মার্চ মাস। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার সূচনা এ মাসেই। ২৫ শে মার্চের রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের উপর। এদেশের নিরস্ত্র মানুষের প্রতিরোধের দেয়াল গড়ে ওঠার আগেই শহীদ হয় হাজার বুদ্ধিজীবী, সামরিক, আধা সামরিক ও বেসমারিক লোক। রাত শেষ হওয়ার আগেই গড়ে ওঠে প্রতিরোধের মজবুত দেয়াল। কিছু লোক ছাড়া এ দেশের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থান থেকে অংশ নেয় মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা লাভ করি আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা আর আমাদের স্বাধীনচেতা মানসিকতাই এ সংগ্রামের পেছনে বারুদ হিসেবে কাজ করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সকলেই দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ।
দীর্ঘ ৪০ বছর পার হয়ে গেছে। ঘটে গেছে অনেক উত্থান-পতন। কিন্তু একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে আমাদের গড়ে ওঠা হয়নি। আমাদের কাছাকাছি সময়ে স্বাধীনতা লাভ করে বহু দেশ আজ উন্নত দেশের কাতারে স্থান করে নেয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু আমরা আজও দেশের সব মানুষের মুখে তিনবেলা খাবার তুলে দিতে পারিনি। সবার জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে পারিনি। মাথা গোঁজার মত ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরও নেই সবার জন্য। পরিবারের ঘানি টানতে গিয়ে আজও হাজারও কচি শিশুকে ভিক্ষার ঝুলি, কাগজ টোকানো ব্যাগ, লোহার দোকানের বড় বড় হামার আর পেটে ভাতে পাশবিক শ্রমে বাধ্য হতে হচ্ছে। চিকিৎসার অভাবে দরিদ্ররা ধুকে ধুকে মরছে। একদিকে চলছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের হাহাকার অন্যদিকে গড়ে উঠছে কিছু লোকের সম্পদের পাহাড়। একদিকে ডাস্টবিনে কুকুরের সাথে মানুষের খাদ্য গ্রহণ, অন্যদিকে চাইনিজ-পাচতারকা হোটেলে ধনীদের অবাধ ভোগ। একদিকে বস্তি অন্যদিকে আকাশচুম্বী বাড়ি। এ হচ্ছে বর্তমান বাংলাদেশ।
দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করার দায়িত্ব সরকারের। অন্যকথায় বলা যায় রাজনীতিবিদদের। দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বেশি ভাবনা তাদেরই থাকা উচিত। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদেরই নেতৃত্ব দিতে হয়। জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠায় দেশের সার্বিক দেখাশোনা করার জন্য। ১৯৯১ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের জনগণ তাদের দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের হাতে অর্পণ করে স্বস্তি লাভ করেছিল। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই শুরু হয় তাদের ছেলে খেলা। তাদের হিংস্র আচরণে দেশ সংকটের মুখে পতিত হয়। বহুদলীয় গণতন্ত্র পরিণত হয় শাসক দলীয় স্বৈরতন্ত্রে। দ্বি-দলীয় রাজনীতির আড়ালে শুরু হয় দ্বি-দলীয় হানা-হানি, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা। রাজনীতিবিদদের অবিবেচক আচরণে গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান জাতীয় সংসদ (ইতিবাচক ভূমিকার পাশাপাশি) পরিণত হয় অপবাদ, ঝগড়া, মিথ্যা আশ্বাস এবং মিথ্যা বক্তব্যের কেন্দ্রে। সময়ের ধারাবাহিকতায় রাজনীতিবিদদের এ আচরণ জাতীয় সংসদকে মাছের বাজারে (স্পিকারের ভাষায়), কুস্তি করার ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। জাতীয় সংসদকে তাঁরা দলীয় নেতাদের গুণগান ও চাটুকারিতার উত্তম কেন্দ্র হিসেবে পরিণত করেছেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের চাটুকারিতার মাত্রা কোনো পরিমাপক ব্যবহার করেও আজ আর মাপা সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে। চাটুকারিতার রেশ ধরে আবার সংসদে মারামারির পরিবেশও তাঁরা তৈরি করছেন। আজ মনে হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য কোনো জাতীয় সংসদের প্রয়োজন নেই।
জাতীয় সংসদের প্রত্যেক অধিবেশনে যেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ হয় সেখানে জাতীয় স্বার্থ, জনগণের মৌলিক চাহিদা, দেশের উন্নয়নে গঠন মূলক আলোচনা, জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব না পেয়ে দলীয় চাটুকারিতা আর হিংস্রতা গুরুত্ব পেলে জনগণ ফরাসি বিপ্লবের মত বিপ্লব ঘটিয়ে বসতে পারে। মানুষের পেটে ভাত না থাকলে, শিক্ষার অধিকার না পেলে, বাসস্থানের সংকট, বিদ্যুৎ-পানির চরম অভাব, রাজনৈতিক প্রতারণা, দুর্নীতির সয়লাব, দলীয়করণের নগ্নতা, স্বজনপ্রীতি মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি থাকলে জনগণ সংসদ রাখা না রাখার দাবি তুলতে পারে। জনগণ এমন দাবি তুললে জাতি হিসেবে আমাদের চরম অধঃপতনের বিষয়টি সামনে চলে আসবে।
জাতীয় সংসদ আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। স্বাধীনতা আছে বিধায়ই জাতীয় সংসদ আছে। স্বাধীনতার পর জাতিকে অন্যান্য স্বাধীনতা প্রদানের জন্যই জাতীয় সংসদ। সুতরাং স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে হলে, জনগণের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা দিতে হলে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার বিকল্প নেই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আমাদের স্বাধীনতাকে টেকাতে পারে। আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিমাপক হচ্ছে জাতীয় সংসদ। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখতে হলে রাজনীতিবিদদেরকে বিবেচকের ভূমিকায় ফিরে আসতে হবে। সংঘাত, চাটুকারিতা, নীতিহীনতা, অসহিষ্ণুতার রাজনীতি পরিত্যাগ করে তাদেরকে জাতীয় স্বার্থে সহনশীলতা ও ঐক্যবদ্ধতার দিকে ফিরে আসতে হবে। প্রত্যেকটি নাগরিককে সমানভাবে মর্যাদা ও অধিকার দেয়ার মানসিকতা নিয়ে তাদেরকে কাজ করতে হবে। সামগ্রিক জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মতাদর্শগত পার্থক্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি না করে দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীনতা দিবস আমাদেরকে এক হয়ে কাজ করার শিক্ষা দিয়েছে। এ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীনতা দিবসে আমরা এভাবেই চিন্তা করতে চাই।