেন্,া শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণকারী সকল আত্মার মঙ্গলার্থে প্রণয়ন করতে হবে আইন।
৫. পারিবারিক, সামাজিক শান্তি বিনাশের উপযোগী অশ্লীলতাপূর্ণ অপসংস্কৃতি নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সকল পর্যায়ে রুচিশীল সংস্কৃতি চর্চার ও তার পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
(খ) প্রত্যেক নাগরিকের জন্য করণীয়
৬. একপক্ষ রাগী, বেয়াদব, অযৌক্তিক, আবেগহীন, অবাচনিক, অকর্ম, অথর্ব ইত্যাদি এবং অনপক্ষ সব ভাল বিশেষণে বিশেষিত এমন ধারণা সম্পুর্ণ পরিহার করে সকলকে সম্ভাব্য ত্র“টি, বিচ্যুতি শোধরানোর মানসিকতা অর্জন করতে হবে ও পরস্পরের প্রতি হতে হবে আন্তরিক, শ্রদ্ধাশীল, সহানভুতিশীল।
৭. নারী নরের নিকট যেভাবে ট্রিটেড হওয়াকে সম্মানের বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে ঠিক তেমনিভাবে নরকে ট্রিট করতে হবে নারীকেও। আবার, নর যে ভাবে ট্রিটেড হওয়ার জন্য মরিয়া তেমনি ভাবে নারীকে ট্রিট করতে হবে তাঁকেই। এর বিপরীতে নারীবাদ, নরবাদ সহ যাবতীয় ব্যক্তিবাদ পরিহার করতে হবে।
৮. নারীজাতিকে যৎসামান্য জ্ঞান করা, নারী স্বাধীনতা কে খর্ব করে নিজ নিজ সংযম রক্ষা করা, নারীদেরকে রাজপথ থেকে জোরপূর্বক গৃহে প্রবেশ করানো কিংবা নারীশূন্য রাজ্যে নরের প্রস্থান ইত্যাদি পুরুষ-পুঙ্গবের দলকে অতি নীচ পর্যায়ে নিয়ে যায় বিশ্বাস করেই নারীর প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিৎ করতে হবে নরকেই। মন থেকে নারীর সংস্কার মুছে ফেলা, নারীকে মাতৃত্বের আসনে বসানো, হৃদয়-আসনকে পবিত্র করা, মাতৃবুদ্ধিকে প্রসারিত করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে নরকে তার প্রলোভনের তান্ডব-নর্তন দমন করতে হবে।
৯. নারীকে সেই যোগ্যতা অর্জন করতে হবে যার বলে সে তার চোখ দিয়ে নিকট বা দূরবর্তী কোটি কোটি সন্তানের দু:খ খুজতে সক্ষম হবে, কান দিয়ে কাছের কিংবা লক্ষ যোজন দুরের সন্তানদের করুণ আর্ত্তনাদ শুনবে, স্নেহস্পর্শ প্রসারিত হবে নিখিল ভুবনের প্রত্যেক মাতৃঅঙ্কলোভী সন্তানের জন্য, সহযোদ্ধাকে করবে মর্যাদাবান ও সম্মানিত।
১০. প্রত্যেক গৃহীকে সন্তানদের সর্বদা সৃজনশীল ও উন্নয়নমুখী কাজে সম্পৃক্ত রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে সিংহবাহিনীরই সন্তান সিংহবাহন হয়, শৃগাল-বাহিনীর সন্তান কেশরী-মর্দ্দন হয়না আবার ঐরাবত জন্ম দিয়ে সঠিক ভাবে পরিচর্যা না করে বাচানোও যায়না।
১১. বছরে একবার সৎ হব, দুর্নীতি করব না প্রতিজ্ঞা করে কত জন সৎ হয় এবং সমাজ কতটা দুর্নীতিমুক্ত হয় তার পরিসংখ্যান জানা নেই। তবে এ রকম কোন প্রতিজ্ঞা দ্বারা মানবতাবিনাশী এই মহামারী যে কিঞ্চিৎ কমানো যাবেনা তা পাশ্চাত্যের দিকে তাকিয়ে বুঝা যায়। এ জন্য নৈতিকতাসমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী দরকার, নৈতিকশিক্ষার উপর গুরত্ব দেয়ার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তাহলেই নারী-নর হবে ধন্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে বড়, সমুন্নত-সুপ্রসন্ন হবে মানবতা।
সর্বোপরি, আমাদের দেশের মানূষ (গুটি কয়েক নাস্তিক গোছের হতভাগা ছাড়া) ধর্মে বিশ্বাসী এবং শতকরা ৮৮-৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। সেই দেশে এই মহামারী নির্মূল করা কঠিন কিংবা অসাধ্য নয়। পবিত্র কোরআন শরীফে (দেখা যেতে পারে সুরা বাকারা-১৮৭,২২৮; নিসা-৪,১৯,২১,৩৪,১২৪; নাহাল-৫৮, ৫৯,৭২, ৯৭; ইসরা-৩১,৭০; হুজরাত-৪৯; ইমরান-১৯৫; আনাম-১৫১;নুর-৩০; তওবা-৭১) লিঙ্গবৈষম্য, ভেদাভেদ, অবজ্ঞা, অপমান, অত্যাচার, নির্যাতন, নিগ্রহ, পাশবিকতা ইত্যাদি অমানবীয় কার্যবলী নিষিদ্ধ এবং প্রত্যেকের অধিকার, মর্যাদা, দায়িত্ব সুস্পষ্ট। ফিক্হ্ াবিদদের ঐকমত্য অনুযায়ী রাসুল মোহাম্মদ (সা:) জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার শতভাগ প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। কাজেই মুসলমানিত্বের দাবী মোতাবেক আমাদের দেশে নারী-নর নিগ্রহ, নির্যাতন থাকতে পারেনা। সুতরাং আমাদের মুসলমানিত্বের মাধ্যমেই সম্ভব দেশ ও বিশ্বকে নারী-নর নিগ্রহ, নির্যাতন নির্মূলের এবং মানবতা রক্ষার কার্যকর পদ্ধতি উপহার দেয়া, সেটিই আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য । আমাদের উচিৎ সেই নৈতিকতার উজ্জল প্রয়োগ দেখানো।
তথ্যসুত্র:
1. Hagemann-white, 2001
2. Statistics Canada, 1993a
3. Bureu of justice Statistics , 2000
4. Coker-Appiah & Cusack, 1999
5. Lundgren and others , 2002
|
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/ProfDrMSajedulKarim |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|