মঙ্গলবার, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ২২ মে ২০১২; সন্ধ্যা ০৭:১৪ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

আমাদের রাজনীতিঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ সংবিধান

এস.এম. আখতারুজ্জামান সুমন

সংবিধান যে কোন দেশ পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্রের মৌলিকনীতি এবং মানুষের মৌলিক অধিকার সহ সকল বিষয়ই সংবিধান নির্ভর। রাজনীতি মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম যা সংবিধান অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার বলে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষের যে কোন আদর্শের রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। এ অধিকারে হস্তক্ষেপ করা কারোর জন্য বৈধ নয়। কিন্তু সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী। সংবিধানের এই শর্তের বাইরে কোন রাজনীতি করা কোন ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়।

৩৮ নং অনুচ্ছেদঃ জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ- সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।

অত্র ধারা অনুযায়ী আমি বলতে চাই, যে সংগঠনের কার্যক্রমের মধ্যে জনস্বার্থ নেই, যার মধ্যে নৈতিকতা নেই, যে সংগঠন মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, যে সংগঠন মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে পারে না, যারা নিজেদের মধ্যেই রক্তের হোলিখেলায় মেতে থাকে তাদের এমন কোন সংগঠন করার কোন সাংবিধানিক অধিকার নেই। আজ আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের মধ্যে যদি মিলিয়ে দেখি তাহলে দেখা যাবে অধিকাংশ দল এমন সব কাজের সাথে জড়িত। তারা হত্যা, সন্ত্রাস, জনস্বার্থহীন ও অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত যা অত্র অনুচ্ছেদের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীন। অবশ্য এর পাশাপাশি কিছু সংগঠন আছে যাদের মধ্যে এমন সব অপরাধ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। যে সংগঠনের মধ্যে জনস্বার্থ ও নৈতিকতা বিদ্যমান, যারা দেশ ও জাতীর কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে তারা আদর্শের কারণে আজ প্রতিহিংসার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। আজ যদি সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সঠিকভাবে এবং নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করেন তাহলে আজ সঠিক রাজনীতির কথা হয়তোবা তারা বলবেন। তাই আমি বলতে চাই, প্রতিটি বিবেকবান মানুষের উচিত সঠিক রাজনীতিকে সাড়া দিয়ে দেশ ও জাতীর কল্যাণ সাধন করা। এবার আমি সংবিধানের শর্তগুলি উল্লেখ করবো যা একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার শর্ত বলে বিবেচিত।

প্রথম শর্ত - জনশৃংখলার স্বার্থে।
জনশৃংখলার স্বার্থে বলতে আমি মনে করি সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে বর্ণিত সকল প্রকার মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও নিশ্চিতকরণ। যেখানে সকল পর্যয়ের মানুষ যে কোন আদর্শের সংগঠন কায়েম করতে পারবে এবং সবাই একযোগে কাধে কাধ মিলিয়ে জনগণের স্বার্থে কাজ করে যাবে। কিন্তু আজ দেখা যায় যখন যে আদর্শের সংগঠন ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয় তখন তারা অন্য আদর্শের সংগঠনের উপর চরম নির্যাতন শুরু করে। এটা কখনো সংবিধানের ভাষ্য নয়। যদি কোন সংগঠনের নেতা- কর্মীরা নিজেদের মধ্যে অথবা অন্য কোন সংগঠনের কর্মীদের উপর আঘাত করে, পিটিয়ে, গুলি করে, জবাই করে হত্যা করে, যদি দুর্নীতি করে দেশের সম্পদকে নিজের সম্পদে পরিণত করে, কাহারো সম্পদ জোর পূর্বক ভোগ দখর করে, যদি কোন সংগঠন লগি-বৈঠা তৈরী করে মানুষদেরকে হত্যা করে, জ্বালাও- পোড়াও রাজনীতি করে তাহলে এমন সব রাজনীতিই কিন্তু সংবিধানের পরিপন্থী। যা সংগঠন কায়েম করার প্রথম শর্ত জনশৃংখলার স্বার্থে সম্পূর্ণভাবে ব্যহত করে।

দ্বিতীয় শর্ত- নৈতিকতার স্বার্থে।
এটাও কিন্তু সংগঠন কায়েম করার আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। প্রতিটি সংগঠন কায়েম করা উচিত এমন সব মৌলিক নীতির ভিত্তিতে যেখানে প্রতিটি মানুষ নৈতিকতার কথা শিখবে। কিন্তু দু:খের বিষয় হলেও সত্য যে আজ আমাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা মদ, জুয়া, গাজা আর নারী নিয়ে অবৈধ কাজে লিপ্ত। আজ আমরা যদি আমাদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখি তাহলে অধিকাংশ সংগঠনের নেতা- কর্মীদেরকে খুঁজে পাওয়া যাবে তারা নৈতিকতার ধ্বংসের চরম পর্যায়ে উপনীত। আজ ইভটিজিং তৈরী হয়েছে, ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তি হতে গেলে বা হোষ্টেলে থাকতে হলে অনেক ছাত্রীকে হতে হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও নেতা-কর্মীদের ভোগের পাত্রী, তাদেরকে হতে হয়েছে পতিতা, কিছুদিন পূর্বে আমেরিকায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরকারী সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব মাতাল অবস্থায় নারী কেলেংকারী করেণন ও অপহরণের খবর, ইভটিজিং এর খবর, এসব কিছুই নৈতিকতার অবক্ষয়। নৈতিকতার অবক্ষয়ের আরো একটি জলন্ত উদাহরণ হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সকল ব্যক্তিরাই ছিল উচ্চ শিক্ষিত এবং সকলেই ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ না দিলেই নয়। তা হলো, যখন শিক্ষার্থীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে তখন কিছু শিক্ষক ও ছাত্র নেতৃবৃন্দ ভর্তি বাণিজ্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এমন সব কার্যক্রমই নৈতিকতার স্বার্থের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আর এ সকল কিছুই রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় সংগঠিত হচ্ছে। আজ যদি আমরা বিভিন্ন দলের জনশক্তি বৃদ্ধির কৌশল বা কার্যক্রম বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব তারা জনশক্তি বৃদ্ধির জন্য ছাত্রদের হাতে বই-খাতা আর কলমের পরিবর্তে তুলে দিচ্ছে সিগারেট, মদ, গাজা আর ফেন্সিডিলের মত নেশার দ্রব্য। যার কারণে তারা হচ্ছে সমাজের নিকৃষ্ট মানুষ, যার প্রভাবে তারা আজ রাস্তায়, স্কুল, কলেজ- ক্যাম্পাসে ইভটিজিং আর নারী ধর্ষণের মত জঘন্যতম অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এমন সব প্রতিটি কাজ যদি পর্যালোচনা করা হয় তাহলে অবশ্যই আমরা বলতে পারি তাদের রাজনীতি করা সেই মহান সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাদের রাজনীতি সাংবিধানিক ভাবে অবৈধ। অবশ্য এত সব হতাশার মধ্যেও কিছু রাজনৈতিক সংগঠন আছে যারা এমন সব অনৈতিক কাজের সাথে বিন্দু পরিমাণ জড়িত নয় বরঞ্চ তাদের সকল জনশক্তি এসব অপরাধ থেকে মুক্ত থাকার জন্য অন্যদেরকেও আহবান করে।

তৃতীয় শর্তঃ আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ।
আজ দেখুন আপনারা যদি প্রতিটি মানুষের কাছে প্রশ্ন করেন যে, কাহারো কাছে যদি কোন অবৈধ অস্ত্র থাকে তাহলে সে অপরাধী কি না? অবশ্যই সবাই বলবে সে অপরাধী। যদি প্রশ্ন করেন একটি সংগঠনের মিছিল বা সমাবেশে আরেকটি দলের হামলা বেআইনি কিনা? অবশ্যই সবাই বলবে এটা বেআইনি। যদি প্রশ্ন করেন একটি দলের মিছিল হতে সাধারণ জনগণের উপর হামলা করা হয় বা দেশের সম্পদের উপর হামলা করা হয় তাহলে এটা কি বেআইনি? অবশ্যই সবাই বলবে এটা বেআইনি। যদি হত্যার ব্যাপারে প্রশ্ন করেন তাহলে একই জবাব দিবে। এসব কিছুই যদি বেআইনি হয়ে থাকে তাহলে বলুন এমন কাজের সাথে যে সব সংগঠনের নেতা কর্মীরা জড়িত তারা কি সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংগঠন করার জন্য বৈধ? সকল বিবেকবান মানুষই এক বাক্যে এ জবাব দিবেন অবশ্যই না।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ পরিচালনার মৌলিক হাতিয়ার হচ্ছে সংবিধান। আর অবশ্যই সংবিধান সকলের কাছেই শ্রদ্ধার সম্পদ। তাই আমাদেরকে বৈধ রাজনীতি করতে হলে অবশ্যই সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ পুরোপুরি মানতে হবে। তাই আমি বলতে চাই, প্রতিটি বিবেকবান মানুষের উচিত সঠিক রাজনীতিকে সাড়া দিয়ে দেশ ও জাতীর কল্যাণ সাধন করা।

লেখকঃ এল.এল.বি (অনার্স), দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
http://www.sonarbangladesh.com/articles/SMAkhtaruzzamanSumon
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখকঃ
এল.এল.বি (অনার্স), দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
মোবাইল-০১৭৩৬-৮৮৪৯৭৭/ ০১৯১২-৫৮১৫৭৬

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy