বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:০৯ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

তিস্তা নদীর অস্তিত্ব ও পানিচুক্তির আদ্যপান্ত

সরদার আবদুর রহমান

এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতি যেন অনেকটাই তিস্তা নদীর ভাগ্যের উপর নির্ভর হয়ে পড়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর অন্যতম এই তিস্তা। ফলে এটি একটি আন্তর্জাতিক নদী হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। এই নদীর পানি প্রবাহের উপর বাংলাদেশের হিস্যাও তাই আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। এই নদীর পানি বাংলাদেশ ন্যয়সঙ্গতভাবে পাচ্ছেনা বলে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের মধ্যে এক টানাপড়েন চলে আসছে। পানি না পাবার প্রধান কারণ- তিস্তায় ভারতের নির্মিত বাঁধ, খাল ও অন্যান্য প্রকল্প। এসব প্রকল্পের কারণে শুকনো মওসুমে তিস্তার ভাটিতে পানি আসতে পারে না। যে কারণে বাংলাদেশ অংশ মরুকরণের শিকার হচ্ছে। যেমন হয়ে থাকে ফারাক্কার কারণে গঙ্গার পানি পদ্মা নদীতে পৌঁছাতে না পারায়। তিস্তার পানি নিয়ে দুই দেশের কূটনীতির পানি অনেক ঘোলা হলেও এর সমাধানে পৌঁছাতে পারছেনা ভারত-বাংলাদেশ। এনিয়ে দু’দেশের রাজনীতেই প্রবল আলোড়ন চলছে।

তিস্তার ঠিকানা
তিস্তার যাত্রা ভারতের উত্তর সিকিমের সো লামো হ্রদ থেকে শুরু হয়েছে। অতঃপর তা দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্সের সমভুমি দিয়ে চিলাহাটি থেকে ৪/৫ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ির নিকট ডিমলা উপজেলার ছাতনাই নামক স্থানে প্রবেশ করেছে। ছাতনাই থেকে এই নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, কালিগঞ্জ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশে গেছে। প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ডিমলা থেকে চিলমারী পর্যন্ত এই নদীর বাংলাদেশ অংশের মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গ কিলোমিটার। আর ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও খরস্রোতা বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ ১শ’ ২৪ কিলোমিটার। ফলে এটি শুধু স্বাধীন একটি নদীমাত্র নয়, তিস্তা বাংলাদেশেরও নদী এবং তা ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহেরও অন্যতম উৎস। তিস্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া মানেই ভাটিতে বাংলাদেশের তিস্তার অপমৃত্য এবং সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনার প্রবাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এই নদীর অস্তিত্বের সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্ভরশীল। বর্তমানে তিস্তার অবস্থা দাঁড়িয়েছে একটি মরা খালের মতো। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ৫শ’ ফিট উচ্চতায় এ নদীর উৎস হওয়ায় উজানে তিস্তার গতি ছিলো উচ্ছল ও দূর্বার। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের উজানে গাজলডোবা নামক স্থানে ভারত একটি ব্যারেজ নির্মাণ করে তিস্তার এই দূর্বার গতিকে থামিয়ে দেয়। তিস্তার মূল স্রোতধারাকে ব্যারেজের বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে ঘুরিয়ে তারা তাদের উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিভিন্ন সেচ কাজে লাগায়। গাজলডোবা ব্যারেজ থেকে শুস্ক মৌসুমে যে পরিমাণ পানি ভাটিতে বাংলাদেশকে দেয়া হয় ওই পরিমান পানি প্রায় ৬৩ কিলোমিটার অতিক্রম করে তিস্তা ব্যারেজে এসে পৌঁছে তখন নদীর স্রোতধারা ক্ষীণ হয়ে সরু ফিতার আকার ধারণ করে।

তিস্তা নদীর ইতিহাস সূত্রে প্রকাশ, ১৭৮৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিস্তা নদী ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদী। এই নদীর যৌবনা অবয়বের কারণে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতি ছিল শীতল, শান্ত ও মায়াময়। জলবায়ু ছিল অতিব সহনীয়। কিন্তু পানি ভারতের পানি আটকানো ও প্রত্যাহারমূলক কার্যক্রমের ফলে তিস্তা তীরবর্তি ও আশেপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠতে থাকে। তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুক জুড়ে শুষ্ক মৌসুমে থাকে বালূ আর বালু। অন্যদিকে বর্ষাকালে মুল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচন্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙ্গনে প্রতিবছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে পথের ভিখিরি হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশী। অন্যদিকে বর্ষাকালে এই নদীর গভীরতা হয় ৫ দশমিক ৫০ মিটার। আর শুষ্ক মৌসুমে তা গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১ মিটারে। ফলে তিস্তার দুই পার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় অর্ধকোটি মানুষ রুক্ষ প্রকৃতির দানব ছোবলে বিপর্যস্ত।

তিস্তায় অসংখ্য প্রকল্প
ভারত তিস্তার উজানে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে গাজলডোবা নামক স্থানে তিস্তা নদীর উপর একটি ব্যারাজ ১৯৯০ সালে নির্মাণ সম্পন্ন করে। যা বৃহৎ একটি সেচ প্রকল্প হিসেবে কাজ করছে। ভারত তার অংশের তিস্তার পুরো অংশকে কাজে লাগিয়ে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় পানির বৃহৎ বৃহৎ রিজার্ভার গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এগুলোর শক্তিশালী প্রবাহ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। গাজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিনষ্ট হওয়ায় পানিপ্রবাহের ডাটা আর পরস্পরকে আদানপ্রদান করা হয়নি।

শুধু গাজলডোবায় বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোই শেষ নয়, উজানে খাল কেটে তিস্তার পানি মহানন্দায় সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ‘তিস্তা-মহানন্দা ক্যানেল’ নামের প্রকল্পের মাধ্যমে এই পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এর দৈর্ঘ ২৫ কিলোমিটার। আর মহানন্দায় একটি ব্যারাজ প্রকল্পের সাহায্যে এই বাড়তি পানি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশকে কতটুকু পানি দেয়া হবে না হবে তা নিয়ে এক কৃত্রিম দরকষাকষি চালানো হচ্ছে।

ভারত গাজলডোবায় যে ব্যারাজ নির্মাণ করেছে তার ফলে তিস্তার ভারতীয় অংশ শুকনো মওসুমে পানির আধারে পরিণত হয়। এই আধার থেকে পানি সরিয়ে নেবার জন্য তৈরি ‘তিস্তা-মহানন্দা মূল ক্যানেল’-এর সাহায্যে তিস্তার শুকনো মওসুমের প্রবাহ থেকে ১ হাজার ৫শ’ কিউসেক পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। তিস্তা-মহানন্দা সংযোগ খাল থেকে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, কোচবিহার, মালদহ জেলার কৃষি জমিতে সেচের পানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ খালটির মধ্যে করলা, নিম, সাহু, করতোয়া ও জোড়াপানি নদী রয়েছে। এসব নদীর ওপর অ্যাকুইডাক্ট (কৃত্রিম পানিপ্রণালী) তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক কারিগরিতে তৈরি অ্যাকুইডাক্টের নিচে বয়ে চলেছে নদী, ওপর দিয়ে খাল। এতে খরচ হয়েছে ১৫ কোটি রূপী।

বাংলাদেশের একপাশে (বাংলাদেশ থেকে ৬৩ কি. মি. উজানে) ১৯৭৫-৭৬ সালে তিস্তায় তৈরি করা হয়েছে ৯২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ তিস্তা ব্যারাজ এবং অন্য পাশে বাংলাবান্ধার অদূরে মহানন্দায় ১৯৮৬ সালে নির্মাণ করা হয়েছে মহানন্দা ব্যারাজ। মহানন্দা ব্যারাজে লকগেট রয়েছে ১০টি। এই দুই ব্যরাজের মধ্যবর্তী স্থানের হাজার হাজার একর জমিকে সুজলা-সুফলা করতে তিস্তার প্রায় সমুদয় পানি প্রবাহ কাজে লাগানো হচ্ছে। এজন্য আরো একাধিক শাখা-প্রশাখাযুক্ত খাল খনন করা হয়েছে। এই ব্যারাজ ও খালের মাধ্যমে ভারত তিস্তার মোট পানি প্রবাহের ৮০ শতাংশ পানি জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও কুচবিহার জেলার ব্যাপক কৃষি জমিতে সেচ প্রদান করছে। উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ পানি ভারত ভাটিতে ছাড়লেও ৬৩ কি. মি. পথ অতিক্রম করে এই স্রোতধারা বাংলাদেশের ব্যারেজ এলাকায় পৌঁছাতে গিয়ে একেবারেই ক্ষীণ দশায় পরিণত হয়।

সূত্র জানায়, তিস্তার পানি কাজে লাগানোর মাধ্যমে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য ভারত বিভিন্ন স্তরে কয়েকটি ভাগে প্রকল্প গ্রহণ করে। এগুলো হলো, তিস্তা-মহানন্দা মূল ক্যানেল, মহানন্দা মূল ক্যানেল, ডাউকনগর মূল ক্যানেল এবং নগর ট্যাঙ্গোন মূল ক্যানেল। সম্পূর্ণ প্রকল্পটির নির্মাণ শেষ হলে সেচের আওতায় আসবে প্রায় সোয়া ৯ লাখ হেক্টর জমি। কিন্তু পুরো প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। কেননা বাস্তব কারণে তা আর বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এমনকি মূল ক্যানেল নিয়েই সমস্যা রয়ে গেছে। এ সমস্যার কারণে পুরো ব্যবস্থাটি অকার্যকর হয়ে আছে। ফলে এই প্রকল্প অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমিয়ে রাখা পানির অপচয় ঘটছে। আর বাংলাদেশ অংশ পরিণত হচ্ছে পানিহীন শুষ্ক ভূমিতে।

এদিকে, তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে ভারত অন্ততঃ আরও ৩৫টি সেচ ও পানি-বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের মাধ্যমে বেশীরভাগ পানিই টেনে নেয়ার পরিকল্পনা করছে। এসব প্রকল্পের জন্য বিশাল বিশাল বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে পানি সংক্ষণের জন্য। এর ফলে তিস্তার পানি ভারতের অভ্যন্তরেই থেকে যাবে। তিস্তা নদীর উপরে ভারতের প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো হলো, ভাসমি, বিমকং, চাকুং, চুজাচেন, ডিক চু, জোরথাং লোপ, লাচিন, লিংজা, পানান, রালাং, রামমাম-১, রামমাম-৪, রণজিৎ-২, রনজিৎ-৪, রাংইয়ং, রাতিচু-বাকচা চু, রিংপি, রংনি, রুকেল, সাদা মাংদের, সুনতালি তার, তালিম, তাশিডিং, তিস্তা-১, তিস্তা-২, তিস্তা-৩, তিস্তা-৪, তিস্তা-৬, থাংচি, টিং টিং প্রভৃতি। এছাড়াও বর্তমানে চলমান প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, লোয়ার লাগিয়াপ, রামমাম-২, রণজিৎ-৩, তিস্তা-৫ এবং রঙ্গিচু। এগুলো সবই পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এসব প্রকল্পের কারণে তিস্তার ভাটিতে পানির কথিত ‘স্বাভাবিক প্রবাহ’ কতটুকু থাকবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।

তিস্তা চুক্তির অতীত
প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই দেশের মন্ত্রী পরিষদের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বন্টনে শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ ও ৩৯ ভাগ ভারত এবং ২৫ ভাগ নদীর জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু ঐ সিদ্ধান্তে তিস্তার পানি প্রবাহের পরিমান, কোন কোন জায়গায় পানি ভাগাভাগি হবে এরকম কোন বিষয় উল্লেখ না থাকায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, ২০০৭ সালের ২৫, ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে বাংলাদেশ তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বন্টন করে বাকী ২০ ভাগ নদীর জন্য রেখে দেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে উল্টো তিস্তার কমান্ড এরিয়া তাদের বেশী-এই দাবী তুলে বাংলাদেশ তিস্তার পানির সমান ভাগ পেতে পারে না বলে যুক্তি দেখায়। শুধু তাই নয়, ভারত তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের সেচ এলাকা কমিয়ে দ্বিতীয় প্রকল্প বাতিল করার জন্য চাপ দেয়। পরবর্তীতে ভারত এক চিঠিতে তিস্তার মাত্র ২০ ভাগ পানি ভাগাভাগি করার বিষয়টি জানিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। ফলে শুস্ক মৌসুমে পানি শূন্য হয়ে তিস্তা হয়ে যায় মরুভূমি। আর অসময়ে অর্থাৎ বর্ষাকালে গাজলডোবার গেট খুলে তিস্তায় পানি ছেড়ে দিয়ে তিস্তাতীর ও আশেপাশের অর্ধকোটি মানুষকে বন্যায় বন্দী করে ফেলে।

সর্বশেষ, ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারী ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লীতে নদী কমিশনের সচিব পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন। পরে ১৮ ও ১৯ মার্চ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বেশ কয়েক দফায় বৈঠকের পর মনমোহন সিংহের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার চুড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অসম্মতির বরাত দিয়ে এই চুক্তি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।

চুক্তি নিয়ে টানাপড়েন
তিস্তা চুক্তির বিষয়টি কখনোই খোলাসা করে বলেনি ভারত। তবে এনিয়ে ভারতের সংবাদপত্রের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ভারতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শংকর মেনন কলকাতা গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং চুক্তির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। এই বৈঠকের পর গত ৩০ অগাস্ট কলকাতার পত্রিকা আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মমতা খসড়া চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন। অবশ্য খসড়া চুক্তিতে পানি বণ্টন নিয়ে কী লেখা আছে, তা নিয়ে দুই রকম খবর এসেছে গণমাধ্যমে। আনন্দবাজারের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী শিলিগুড়ি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের গাজলডোবা পয়েন্টে তিস্তায় প্রবাহিত পানির পরিমাণ হিসাব করে দু’দেশের মধ্যে পানিবণ্টন হবে। ৪৬০ কিউসেক হারে পানির সঞ্চয় রেখে বাকি পানির ৫২ শতাংশ নেবে ভারত, ৪৮ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু পরদিনই ভারতের লোকসভার সদস্য আবু হাসেম খান চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিস্তার পানির ৭৫ শতাংশ ভারত নেবে এবং ২৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের তিস্তার পানি বণ্টন (প্রতিবছর ১ অক্টোবর থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ এপ্রিল) নিয়ে তিনটি প্রস্তাব আলোচিত হয়েছে। ১. ভারতের গাজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি বাংলাদেশ ও ভারত সমভাবে ভাগ করে নেবে। ২. ভারতের গাজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ২০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৮০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালে প্রস্তাবিত এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৩৮ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪২ শতাংশ এবং ৩. ভারতের গাজলডোবায় লব্ধ পানির শতকরা ১০ ভাগ নদীখাত সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকবে, আর বাকি শতকরা ৯০ ভাগ পানি ১৯৮৩ সালের এডহক চুক্তি অনুযায়ী ৩৬:৩৯ অনুপাতে বাংলাদেশ ও ভারত ভাগ করে নেবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ পাবে ৪৩ শতাংশ আর ভারত পাবে ৪৭ শতাংশ।

এই তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে প্রথমটি ছিল বাংলাদেশের মূল প্রস্তাব আর বাকি দুটি ছিল বিকল্প। সুতরাং অধিক আলোচনা হয়েছে প্রথমটি নিয়েই। এর বিপরীতে ভারতের প্রস্তাব ছিল অতিমাত্রায় একপেশে; যাতে উল্লেখ করা হয়, শতকরা ১০ ভাগ পানি নদীর জন্য রেখে ভারতের গাজলডোবা ও বাংলাদেশের দোয়ানীতে সেচ প্রকল্পের কমান্ড এরিয়ার অনুপাতে পানি বণ্টন করা হবে। গাজলডোবায় সেচ প্রকল্পের কমান্ড এরিয়া ৫.৪৬ লাখ হেক্টর আর দোয়ানীতে ১.১১ লাখ হেক্টর- সেই বিচারে ১০ শতাংশ পানি নদীর জন্য রেখে বাকি ৯০ শতাংশ পানি ৫:১ অনুপাতে বণ্টন করার প্রস্তাব করে ভারত, যাতে বাংলাদশের ভাগে জুটবে মাত্র ১৫ শতাংশ আর ভারতের ভাগে ৭৫ শতাংশ।

শুভঙ্করের ফাঁকি
সংশ্লিষ্ট মহল থেকে শোনা যায়, তিস্তার পানি বন্টনের জন্য ১৫ বছরের একটি সাময়িক চুক্তি হবে। তিস্তার পানি প্রবাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে এই পানি বন্টনে স্থায়ী চুক্তি হবার কথা ছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও শুধু গঙ্গা ছাড়া অন্য কোন নদীর পানি বন্টনে দু’দেশের মধ্যে কোনো চুক্তি নেই। এখন তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির মডেল অনুসরণ করে অপরাপর অভিন্ন নদীর পানি বন্টন চুক্তি হবার কথা। এর আগে বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তিস্তার পানিপ্রবাহে যে ডাটা পরস্পরকে হস্তান্তর করেছে সেটাকেই ভিত্তি ধরে চুক্তি সই করতে বলেছিল। কিন্তু গাজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করার ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিনষ্ট হওয়ায় পানিপ্রবাহের ডাটা আর পরস্পরকে আদানপ্রদান করা হয়নি। অপরপক্ষে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সমঝোতা মোতাবেক যদি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য ১০ ভাগ রেখে অবশিষ্ট পানি সমানভাগে ভাগ করে নেবার কথা বলা হয় তবে তা হবে এক শুভঙ্করের ফাঁকিমাত্র। কারণ ভারতের অসংখ্য প্রকল্পের চাহিদা মেটাতে গিয়ে তিস্তার ভাটিতে এসে মোট পানির পরিমাণ ১০ ভাগ থাকবে কিনা সে সন্দেহও রয়েছে। আর এই প্রবাহের হিসাব হবে কিসের ভিত্তিতে তাও নির্দিষ্ট নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পানিই বাংলাদেশকে দেবার কথা বলা হোক না কেন- এই পানি প্রাপ্তি কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোন হদিস দেয়া হচ্ছেনা। পানির মোট পরিমান গাজলডোবা বাঁধের ভেতর থেকে হিসাব করা হবে, নাকি বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের মুখে হিসাব করা হবে, তাও নিশ্চিত নয়। ফলে এক গোলক ধাঁধার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো বিষয়টি। এখান দেখা যাচ্ছে, যে কোন ভাবে ভারত বাংলাদেশকে কখনো ১০ শতাংশ আর কখনো ২৫ শতাংশের বেশি পানি দিতে সম্মত হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে কোন ফরমূলাতেই তার প্রয়োজন পরিমাণ পানি পাবেনা। কারণ ভারত তার অংশে যে সকল প্রকল্প গড়ে তুলেছে সে সবের পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের ভাগে কোন পানিই জুটবেনা।

ভারতের কৌশল?
এদফায় তিস্তা চুক্তি না হবার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়কে দায়ি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা একটা কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে। কেননা মনমোহন সিং ঢাকায় সফর শুরুর আগেই মমতা ব্যানার্জিকে আশ্বস্ত করে আসেন যে বাংলাদেশে তিনি এমন কিছু করবেন না যা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কোনো ক্ষতির কারণ হবে। তৃণমূল কংগ্রেসে মমতার এক ঘনিষ্ঠজনের বরাত দিয়ে এনডিটিভি জানায়, প্রধানমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে বলেছেন, ভারত সরকার সব কিছুতেই পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের দিকগুলো বিবেচনায় রাখবে। এবং এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তই মমতার সঙ্গে আলোচনা না করে চুড়ান্ত করা হবে না। বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে বাংলাদেশ আসার সব কর্মসূচি চুড়ান্ত থাকলেও মমতা ব্যানার্জি শেষ মূহৃর্তে জানান, তিনি ঢাকা আসছেন না। এর কারণ তিস্তার পানি বন্টনে পশ্চিমবঙ্গ ন্যয্য হিস্যা পাচ্ছে না। মমতা এই অবস্থান নেয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি চুড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও তা বাতিল করে ভারত। সেই সূত্র ধরেই দেশ ত্যাগের ঠিক আগেই ভারতীয় সরকার প্রধান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন, তাদের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তিই ঢাকায় স্বাক্ষর করবেন না তিনি। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, একটা ছিল একটা নাটক। ভারত তাদের স্বার্থ থেকে একচুলও নড়তে রাজি নয়।

অপমৃত্যূর কবলে তিস্তা
তিস্তা বাংলাদেশেরও নদী এবং তা ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহেরও অন্যতম উৎস। তিস্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া মানেই ভাটিতে বাংলাদেশের তিস্তার অপমৃত্য এবং সেই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনার প্রবাহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এই নদীর অস্তিত্বের সঙ্গে বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্ভরশীল। খোদ সিকিমের সাধারণ মানুষ এসব বাঁধ-ব্যারাজের বিরোধিতা করছে। এনিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছেনা বলে জানা গেছে।

এদিকে বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার দোয়ানিতে যে তিস্তা ব্যারাজ নির্মিত হয়েছে তাও এসব প্রকল্পের ফলে অকার্যকর হয়ে পড়বে। এখান থেকে একশো কিলোমিটার উজানে জলপাইগুড়ির গাজলডোবার তিস্তা ব্যারাজ দিয়ে ভারত ইতোমধ্যে শুকনো মওসূমে দেড় হাজার কিউসেক করে পানি তার অংশের মহানন্দায় প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে। তার প্রতিক্রিয়াই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের অধীন সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেবার কার্যক্রমও শিকেয় উঠবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এখন আবার ৩৫ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করা শুরু হলে বাংলাদেশের তিস্তার অপমৃত্যূই ঘটবেনা- বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহও ব্যাপক হ্রাস পাবে। ফলে এক বিরাট অববাহিকা জুড়ে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির কবলে পড়বে বাংলাদেশ। অচল হবে উত্তরাঞ্চলের ছোটবড় ১২টি নদী ও নালা। মরুকরণের কবলে পড়বে উত্তরের জীববৈচিত্র্য, হ্রাস পাবে মাছের উৎপাদন। বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ বাড়বে বৃহত্তর রংপুরে।

তিস্তা সেচ প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ৩৮ বছর আগের ভরা তিস্তা আজ মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের জীববৈচিত্র্যের ওপর। দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের সেচ কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার মতো পানিও মিলছে না। চর পড়েছে নদীতে। চারপাশে ধু-ধু বালু।

অনুসন্ধান ও সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার প্রবাহ পথে বিশাল বালু চর ও উভয় তীরে ভাঙনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশী। আবার কোন জায়গায় মাত্র ২শ’ থেকে ৫শ’ গজে সংকীর্ণ হয়ে গেছে। বর্ষাকালে এই নদীর গভীরতা ৫ দশমিক ৫০ মিটার হলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কোথাও কোথাও মাত্র এক মিটার থেকে এক মিটারে এসে দাঁড়ায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, তিস্তার তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার ১২৫ বর্গকিলোমিটার বুকে এখন বালির উত্তাপ। দেখে বোঝার উপায় নেই-এটি একদা খরস্রোতা নদী ছিলো। পরিবেশবিদরা বলেছেন তিস্তাসহ এই অঞ্চলের ধরলা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, আখিরা, দুধকুমার, বুড়ি তিস্তাসহ প্রায় ৩৩টি ছোট-বড় নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ভুগর্ভস্থ পানির স্তর ব্যাপকভাবে নেমে গেছে। পাউবো সূত্রে প্রকাশ, এবার শুষ্ক মওসুমের শুরুতেই ভারত গাজলডোবার সবক’টি গেট বন্ধ করে দেয়ায় তিস্তায় পানির প্রবাহমাত্রা এখন বিগত ১শ’ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তিস্তায় পানির প্রবাহমাত্রা ছিলো ৪ হাজার ৬৭০ কিউসেক। কিন্তু এবার মওসুমের শুরুতে তিস্তার পানি প্রবাহমাত্রা মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ কিউসেকের মধ্যে উঠানামা করে।

তিস্তা সেচ প্রকল্পের অবকাঠামো অচিরেই কঙ্কালে পরিণত হবে
ভারতের সঙ্গে তিস্তা পানি চুক্তি না হবার ফলে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প ভেস্তে যাবার উপক্রম হয়েছে। আর পানি না পেলে তিস্তা প্রকল্পের অবকাঠামো অচিরেই কঙ্কালে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দীর্ঘদিনের আলোচনার বহুল প্রত্যাশিত তিস্তার পানিচুক্তি স্বাক্ষর না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের ৩৫টি উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক সাধারণ কৃষক হতাশ হয়ে পড়েছেন তাদের কৃষি নিয়ে। তিস্তার পানি চুক্তি না হওয়ায় তিস্তাসেচ প্রকল্পে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। ১৯৭৯ সালের ১২ই ডিসেম্বর নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া ও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার দোয়ানী এলাকায় তিস্তা নদীর উপর ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ প্রকল্প (তিস্তা ব্যারেজ) নির্মাণ করা হয়। এই প্রকল্পে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৩৫টি উপজেলার প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি ইরি এবং বোরো মৌসুমে সেচ সুবিধার আওতায় আনার পূর্ণ পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু গাজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে সেখানে ভারতের সুবিধামতো পানি আটকে দেয়া হয়। তাতে পানির অভাবে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য বাধাপ্রাপ্ত হয়। সেই পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাত্র ৬৫ হাজার হেক্টর জমি সেচ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমি সেচ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। কিন্তু ক’বছরের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তিস্তা পারের হাজার হাজার হেক্টর জমি সেচের অভাবে অনাবাদি পড়ে থাকে। এবার পানি চুক্তি হওয়ায় একটা আলো জ্বলে উঠলেও শেষ মূহুর্তে তা নিভে গিয়ে উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের আশার তরী ডুবে গেছে। পানিচুক্তি না হওয়ায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন বন্যা ও খরায় বিপন্ন নিঃস্ব মানুষেরা।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে পানির হিস্যা দিতে হলে এসব খাল বন্ধ করে দিয়ে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। ভারতের গাজলডোবা থেকে বাংলাদেশের ডালিয়া পর্যন্ত তিস্তা নদীর ৬৩ কিলোমিটার অংশকে নাব্য রাখার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুবা বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি নিয়ে দরকষাকষি হবে নিছক কুটনীতির মারপ্যাঁচের খেলামাত্র। কাগজে-কলমে তা ২৫ না ৫০ শতাংশ হলো, না তার বেশী হলো- তাতে কিছুই আসে যায়না। বাংলাদেশ তাতে কখনোই উপকৃত হতে পারবেনা।

sardarabdurrahman@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/SardarAbdurRahman
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
রাজশাহী থেকে মাসউদ লিখেছেন, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১১; রাত ১০:০৮
ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি কখনই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল জনক নয়, অতীত ইতিহাস ও বর্তমান ভারতীয় চাণক্য নীতি তাই বলে! যেখানে এদেশের নিগোশিয়েটররা দালালীপনা, নিজ জাতির প্রতি শঠতা ও দাদাদের গোলামীকেই স্বীয় কর্তব্য মনে করে সেখানে ''দরকষাকষি'' র কী আছে?

এমন তথ্যবহুল, যুক্তিগ্রাহ্য অধিকারগুলি বিশ্লেষণ করলেই হতে হবে সংকীর্ণমনা, অসভ্যতা, আইএস আই মদদপুষ্ট চিন্তা চেতনা আরো কত কি!! লেখককে আন্তরিক শুভেচ্ছা!!!

তাই যখন আমার প্রাণের স্পন্দন পদ্মাকে দেখি তখন ভেসে উঠে সর্বনাশী পদ্মার পরাজিত রূপঃ
কতদিন থেকে যাই না পদ্মার পাড়ে
কিংবা পদ্মা গার্ডেনের দুর্বায়িত ধারে
অতীতে বহু পদধূলি পড়েছে সেথা
হৃদয়ের সুপ্ত বাসনা যায়নি বৃথা
বাসনার সে যাপিত রঙিন জীবন
সদা আকর্ষিত মনে তোলে আলোড়ন।
হঠাৎ যেন সব তছনছ হয়ে গেল
জীবনের স্বপ্ন ভূলুণ্ঠিত এলোমেলো
পরিকল্পিত জীবনের স্বপ্নিল সাধ
ভাসিয়া গেল সব, যেন বালির বাঁধ!
আজ এসেছি আনমনে অদৃশ্য টানে
এক আশাহত ব্যাথাতুর ভগ্ন মনে।
ক্রুর হেসে স্বাগত জানায় বালুচর;
যেথা ছিল একদা মোর স্বপ্নের ঘর।
ঘোর সর্বনাশী পদ্মার মরণ স্রোত
থমকে দিয়েছে আজ জীবন পরোত!
কী পেয়েছ গো পদ্মা আমায় করে পর,
শুধু সম্মুখে হেরি ধু-ধু বালুর চর।
তুমি করেছ মোরে যে পথের ভিখারী
এবে সে পথে তুমি এক লাঞ্ছিতা নারী
নেই তব রূপের ঐ উলঙ্গ জোয়ার
বিস্মৃত আকর্ষণ তাই বদ্ধ দুয়ার!
তবুও আসি স্মৃতিময় মধুর তানে
এ পড়ন্ত বিকেলের মরীচিকা পানে।
http://sonarbangladesh.com/blog/nahid74/41025
68422
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
সরদার আবদুর রহমান। ১৯৭৬ সালে সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে লেখালেখির সূচনা। জাতীয় পর্যায়ের ৩টি পুরস্কার পেয়েছেন : পরিবেশ সাংবাদিকতায় এফইজেবি পুরস্কার, প্যানোস পুরস্কার ও শব্দশীলন একাডেমি পুরস্কার। তাঁর এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, ১. রাজশাহী বিভাগ গাইড (যৌথ), ২. উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ৩. শব্দ শুনে জব্দ (ছড়াগ্রন্থ), ৪. মানুষের পেটে কেন জিলাপির প্যাঁচ (ছড়াগ্রন্থ), ৫. প্রসঙ্গ ইসলামী সংস্কৃতি (প্রবন্ধ) এবং মুঠোফোনের আর্তস্বর (গল্পগ্রন্থ)। ভ্রমণ করেছেন সৌদি আরব, ইংল্যান্ড ও ভারত।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy