|
এই দেশ এই সময়
সাইফ বরকতুল্লাহ |
|
ঘটনা ০১.
নরসিংদীতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দুর্বৃত্তরা গুলি করে নৃসংশভাবে হত্যা করে লোকমান হোসেনকে। [ সূত্র : ০১.১১.২০১১, এনটিভি, বাংলাভিশন, এটিএনবাংলা, দিগন্ত টিভি ]। ০১ নভেম্বর মঙ্গলবার রাতে এই শিরোনামটা দেশীয় প্রত্যেকটা টেলিভিশন চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ ছিল।
ঘটনা ০২.
০৯.১১.২০১১ বুধবার রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নিজের অফিসে খুন হন স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল বাকি মিল্টন। [ সূত্র : ০৯.১১.১১, বিডিনিউজ, আরটিএনএন, বার্তা২৪ ]। পরদিন সকালে পুলিশ তার গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে।
ক.
এবারের কোরবানী ঈদের আগে ও পরে এ দুটি ঘটনাই বলে দেয়, স্বাধীনতার এতবছর পরও এখনও আমাদের রাজনীতি কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ। এক এগারো থেকে আমরা রাজনীতির কোন শিক্ষাই এখনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মঞ্চায়ন করতে পারিনি। প্রতিহিংসার রাজনীতি আর কত কাল বয়ে বেড়াতে হবে- এর কোন উত্তর আমার জানা নেই।
খ.
স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসূচকের কিছু অগ্রগতি, আর এমনকি দারিদ্র্যও কিছু মাত্রায় কমার ক্ষেত্রে বিলক্ষণ উন্নতি ঘটেছে। তবে বাংলাদেশের সমাজ যে আরও অসম হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। আমরা দুই অর্থনীতির মধ্যে বন্দী ছিলাম, এখন সেখান থেকে বেরিয়ে দুটি বিভক্ত সমাজের কাছে বন্দী হয়ে পড়েছি। একদিকে বিশেষ সুবিধাভোগী অভিজাতেরা, অন্যদিকে বাদ পড়া সিংহভাগ জনগণ।
গ.
এ দেশের অনেক মানুষ আগামীকাল পেটের ভাত কেমন করে জুটবে, এই দুঃস্বপ্ন দেখে রাত কাটায়। বাড়তি জনসংখ্যার চাপে এবং ভাতের জোগান ঠিক রাখতে হাপিয়ে উঠছে সাধারণ মানুষ। মাথাপিছু ডালের ভোগ স্বাধীনতার সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ঘ.
স্বাধীনতা-উত্তরকালে নানা দুর্যোগ পেরিয়ে বাংলাদেশও অনেক ক্ষেত্রে উন্নতির পথে এগিয়ে এসেছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক শিক্ষা, গণস্বাস্থ্য, সামাজিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি। দুঃখজনক হলেও অপ্রিয় সত্য, নীতিগতভাবে আমরা অনেক দিকে পিছিয়ে গেছি। যেমন শিক্ষার মান হ্রাস, দুর্নীতি, আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা, সহিংসতা ইত্যাদি।
ঙ.
বাংলাদেশে কূটনীতির কাঠামো এখনো অপেক্ষাকৃত সীমিত আকারে এবং জাতীয় প্রাধান্যের প্রেক্ষাপটে অপেক্ষাকৃত অসমাদৃত। এখানে দুটি সমস্যা বিদ্যমান। একটি ধারণাগত সীমাবদ্ধতা, অন্যটি কাঠামোগত সমস্যা। ধারণাগত দিক থেকে পররাষ্ট্র সম্পর্ককে আর দশটা সম্পর্কের মতো দেখা হয়, যা বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির।
চ.
স্বাধীনতার এত বছর পরও পররাষ্ট্র সম্পর্কের ধারণা অস্পষ্টতা বিদ্যমান। সাধারণত পররাষ্ট্র সম্পর্ককে কনস্যুলার বা প্রটোকল কাজের প্রেক্ষাপট থেকে দেখার একটি প্রবণতা দৃশ্যমান। ফলে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও গভীরতা নিয়ে নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভবত সে কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব এই প্রতিষ্ঠানটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি বা একে যথাযথভাবে কর্মক্ষম করে তুলতে সহযোগিতার হাতও বাড়িয়ে দেননি। যখন বিভিন্ন দেশ বিশ্বায়িত পৃথিবীতে তাদের পদচারণ সরব ও সচল করার জন্য কূটনৈতিক কাঠামো ও কর্মকাণ্ডকে বহুগুণে শক্তিশালী করছে, তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র-সম্পর্কিত কাঠামো—যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঘিরে আবর্তিত হয়—তা বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছে। বাজেটস্বল্পতা থেকে শুরু করে জনবলের ঘাটতিসহ বাইরের অযাচিত ও অপেশাদার হস্তক্ষেপ এ কাঠামোটি এখন ভগ্নপ্রায় এবং সে সঙ্গে বাংলাদেশের পেশাদার কূটনীতিকেরা হারাচ্ছেন তাঁদের নৈতিক ও পেশাদারি মনোবল।
ছ.
নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে যখন ক্রসফায়ার নামের শব্দের আড়ালে নাকচ করা হয়; সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের নামে যখন হয়রানি কিংবা নির্যাতন করা হয়; যখন মানুষকে অপহরণ করে গুম করা হয়; রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ পুলিশ যখন আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কোনো কর্মতৎপরতা দেখায় না; ম্যাজিস্ট্রেট ও আদালতের কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির কারণে যখন দরিদ্র জনগোষ্ঠী ন্যায়বিচার পায় না; রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করতে পারে না বলে মানুষ যখন উপায় না পেয়ে বিচারের ভার নিজের হাতে তুলে নেয়— তখন আমাদের জীবন মুক্ত নয়, বরং ভীতি-শঙ্কাময়।
জ.
বাংলাদেশে মানুষের জীবন যে কত সস্তা, তা প্রমাণ দিয়েছে প্রতিদিনের সড়ক দুর্ঘটনা। একটি দুর্ঘটনার মর্মান্তিক শোক সামলে উঠতে না উঠতেই আরেকটি দুর্ঘটনার মৃত্যুফাঁদ রক্তাক্ত করে মানুষের জীবন। সংবাদপত্রে প্রতিদিনই ছাপা হয় দুর্ঘটনার খবর। ভারী হয় স্বজন হারানো মানুষের কান্না। ঈদের ছুটিতে তিনদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫২ জন। আহত হয়েছে ২৭৪জন। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছে কমপক্ষে ১৫৭৮ জন নারী ও পুরুষ। গুরুতর আহত হয়েছে আরও ২৬৮৫ জন। দুর্ঘটনা বিশ্বের সব দেশেই ঘটে। সন্দেহ নাই, সড়ক দুর্ঘটনার হার স্বাভাবিকতার সীমা ছেড়ে গিয়েছে বহু আগেই। কিন্তু কার অপরাধে প্রতিদিন অকাতরে প্রাণ দিতে হবে দেশের মানুষকে? মৃত্যুর মিছিল আর কত দীর্ঘ হলে, স্বজন হারানো মানুষের শোক ও ক্ষোভ আর কতোটা ব্যাপ্ত হইলে সড়ক দুর্ঘটনার মহামারি হইতে মুক্ত হবে দেশ?
ঝ.
প্রতিদিনই পত্রপত্রিকার পাতায় প্রকাশিত দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন-খারাবি, হানাহানি-মারামারির ক্রমবর্ধমান ঘটনা থেকে বর্তমান সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা পরিষ্কার হয়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যত জোরের সঙ্গে পরিস্থিতি ভালো দাবি করুন না কেন, বাস্তবতা যে ভিন্ন সেটা এখন কেউই অস্বীকার করতে পারেন না। এমনটা চলতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দিন দিনই সবার কাছে বড় হয়ে উঠছে।
ঞ.
দেশজুড়ে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক নেতৃত্ব তথা সরকারের ব্যর্থতাই প্রকট হয়ে উঠেছে। আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষার মতো বিষয় নিয়ে যত বড় বড় কথা বলা হয় কাজে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যায় না। সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাছাড়া ভাবই সবাইকে বেপরোয়া করে তুলেছে। দলীয়করণ, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশাসনও যেন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার ও অপরাধীদের ছাড়া পাওয়ার ঘটনা সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। লুটপাট, সন্ত্রাস, জবরদখলে মেতে উঠেছে ক্ষমতাশালী ও তাদের ছত্রছায়ায় লালিতরা। ফলে জননিরাপত্তাই শুধু নয়, বিষয়-সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ সদা শঙ্কিত না হয়ে পারছে না।
শেষ কথা
বিজয়ের একচল্লিশে দাঁড়িয়ে আমরা এখন। বদলেছে বাংলাদেশ। বদলেছে বিশ্বের চলমান রাজনীতির গতি প্রকৃতি। একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার এবং সত্যিকারের গণতন্ত্রে উন্নীত হওয়ার শপথ নিতে হবে আমাদের। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। তাহলেই সম্ভব নতুন বাংলাদেশ এর স্বপ্ন দেখতে।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/SaifBarkatullah |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| সাইফ বরকতুল্লাহ। কম্পিউটার প্রকৌশলী হলেও মূলতঃ একজন কথাশিল্পী,কলাম লেখক ও সাংবাদিক। ১৯৮৩ তে জন্ম জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানার তেঘরিয়া গ্রামে। ছাত্র জীবন থেকেই লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ১৯৯৭ সাল থেকে সাপ্তাহিক, মাসিক এবং দৈনিক পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, ফিচার, কলাম লিখে চলেছেন অনবরত। ১৯৯৯ সালে তার প্রথম সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন মুক্তবাচন প্রকাশিত হয়। ২০০৪ সালে তার সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন কোলাকুলি প্রকাশিত হয় বিশেষ ঈদ সংখ্যা হিসেবে। ২০০৬ সালে তার পরিকল্পনা ও সহযোগি সম্পাদনায় বের হয় মাসিক পত্রিকা বিপরীত। পত্রিকাটি ৮ম সংখ্যা প্রকাশিত হবার পর বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি যোগদেন সাপ্তাহিক আগামীর সাথে । আগামীর সাথে তার নিয়মিত কলাম মিডিয়াওয়াচ ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০০৭-এ যায়যায়দিনে নিয়মিত কলাম লিখতে থাকেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯৯ সালে জামালপুর অভিযাত্রী শিল্পী গোষ্ঠীর সহকারী পরিচালক, ২০০৪ সালে ঢাকার অনুরণন শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ২০০৫সালে বিপরীত উচ্চারণ সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকরে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশে নতুনদের জন্য পুরস্কার ভিত্তিক সাহিত্য সভা চালু করেন। এছাড়াও ত্রৈমাসিক নতুনকণ্ঠ এবং মাসিক সম্ভাবনার বাংলাদেশ এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেছেন এক বৎসর। তিনি গ্লোবাল লাইটহাউস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর আজীবন সদস্য। ২০০৮ থেকে ২০০৯ এর জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইসলামিক টেলিভিশনে নিউজরুম এডিটর হিসেবে হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি অনলাইন নিউজ পেপার আরটিএনএন-এর নিয়মিত কলাম লিখছেন। |
|
বিজয়ের একচল্লিশে দাঁড়িয়ে আমরা এখন। বদলেছে বাংলাদেশ। বদলেছে বিশ্বের চলমান রাজনীতির গতি প্রকৃতি। একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার এবং সত্যিকারের গণতন্ত্রে উন্নীত হওয়ার শপথ নিতে হবে আমাদের। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে। তাহলেই সম্ভব নতুন বাংলাদেশ এর স্বপ্ন দেখতে।