চীনে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা কৌশল ও অর্থনৈতিক সংলাপ শেষ করে সরাসরি ঢাকায় এসেছিলেন একক পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। ঢাকায় ঝটিকা সফর শেষে বলে গেলেন, 'বাংলাদেশ অনেক পথ পাড়ি দেবে, সঙ্গী হবে যুক্তরাষ্ট্র।' কথাটির তাৎপর্য ও সম্ভাবনা নিয়ে এ দেশের অভিজন সমাজ কিংবা জনসমাজের এখনো সম্যক উপলব্ধি ঘটেনি, কিংবা পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক বাদ-বিসম্বাদ এখনো দানা বাঁধেনি।
হিলারির ১৯ ঘণ্টার বাংলাদেশ সফরে সরকারিভাবে সন্ত্রাসবাদ দমনে সাফল্য এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগ সম্পর্কে কিছু মামুলি প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক অপহরণ, খুন, লাশ ও গুম আতঙ্কের দুঃশাসন, নাগরিক সমাজ এবং সংবাদ মাধ্যমের বাধ্যতা আদায় ও দলীয়করণের নাগপাশ, আদালতের প্রক্রিয়ার প্রশ্নবিদ্ধতা, বিরোধীদলীয় তৎপরতা ঠেকাতে ঢালাও মামলা-হামলার দমন কৌশল ইত্যাদি বিব্রতকর বিষয় কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, নাগরিক সংযোগ, তরুণ প্রজন্মের সাক্ষাৎ ও সংবাদ সম্মেলন পর্যায়ে খোলামেলা উত্থাপিত হয়েছে। সেগুলোই পত্রপত্রিকায় ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রাধান্য লাভ করেছে। কিছু কিছু ইঙ্গিতবহ আচরণও জল্পনা-কল্পনায় এসেছে। যেমন_ হিলারি 'চীন থেকে কলকাতা হয়ে দিলি্ল যাওয়ার পথে মাঝখানে ছুটির দিনে বাংলাদেশ সফরে আসার পর প্লেন থেকে নেমেছেন দেরি করে।' তাকে অভ্যর্থনায় আগত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিমানবন্দরে বসিয়ে রেখে তিনি তার রাষ্ট্রীয় বিমানে বসেই বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও সফরসঙ্গীদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করেছেন। তারপর হোটেলে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দিয়েছেন।
'পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি তার জন্য যে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন, হিলারি তাতে শামিল হননি।' আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ সর্বাঙ্গীণ 'অংশীদারি সংলাপের যৌথ ঘোষণা' সই করে সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং কিছু একান্ত আলাপচারিতার পর সরাসরি চলে যান বিরোধীদলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার বেসরকারি বাসভবনে। সেখানেই রাতের 'নাশতা' করেছেন বলা চলে, একান্ত বৈঠক করেছেন সংসদের বিরোধী দলনেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে। পরদিন সকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে তিনি দীর্ঘ সময় দিয়েছেন এ দেশের জনকল্যাণ তৎপরতায় নিয়োজিত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি স্যার ফজলে হাসান আবেদ ও নোবেল লরিয়েট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলাপচারিতায়। তারপরও সময় করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আয়োজিত নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের 'ধারাবাহিকতা' রক্ষার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু না বললেও প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি 'সরকারের কাছ থেকে একটা দূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছেন?'
ওই সফরের পর সরকারি মহলে একটু থমকে থেকে বলতে গেলে অকারণেই 'হিলারির মুখে হক কথা'র তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেসামাল, শ্রুতিকটু বাদানুবাদ সমানে চলেছে। বিরোধী শিবিরে একটা চাপা উল্লাস, অবাস্তব একটা ভরসার ভাব দেখা দিয়েছে। কিন্তু মূলত যে কারণে হিলারির 'আকস্মিক' আগমন ও বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি 'অংশীদারিত্ব সংলাপের যৌথ ঘোষণা' স্বাক্ষর, তার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা-গবেষণা হয়েছে সামান্যই। অবশ্য হিলারির বাংলাদেশ সফরের 'সাফল্য' এবং 'গুরুত্ব' সম্পর্কে সংসদীয় সরকার পক্ষ ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই একমত। যেমন_ সরকার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও একরকম বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক মুখপাত্র ড. গওহর রিজভী বলেছেন (সংক্ষেপিত) : "দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের অংশীদারি সংলাপের জন্য যৌথ ঘোষণা সই হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের ব্যবস্থা ভারত ও চীনের সঙ্গেও আছে। যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরের এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। আমাদের নিজেদের যোগাযোগ-সংক্রান্ত অক্ষমতার কারণেই হয়তো এ দেশের বলিষ্ঠ ও স্বাধীন গণমাধ্যম হিলারির এ সফরের প্রকৃত মর্মার্থ ও প্রাপ্তি যথার্থভাবে তুলে ধরতে পারেনি। তাদের বেশির ভাগই বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপে বসতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শের কথা তুলে ধরেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংলাপের যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও সম্পূর্ণ মিলে যায়। কোনো দল যাতে নির্বাচন বর্জন না করে, সে ব্যাপারে হিলারির আহ্বানকে আমরাও স্বাগত জানাই। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠক নিয়ে গণমাধ্যমের বাড়তি আগ্রহ থাকাটা বিস্ময়ের কিছু নয়। অধ্যাপক ইউনূস যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের পাশাপাশি দেশেও অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন, সে বিষয়টি প্রশ্নাতীত। হিলারি ক্লিনটন ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ব্যাপারে ভীষণ উৎসাহী। গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে সত্যটা হলো_ তাদের ঋণের পরিমাণ কমেনি, ঋণ আদায়ের হার আগের মতোই আছে এবং মূলধন সরিয়ে নেওয়ার বা ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। সব তথ্যই হিলারি জানেন। যে কোনো বিবেচনায় হিলারির এ সফর সফল।"
অন্যদিকে বিরোধী দলনেতার উপদেষ্টা ও বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র, সাবেক রাষ্ট্রদূত শমশের মবিন চৌধুরী বলেছেন (সংক্ষেপিত) : "যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফরকে দলীয়ভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমরা বিষয়টিকে দেশ হিসেবেই দেখি। তার বাংলাদেশ সফর দুই দেশের সম্পর্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। কোনো ক্ষেত্রেই নীতিগত কোনো বিরোধ নেই, একমাত্র ফিলিস্তিন ইস্যু ছাড়া। বাংলাদেশ একটি মুসলিম ও একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক দেশ। (দ্বিপক্ষীয়) আলাপ-আলোচনার একটি বড় সুযোগ এ সফরের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে আর রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরাও বিএনপির পক্ষ থেকে এসব বিষয় তুলে ধরেছি। আমরা আসলে হিলারির বাংলাদেশ সফরকে একটি বৃহত্তর পরিসরে দেখতে চাই। তবে এটাও ঠিক যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বাংলাদেশ সফর করেন, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গুম হয়েছেন।
এর সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি উঠে এসেছে। পাশাপাশি বড় ইস্যুটি হচ্ছে, আগামীতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে জনগণের ভোটাধিকার বা মতামতের প্রতিফলন ঘটবে কি-না। (সে জন্য হিলারি রাজনৈতিক সংলাপের বাঞ্ছনীয়তার কথা বলেছেন।) এ ছাড়াও বাংলাদেশের কিছু বিষয় নিয়ে হিলারির আগ্রহ ও উদ্বেগ রয়েছে। অনেক দিক রয়েছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চিন্তাধারা অনুযায়ী হয়নি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার পর হিলারি ক্লিনটন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অশান্তি, সংঘাতময় পরিস্থিতি ও মানবাধিকার প্রশ্নে কথা বলেছেন। হরতালের রাজনীতি নিয়েও তিনি তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হিলারি বাংলাদেশের যুব প্রজন্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজনীতির বাইরে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। এর বাইরে তিনি কথা বলেছেন বাংলাদেশের সুশীল সমাজের দুজন প্রতিনিধির সঙ্গে। আমরা মনে করি, স্বল্প সময়ের মধ্যে হলেও এ সফরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছে।"
কিন্তু সামান্য উল্লেখ ছাড়া দুই পক্ষের কোনো পক্ষই হিলারি স্বাক্ষরিত বাংলা-মার্কিন 'অংশীদারিত্ব সংলাপ' ঘোষণা আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে যে হেরফের ঘটিয়েছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাননি বা কিছু বলেননি। উল্লেখ্য, এ বছর ১৯ এপ্রিল প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-আমেরিকা সামরিক অংশীদারিত্বের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সরকারের বিশেষ কোনো 'রাজনৈতিক' লাভ না হলেও প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ও স্বতন্ত্র ভূমিকার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিলাভ ঘটেছে। বাংলা-মার্কিন সামরিক সহযোগিতার এই মোড় প্রভুত্ববাদী ভারতীয় মোড়লরা অাঁচ করতে পারেনি কিংবা গুরুত্বহীন সাব্যস্ত করে নিশ্চিন্ত ছিল। দিলি্লর সখ্যধন্য ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ সরকারের বিদেশ ভ্রমণপ্রিয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মনি স্বয়ং তার স্বাক্ষরিত যৌথ ঘোষণার প্রস্তুতিপর্ব ও 'কৌশলগত' তাৎপর্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে চেষ্টা করেননি কিংবা দিলি্লর সঙ্গে আগাম কোনো পরামর্শের সুযোগ পাননি বলে কোনো কোনো বিশ্লেষকের ধারণা। তাই চীন ও ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-নির্ধারিত নিরাপত্তা কৌশলগত সংলাপের মাঝামাঝি 'উড়ে এসে জুড়ে বসা' মার্কিন-বাংলা অংশীদারিত্ব সংলাপের ঘোষণা হয়তো দিলি্লর জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত, 'আকস্মিক'।
প্রকৃতপক্ষে গোপনে হলেও 'বাংলা-মার্কিন অংশীদারিত্ব সংলাপ' ঘোষণার প্রস্তুতি আকস্মিক ছিল না। বিদেশি সংবাদপত্রে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংলাপে মার্কিন পক্ষের প্রধান এন্ড্রু জে শ্যাপিরোকে উদ্ধৃত করে বলা হয় : "গত দশকে বাংলাদেশ-আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় সামরিক সম্পর্ক এশিয়ায় সবচেয়ে তেজিভাবের সম্পর্কগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে। বঙ্গোপসাগরে নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ অন্যতম প্রধান কর্তা। ... কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা কিভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তার একটা প্রধান উদাহরণ হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা। বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এমন সামরিক সরঞ্জামাদি দরকার হবে, যা বাংলাদেশের সামর্থ্যের মধ্যে এবং সেই সরঞ্জাম সংগ্রহে অংশীদারও খুঁজে পেতে হবে বাংলাদেশকে। এ আধুনিকায়ন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারিত করার সুযোগ করে দিয়েছে, বিশেষ করে 'অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জামাদি কর্মসূচি'র মাধ্যম, যে কর্মসূচির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দরকারের অতিরিক্ত সরঞ্জামাদি নিরাপত্তা অংশীদারের ব্যবহারের জন্য সুযোগ করে দেয়।"
নয়া সহস াব্দের শুরুর দিকে বিএনপি আমল থেকেই বাংলাদেশ-মার্কিন অংশীদারিত্বের সংলাপ-প্রস্তুতির আরম্ভ। হিলারির বাংলাদেশ সফরের প্রস্তুতিপর্বও কোনোক্রমেই সংক্ষিপ্ত ছিল না, কিংবা তড়িঘড়ি ঘটেনি। সম্ভবত সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওই সফর থেকে শুধু প্রচারমহিমার উপাত্ত সংগ্রহে মনোযোগী ছিলেন, সারবস্তুর বিষয়াদি প্রজাতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তাদের ওপরই ছেড়ে দিয়েছিলেন। নানা পর্যায়ের প্রস্তুতি চলেছে জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফর করেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ও. ব্লেক। পরের মাসের ৫ তারিখে আসেন উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ড. জেমস এ শিয়ার। ১৯ এপ্রিল সামরিক সংলাপের আগে ৪ এপ্রিল ঢাকায় আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়াদির আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি আর. শেরম্যান।
রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রসহ সামগ্রিক কৌশলগত ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব বাড়াতে যৌথ একটি ফোরাম গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয় সামরিক সংলাপে। সেই সংলাপের ওপর ভিত্তি করেই প্রণীত হয়েছে 'বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারিত্ব সংলাপ' শীর্ষক দলিলটি। বলা যায়, অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক উভয় পরিসরে হিলারি সফরের তাৎপর্য সম্পর্কে ক্ষমতাসীনদের অভ্যন্তরে ভারতপ্রেমিক মহলের সম্বিৎ ফিরেছে সফরের পরে। অবশ্য রাজনৈতিকভাবে সংলাপের জন্য হিলারির দেওয়া তাগিদকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। হিলারির সফরও সরকারের জন্য ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। হিলারির দক্ষতার প্রশংসা করে বলেছেন, '(হিলারি) কাকে কি পরামর্শ দিয়েছেন জানি না। তবে সংলাপ হতে হলে দুই দলকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে।'
কিন্তু কার্যত সংলাপের কোনো পথই খোলা রাখছে না ক্ষমতাসীন চক্র। সুশীল সমাজের যে দুই প্রতিনিধিকে হিলারি সাক্ষাৎ দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে সরকারি মহলের বিষোদ্গারের পাশাপাশি চলছে রাজনৈতিক বিরোধিতা গুঁড়ো করে দেওয়ার অভিযান।
বাস্তবিক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে 'জব্দ' করতে সরকারের মন্ত্রীদের পাল্লা দিয়ে কটূক্তির প্রতিযোগিতা চলছে। প্রথমে সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগের তীব্র সমালোচনা করে উত্তেজিত অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বললেন, ইউনূস সাহেব যে বলছেন, সরকার গ্রামীণ ব্যাংক দখল করছে, এ বক্তব্য 'টোটালি রাবিশ'। তারপর হুঁশ ফিরলে তিনি বললেন, আমি দুঃখিত, আমি এটাকে রাবিশ বললাম।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও শিল্পমন্ত্রী বললেন, "তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা নিয়ে বিদেশিদের কাছে নালিশ করে একটি মহল দেশকে খাটো করছে। ড. ইউনূস গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ফখরুদ্দীন ও মইনুদ্দিনের কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেননি। আপনার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এতই ভালো লাগে, তাহলে আপনি রাজনীতিতে আসুন। দেখুন, দেশের জনগণ কি চায় আর জনগণ কাদের পক্ষে থাকে।" পরে অতিরঞ্জিত বানোয়াট আরও মন্তব্য করেছেন : 'গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে কত লোক যে বাস্তুহারা হয়েছেন, কত লোক আত্দহননের পথ বেছে নিয়েছেন, তার খবর গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী জানে।'
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বললেন, 'ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে জড়িত কেউ একজন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কোন যুদ্ধে তিনি শান্তি এনেছেন, কোন মহাদেশে তিনি শান্তি এনেছেন? কোথায় তিনি ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে শান্তি স্থাপন করেছেন? বিশ্বের বেশকিছু রাজধানীতে চিজ-স্যান্ডউইচ আর সাদা ওয়াইন খেলে জনপ্রিয়তা বাড়ে। সময়মতো একটি নোবেল পুরস্কারও পাওয়া যায়।'
নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এসব মন্তব্যে হতশ্রদ্ধ হয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, "একজন মন্ত্রী বলেন, ড. ইউনূস যুদ্ধ থামালেন কবে যে শান্তিতে নোবেল পেলেন? একটি বড় দলের নেতা মন্ত্রী যদি মনে করেন শান্তিতে নোবেল পেতে হলে যুদ্ধ থামাতে হবে, তাহলে বোঝেন আমরা কত বড় বেকুবের দেশে আছি। শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়ার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি, তিনি ড. ইউনূসের নখের সমান হওয়ার যোগ্যও নন। (আর) আমাদের অর্থমন্ত্রী, তিনি তো 'রাবিশ' বলে পরক্ষণেই তা আবার প্রত্যাহার করে নিলেন। একজন মানিলোককে এভাবে অপমান করার চেয়ে আর জঘন্য কিছু হতে পারে না।" ওদিকে নিম্ন আদালত হরতালে সহিংসতার 'হুকুমের আসামি' হিসেবে সাজানো মামলায় অভিযুক্ত ১৮ দলীয় জোট নেতাদের জামিনের দরখাস্ত খারিজ করে ১৬ মে বেবাক তাদের জেলে পাঠিয়ে দিয়েছেন। মূল আসামির খবর নেই। ফলে ঘটছে রাজপথে ভাঙচুর-বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। বিরোধী জোটের ডাকে আবারও শুরু হয়েছে হরতালপর্ব। কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পারিষদরা সরকারের নাক কেটে জাতি-রাষ্ট্রের যাত্রাভঙ্গ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(সূত্র: বাংলদেশ প্রতিদিন,১৮/০৫/২০১২) |