মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৬:৫৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

দুইদিনের মন্ত্রী

কাজী জহিরুল ইসলাম

বসন্তকালকে আলবেনিয়ানরা বলে প্রাণভেরা। এখন প্রাণভেরা চলছে। এ সময়ে তুষারপাত হয় না কিন্তু কনকনে ঠান্ডা বাতাসে হাঁড়ে কাঁপন ধরে ঠিকই। শীতে গুটিয়ে যাওয়া কসোভো আস্তে আস্তে জেগে উঠতে শুরু করে অতি সংক্ষিপ্ত এই প্রাণভেরা ঋতুতে। এরপরই সকলের প্রিয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ঋতু ভেরা অর্থাৎ গ্রীষ্মকাল। সামারে গ্রান্ড হোটেলের লবিতে খোলা রেস্টুরেন্টের পশরা বসে। তার প্রস্তুতি চলছে। প্রাণভেরাটা আসলে ভেরার প্রস্তুতিমূলক ঋতু। এই সময়ে ওভারকোর্টের ভেতর থেকে আস্ত আস্তে বেরুতে থাকে কসোভো। কসোভোর সুন্দরী ললনাদের কাপড় খোলার উৎসব শুরু হবে আর ক’দিন পরেই।

কসোভোর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। ইব্রাহিম রুগোভোর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে কসোভোর প্রথম সরকার, দশ মন্ত্রীর একটি ছোট্ট কেবিনেট আর ১২০ সদস্যের সংসদ। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বাইরাম রেজেপি। যদিও অফিশিয়ালি এখনো কসোভো সার্বিয়ার একটি প্রভিন্স কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সার্বিয়ার কোনো খরবরদারী চলে না কসোভোতে। কসোভোর যে সরকার গঠিত হয়েছে, এটা প্রভিশনাল সরকার। কাজ করছে জাতিসংঘের প্রতিনিধি (মহসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি), কসোভো মিশনের প্রধান জার্মান ডিপ্লোমেট মাইকেল স্টাইনারের অধীনে। একটা খিচুরি টাইপের ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদ, সংসদ, স্পিকার সবই আছে কিন্তু কোনো দেশ নেই। সরকার আছে কিন্তু কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা সব জাতিসংঘের হাতে। মন্ত্রীই মন্ত্রণালয়ের প্রধান কিন্তু সব মন্ত্রণালয়েই মন্ত্রীর প্যারালাল একজন করে জাতিসংঘের অফিসার রয়েছে, যার পদবী প্রিন্সিপাল ইন্টারন্যাশনাল অফিসার (পিআইও)। অনুরূপভাবে মন্ত্রণালয়গুলোর সমস্ত বিভাগেও বিভাগপ্রধানদের সমকক্ষ জাতিসংসঘের অফিসার রয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রী এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের হাতে থাকলেও জাতিসংঘ যে কোনো বিষয়ে ওভাররুল করতে পারে। এমন কি চাইলে সংসদও ভেঙ্গে দিতে পারে, সরকারকেও বহিস্কার করতে পারে। তবে জাতিসংঘের অফিসারদের বলা হয়েছে, তোমরা উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করো। ওদেরকেই সরকার চালাতে দাও। যদি বড়- ধরনের ভুল করে তখনই কেবল হস্তক্ষেপ করবে।

এই অসীম ক্ষমতাধর সংস্থাটিতে আমি যোগদান করি সংস্কৃতি, ক্রীড়া, যুব প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসন বিভাগের প্রধান হিসাবে। আমার কাউন্টারপার্ট যিয়েদিন প্রথম তিনমাস এরকম আমার এসিসট্যান্ট হিসাবেই কাজ করেছে। এখন যে অনেক বিষয়েই একা একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে ফাইল-পত্রে কিছু লেখার আগে আমাকে ড্রাফট দেখিয়ে নেয়। আমাদের মন্ত্রণালয়ের পিআইও ভেস্কপেশ বিয়ালা পাপা রাও। রাও বেশ প্রতাপশালী অফিসার, ভারত সরকারের সচিব। লিয়েনে জাতিসংঘে কাজ করছেন। আঞ্চলিকতার টানেই হোক আর যে কারণেই হোক রাও আমাকে বেশ পছন্দ করেন। রাওয়ের দুটো দায়িত্ব, মন্ত্রী বেহজেত ব্রাইশোরির কাউন্টারপার্ট, অর্থাৎ পিআইও-র দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাকে মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারীর দায়িত্বও পালন করতে হয়ে। পার্মানেন্ট সেক্রেটারী মানে আমাদের দেশের সচিব। একদিন সকালে রাও আমাকে তার রুমে ডেকে নিয়ে বললেন, আমি একমাসের ছুটিতে যাচ্ছি। এই একমাস তুমি, আমার দায়িত্ব পালন করবে। আগামী দুইদিনে দায়িত্ব বুঝে নাও। আমি বললাম, দেখো, আমি কোনোদিন সরকারী চাকরী করিনি। তাছাড়া মন্ত্রণালয়ে আমার চেয়ে জৈষ্ঠ্য আরো চারজন কর্মকর্তা রয়েছেন, আমাকে চার্জ দেয়া কি ঠিক হবে? তিনি খুব ঠান্ডা মাথার লোক। আমার কথায় একটু হাসলেন। তারপর বললেন, সরকারী নথি-পত্রতো দেখি তুমি ভালোই বোঝো। আশা করি অসুবিধা হবে না। বুঝলাম এ বিষয়ে আর কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। আমি কিছুটা অস্বস্থি বোধ করছি, বিশেষ করে যখন স্টাফ মিটিংগুলো চেয়ার করবো, তখন দুজন আমেরিকান জৈষ্ঠ অফিসার এবং ফরাসী ডিপ্লোম্যাট ষাট বছরের বুড়ো জেরার্ড বিষয়টাকে কিভাবে দেখবে? ক্যারাবিয়ান ইমানুয়েলের কথা না হয় বাদই দিলাম।

কিন্তু দেখা গেলো, সমস্যা সৃষ্টি করলো ওই ইমানুয়েলই। স্টাফ মিটিংয়ে ও এলো না। আমিও আর এ নিয়ে ঘাটাইনি ওকে। আমেরিকান দুজন মিটিংয়ে টুকটাক প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া তেমন কিছুই বললো না। জেরার্ড বিষয়টাকে নিলো খুবই হাল্কাভাবে। এছাড়া আর যেসব ইন্টারন্যাশনাল অফিসার আছেন (১৬/১৭ জন) ওদের নিয়ে আমার তেমন কোনো চিন্তার কারণ ঘটেনি। পরদিন সকালে জেরার্ড একটি ছুটির দরখাস্ত নিয়ে আমার অফিসে হাজির। আমিও কোনকিছু না দেখেই সই করে দিলাম। আসলে আমিও চাচ্ছিলাম এই চারজন আগামী একমাস একটু দূরে দূরে থাকুক। বিষয়টা অনেক পরে বুঝেছি, রাওয়েরও এটাই উদ্দেশ্য ছিলো। ও জানতো আমাকে চার্জ দিলে ওরা ছুটি ছাটা নিয়ে কেটে পড়বে। আর ওরা মন্ত্রাণালয়ে না থাকলে রাওয়ের অবর্তমানে ওর বিরুদ্ধে কোনো কন্সপ্রেসি হবে না। ভারত সরকারের সচিব, বড়ই কঠিন চিজ।

রোজ সকালে মন্ত্রীর সঙ্গে একঘন্টার একটা ব্রিফিং থাকে। আজ সকালে মন্ত্রী জানালেন তাকে দুদিনের জন্য জার্মানীতে যেতে হবে। সুতরাং এই দুদিন আমাকে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করতে হবে। কিছু ফাইলপত্রে সই করা আর মিটিং ফিটিংয়ে আ্যাটেন্ড করা, তেমন কিছু না, তুমি পারবে। বলেই হাসলেন ব্রাইশারি।

কসোভো কারাতে ফেডারেশনের চেয়ারম্যান আমার অফিসে এসে হাজির। ওদের ফেডারেশন আন্তর্জাতিক কারাতে ফেডারেশনে এসোসিয়েট মেম্বারশিপ পেয়েছে, আর এর সেলিব্রেশন। মন্ত্রী বেহজেত ব্রাইশারি প্রধান অতিথি হিসাবে যাওয়ার কথা, তিনি নাই। কাজেই আমাকে যেতে হবে। আমি যিয়েদিনকে ডাকলাম। যিয়েদিন সম্মতি দিলো। বললো, আমরা সবাই দল বেঁধে তোমার পেছনে মিছিল করতে করতে যাবো। বিকালে ছোট খাটো একটা মিছিলের মতোই হলো, বিশাল কালো কালো ওভারকোর্ট পরা একদল মানুষ মিছিল করতে করতে যাচ্ছি স্পোর্টস কমপ্রেক্সের দিকে। মন্ত্রণালয় থেকে তিন মিনিটের ওয়াকিং ডিসটেন্স। কাজেই আমরা হেঁটেই রওয়া দিলাম। আমাদের সঙ্গে আছেন ১৯৯৮ সালের বিশ্ব মহিলা কারাতে চ্যাম্পিয়ন, এই মূহুর্তে ওর নামটা ভুলে গেলাম।

প্রধান অতিথিকে রিসিভ করার জন্য ফেডারেশনের সভাপতিসহ একদল কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছেন ঠিকই কিন্তু মঞ্চ-ফঞ্চের তেমন কোন আয়োজন নেই। অত্যন্ত শাদা-মাটা একটা ঘরোয়া আয়োজন। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ২০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারী দেখলাম, যেখানে কসোভোর কারাতে ফেডারেশনের সাফল্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এরপর মাইকে আমার নাম ঘোষণা করা হল। একটি ভিড়কে পেছনে নিয়ে মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। আমার ডানপাশে এক আলবেনিয়ান সুন্দরী, ভালবোনা, আমার ভাষা সহকারী। কি বক্তৃতা করবো? আমি কারাতের কি বুঝি? দেশে বক্তৃতা করতে হলে অনেক কিছু ভেবেচিন্তে করতে হয়, কে কোনটা ধরে বসে ঠিক নেই, সবাই চেনা জানা মানুষ। কিন্তু এই দেশে আমাকে কে চেনে, একটা কিছু বলে দায়িত্ব পালন করে চলে গেলেই হলো। শুরু করলাম, আজকের এই সাফল্যের আনন্দ তোমাদের সাথে শেয়ার করতে পেরে আমি গর্বিত। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ফেডারেশনের সকল স্তরের কর্মী ও কর্মকর্তাকে অভিনন্দন জানাই। আমি কারাতের কিছুই বুঝিনা। কিন্তু ওই ডকুমেন্টারীটা দেখতে দেখতে আমার মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন দেখা দিলো। সবাই শাদা পোশাক পরে এই যুদ্ধের খেলাটা কেনো খেলে? শাদা হলো শান্তির প্রতীক। আমার মনে হলো, এই যুদ্ধটা শান্তির জন্য। অকল্যাণের বিরুদ্ধে কল্যাণের ও যুদ্ধ অব্যহত থাকুক। জাতিসংঘের পতাকার রঙ নীল। নীল মানে আকাশ। এসো আমরা অভিন্ন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাই। সাফল্য অর্জন যতো কঠিন, এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা তার চেয়েও কঠিন। আশা করি কসোভো কারাতে ফেডারেশন খুব শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করবে। করতালিতে ফেটে পড়লো সবাই। মিডিয়ার ক্যামেরাগুলোর ফ্ল্যাশলাইট ক্রমাগত জ্বলতে থাকলো। এরপর একটি শ্যাম্পেইনের বোতল খুলে ককটেল পার্টির শুভ উদ্ভোধন করলাম।

ফেরার পথে যিয়েদিন আমাকে কানে কানে বললো, রাও আর ফিলে না এলেও ক্ষতি নেই।

কিছুদিন আগে কসোভোর প্রথম প্রেসিডেন্ট ইব্রাহীম রুগোভো মারা গেছেন। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/QuaziJahirulIslam
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে সাইফ বরকতুল্লাহ লিখেছেন, ২৪ জুলাই ২০১০; সকাল ১১:১৯
ভাল লাগল।
28565
dhaka থেকে jashim লিখেছেন, ২৪ জুলাই ২০১০; সকাল ১১:৩৭
jhohir bhai kemon assen?
28573
ক্যানাডা থেকে পাঠক লিখেছেন, ২৪ জুলাই ২০১০; রাত ০৯:১৬
অথচ চীন ও রাশিয়ার চাপে বাংলাদেশ এখনও কসোভোকে স্বীকৃতিই দেয়নি। দুঃখজনক!
28675
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy