জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ যে কী ধরনের ভয়াবহ সমস্যার সন্মুখীন হতে পারে, তা নিয়ে যতটা ভাবনাচিন্তা হওয়া উচিত, তা হচ্ছে না সেটা সহজেই আচঁ করা যায় । আবার এও হতে পারে যে, পুরো ব্যাপারট নিয়ে কেউ যেন তেমন মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু সমস্যাটিকে গ্রাহ্যতার মধ্যে না আনলে অথবা এড়িয়ে গেলে তা কোন না ভাবে চলে যাবে সে ধারণা করা নিতান্ত ভুল হবে। বরং এর অব্যবহতি কারণে দারিদ্রপীড়িত এই দেশটির অবস্থার যে দ্রুত অবনতি ঘটবে, এমন কি তা পরে সমগ্র বিশ্বকেও প্রভাবিত করবে সে কথা উপলব্ধি না করার কোন উপায় নেই।
জনসংখ্যা অনুসারে বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম দেশ। বলতে গেলে ১৪৩,০০০ বর্গকিলোমিটার এর দেশের ভূমিতে ১৫ কোটি লোক একজনের পাশে আর একজন প্রায় ঠেসাঠেসি করেই বাস করছে, যেখানে জনবসতির ঘনতা প্রতি কিলোমিটারে ১,১০০ জনেরও বেশী। এটা এতখানি জনাকীর্ণ দেশ যে, সিঙ্গাপুরের মত নগর রাষ্ট্রগুলিকে বাদ দিলে পৃথিবীর অন্যান্য সব দেশের তুলনায় জনবসতির ঘনতায় বাংলাদেশ থাকবে সবার উপরে। তবে বাংলাদেশের জন্য যা আরো বেশ সাংঘাতিক ব্যাপার তা হল, বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা- জনিত সমুদ্রপৃষ্ট স্ফীতির কারণে একদিকে দেশটি তার ভূমি-অঞ্চলের বেশ কিছু অংশ হারাতে বসেছে, আর অন্যদিকে তার জনসংখ্যা বাড়ছে অসহনীয় হারে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, যা গত ৩৭ বছরে বেড়ে দ্বিগুণের চাইতেও বেশী হয়েছে । দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক জরিপের বিভিন্ন নির্ধারণীতে প্রতিবছর শতকরা ১.৫ থেকে ২.০ ভাগের মধ্যে দেখানো হয়। আলোচনার খাতিরে যদি এদের মাঝামাঝি স্থানে প্রতিবছর শতকরা ১.৭৫ বৃদ্ধির হার ধরা হয়, তাহলেও দেখা যাবে যে বাংলাদেশের জনসংখ্যা আবার দ্বিগুণ হবে আগামী ৪০ বছরে। আর এদের মধ্যে নিম্নতম বৃদ্ধির হার হিসাবে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে ৪৭ বছরে। এই ভাবে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হলে দেশটি কী রকম এক কঠোর সমস্যার সম্মুখনি হবে? এর পরিস্কার একটি ধারণা মিলবে যদি আমরা কল্পনা করতে পারি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ৩০ কোটি লোকজনকে তার উইস্কনসিন রাজ্যের সীমার মধ্যে বসবাস করতে দিলে কী রকম অবস্থা হতে পারে তার সম্ভাব্য দৃশ্যের কথা চিন্তা করলে। উইস্কনসিন রাজ্যের আয়তন বাংলাদেশের প্রায় কাছাকাছি।
দেশের এই অবিশ্বম্ভাবী ভয়ঙ্কর চিত্রটি সহজে ফুটে ওঠলেও কেউ কেউ, বিশেষ করে আদর্শবাদীরা, প্রসঙ্গ তুলে যে বাংলাদেশ শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্র ছাড়াও গত কয়েক দশকে শতকরা ৫.০ হারে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করেছে তা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য এবং সেটা বিবেচনায় আনাও দরকার। এই সব উন্নতির দিকগুলো সত্য হলেও কিন্তু সার্বিকভাবে দেশের দারিদ্রের পরিমাণ কমেনি বরং বেড়েছে, তা বিভিন্ন সমীক্ষাতে ইতিমধ্যে প্রমাণিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এ ধরনের অসামঞ্জস্যতার অন্তর্নীহিত কারণ কী? এর সহজ উত্তর হল, দেশে অবাধ দূর্নীতির মাধ্যমে যে অল্প সংখ্যক লোক সম্পদের বড় বড় পাহাড় গড়ে তুলেছে তা সর্বাঙ্গীন অর্থনৈতিক উন্নয়নে অপুরনীয় ক্ষতি করা ছাড়াও যে জিনিসটা এখানে খুব বেশী প্রভাবিত করেছে তা হল দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, যাদের অধিকাংশই কিনা রয়ে গেছে বেকার।
বাংলাদেশে শিক্ষিত সমাজে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশ কমেছে। কিন্তু তাদের তুলনায় অশিক্ষিত এবং সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ বা আরো বেশী এবং এরাই হচ্ছে দেশের সংখ্যাগুরু। এই হৃতদরিদ্রদের কোন দীর্ঘসুত্রী আয় নেই এবং বলতে গেলে তাদের অনেকেই দিন এনে দিন খায়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, তাদের বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তা ও অবলম্বনের জন্য তারা সচরাচর বেশী সন্তান চায়। এরাই আবার বিয়ে কলে অল্প বয়সে। অথচ দেখা যায় তারা যে সন্তানদের জন্ম দেয় তাদের শিক্ষাদীক্ষা এমন কি সুষ্ঠভাবে এদের গড়ে তোলার সামর্থও এই গরীরদের নেই। এর চেয়েও বড় দুভার্গ্য হল যে, এ সন্তানেরাই আবার একই ভাবে একই ধরনের সন্তানদের জন্ম দেয় প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
অতএব, এইভাবে দেশের শিক্ষিতদের সংখ্যাবৃদ্ধির হারের কমতির তুলনায় দরিদ্রদের সংখ্যাবৃদ্ধির হারের বাড়তি ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠছে অনেক বেশী। এর চেয়েও কঠোর বাস্তবতা হল, এ ধরনের দরিদ্র জনসংখ্যা বৃদ্ধি শুধু যে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরতর সঙ্কট বয়ে আনবে তা নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যও তা বয়ে আনবে অনেক দূর্ভোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাস্তবে সবখানেই ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলে সারা পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে হিমবাহ গলছে, সাগরের পানির মাত্রা উপরে উঠছে, অনাবৃষ্টি অঞ্চল প্রসারিত হচ্ছে, মিষ্টি পানির সরবরাহ কমছে এবং ঘূর্ণিঝড় ও ঝঞ্জার প্রকোপও বাড়ছে।
এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের জনজীবন ও জীবিকা উভয়ই গভীরভাবে সঙ্কটগ্রস্থ হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের এর প্রভাব হবে অতি কঠোর, কেননা এমনিতেই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা দেশটির সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর প্রচন্ড চাপ ফেলছে, এখন তার সাথে যোগ হবে এ আলগা প্রভাব। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের পরিবেশের সর্বদা অবক্ষয় হচ্ছে, তদুপরি পানি, বনসম্পদ ও কৃষি জমির মত যেসব অতি আবশ্যক সম্পদ দেশের ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য, সেগুলি ধীরে ধীরে নি:শেষিত হয়ে যাচ্ছে। আবার এসব ছাড়াও দেশে সম্প্রতি নতুন আরেক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে – সাগর সৈকত অঞ্চলে এক ধরনের মশার উৎপত্তি হয়েছে যেগুলি আকারে বড় এবং সহজে ধ্বংস করা যাচ্ছে না এবং এদের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু সহ বহু ধরনের ভয়াবহ রোগের প্রকোপও ক্রমশ: বাড়ছে।
কৃষি উৎপাদন, জমি ব্যবহার, এবং পানি সরবরাহ এগুলিই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম। এখানকার ভূমিভাগের বড় অংশ আবার সাগর থেকে খুব বেশী উঁচুতে নয় এবং বর্ষাকালে দেশের শতকরা ৪০ ভাগ ভূমি সাধারণত: বন্যার পানিতে ডুবে যায়। এ অবস্থা ক্রমশ: আরো খারাপ হচ্ছে কারণ পার্শ্ব্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত তাদের দেওয়া বাঁধ বন্ধ করে বছরের শোকনো মৌসুমে স্রোতের উজানে নদীর পানির প্রবাহ নিজ দেশের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলো পলিমাটি আর কাদায় ভরে যাচ্ছে। তাতে নদীগুলি বর্ষাকলে বেশী পারি বহণ করার সামর্থ হারিয়ে ফেলছে। তদুপরি আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তন হলেই বন্যার আক্রমণ বেড়ে যায় ভীষণভাবে, যা ইদানিং খুব ঘন ঘন ঘটছে। এই বন্যায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিনষ্ট হয় এবং বহু লোক প্রাণও হারায়। এটা নিশ্চিত যে বিশ্বব্যাপী উষ্ণতার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্ফীতি হলে বাংলাদেশে বন্যার এ ধ্বংসাত্মক রূপও বেড়ে যাবে। এই ভাবে সৈকত অঞ্চলের ভূমি যখন পানিতে ডুবতে থাকবে তখন জনগণের উঁচু জায়গার দিকে ধাবিত হওয়া ছাড়[ আর কোনো উপায় থাকবে না।
প্রকৃতপক্ষে সৈকত অঞ্চল থেকে লোকজনের বহির্গমনের প্রক্রিয়া হয়তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে ঘেছে ভেতরে ভেতরে এবং অবস্থা যত খারাপের দিকে যাবে তত এই প্রক্রিযা আরো প্রকট হয়ে উঠবে। কিন্তু কোথায় যাবে ঐসব লোকগুলি? রাজধানী ঢাকা শহরের উপর লোকের যে প্রচন্ড চাপ পড়ছে এটাও তার একটা কারণ, আর এ চাপ কমার পরিবর্তে এখানে লোকের ভিড়ও প্রতিদিন বেড়ে চলছে। অন্যদিকে লোকে লোকারণ্য এই ঢাকা শহরে বসবাসের অবস্থা ক্রমশ: খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এখানে বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানির মত মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয় জিনিসও সরকার লোকজনকে সময়মত আর সরবরাহ দিতে পারছেনা। দেশের অন্যান্য শহরের অবস্থাও খারাপ এবং সেখানেও দিনদিন অবস্থার অবনতি ঘটছে। এখন গ্রামাঞ্চল সহ সর্বত্র সরকারী জমির উপর অনধকিার প্রবেশ যেন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই ধারণা যে দেশের অবস্থা বেগতিক হলে লোক প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিবে। প্রকৃতপক্ষে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন – সংক্রান্ত আন্ত:সরকার প্যানেল এ ধরনের একটি সম্ভাবনার আভাস দিয়ে বলেছে যে সমুদ্রপৃষ্ঠের স্ফীতির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আরো সাড়ে তিন কোটি লোক ভারতে পাড়ি দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিশ্বের খাদ্য সরবরাহের উপর তার বিশেষ প্রভাব। বৈজ্ঞানিকদের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ শতকের শেষ দিকে বিশ্বব্যাপী ফসলের পরিমাণ কমবে শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যে প্রকট সমস্যা দেখা দিবে তার স্বরূপ হবে অনেকটা এইরকম: বর্তমান পরিস্থিতিতেই দেশ তার খাদ্যের অভাব মিটাতে হিমশিম খাচ্ছে, অথচ যখন প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে এবং কৃষি জমিও কমে যাবে, তখন বিশ্ব খাদ্য সরবরাহের উপর সৃষ্ট প্রত্যাশিত চাপের মুখে বাংলাদেশ আরো অধিকতর খাদ্যের ঘাটতি কীভাবে মোকাবেলা করবে?
বাংলাদেশের বড়শহরগুলিতে ক্রমাগত জনসংখ্যার কেন্দ্রীকন এবং গ্রামাঞ্চলে কৃষি জমির উপর সৃষ্ট অপরিসীম চাপ, এ দুটো সমস্যাকে এড়াবার জন্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেউ কেউ ‘কমপ্যাক্ট টাউনশীপ’ বলে একটি ধারণার যুক্তি দিয়েছেন। আবার কারো কারো মতে পলিমাটি জমে প্রতিবছর বাংলাদেশে ২০ কিলোমিটার স্থলভূমি যোগ হচ্ছে, তাতে দেশের সমস্যার খানিকটা সুরাহা হবে। কিন্তু স্থলভুমি বাড়ছে, এ যুক্তিটিকে খন্ডন করে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন - সংক্রান্ত আন্ত:সরকার প্যানেল এর সদস্য আতিক রহমান বলেছেন, ‘পলিমাটি জমে জমে যে হারে বাংলাদেশে নতুন স্থলভূমি সৃষ্টি হচ্ছে, তা জলবায়ু পরিবর্তন হেতু যে হারে সমুদ্রপৃষ্ঠ স্ফীতি হচ্ছে তার চাইতে অনেক কম’।
এইসব কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চরম চ্যালেঞ্জকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবেলা করা বাংলাদেশের জন্য এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান না হলে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিতদের স্ফীতিতে রোধ করতে না পারলে, বাংলাদেশে সফল অর্থনৈতিক উন্নয়ন তো হবেই না বরং দেশে দারিদ্রতার প্রকট অসাধারণভাবে বেড়ে যাবে যা নিশ্চিতভাবে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিবে। বস্তুতপক্ষে দেশ যে এ ধরণের পরিণতির দিকে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে তার অনেকগুলি সংকেত এখন দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অহরহ দাঙ্গা, রাজনৈতিক অঙ্গণে অবিরাম মারাত্মক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদীদের তৎপরতা, মৌলবাদের বিস্তার, রাহাজানির প্রসার এবং সর্বত্র গুরুতর আর্থিক দুর্দশাজনিত বিধিহীনতা ও নানাবিধ সামাজিক বিক্ষোভ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি কীভাবে অবনতির দিকে এগুচ্ছে তা সাম্প্রতিক দুটি নজিরবহিীন ঘটনা থেকে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া যায়। এক, বিগত ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় দেশের সীমান্তবাহিনীর মাঝে বিদ্রোহের ফলে ৬০ জনের মত উর্দ্ধতন সামরিক অফিসারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা। দুই: জনবিরল সৈকত এলাকায় একটি ধর্মীয় স্কুলের অঙ্গনে অস্ত্রসস্ত্রের বিরাট গুপ্তভান্ডার খুঁজে পাওয়া। সমাজ বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের পরিস্থিতি যত খারাপের দিকে যাবে তত এ ধরনের গুরুতর কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাবে।
চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা কীভাবে
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশকে আন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, চীন এ ব্যাপারে সবচাইতে কঠোর এক নীতি গ্রহণ করেছে, যেমন, তারা প্রতি পরিবারে সন্তানের সংখ্যা নির্ধারণ করেছে মাত্র একটি। তবে এ ধরনের নীতি গ্রহণের জন্য চীনের স্থান একেবারে অনন্য। কেননা যদিও চীন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ধনতন্ত্রের নীতিকে গ্রহণ করেছে, সরকারী কার্যকলাপ ও নীতি নির্ধারণ এখনও চীনের কম্যুনিস্ট পার্টির একক নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে। অন্যদিকে জনসংখ্যা নীতির প্রেক্ষিতে চীন বৃদ্ধদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বিধানেরও ব্যবস্থা করেছে।
বাংলাদেশ জনসংখ্যা পরিষদের সাম্প্রতিক এক সভায় স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা চীন নীতির উপর বেশ খোলাখুলি আলোচনা করেছেন এবং দেশের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে –নীতি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি চিরাচরিত সমাজ ব্যবস্থায় চীনের মত প্রতি পরিবারে এক সন্তানের নিয়ম কার্যকরী করা খুবই দুষ্কর হবে। প্রথমত: বাংলাদেশে চীনের মত কোনো সুষ্ঠ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এবং চীনের মত কোনো শক্তিশালী স্বৈরতন্ত্রী সরকারও নেই। তার চেয়েও বড় কথা হল সে - নীতি বাংলাদেশে অনিবার্যভাবে ধর্মীয় মৌলবাদের কোপের মুখে পড়বে। ধর্মের নামে অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত জনগণকে খুব সহজেই প্রভাবিত করা যায়। সন্তানরা আল্লাহর দান এবং আল্লাহই তাদের দেখাশুনা করবেন, এ ধরনের যুক্তিতে এখনও তারা বিশ্বাসী। এ মনোবৃত্তি কিন্তু খুব সহজে বদলানো যাবে না।
অপরপক্ষে ভারত একসময়ে আইন প্রণয়ন করে তাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা মোকবেলা করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রবল সামাজিক ও ধর্মীয় চাপের মুখে সে – নীতি পরে তারা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।
বাংলদেশও একসময়ে পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রম নিয়ে খুব উৎসাহের সাথে ঝাপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী নির্বাচিত সরকারের সময়ে সে উৎসাহের যথেষ্ট ভাটা পড়ে যায়। খুব সম্ভবত: এর কারণ ঐ সরকারের প্রধান রাজনৈতিক শরিকদার ধর্মীয় এ কাজের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিল বলে। এ বছর নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে পরিস্থিতি হয়তো বা বদলেছে। তবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে এ নতুন সরকারের পরিকল্পনা ও কর্মসূচী কী হবে তা এখনো পরিস্কার নয়।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার পরিস্থিতি যে দিন দিন খারাপ হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে প্রতিবছর ৩০ লক্ষের মত লোক যোগ হচ্ছে দেশের জনসংখ্যায়। এই বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি এড়াতে হলে সমস্যা সমাধানের লক্ষে বহু প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। এই যেমন - বিবাহের নূন্যতম বয়স সম্পর্কে যে আইন রয়েছে তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, আয়ের অবলম্বন ছাড়া বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতে নিরুৎসাহিত করে আইন প্রণয়ন করা, হবু বর-কনেকে বিয়ের আগে পরিবার পকিল্পনার উপর শিক্ষা নিতে বাধ্য করা এবং সেই সাথে বৃদ্ধদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তারও একটা ব্যবস্থা করা।
তবে গ্রামের অশিক্ষিত সমাজের কাছে উপরোক্ত ধারণাগুলি তুলে ধরতে অভিনব উপায় খুজেঁ বের করতে হবে। যেমন – যৌনতা, শারীরিক অবস্থা, স্বাস্থ্য-বিজ্ঞান, সন্তান ধারণ, পরিবার পরিকল্পনা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে খুব সহজ ধরনের একটি ভিডিও দেখানোর পরে প্রশ্নোত্তরের সুযোগ রাখলে প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেকগুন বেড়ে যাবে। তদুপরি জনগণের ব্যাপক দারিদ্রের কথা মনে রেখে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও স্বল্পমূল্যের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির উপর জোর দিতে হবে, যথা – বীর্যস্খলন বাইরে করার নিয়ম শেখানো, যা ডাক্তারি ভাষায় ‘কয়েটাস ইন্টারাপটাস’বলা হয়। এ ধরনের সহজাত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হয়তো দেশের ধর্মীয় নেতাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তাছাড়া প্রচলিত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির কিছু না কিছু আনুসাঙ্গিক সমস্যা রয়েছে যা তাদের নিয়মিত ব্যবহারে অনেক লোক নিরুৎসাহিত বোধ করতে পারে।
সর্বোপরি জনসংখ্যা সম্পর্কে বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বোত্তম পন্থা হবে পরিবার গঠনের ব্যাপারে কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেওয়া না নেওয়ার পরিণতি কী দাঁড়াতে পারে সে সব কিছুর উপর পুরুষ – মহিলা উভয়কে বিশেষভাবে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। এ ধরনের শিক্ষা স্ত্রী-পুরুষদেরকে তাদের ভবিষ্যত শিশু সন্তানদের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার ব্যাপারেও যথেষ্ট সহায়তা করবে, যা কিনা বাংলাদেশের আরেক বিশেষ লক্ষ্য। আশা করা যাক, নতুন সরকার দেশের জনসংখ্যা সমস্যার গুরুত্ব সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে পারবে এবং শীঘ্রই এ ব্যাপারে তাদের বাস্তব কর্মসূচী গ্রহণ করবে।
বাইরের সহায়তা
গণ শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে স্থিতিতে আনা বাংলাদেশ সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এত বড় একটি ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নেওয়ার মত সামর্থ বা মনোবল বাংলাদেশের অনেকটা নেই বললেই চলে। অন্যদিকে বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সহায়তা করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমাজের একটি বিশাল দায়িত্বও রয়েছে। প্রথমত: বিশ্বব্যাপী উষ্ণতার ব্যাপক সমস্যাটির প্রধান কারণ শিল্পায়িত দেশগুলির কার্বন নিষ্কাশন। অথচ এতে বাংলাদেশের অবদান অতি নগণ্য হলেও এই গরীব দেশটি ক্ষতিগ্রস্থ হবে অন্যদের চেয়ে বহুগুণ বেশী। দ্বিতীয়ত: মানবিক কারণ ছাড়াও জনসংখ্যা বিস্ফোরনের ফলে বাংলাদেশ যদি আরেকটি অরাজকতার দেশে পরিণত হয় তা সমগ্র বিশ্বের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা আন্তর্জাতিক সমাজের জন্য বিশেষ উদ্বেগেরও কারণ হওয়া উচিত। অরাজকতার একটি দেশের প্রভাব কী হতে পারে তার সম্যক উদাহরণ হল সাম্প্রতিক কালের সোমালিয়া।
এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশে হাজার হাজার বেসরকারী সংস্থা ( এনজিও) কাজ করছে। এই বেসরকারী সংস্থাগুলি নি:সন্দেহে সেখানে বহু দরিদ্র ব্যক্তির জীবনে পরিবর্তন আনছে। অথচ বাংলাদেশের দরিদ্রদের মাঝে পরিবার পরিকল্পনার প্রয়োগ অতি প্রয়োজন, কেননা এর প্রয়োগ ছাড়া সহজে তারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তন আনতে পারবে না। বেসরকারী সংস্থাগুলি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে গণশিক্ষার জন্য সব সংস্থা একত্রিত হয়ে সেই উদ্দেশ্যে তাদের কার্যক্রম গ্রহণ করলে, তার ফলে তারা মানবতার আদর্শকে অনেকদুর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তদুপরি. প্রবাসী বাংলাদেশীদেরও বড় নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে নিজ দেশের এই বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য অভিনব বা উপযোগী কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে আসা। পরিশেষে প্রতি মহলে সহসা এ শুভ বুদ্ধির উদয় হোক এটাই সবার আশা।
লেখকঃ নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির চি ডাবলিউ পোস্ট এ অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেন, ই-মেইল, mahfuz.chowdhury@liu.edu