মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৫৫ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

বাংলার সোনালী রবি

প্রথমা চৌধুরী

যেদিন দেখেছি গোধূলী বিকেলে
তোমার প্রথম ছবি।
স্বাধীনতার অধর ছুঁয়ে উঠেছ তুমি
বাংলার বুকে এক সোনালী রবি।

আমার একটা নদী আছে। ভালবাসার নদী। সেই নদীতে কষ্টের অশ্রুগুলো ভাসিয়ে আসছি এতকাল। আমার অশ্রুর সাগরটা কখনও শুকাবেনা। যে কষ্টে বুকটা প্রতিটি মূহুর্ত কেঁদে যায়। যে চোখে নামে বেদনার ঝর্ণা ধারা। সে নদীর পানি কখনও শুকায়না। যখন ফিরে যাই আমার সেই শৈশবের নদীতে, শ্যামল ছায়াঘেরা গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যায় কূলকূল ধ্বনী তুলে আমাদের ছোট্ট সোয়ানদী। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি থাকে হাঁটুজল। বর্ষায় তার যৌবন স্ফীত হয়। সবুজ ধানের ক্ষেতের উপর দিয়ে বিস্তৃত উপজেলার পূর্বদিকের রাস্তা পর্যন্ত। পানির নিচে চিকচিক করে বালি। পানি খুব সচ্ছ। স্থির পানির দিকে তাকালে নিজের ছবি স্পষ্ট দেখা যায়। এভাবেই নদীর সাথে গড়ে উঠে আমার আত্মিক সম্পর্ক। সেটা আরও গাঢ় হয় খুব ছোট্ট বেলায় একটা মর্মদন্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে। এখনও স্মৃতির পাতায় জ্বলজ্বল করে সেইদিনের ঘটনা। অতীতের ডানায় চড়ে উড়ে যাই আমার গ্রাম গোপালপুর থেকে আমার নানুর বাড়ী। তিন মাইলের পথ পেরিয়ে দিঘড়ী গ্রামে। সেইখানে আমার স্মৃতির বীজে কষ্টের আগুনটা বুকের মধ্যে আজও পোড়ায়। মনের ভিতর প্রতিবিম্বিত হতে থাকে ১৯৭৫ সালর ১৫ই আগষ্ট। এইদিনটা আমার ছোট্ট মনে সেদিন প্রচণ্ড আলোড়ন তুলেছিল। সেই আলোড়ন এখনও বুকের ভিতর বয়ে যায় নিদারুণ কষ্ট। মন শূন্যতায় ছেঁয়ে থাকে সারাক্ষণ। হৃদয়ে বহেনা সুখের বাতাস, জীবনে কখনও ভাল লাগেনি রঙ্গিন স্বপ্ন। ছোট্ট বেলায় খুব গান পছন্দ করতাম। রেডিও ছাড়া তখন কোন যন্ত্র ছিলনা। অনেক গানের মধ্যে একটা গান আমার খুব পছন্দ ছিল।

আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল,
বাতাসের আছে কিছু গন্ধ,
রাত্রির গায়ে জ্বলে জোনাকী;
তটিণীর বুকে মৃদু ছন্দ ।

এই গান মনে এমন নাড়া দিত যে সংকল্প করি আমি একদিন শিল্পী হবো। সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখার জন্য অনুরোধর আসর গুলো নিয়মিত শুনতাম। তাই রেডিও এর সাথে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সুরটা বসে যেত গলায়। আমার এই গান শুনার পছন্দটা আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে মোটামুটি সবারই জানা ছিল। সেদিন ছোট মামী বারান্দায় রেডিওটা অন করে দিয়ে তিনি কাজে চলে যান। আর আমি অনুরোধের আসরে গানের সাথে সুর মিলাতে থাকি হঠাৎ গানটা বন্ধ হয়ে গেল। একটি কন্ঠ ভেসে এল; একটি বিশেষ ঘোষণা, আজ ভোর চারটার সময় শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। । হহএএএএএএএ। প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। মনে হলো ১০০টা জেট বিমান আমার বুকে আঘাত করল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এটা কি করে সম্ভব। একজন দেশের প্রেসিডেন্ট আততায়ীর হাতে নিহত হলেন। তাঁর সেনাবাহিনী, মন্ত্রীবর্গ কোথায় গেল। আমি ভুল শুনিনিতো আবার শুনার জন্য বসে রইলাম। সত্যিই পাঁচ মিনিট পরপর কি অবজ্ঞা ভরে প্রচার করছে। নামের আগে প্রেসিডেন্টও নেই, বঙ্গবন্ধুও নেই। মনে হলো বংলাদেশের কোন সাধারণ নাগরিক। যদি বাংলার সাধারণ নাগরিকই হবে তাহলে জাতি কে ঘোষণা দিয়ে জানানোর দরকার ছিলনা। ঘোষণাটি বারবার শুনার পর আকাশের দিকে তাকাই, মেঘগুলো থমকে আছে; গাছের পাতারা স্থির। বাতাস থেমে গেছে। চলমান সববস্তূই যেন শোকে পাথর। আমার শরীর বেয়ে একটা কষ্টের রক্তস্রোত বয়ে যেতে থাকে। স্থির হতে পারিনি। অস্থিরতায় দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হতেই পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ছোট মানুষ মনের কথা না পারি প্রকাশ করতে না পারি কাউকে বলতে। ছোটবেলায় খুব লাজুক ছিলাম। তাই চাপা কষ্টে দম দন্ধ হয়ে আসে।

ভেজা কাপড়ে সোজা মামীর ঘরে। মামী আমাকে ভেজা অবস্থায় দেখে বলে উঠে কী ব্যাপার চৌধুরীর বেটী, আজ এত সকালে গোসল তাও আবার তাড়াতাড়ি। কারণ পুকুরে গোসল করতে নামলে সহজেই পুকুর থেকে উঠতে চাইতামনা। মামীর ইয়ার্কি সূলভ কথা আমার মনকে নাড়া দিলনা। এবাড়ির কারও কোন প্রতিক্রিয়াই নেই। সবই স্বাভাবিক চলছে। মনে হলো পৃথিবীতে আজ কোন ঘটনাই ঘটেনি। কিন্তু আমার কানে কোন কথাই ঢুকছেনা। শুধু একটি কথাই অবিরাম ভাবে বেঁজে যাচ্ছে মনের ভিতর, একটি বিশেষ ঘোষণা, আজ ভোর চারটার সময় শেখ মুজিবুর রহমান আততায়ীর হাতে স্বপরিবারে নিহত হয়েছেন। কথা বলার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছি। বাস্তবকে বুঝার মত কোন ক্ষমতা তখন আমার ছিলনা। আমি নীরবে আমার কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছি ।মামী তার কথার জবাব না পেয়ে নীরবে দেখতে দেখতে এক সময় আমার কাছে এসে হাতটা ধরে জানতে চাইলেন। কেউ কিছু বলেছে। আমার ছোট্ট উত্তর, না। মামী বুঝতে পারে কেউ কিছু বললে আমি যদি মাকে গিয়ে বলি ,মা কষ্ট পাবে।

বাইরে কদম গাছটার নিচে দাড়াই, বড় বড় সাদা ফুলে ঢেকে গাছের পাতা। অপূর্ব সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে মেলেছে পাখা। কদমফুল আমাকে ভিষণ আকৃষ্ট করে। আজ সেটার প্রতি আগ্রহ হারাই। মনে কোন প্রতিক্রিয়া হলনা। শুধু বুকটা জ্বলে যাচ্ছে। কেউ যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
সামনের পাথারের দিকে দৃষ্টি মেলি, বিরাট পাথারের মাঝে তখনও কৃষাণেরা জমি চাষে ব্যস্ত। পাথারের মাঝখানে বড় কবরস্থান। দিনের বেলা কবরস্থানের পাশ দিয়ে গেলে ভয়ে গা ছমছম করে। আমি যতবার এই শর্টকাট রাস্তা দিয়ে গেছি, ততবার দোয়া পড়তে পড়তে এক রকম উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে পার হয়েছি। আজ বুকে আকাশের মত বিশাল সাহস। আকাশে বিচিত্র মেঘের আনাগোনা। জলভরা মেঘ রোদের তীব্রতাকে ঢেকে দিয়ে ছায়া পড়ে। মেঘের ছায়ার সাথে সাথে আমিও হাঁটতে থাকি। মাঝে মাঝে মেঘের ছায়াটা বাতাসে দ্রুত সরে যেতে থাকলে আমিও দৌঁড়াতে থাকি। মমমমমমমমমমমমমমমমববঈকবরস্থানের কাছে এসে মেঘটা দূরে সরে গেল। আবার তীব্ররোদ। এবার এক দৌড় গ্রোমের প্রথমে গিয়ে থামি। তারপর আখক্ষেত। মাথা সমান আখক্ষেত হলেও আখের ঝোপ এখনও ঘন হয়ে উঠেনি। তাই আখক্ষেতের ফাঁকে ফাঁকে দৌড়াচ্ছি বাড়ির দিকে। গিয়ে উঠি উপজেলা রাস্তায়। যে রাস্তা উত্তর দিক দিয়ে সোজা দক্ষিণে গিয়ে বাঁক নিয়ে পূর্বদিক দিয়ে চলে গেছে উপজেলার দিকে। ডিসি নজরুলের আখক্ষেত পার হয়ে রায়হানাদের বাগান বাড়ী। তারপর আমাদের পুকুর। পুকুর সংলগ্ন আমাদের বাড়ী। বাড়ীতে ঢোকামাত্র রান্নাঘর থেকে বড় ভাবী বেড়িয়ে এসে জানায়, শুনেছ, শেখ মুজিবকে মেরে ফেলেছে। কথাটা শোনামাত্র কষ্টে বুকটা খামচে ধরল। আমি জবাব দিতে পারলামনা। বুঝলাম, আমাদের বাড়ীতে হত্যাকান্ডের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকলে চলে যাই আমার রুমে। টেবিলের পাশে চেয়ারে বসতে না বসতেই বুকটা ভেঙ্গে সব কান্না একসাথে বেরিয়ে আসতে থাকলে মাথা গা প্রচন্ড গরম হয়ে উঠে। বুকে প্রচন্ড চাপ অনুভব করি। যেন ইনক্রিডবলের হাক এর মত ফেটে যাবে আমার শরীর। মনে হল ঘরে একটুও অক্সিজেন নেই। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে ঘর থেকে কোন রকমে ছুটে বের হয়ে সোজা নদীর ধারে এসে যেন দম ফেলি। আর সাথে সাথে বুকটা হু হু করে উঠে। ডুকরে কেঁদে উঠি। কেঁদেই চলি আমি। হঠাৎ মনে হলো কেউতো আমার কান্না শুনছেনা। আশে পাশে তাকিয়ে দেখি কোন লোকজন নেই। আমার মাথার উপর নারিকেল গাছ। তার ছায়ায় বসে কাঁদছি। আমার সাথে কাঁদছে লিচুর গাছ। ডান পাশে কাঁদছে কাঁঠাল ও শিমুল গাছটাও। ওরাও শোকে পাথর আমার সাথে। এত ছোট মানুষের বুকের ভিতর এত কান্না কোথায় লুকিয়ে ছিল। আমি ভেবে অবাক হই। দিনে দিনে যে ভালবাসা ছুঁয়েছে হৃদয়ের মাটি। ছুঁয়েছে বুকের ভিতর সবুজ সমুদ্দর। তার কান্নার শেষ কোথায়? কি অদ্ভুত এক সময় অতিক্রম করছি আমি। স্মৃতির জানালা খুলে দেখি, আমি আমার দাদার মেয়ে কোহিনুর সাহাবুদ্দিনের দোকানের দিকে দৌঁড়াচ্ছি কেরোসিন তেল আনতে। যুদ্ধের পর দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল কিনা জানিনা। তখন মাসের কেরোসিন তেল শেষ হলে বড় ভাবী আমাদের দুজনকে লজেন্স ও লেবেনচুষ এর লোভ দেখিয়ে লুকিয়ে হাতে একটা একসের ওজনের কাঁচের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বলতেন, দাদা যেন না দেখে। আর আমরা বকরীর লাদির মত লজেন্স আর কাঠির আগায় লেবেনচুস এর লোভে লাফিয়ে লাফিয়ে হাজির হতাম সাহাবুদ্দিনের দোকানে। দোকানে একটা এক পাতার কেলেন্ডার টাঙ্গানো। কেলেন্ডারের পাতাটা ভরা দুইটি নারী পুরুষের ছবি। নীচে বাংলা মাসের নাম ও তারিখ। কি সুন্দর আভিজাত্য ভরা ছবি দুইটি। নারীর ছবিটা উপরে। মাথায় ঘোমটা দেওয়া। নীচে পুরুষ মানুষটার ছবি। ঘন গোঁফ, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। গম্ভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষটি। দেখেই যেন ছবিটার প্রতি প্রেমে পরে গেলাম। স্মৃতির ভিতর একেঁ গেল ছবি। তেল ও লজেন্স নেওয়া শেষ হলেও আমরা দাঁড়িয়ে আছি দেখে দোকানি বলে, তোমরা দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাও, সন্ধ্যা হয়ে গেলে যেতে ভয় পাবে। আমরা সুযোগ পেয়ে গেলাম। মনের ভিতর এতক্ষণ ছবি দুইটা কার জানার জন্য আকু পাকু করছিল। জানতে চাইলাম ছবি দুইটা কার। দোকানদার গবে বুক ফুলিয়ে হাতটা ছবিটার দিকে উঁচু করে ধরে ভাষণের মত করে বলতে লাগলেন, ইনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্থপতি। আর ইনি হচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। যার সাহায্য সহযোগিতা না পেলে আমরা কখনও স্বাধীন হতে পারতাম না। তখন সন্ধ্যা প্রায় আগত। কিছুক্ষণ পর আযান দেবে মাগরিবের। আমরা দুজনে দোকান থেকে বের হয়ে মসজিদের পাশ দিয়ে জঙ্গল পেরিয়ে, আখক্ষেত মাড়িয়ে, একটি পাড়ার ভিতর দিয়ে হাত ধরাধরি করে দৌড়ে দৌড়ে বাড়িতে আসি। সন্ধ্যা হয়ে গেলে দুটো পথই ভয়ের কারণ আছে। বড় রাস্তায় পড়বে বিরাট পুকুর। উচুঁ টিলার মত পুকুরের পাড় ঘন জঙ্গলে ভরা। তার মধ্যে আকাশ ছোঁয়া তেঁতুল গাছ। তেঁতুল গাছে থাকে ভুত। তারপর যুদ্ধের সময় মানুষ মেরে এই পুকুরে ফেলেছে। যুদ্ধের নয় মাস পযন্ত পুকুরের পানি লাল ছিল। পরে কালো বর্ণ ধারণ করে। দিনের বেলায়ই মানুষ কম হাঁটে। অনেক দিন পর্যন্ত পুকুরের মাছ কেউ খেতনা।

সারাক্ষণ চোখে ভাসতে থাকে ছবি। আর মনের ভিতর অবিরাম ভাবে বেজে যায়, ইনিই জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিটা দেখার একটা নেশায় পরিণত হল। তেল আনতে না পাঠালেও আমরা দুজনে বিকেল হলেই ছবিটা দেখার জন্য ছুঁটে যেতাম দোকানে। কিছুক্ষণ দেখে ফিরে আসতাম। গভীর একটা আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গেল ছবিটার মধ্যে। না দেখলে কষ্ট হতো। বুকের কোথায় যেন চিনচিন করে ব্যাথা হতো। স্মৃতির ভিতর বিচরণ করছি আর নীরবে ঝরছে চোখের পানি। চোখের পাতা ফুলে ডুমাডুমা। পলক ফেললেই কাঁটার মত ফুটে। বাধ্য হয়ে নেমে যাই নদীতে। স্থীর পানি। পানি আয়নার মত স্বচ্ছ। মুখের ছবিটা ভেসে উঠে পানিতে। চোখ মুখ লাল আর ফোলা ফোলা। এভাবে বাড়িতে গেলে সবাই ক্ষেপাতে পারে। তাই দুই হাত দিয়ে সমানে পানি দিয়ে চোখ ধুই যেন ফোলাটা কমে যায়। তবুও বুকের ভিতর গুমরে উঠে কষ্ট আর গাল বেয়ে নামছে অবিরাম চোখের জল। আর আমিও নদীর পানির সাথে চোখের পানি মিশিয়ে যাচ্ছিতো যাচ্ছিই।

এক সময় বুকটা শান্ত হয়ে এলে কান্নাটও থেমে যায়। কিন্তু চোখ মুখ ফোলা যায়না। তাই লিচুর গাছে উঠে দাদার জন্য অপেক্ষা করি, দাদা নিশ্চয়ই সেতাবগঞ্জ বাজার থেকে আরও কোন খবর নিয়ে আসবে। বসে আছি আর রবীন্দ্রনাথের ছুটি গল্পের ফটিকের মত লিচুর পাতা চিবুচ্ছি। ছোটবেলায় যা-তা চিবানোর অভ্যেস ছিল আমার। এই লিচুর গাছের সাথে আমাদের ছিল বিভিন্ন খেলার সম্পর্ক। কখনও সবাই মিলে গাছের ডালের উপর দুই পা শক্ত করে ধরে মাথা নিচের দিকে ঝুলিয়ে রেখে হাত ছেড়ে দিয়ে সার্কাসের মত কসরত করতাম। আজ কোন কিছুই ভাল লাগছেনা। শুধু মন চাইছে দাদা কখন বাড়ী আসবে, তাই আমি চাতক পাখির মত ডালে বসে পাতার ফাঁক দিয়ে বাড়ীর দিকে তাকিয়ে আছি।
তীব্ররোদে বুঝিয়ে দিচ্ছে এখন দুপুর। ঝকঝক করছে পৃথিবী। কারণ সকাল থেকে মেঘের আনাগোনা থাকলেও এক সময় কিছুটা বৃষ্টি হয়ে পৃথিবীকে পবিত্র করেছে জাতির জনকের হত্যার কলঙ্ক থেকে।

দেখি দাদা সাইকেল চালিয়ে বাড়ীর গেটে নেমে ভিতরে যাচ্ছে। আমি গাছ থেকে নেমে ধীরে ধীরে বাড়ীতে গেলাম। দাদা সাইকেলটা বারান্দায় থাম্বার সাথে হেলান দিয়ে রেখে বারান্দায় বসলেন। সেখানে তার জন্য সাবান পানি রেডি থাকে। বাহির থেকে ফিরলেই সাবান দিয়ে হাত মুখ না ধুয়ে ঘরে ঢুকেন না। সেদিন বসেই ভাবনায় হারিয়ে গেলেন। আনমনে সাবান দিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বুকের গভীর থেকে কষ্টটা বেড়িয়ে এল, আহ্! মারার কি দরকার ছিল। দেশ চালাতে না পারলে গদি থেকে নামিয়ে দে। তিনি ভাবনার মধ্যে খেই হারিয়েছেন। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধুয়েই চলছেন। আর থেমে থেমে আহ শব্দটা বুকের ভিতর থেকে নিংড়ে বের করছেন। সহ্য করতে পারছেননা জাতির পিতার এই মর্মান্তিক মৃত্যু। স্মৃতির নীলিমা জুড়ে খুঁজে ফিরছেন জনকের খন্ড খন্ড স্মৃতি। আর মনের চোখে সেটা রিলে হয়ে চলছে। এভাবেই তিনি ঘন্টা খানেক ব্যাথা বেদনা, শোকে দুঃখে কাতর হয়ে রইলেন ভাবনার গভীর অরণ্যে। এক সময় উঠে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। সেদিন বাড়ীর সবাই ভাত খেলেও আমি আর দাদা ভাত খাইনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বুকের ভিতর কষ্টটা প্রবল আলোড়ন তুলেই চলছে। আর আমি প্রাণপণ নিজেকে সামলাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেদিন থেকে শুরু হলো আমার হৃদয়ের কান্না।

ইতিমধ্যে দাদা জেনে গেছেন যে, আমিও ভাত খাইনি। তিনি রাতে সবাইকে নিয়ে ভাত খেতে বসলে বলে উঠেন, দেশটায় এখন অরাজকতা শুরু হবে। স্বাধীনতার স্বপ্ন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবেনা। কষ্ট পেলে আমি দমে যাই, কোন জবাব দিতে পারিনা। মুখের ভাষা যায় হারিয়ে। দাদা বুঝাতে চাইছেন, যে স্বাধীনতার পর বাংলার মানুষ মুক্ত হওয়ার আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে নিজেরাই দেশ গড়ার কাজে নেমে যায়। রাস্তা নির্মাণ. স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সাধারণ মানুষও এগিয়ে আসে। আমার দাদাও আমাদের এক একর জমির উপর প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন। পরে একটি হাইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করেন। যারা স্বাধীনতার বিরোধী ছিল তারা সহযোগিতা তো করলনা বরং বিরোধীতা করতে থাকে। দম্ভ ভরে বলতে থাকে তাদের ছেলেমেয়ে এদেশের মাটিতে পড়বেনা লন্ডন, আমেরিকা ও রাশিয়ায় পড়বে। এই কথাটা স্বগৌরবে প্রচার করতে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বিদেশের মাটিতে পড়াতো দুরেই থাক। দেশের মাটিতেই পড়তে পারেনি। আর প্রাথমিক শিক্ষাটা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলেই পড়েছে।

দাদা কারও কথায় কান দিলেননা। স্কুলের কাজ তিনি চালিয়ে গেলেন সবকিছু অপেক্ষা করে। গ্রামের মানুষও স্বতঃফূর্তভাবে এগিয়ে এল। কেউ বাঁশ, কেউ খড়, কেউ দড়ি কিংবা পাট। যে যা পারল মুক্তহস্তে দান করতে থাকে। দাদা খুব জনপ্রিয় ছিল সবাই তাঁকে ভালবাসত। সবারই বিপদে আপদে রাত বিরাতে ছুটে যেতেন। আমাদের বলতেন. উপকার করতে না পার, সাহায্য করতে না পার; কিন্তু কার ক্ষতি করনা।

স্কুল ঘরটি নির্মাণ করা হলো পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে লম্বা করে। বাঁশের খুটির উপর বাতার বেঞ্চ। একটা বড় বেঞ্চ, বইখাতা রাখার জন্য আর একটা ছোট বেঞ্চ, সেটা বসার জন্য। ঘরের তিন দিকে লাগানো ছিল লম্বা করে বেঞ্চটা। পাঁচ বছরের বয়স থেকে বিশ বছরের বয়সের ছেলেমেয়ে ক্লাস ওয়ানে ভতি হল। আমার আজ খুব গর্ব হয়। স্বাধীনতার প্রথম নতুন স্কুলের প্রথম ছাত্রী আমি। এটা একটা ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর জীবনী পড়ে আরও বেশী নিজেকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছি। কেউ সেই আদর্শ থেকে এক চুলও সরাতে পারেনি। নীতির কাছে থেকেছি অবিচল।

'৭৫ পরবতী ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমানের জীবনী এল ছবিসহ। আর ছিল কাজী নজরুল ইসলামের। জাতির জনকের জীবনী থাকলেও এমন ভাবে উপস্থাপনা করা হলো যে, দেশ ও স্বাধীনতার জন্য তাঁর কোন অবদান নেই দুঃশাসন আর ব্যাথতা ছাড়া। '৭১ এর পরাজিত রাজকারেরা আবার সক্রিয় হলো। যারা আওয়ামী ঘরানার ছিল। তাদের নামে অস্ত্র মামলা দিয়ে জেলে পুরতে লাগল। শুরু হল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে হয়রানি ও জুলুম। আমার দাদা ও খালু এবং গ্রামের কিছু গন্যমান্য ব্যক্তি এইসব মামলার আওতায় পড়লেন। যেখানে যেখানে অস্ত্র লুকানো আছে বলে থানায় মামলা করা হয়েছিল। সেখানে থানার দারোগা কোন অস্ত্র খুঁজে পেলনা। প্রমাণ করতে না পেরে মামলা খারিজ হলে দাদা বাড়ীতে ফিরে আসেন। কারণ, মামলার কারণে তিনি তিন চার মাস আত্মগোপন করেছিলেন। এরপর জাতির পিতার কোন ছবি, লেখা কোথাও খুঁজে পেলাম না। না পত্রিকায় না পোষ্টারে। কেউ মুজিবের নাম উচ্চারণ করতে পারবেনা। যেন অলিখিত সংবিধান। চিরদিনের মত মুজিবের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা চলতে থাকল। কিন্তু কোটি কোটি বাঙ্গালির হৃদয় থেকে আজও তিনি মুছে যাননি। বরং তাঁর বুলেটের আঘাত এখনও বাঙ্গালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। সেই রক্তক্ষরণ চলেবে কাল থেকে মহাকাল পর্যন্ত।

নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের যেমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে, তেমনি আমার আকাঙ্ক্ষা হল জাতির পিতাকে জানার। দাদাকে দেখতাম, প্রায় একটা মোটা বই পড়ে বারান্দায় বসে। আমার কৌতুহল হলো কি বই পড়ে। দাদা বইগুলো যত্ন করে রাখতেন একটা কালো লেদার বাক্সে তালা দিয়ে। দাদা বাজারে চলে গেলে আমি খুব সাবধানে বই বের করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে আবার সেইভাবে রেখে দিতাম। এইভাবে কতদিন লুকিয়ে পড়েছি ’’আমি সুভাস বলছি” বইটা। সেখানে অসংখ্য ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের জীবনী লেখা, আর তার যুদ্ধের কোলাকৌশল। কিন্তু '৭৫ এর পর মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন যেন পাল্টে যেতে থাকে। জাতির জনকের শাসনামলকে দুঃশাসন বলে ইতিহাস লেখার আর এক অধ্যায় আরম্ভ হলো। এমনভাবে প্রচার করা হলো, স্বাধীনতা যুদ্ধ করে কোন লাভ হয়নি বরং মুজিব সরকার ব্যর্থ। এমনভাবে উপস্থাপনা করা হলো জাতির কাছে যে, এই স্বাধীনতার কোন দরকার ছিলনা, শুধু ৩০ লাখ মানুষ হুদাই মরল। পরীক্ষার প্রশ্ন এমন কৌশল করে তৈরী করা হলো যাতে মুজিব সরকারের দুঃশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার কারণ শিক্ষার্থীরা ছোট থেকেই বুঝতে পারে মুজিব সরকার কেমন ছিল। প্রশ্নের ধরণ ছিল কৌশলগত। যেমন, মুজিব সরকারের দুঃশাসনের চিত্রগুলি কি কি ছিল। মুজিব সরকারের ব্যর্থতার কারণ গুলি কি কি ছিল। এই প্রশ্ন গুলি ছিল বাধ্যতামূলক।
এরই একটি প্রশ্নসহ মোট দশটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে হতো। আর নম্বরও বেশী দেওয়া থাকত। আমি আর দাদার মেয়ে কোহিনুর খুব মন খারাপ করলাম। এমন প্রশ্নের ধরণ দেখে। দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম। ফেল করবো তবু ঐ প্রশ্নটির উত্তর লিখবনা। লিখিনিও কোনদিন।

আওয়ামী লীগ কতদিন নিষ্ক্রীয় ছিল আমার মনে নেই। ঝড়ের পড়ে আড়মোড়া ভেঙ্গে গাছ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে। তেমনি দেখলাম ১৫ই আগস্ট আওয়ামীলীগ কাঙ্গালী ভোজ আর দুই পাতার এক ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে থাকে। ক্রোড়পত্রের চার পৃষ্ঠায় থাকতো জাতির জনকের উত্থান পতন ও পরিবার স্বজনদের নির্মম হত্যাকান্ডের বিশদ বিবরণ, পরিবার ও স্বজনদের ছবি। ক্রোড়পত্রটি পড়লে অনেক দিন স্থির থাকতে পারতামনা। মনের ভিতর চলতো ভাঙ্গাগড়া। কাঁদতাম আমি লুকিয়ে। এই ক্রোড়পত্রটির জন্য অপেক্ষা করতে হতো আমাকে একটি বছর।

বিয়ের পর পেলাম ডানা মেলে উড়ার আকাশ। অসংখ্য বই পড়ার সুযোগ হলো। বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে পড়তে দেশের রাজনীতি সম্বন্ধে একটা স্বচ্ছ ধারণা জন্মে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এম আর আখতার মুকুলের বই গুলো বেশী টানতো। জাতির পিতা ও তাঁর শাসনামলের একটি চিত্র খুঁজতে পড়েছি পিতা সম্বন্ধে বিভিন্ন ধরনের বই, পড়ি এখনও বিভিন্ন কলাম, প্রবন্ধ, সাক্ষাতকার ইত্যাদি। এখনও খুঁজি যুদ্ধ পরবতী সঠিক ইতিহাস। বিভিন্ন ধরনের লেখা পড়ে মনের অনেক জটিলতা দুর হয়ে যায়। একটি সঠিক ও নির্ভুল পথের সন্ধান পাই। সরকারী চাকরীর সুবাদে অনেক জায়গায় ঘুরেছি। অনেক মানুষের সাথে হয়েছে পরিচয়। বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গায় বেড়ানো হতো। তারই ফলশ্রুতিতে কুড়িগ্রাম থাকা কালে আমার ”বাসন্তী” কে দেখার ও জানার সুযোগ হয়। যে বাসন্তীকে পাটের চট পরিয়ে দেশী বিদেশী স্বাধীনতা বিরোধীরা একজন বিদেশী সাংবাদিকের মাধ্যমে ছবি তুলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কাভারেজ করে যে, মুজিব সরকার ব্যর্থ এবং তাঁর দুঃশাসনের ফলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ দূর্ভিক্ষে কবলিত। কিন্তু জয়নুল আবেদিনের মতান্তরে দূর্ভিক্ষের একটি ছবি প্রমাণ করে যে, দুর্ভিক্ষ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। স্বাধীনতা উত্তর সরকারের শোষণ, নিপীড়ন, লুটপাট কতটা ভয়াবহ ছিল যে, তারাই সেদিন নিরন্ন জনগণকে ঠেলে দিয়েছিল যুদ্ধের দিকে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটি দেশ পূনর্গঠন করতে কিছুটা অসুবিধা হওয়া বিচিত্র নয়। সেদিন সেই ছবি দেখে জাতির পিতা বাংলার মানুষের কষ্টের মর্মবেদনায় উদ্বেলিত হয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে উত্থিত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমার দেশের মানুষের আমি কিছুই দিতে পারিনি। সর্বো কালের শ্রেষ্ঠ নেতা এভাবেই সব অপরাধ নিজের কাঁধে নিয়ে স্বাধীন দেশটাকে পুনর্গঠন করার সকল চেষ্টা অব্যহত রেখেছিলেন। সেই বাসন্তীর যখন আমি ছবি তুলতে চেয়েছি। সে ঘরের মধ্যে দ্রুত ঢুকে পড়ে। রাগে, দুঃখে, হতাশা মাথার ঘোমটাটা এমনভাবে মুখের সাথে লেপটে ধরে, যেন তার ছবি কেউ তুলতে না পারে। কিছুতেই যখন তার ছবি তুলতে পারছিলামনা। তখন বাড়ী ভর্তি লোকের মধ্যে একজন বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলাম। সে কেন ছবি তুলতে চাচ্ছেনা। বৃদ্ধার অভিযোগ, সবাই খালি ফটক তুলি নিয়ে যায় বাহে। কেউ কোন সাহায্য করেনা ,ফটক তুলি কি হইবে। আমি জানতে চাইলাম, সেদিন যে চট পরে ছবি তুলেছিল, কত টাকা দিয়েছিল। বৃদ্ধা নিরুত্তর। চুপ করে থাকেন। এই কথার জবাব তার জানা ছিল কি না জানিনা। আরেক প্রশ্ন করি, কি কথা বলে চট পরিয়েছিল। এবার বৃদ্ধা কথা বলার সুযোগ পেল। বলেছিল, ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপালে অনেক সাহায্য পাওয়া যাবে।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পূনর্গঠন করতে সেদিন অনেক দেশই এগিয়ে আসে। দুধ, বিস্কিট, টিনজাত মাছ মাংস আমিও খেয়েছি স্কুলের ছাত্রী হিসাবে। আমাদের রাজনীতিবিদরা জনগণকে কৌশলে ফাঁদে ফেলার জন্য রাজনৈতিক ফায়দা নেয়। এটাও ছিল সেদিন রাজনৈতিক বড় ষড়যন্ত্র। সেদিন মুজিব সরকার ব্যর্থ হয়নি। ব্যর্থ হয়েছিল দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে এদেশের কিছু সংখ্যাক উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক, সেনাবাহিনী, বুদ্ধিজীবী, কবি সাহিত্যিক ও বিপথগামী কিছু জনগণ তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে। সেই বাসন্তীর’ ৭৫ থেকে ৯৫ পযন্ত এই বিশ বছরে তার কোন অর্থনৈতিক পরিবর্তন হয়নি। সেই নদীর ধারে আজও উদ্বাস্তু হয়ে বসবাস করছে। তার ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জাতির পিতাকে পরিবার পরিজনসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। এখনও তো দেখিনা তার ভাগ্যের পরিবর্তন বরং ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের।

একদিন পারকি বীচ এ বেড়াতে গেলে সাগরে নেমে দু হাত ভরে পানি তুলে দেখছি। ও জানতে চায় পানি তুলে আমি কি দেখছি। কোন জবাব দিলামনা। কারণ, তখন মনের ভিতর যে রক্তক্ষরণ চলছে, তারই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় আমি বিধ্বস্ত। কষ্টের রং নাকি নীল। ’৭৫ এর ১৫ই আগস্টে যে আমি চোখের জলগুলো পানিতে মিশিয়ে ছিলাম। ঢেউগুলো নিশ্চয়ই এতদিন গড়িয়ে গড়িয়ে বিভিন্ন নদী দিয়ে সাগরে মিশেছে। সাগরের নীলের সাথে আমার কষ্টের নীল গুলো মিশে আরও গাঢ়ঁ নীল হয়েছে। না পেলামনা। পেলাম পরিবেশ দুষণের কারণে সাগরে ভেসে থাকা ময়লা আবর্জনা গুলো তার ঢেউ এর ধাক্কায় আবার বীচে তুলে দেওয়ার জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ভাবেই আমি খুঁজি জাতির পিতার স্মৃতি। যা আমাকে কখনও ভুলতে দেয়না। কি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমার জীবনের সাথে। কত অন্তরঙ্গ সে সম্পর্ক। বসে আছি কক্সবাজার কলাতলী লাবণী পয়েন্টে। একদল ছোট ছেলেমেয়ে জোরাজুরি শুরু করল গান শুনানোর জন্য। আলাপচারিতায় জানতে পারি তারা গান শুনিয়ে পর্যটকদের কাছে টাকা নেয়। আমি’ ৭১ এর গান শুনাতে বলি, অনেক টাকা দেব। ছেলেমেয়ে গুলো থমকে গেল। চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর জানালো, তারা ’৭১ এর গান জানেনা। আমি বলি, তাহলে টাকাও পাবেনা। ওরা নিরাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এক সময় ওরা জানায়, গান শিখিয়ে দিলে ওরা গান শুনাতে পারবে। আমি একটা মক্ষম সুযোগ পেয়ে গেলাম। ওদের যদি ’৭১ এর গান শিখিয়ে দেওয়া হয় তাহলে পর্যটকরা শুনতে পারবে স্বাধীনতার গান। কিভাবে আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। আমি ওদের সামনের দিকে ডান হাত উঁচু করে তর্জনী আংগুলটি সোজা করে ধরে বলতে বলি, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। আমি ওদের সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ধ্বনিটা অনন্তকাল ধরে শুনতে চাই।

১৯৯৮ সালে নভেম্বর মাসে ওর বদলী হলো মেহেরপুর জেলায়। দুর্গম একটা জেলা রাস্তা ঘাটের ঠিক নেই। তাছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে চরমপন্থীদের বিচরণ। এইসবভেবে আমি দমে যাই। ছোট দুটো বাচ্চা আর অসুস্থ শাশুড়ী। আমি গো ধরলাম যাবনা। সে তখন বদলী ক্যানসেল করার জন্য তদবির করতে থাকে। একদিকে ও মন্ত্রণালয় থেকে বদলী ক্যানসেল করে। আর মেহেরপুর এর ডিসি কামরুল ইসলাম পোষ্টিং করিয়ে নেন। এভাবে ৬/৭ বার খেলা চলে পোষ্টিং আর ক্যানসেল এর। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। ডিসি স্যার মন্ত্রীকে জানায় যে, সে একজন দক্ষ অফিসার তাকেই পোষ্টিং দেওয়া হোক। মন্ত্রী আর ক্যানসেল করলেন না। আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম, তোমাকেই কেন বারবার ওখানে চাইছে এমন জরুরী ভাবে। ও জানায়, ডিসি স্যার একজন দক্ষ অফিসার চাচ্ছেন। মুজিব নগর কমপ্লেক্স এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। একটা থানা হবে মুজিব নগর নামে। জেলখানার জন্যও ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ওর কথা শুনার সাথে সাথে শরীরময় একটা ভাললাগার রোমাঞ্চ বয়ে গেল।

সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা সেখানেই যাব। কমপ্লেক্স এর কাজ যত দ্রুত শেষ করা যায় ততই মঙ্গল। আমার যেন তর সইছিলনা। মনে হলো পাখির মত উড়ে যাই। ছেলেদের পরীক্ষা না দিয়ে ৭/৮ দিনের মধ্যে চলে যাই মেহেরপুর। গ্রামবাসীদের সাথে দফায় দফায় মিটিং ও বিভিন্ন কর্মসূচী চালালো ও। কিভাবে যেন ম্যানেজ হয়ে গেল। জনগণও স্বঃস্ফুর্তভাবে এগিয়ে আসে। জমি অধিগ্রহণ করতে বেগ পেতে হলনা। কাজ সফল হলেই ও আমার সাথে গল্প করতো তার সফলতা নিয়ে। আর আমিও চ্যালেঞ্জিং কাজে সবসময় সাহস যুগিয়ে এসেছি এতকাল। আমি মনে প্রাণে চাইছিলাম মুজিবনগর কমপ্লেক্স এর কাজ দ্রুত শেষ হউক। অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে থেমে যাবে কমপ্লেক্স এর কাজ। থেমে যাবে বাংলার ইতিহাস।

মুজিবনগর কমপ্লেক্সের কাজ দ্রুত চলছে। আমরা ভাবীরা মিলে প্রায় যেতাম মুজিবনগরে। যেন বিনোদনের একটা জায়গা তৈরী হলো। সময় হলেই ছুঁটে যেতাম মুজিবনগরে। এই আম্রকাননের ছায়ায় বসে সিরাজদৌলার স্মৃতি রোমন্থন করতাম। আর অনুভব করতাম জাতির পিতার অস্তিত্বকে। একে অপরের মিল খুঁজতাম ইতিহাসের পাতায়। এখানে মসজিদ, মার্কেট, মোটেল, এতিমখানা, প্রাইমারীস্কুল, আর থাকবে হাজার হাজার গোলাপের একটি মনোরম উদ্যান। ঘুরে ঘুরে দেখছি আর কল্পনায় কমপ্লেক্সের সৌন্দর্যের একটা রোমাঞ্চকর ছবি ভেসে উঠছে মনের পাতায়। এটা একটা ইতিহাসতো হবেই, আর এর সৌন্দর্য পর্যটকদের কাছে মহিরুহ হয়ে দেখা দেবে। তার কারণ, এই পলাশীর প্রান্তরে ১৭৫৭ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব তাঁর বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্ত গিয়েছিল। ঠিক ২০০ বছর পর এই সেই আম্রকানন, সেই পলাশীর প্রান্তরে বাংলার সূর্য আর একবার উদিত হলো জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেইনা। যার কারণে পলাশীর প্রান্তরে এই আম্রকাননে ক্ষমতার লোভে কুচক্রী মন্ত্রীবর্গ ও অর্থলোভী সিপাহীদের মাধ্যমে যেমন নবাব সিরাজদৌলার পতন হয়েছিল, ঠিক তেমনি ১৯৭৫ সালে ক্ষমতার লোভ আর স্বাধীনতা বিরোধীদের ষড়যন্ত্রে আর এক বার ইতিহাস কলঙ্কময় হলো। এ কলঙ্ক যেমন অমোচনীয় তেমনি বাংলার ইতিহাসে চিরদিন আলোকিত হয়ে থাকবে বাংলার সোনালী রবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ProthomaChowdhury
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ksa থেকে MD. KHORSHED ALAM লিখেছেন, ২৬ ডিসেম্বর ২০১০; বিকেল ০৪:৪৭
shudu matro awamileague khamatai alai ai doroner onek lekhar vir amora dekhte pai... 2001-----2006 porjonto aponi ao lekha keno lekhen ni... takhan aponar bongobondhu priti cilo na. ekhon jarai beshi beshi kore mujib priti dekha be tader k ami sarthopor bolo..
44158
ঢাকা থেকে প্রথমা চৌধুরী লিখেছেন, ৩১ ডিসেম্বর ২০১০; রাত ১১:৫৮
খোরসেদ আলম, আপনাকে ধন্যবাদ। তখন লেখার তেমন সুযোগ হয়নি। তাই লিখিনি। আমি স্বার্থের জন্য লিখিনি ভাই। আমার ছোট্ট মনের ভালাসার অনুভুতির কথা লিখেছি। আর বঙ্গবন্ধুকে কে না ভালবাসে। যারা এখনও বিরোধীতা করে যাচ্ছেন তাঁরা বুকে হাত দিয়ে বলুক,তারা ভালবাসে কিনা। ভাললাগেনি মন্তব্য গুলো পড়তে চাই।
44591
ঢাকা থেকে মাসুদ আনোয়ার লিখেছেন, ০৫ জানুয়ারি ২০১১; রাত ০৯:৪৮
...বঙ্গবন্ধুকে কে না ভালবাসে। যারা এখনও বিরোধীতা করে যাচ্ছেন তাঁরা বুকে হাত দিয়ে বলুক, তারা ভালবাসে কিনা। প্রিয় প্রথমা চৌধুরী, আপনি খুব ভালমানুষ. তাই মানুষের ওপর আস্থা হারাতে চান না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারীরা আপনার মত ভাল মানুষ নয়। তারা বঙ্গবন্ধুকে অনেক কিছুই মনে করে। কারণ তারা তো সব জবরদস্ত মুসলমান। বঙ্গবন্ধুর মত একজন সাধারণ মুসলমান কী করে তাদের ভালোবাসা পাবেন? আর তারা বুকে হাত দিয়ে বলবে কোত্থেকে? আপনি কি মনে করেন, তাদের বুক মানে মন আছে? মন থাকলে তারা কী করে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে সিরাজ শিকদারের ক্রসফায়ারের বিচার চায়? সিরাজ শিকদার কি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করতেন? তার হাতে কত লোক মারা গিয়েছিল, তার হিসেব কে দেবে?তারা কী করে এক রাতে একটা পরিবারের এতগুলো লোকহত্যাকে চুপচাপ মেনে নেয়। গর্ভবতী নারী, অবোধ শিশুহত্যা পর্যন্ত তাদের মনে সামান্য প্রতিক্রিয়া জাগাতে পারে না। তাদের বুকে হাত দিয়ে বলতে বলুন তো, বঙ্গবন্ধু হত্যায় কার কী লাভ হয়েছিল? না, হয়েছিল। একাত্তুরে যারা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা পাকিদের গোলামিকে শ্রেয়জ্ঞান করেছিল, তাদের অনেক লাভ হয়েছিল। সে জন্যই তো আজ তাদের জিভ এতটা লম্বা। যাক, অনেক বলে েফললাম। ..্আপনাকে ধন্যবাদ।
45064
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy