|
বলিউডের ভালো-মন্দ
কাজী আলিম-উজ-জামান |
|
ভারত অনেক বড় দেশ। সে দেশে তামিল, তেলেগু, বাংলা, মালায়ালাম, কানাড়া ভাষায় প্রচুর সিনেমা তৈরি হয়। একেকটা এলাকা থেকে একেকটা ভাষার ছবি তৈরি হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গে বাংলা, দক্ষিণ ভারতে তামিল, কেরালায় মালায়ালাম। তবে জাতীয়ভাবে এসব ততটা আলোচিত হয় না। যেগুলো জাতীয় পুরস্কার পায়, সেগুলো কিছুটা আলোচনায় আসে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সব সময় মুম্বাইভিত্তিক বলিউড। শত শত হিন্দি ছবি মুক্তি পায় এই বলিউড থেকে। বলিউডকে বলা হয়, হিন্দি ছবি তৈরির জমজমাট কারখানা। বলিউড নিয়ে ভারতের সব জনগণের আগ্রহ, জাতীয় গনমাধ্যমেরও প্রবল আগ্রহ। ভারতের মত একটা ‘গণতান্ত্রিক দেশেও’ অন্য ভাষার ছবিকে হটিয়ে কেবল হিন্দি ভাষার ছবি নিয়ে সর্বত্র মাতামাতি বিস্মিত করে আমাদের।
নাচ ও গান হচ্ছে এই ছবিগুলোর প্রধান উপজীব্য। ভারতীয়রা বলে, ‘নাচা-গানা’। ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যও নির্ভর করে এই নাচা-গানার ওপর। কাহিনী যাই হোক, যত ভালো হোক বা যত খারাপ হোক, সেটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গানগুলো ভালো হতে হবে, এর সঙ্গে নাচ। এ ছবিগুলোকে অনেক সময় বলা হয় মাসালা বা মসলা ছবি। দর্শক ছবিটি খাবে। খেয়ে টক-ঝাল চাটনির অনুভূতি পাবে। দর্শকদের এ চাহিদার ব্যাপারে পরিচালক-প্রযোজক, কলাকুশলী সবাই সব সময় সচেতন। তারা জানেন, ভারতীয় দর্শকেরা তাদের টাকার সর্বোচ্চ উসুল চান। বলিউডের সিনেমার যদি কোনো চূড়ান্ত উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তা হলো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্যেই ছবিতে দেশপ্রেম, ক্রিকেট, স্বাধীনতার মত আবেগী বিষয় গড়গড় করে বিক্রি হয়ে যায়।
বলিউডের খুব কম ছবি আছে, যেগুলোতে নাচ-গান কম আছে। একটা ছবি যদি হয় আড়াই ঘন্টা, তবে এর মধ্যে সোয়া ঘন্টা বা দেড় ঘন্টা নাচ-গান। কিছু ছবি শুরু হয় নাচ-গান দিয়ে, শেষও হয় এভাবেই। অধিকাংশ ছবির কাহিনীই অতি নাটকীয়। প্রেম, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ক্ষুব্ধ অভিভাবক, মাদক পাচার, পুলিশ-সন্ত্রাসী সখ্যতা, মোটা দাগে এই-ই হিন্দি ছবির কাহিনী। একেকটা ছবি একেকটা কাহিনী তাদের মত করে ব্যবহার করে। এতেই নির্মিত হয়ে যায় একটা মাসালা ছবি। ইদানিং কাশ্মীর ও পাকিস্তান নিয়ে কিছু ছবি হয়েছে, যেগুলোর মোদ্দা কথা ভারতের অবস্থান ঠিক আছে, পাকিস্তানের অবস্থান ঠিক নেই। যা দুটি দেশের টালমাটাল কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও খাটো করছে বলে অনেকে বলেছেন।
এই বলিউডের ছবি আমাদের বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে দেখানোর সব আয়োজন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল! শেষ পর্যন্ত কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ আর প্রথম সারির কিছু গণমাধ্যমের প্রচেষ্টায় সে চেষ্টা রোখা সম্ভব হয়েছে।
বলিউডি গান : গানগুলো সাধারণত আগেই ধারণ করা হয়। পেশাদার কন্ঠশিল্পীরা এগুলো পরিবেশন করেন। পরে নায়ক-নায়িকারা কেবল ঠোঁট মেলান। ব্যতিক্রম দুএকটা উদাহরণ আছে। প্রখ্যাত শিল্পী কিশোর কুমার ১৯৫০ এর দশকে দুএকটি ছবিতে অভিনয়ও করেছেন। সে ছবিগুলোতে তিনি গান গেয়েছেন। কে এল সায়গল, সুরাইয়া এবং নুর জাহান, তারা একইসঙ্গে অভিনয়শিল্পী এবং সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে পরিচিত। অমিতাভ বচ্চনকে দিয়ে সিলসিলা, মহান, তুফান, ভগবান, কাভি খুশী কাভি গাম প্রভৃতি ছবিতে ‘গান’ গাওয়ানো হয়েছে। তবে সেগুলো কতটা গান বা সঙ্গীত হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে ঢের। আমির খান গুলাম ছবিতে ‘কেয়া বলতে তু’ গেয়েছেন। এটার বেলায় একই কথা বলা যায়। অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠশিল্পী বানানোর ইচ্ছে পরিচালকদের। দর্শকদের ভিন্ন রকম আনন্দ দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।
নাচ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? : ভারতীয়রা কিন্তু নাচে সমৃদ্ধ। ধ্রুপদী ধারা, উত্তর ভারতীয় ধারা এবং লোক ধারা। এই তিনটি মূল নাচের ধারা। এই তিনটি ধারার মিশেল নিয়ে গড়ে উঠেছে বলিউডি ধারা। সাধারণত নাচগুলো এমন হয়, নায়িকা ও নায়ক নাচছেন, সঙ্গে একদল সখা ও সখী। সব সখীদের পোশক এক ধরনের, কেবল নায়িকার পোশাক আলাদা। সব সখাদের পোশাক এক ধরনের, কেবল নায়কের ছাড়া। হয়তো নায়ক ও নায়িকাকে সখা-সখীদের থেকে আলাদা করতেই এমন আয়োজন। লক্ষ্যণীয় হলো, নায়কের শরীর পোশাকে মোড়াই থাকে। শাহরুখসহ অনেক নায়কই নাচের সময় কোট-টাই পরেন। অন্যরা চরিত্র অনুযায়ী পোশাক পরেন। তবে আপাদ মস্তক ঢাকা। কিন্তু কিন্তু নায়িকা আর তার সখীদের গায়ে পোশাক কই? বিস্তারিত বর্ণনায় যাওয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। এর সঙ্গে অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার তো আছেই। ওই যে আগে বলেছি, পরিচালক-প্রযোজকেরা দর্শকদের চাহিদার কথা মাথায় রাখেন। আর দশর্কেরা তাদের টিকিটের দাম উসুল করতে চান। দাম উসুলের এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি আর কি বা হতে পারে!
ইদানিং কোরিওগ্রাফাররাই চলচ্চিত্রের নাচকে বিশেষ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। নাচ ফাটাফাটি হতেই হবে। এ রকম একজন কোরিওগ্রাফার ফারাহ খান। ‘ম্যায় হু না’ ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন তার জারি-জুরি। আর যশ চোপরা ও করণ জোহরের মত কয়েকজন প্রযোজক আছেন, যারা নাচ-গানের পাশাপাশি খুবই আবেগী চরিত্র উপস্থাপন করেন।
সংলাপ : সংলাপ হিন্দি ছবির গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে আছে। সংলাপগুলো খুবই জোরালো বক্তব্য বহন করে। বলা যায়, বলিউডি ছবিগুলো সংলাপ নির্ভর। হলিউডের ছবিতে, বা ইউরোপের অনেক দেশের ছবিতে আমরা অন্য চিত্র দেখি। সেখানে সংলাপে রসবোধ খুবই জোরালো। সেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বলেন কম, পারফরম করেন বেশি। আর বলিউডের ছবিতে তারকারা বলেন বেশি, পারফরম করেন কম। বলিউডের ছবির সংলাপে সৃষ্টিকর্তা, পরিবার ও মা-এই তিনটি বিষয় ঘুরে-ফিরে আসে। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পেয়েছিল ‘দিওয়ার’ ছবিটি। এতে দুই ভাই বিজয় ও রবির কিছু সংলাপ শোনা যাক। ছবিতে বিজয় গ্যাংস্টার আর রবি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।
বিজয় : আমরা দুজন একসঙ্গে এক জায়গা থেকে জীবন শুরু করেছিলাম। দেখ, আজ আমি কোথায় আর তুই কোথায়। আমার দামি গাড়ি আছে, আলিশান বাড়ি আছে, দৌলত আছে। কিন্তু তোর কী আছে?
রবি : আমার আছে মা।
বলিউডে আসা আর যাওয়া : বলিউডে যারা কাজ করে, তারা সবাই সারা ভারতের লোক, কেবল মুম্বাইয়ের লোক নন। সারা ভারত থেকে মেয়েরা, যারা নিজেদের সুন্দরী, আকর্ষণীয়া মনে করেন, যারা নাচ জানেন, তারা আসেন বলিউডে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাদের শতকরা পাঁচজন সফল হন। বাকীরা হারিয়ে যান। কেউ মডেলিংয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ ছোটখাট দুএকটি চরিত্র করে নিভে যান। কেউ কোনো প্রযোজকের সেক্রেটারি হিসেবে, কেউ ধনবান শিল্পপতির প্রেমিকা বনে যান। মাদক ও আন্ডারগ্রাউন্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন অনেকে। বড় একটি অংশের ঠাই হয় পতিতাবৃত্তিতে। ফুলে-ফেঁপে ওঠে মুম্বাইভিত্তিক এই ব্যবসা।
একবার একটি ছবি বাণিজ্যিক সাফল্য পেলেই একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী বলিউডে বড় তারকা হয়ে গেলেন, তার নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। প্রযোজক-পরিচালকেরা সর্বোচ্চ দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার তাকে ব্যবহার করে দেখেন, সাফল্য না পেলে বাদ। সাম্প্রতিক কালে অভিনেতাদের মধ্যে আমির খান একজন, যার ছবি ব্যবসাসফল হয়। বলিউডে প্রতিযোগিতা খুবই নির্দয়, এখানে বক্স অফিসের সাফল্যের ওপরেই সব কিছু নির্ভর করে। একমাত্র কাপুর পরিবার অনেক বছর ধরে এখানে রাজত্ব করছে। পৃত্থিরাজ কাপুর, তার তিন ছেলে রাজ কাপুর, শাম্মি কাপুর ও শশী কাপুর, রাজের ছেলে রন্ধির, ঋষি এবং রাজিব, আর রন্ধিরের দুই মেয়ে কারিশমা ও কারিনা, এরা সবাই মোটামুটি পরিচিত। তবে এসব বংশ, অবস্থান কোনোই গুরুত্ব বহন করে না, যদি ছবি বক্স অফিসে হিট না হয়।
বিনিয়োগ ও বিতর্ক : ভারতের জনগণের বিরাট অংশ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। কিন্তু বলিউডের সিনেমায় অবশ্য তার কোনো প্রতিফলন নেই। সিনেমা দেখে মনে হতে পারে, ভারতীয়রা অনেক ধনী, সবাই কতটা সুখী। সে দেশের সব নাগরিক গান করে, নাচে। ইদানিং বলিউডের ছবির শুটিং হয় নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, মরিশাস, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়। প্রশ্ন আসে, এত টাকা কোথায় পায় ভারতীয় প্রযোজকেরা। অভিযোগ রয়েছে, কালো টাকার মালিক, মাফিয়া, আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্রাটেরা এই ছবিতে বিনিয়োগ করে। মাদক বিক্রিও টাকায় কি না করা যায়!! আর তাই, তারকারা নাকি এসব মাফিয়া ডনদের হাতের পুতুল।
একটা বড় বাজেটের সিনেমার ভালো বাজার পাওয়ার জন্য হেন কোনো চেষ্টা নেই, যা প্রযোজকেরা করেন না। সিনেমা মুক্তির আগে বিতর্ক হয়, বিক্ষোভ-মিছিল হয়, পোস্টার পোড়ানো হয়, সাম্প্রদায়িতকতার দিকে নেওয়া হয়। কত শত মামলা পর্যন্ত হয়। এর কতটা সত্যি তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেকে বলেন, এসব নাকি সাজানো। যত বিতর্ক হবে, ততই ছবির বাণিজ্যিক সাফল্যের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। যারা বিতর্কে অংশ নেন, তারা নাকি প্রযোজকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা পান। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত ছবিটি যদি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়, তাহলে আর কথা নেই। সব বিতর্ক-উত্তেজনা, পোস্টার ছেঁড়াছিড়ি, সব মামলা-মোকদ্দমা নিমেষে উধাও। এই হলো বলিউড আর তার ছি:নেমা!
লেখক : সাংবাদিক, ইমেইল : alim_zaman@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/QaziAlimuzzaman |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
হতে চেয়েছিলেন সাহিত্যিক। কিন্তু হতে হল সাংবাদিক। যদিও সাহিত্যের দুএকটি শাখায় তার বিচরণ আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ার সময়ই সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি। আজকের কাগজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৯৭ এর মাঝামাঝি যাত্রা শুরু। এর পরে ১৯৯৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদান। এরপরে ২০০১ সালের নভেম্বর থেকে দৈনিক প্রথম আলোতে। বর্তমানে সেখানে তিনি সহকারি বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
গত এক দশক ধরে উপমহাদেশ ও সমকালীন আন্তজার্তিক রাজনীতি নিয়ে তিনি বিস্তর লেখালেখি করছেন। তার লেখায় উঠে এসেছে আন্তজার্তিক অর্থনীতির অনেক বিষয়ও। ছোটগল্প লেখেন। ব্লগ লেখা তার হবি। সাংবাদিকদের কিছু সংগঠনের সদস্য তিনি। এখন সাংবাদিকতা পুরোপুরি উপভোগ করেন।
জন্ম বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার সৈয়দমহল্লা গ্রামে। এসএসসি ও এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা বাগেরহাটেই। |
|