বাংলাদেশের ক্রিকেট বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হলো। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ তিনটি ম্যাচ জিতেছে। তিনটিতে হেরেছে। এ ফলাফল আমরা সবাই জানি।
এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সাফল্য নেহায়েত মন্দ বলা যায় না। তিনটি ম্যাচ জেতা ছিল বাংলাদেশের প্রাথমিক লক্ষ্য। তা কিন্তু পূরণ হয়েছে। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে পারিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিন্তু সমান সংখ্যক পয়েন্ট নিয়েই শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে। রান রেটে ওরা এগিয়ে ছিল।
আমরা যে তিনটা ম্যাচ হেরেছি, এর মধ্যে দুটো ম্যাচে আমাদের রান ৫৮ ও ৭৮। এত অল্প রানের মধ্যে আমাদের সব ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যাওয়া ক্রিকেটপ্রেমীরা মানতে পারছেন না। আমাদের তিনটি জয়ের সাফল্য ম্লান করে দিচ্ছে এই ৫৮ আর ৭৮। সমর্থকেরা আশা করেছিলেন, বাংলাদেশ দল ইতিবাচক ক্রিকেট খেলবে। হারার আগেই হারবে না। লড়াই করবে শেষ বলটি পর্যন্ত।
ভারতের সঙ্গে ম্যাচটি বাদ দিলে বাংলাদেশের বোলিং কিন্তু মোটামুটি ভালো হয়েছে। আমাদের দুই পেসার শফিউল ও রুবেল কিন্তু ততটা খারাপ করেননি। যদিও তারা রান আটকাতে সমর্থ হলেও উইকেট তেমন নিতে পারেননি। আমাদের বাঁহাতি স্পিনার রাজ্জাক, সাকিব, নাঈম ও মাহমুদউল্লাহ বেশ ভালো করেছেন। কিন্তু খারাপ হয়েছে আমাদের ব্যাটিং। ভারতের সঙ্গে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ করেছিল ২৮৩ রান। এরপরে আর আড়াইশ পেরোতে পারেনি তামিম, রকিবুল, জুনায়েদরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ ৫৮ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল। বিশ্ব ক্রিকেটবোদ্ধারা তবুও বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এটা একটা দুর্ঘটনা, একটা বাজে দিন আসতেই পারে-এ রকম কথা বলে তারা উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ২৮৪ রান চেজ করতে নেমে বাংলাদেশ আউট হয়ে যায় ৭৮ রানে। তখন আর বলা যায়নি এটা দুর্ঘটনা। তখন মনে হয়েছে, আমাদের সামর্থ এতটুকুই! বাংলাদেশ দল সম্পর্কে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরির জন্য সবাই গালমন্দ করে আমাদের গণমাধ্যমকে।
যাই হোক, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিবি এরই মধ্যে সব দোষ চাপিয়েছে জেমি সিডন্সের ওপর। ঘনিষ্ঠ সূত্রের খবর মতে, অস্ট্রেলীয় কোচের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো নাও হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুক, টুইটার, প্রভাবশালী ব্লগ সামহোয়ার ইন বাংলাদেশ এবং সচলায়তনেও এক শ্রেণীর লেখক যত দোষ সিডন্স আর সাকিবের ওপর চাপাচ্ছেন। সিডন্সের ব্যাপারে তারা নানা ধরনের অশ্লীল শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করছেন। তারা সাকিবকে অধিনায়কের জায়গা থেকে সরানোর জন্য জোরালো মতামত দিচ্ছেন। তাদের কথা, সিডন্স একজন ব্যাটিং কোচ। তিনি কোনোভাবেই ৫৮ আর ৭৮ এর দায় এড়াতে পারেন না।
এ কথা হয়তো ঠিক, তিনি দায় এড়াতে পারেন না, যেহেতু তিনি কোচ। আবার এটাও তো ঠিক, তিনি তো আর মাঠে গিয়ে খেলে দিয়ে আসবেন না। তিনি টেকনিকগুলো শেখাবেন। খেলোয়ারদের চাঙ্গা রাখবেন। সেটা তিনি করেছেনই। তা না হলে গত দুই বছরে এতগুলো ম্যাচ জিতলো বাংলাদেশ, তাতে কী তার কোনো অবদান নেই? এই হলো আমাদের জাতীয় সমস্যা। জিতলে ভাগ সবার। হারলে দায় কেবল একজন বা দুজনের। আমি সিডন্সের পক্ষে ছাতা ধরছি না। কিন্তু আমার কথা হলো, আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার। আমরা মানুষকে সম্মান দিতে শিখলাম না। আমরা বাংলাদেশ দলকে আমূল বদলে দেওয়া কোচ ডেভ হোয়াটমোরের বেলায় যা করেছিলাম, তাই করতে যাচ্ছি সিডন্সের বেলায়। হোয়াটমোর যেদিন বিদায় নিলেন, সেদিন তার প্রিয় দুই ছাত্র অ্যাশ এবং ম্যাশ (আশরাফুল ও মাশরাফি) কেউই বিমানবন্দর পর্যন্ত যাওয়ার সৌজন্যতাটুকুও দেখাননি। জৈষ্ঠরা যদি কনিষ্ঠদের জন্য কোনো উদাহরণ তৈরি করে না যান, তবে কনিষ্ঠদের দোষ দেওয়া চলে না।
সিডন্সকে বলা হয়, টেস্ট না খেলা অস্ট্রেলিয়ার সেরা ব্যাটসম্যান। আর তিনি অস্ট্রেলিয়ার মত দলের সহকারি কোচেরও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পেশাদার কোচ। বাংলাদেশ তার চুক্তির মেয়াদ না বাড়ালে তিনি হয়তো অন্য আরেকটি দলের সঙ্গে কাজ করবেন। আর কোচ আসবেন, যাবেন, এটাই নিয়ম। কিন্তু বিদায় বেলায় বিসিবি তাঁকে সম্মান দেখাবে, এটুকুই চাওয়া।
সাকিবের প্রসঙ্গে কিছু না বললেও নয়। ওর বয়স মাত্র ২৩। কিন্তু ও মাঠে এত চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দেয়, যেন মনে হয় বয়স ওর ৩২। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার সে। সাকিবের সময় কিছুটা হয়তো খারাপ যাচ্ছে, কিন্তু এখনও ওকে অধিনায়ক থেকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে, তেমন সময় এখনও আসেনি। দুটো ঘটনা বলি। বাংলাদেশ-আয়ারল্যান্ড খেলার দিন। সাকিব টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমে ব্যাট করে বাংলাদেশ করতে পারল মাত্র ২০২ রান। একটি ব্লগে সমানে সাকিবের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ লেখা পোস্ট হতে লাগলো। ‘ওকে....লাথি মেরে এখনই বের করে দাও, বড় বাড় বেড়েছে’-এসব নানা অশ্লীল আর আক্রমনাত্বক গালি। ওই ম্যাচে তো বাংলাদেশই জিতেছিল। এরপর ওই ব্লগেই লেখা হলো, সাকিব বাংলাদেশের সেরা অধিনায়ক। ওর অসাধারণ কৌশলই বাংলাদেশকে জিতিয়েছে। এই হলো আমাদের অবস্থা। আমরা অল্পতেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই। ধীর-স্থির, বিবেচনাবোধ সম্পন্ন সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না।
আরেকটি ঘটনা। বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে গেল। লিবিয়ায় হামলার খবর লিড না করে একটি পত্রিকা পরাজয়ের খবরটি লিড করলো। এবং তাতে কেবল সাকিবের ছবি। তিনি মাথা খুব নিচু করে মাঠ থেকে বের হচ্ছেন। যেন পরাজয়ের জন্য অধিনায়ক একাই দায়ী। এটা কী ব্যক্তি আক্রমণ নয়? সাকিব যদি সত্যি সত্যি দায়ী হতেনও, তবু এভাবে আক্রমণ করা যায় না।
তবে সাকিব নাকি জৈষ্ঠ ক্রিকেটারদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। সেটা যদি করে থাকেন, তবে তার ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। তাতে তার সম্মান কমবে না, বরং বাড়বে। তবে এখানে আমি কিছু গণমাধ্যমের সমালোচনা করবো। এমন এমন ক্রীড়া সাংবাদিক আছেন, যারা মনে করেন, তারা বলবেন, লিখবেন, সেভাবেই হতে হবে এবং এরাই সাকিবের মত তরুণদের দিয়ে নানা কথা বলিয়ে নেন, তাদেরই স্বার্থে।
২.
এবার অন্য কয়েকটি বিষয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। ক্রিকেট যেহেতু মানসিক খেলা, তাই মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ যার বেশি, তিনি পারেন দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করতে, তিনি পারেন ঠিক জায়গায় বলটা ফেলতে।
ভালো ফলাফল করার জন্য সবার আগে দরকার ক্রিকেটারদের মধ্যে শৃঙ্খলা। ঠিক সময়ে ঘুম থেকে, নিয়ম মেনে অনুশীলন, ঠিক মত ঘুমানো খুব জরুরি। তবে আমাদের ক্রিকেটাররা পশ্চিমা ক্রিকেটারদের মত ‘নাইট লাইফে’ অভ্যস্ত নন। কিন্তু তারা কতটা মোটামুটি শৃংখলাপূর্ণ জীবন-যাপন করেন, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। পত্রিকায় পড়েছিলাম, দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের আগের রাতে দুই ক্রিকেটার এক বোর্ড কর্মকর্তার আত্মীয়ের বিয়েতে গভীর রাত পর্যন্ত কাটিয়েছেন এবং তারা এ জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। ক্রিকেটাররা যদি কোথাও নিমন্ত্রণে যান, তবে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সবাই মিলে যাওয়াই ভালো। এতে টিম স্পিরিট জোরালো হয়।
দলের সবাই এক মানসিকতার কখনও হবে না। তবে একটি জায়গায় তাদের এক হবে যে দেশের স্বার্থে তারা সবাই এক ও অভিন্ন। ইনজামাম উল হক যখন পাকিস্তান দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন, তিনি দলের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে জামায়াতে নামাজ পড়তেন। দলের ঐক্য ধরে রাখার জন্য এটা ভালো দাওয়াই হতে পারে। বাংলাদেশ দলের ওপেনার ইমরুল কায়েস বলেছেন, তারা সবাই একসাথে নামাজ পড়েন। সবাই মিলে দলের ভালো করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। খুবই ইতিবাচক কথা।
এরপরে আমি বলবো শিক্ষার কথা। আমি বলছি না সব ক্রিকেটারকেই বিএ, এমএ পাশ হতে হবে। তবে শিক্ষা এবং সুশিক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুশিক্ষা মানুষের মনকে বড় করে। অপরকে সম্মান করতে শেখায়, দায়িত্ববোধ তৈরি করে। একজন সুশিক্ষিত ভালো ব্যাটসম্যান এবং একজন কম শিক্ষিত ভালো ব্যাটসম্যানের মধ্যে নিশ্চয়ই অনেক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের ক্রিকেটারদের অনেকেরই লেখাপড়ার অবস্থা তথৈবচ। বিসিবিকে বিষয়টা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
আর জাতি হিসেবে আমাদের শারীরিক গঠন একটু ছোটখাট। দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারদের সামনে যখন আমাদের ক্রিকেটাররা দাঁড়ায়, তখনই আমরা বুঝতে পারি পার্থক্যটা। আমাদের দুই পেসার শফিউল ও রুবেল, একে তো উচ্চতা কম, তার ওপরে আবার হ্যাংলা। এক পত্রিকায় পড়লাম, শফিউল নাকি খুব অল্প খাবার খান, অনেকটা পাখিদের সমপরিমাণ!। এটা একেবারেই কাম্য নয়। মহেন্দ্র সিং ধোনি যেমন লম্বা, তেমনি শক্ত-সামর্থ, একই রকম গ্রায়েম স্মিথ। কিন্তু আমাদের সাকিবকে দেখেন।
তবে উচ্চতা কোনো সমস্যা নয়। কম উচ্চতা শচীন, রমেশ, টেন্ডুলকারের জন্য তেমন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। মূল বিষয় হলো ফিটনেস। ৩৯ বছর বয়সেও সনাথ জয়সুরিয়া ফিট, ২৬ বছর বয়সেও আমাদের মাশরাফি ততটা ফিট নয়।
যাই হোক, এই টিম নিয়ে আমাদের হতাশ হওয়ার কারণ দেখছি না। হ্যাংলা শফিউলই দুটো ম্যাচ জিতিয়েছে। কাবু-পাতলা সাকিবই বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার।
ব্যাটিংয়ে আমাদের উন্নতি করতেই হবে। সেজন্য স্পেশালাইজড ব্যাটিং কোচ আনার প্রয়োজন হলে তাই আনতে হবে। দলের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলাবোধ বাড়াতে হবে। আপাতত সাকিবের বিকল্প দেখছি না। বিশ্বকাপের পরেই তিনটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে অস্ট্রেলিয়া দল আসবে বাংলাদেশে। আপাতত ওটাই হোক লক্ষ্য। ৫৮ আর ৭৮ এর ‘লজ্জা’ ধুয়ে-মুছে সত্যিকারের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মত গর্জে ওঠুক বাংলাদেশ। |