|
সাংবাদিক হত্যার মিছিল আর কত দীর্ঘায়িত হবে?
সাইদ সিদ্দিকী |
|
দেশে কি হচ্ছে এসব? কোথায় যাচ্ছে দেশ? অরাজকতারও একটা সীমা আছে। মৃত্যুর মিছিলে সেসব সীমারেখা ঢাকা পড়ে গেছে অনেক আগেই। এখন মানুষের চাওয়া বড়জোর স্বাভাবিক মৃত্যু। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ‘আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি যেকোন সময়ের চেয়ে ভাল’ নামক বাঁশি অবিরাম বাজিয়ে যাচ্ছেন। অথচ আজ নিজের ঘরেও মানুষ নিরাপদ নয়, রাস্তা-ঘাটের প্রশ্নতো অবান্তর।
প্রখ্যাত সাংবাদিক ‘নির্মল সেন’ এর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী চরম অরাজক পরিস্থিতিতে তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েছিলেন। আজ এই মহান মানুষটি বেঁচে থাকলেও টানা অসুস্থতায় মৃত্যুর দোড়গোড়ায় অবস্থান করছেন। সুস্থ থাকলে আবারও হয়ত দরাজ কন্ঠে স্বাভাবিক মুত্যুর গ্যারান্টি চাইতেন।
যে মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসব কথার অবতারণা করেছি তা হল সাংবাদিক সাগর সরোয়ার দম্পতি হত্যা। গত (১১-০২-২০১২) সারাদিন প্রত্যেকটি গণমাধ্যমের আলোচনার মূল বিষয় ছিল এটি। সাংবাদিকরাতো বটেই, সারা দেশের মানুষ এই নির্মম হত্যাকান্ডের ঘটনায় শোকে মূহ্যমান। যে সাংবাদিকতার মাধ্যমে তারা দেশকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন সেই সাংবাদিকতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাড়াল। যে দেশের ভালবাসার টানে বিদেশের বিলাসী জীবন ছেড়ে দেশে এসে সাংবাদিকতা শুরু করলেন সে দেশই তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ হল-একথা ভেবে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসছে।
দুঃখজনক কথা হল, এমন মর্মন্তুদ ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পুলিশ ঘটনার কোন ক্যু বের করতে পারেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ৪৮ ঘন্টার আল্টিমেটামের পর সাংবাদিকদের ৭২ ঘন্টার আল্টিমেটামও গতকাল শেষ হয়েছে। অথচ খুনিরা এরই মধ্যে মেহরুন রুনীর পরিবারকে মুঠোফোনে হুমকি দিচ্ছে। মামলা সংক্রান্ত পুলিশের সর্বশেষ কথায় হতাশা স্পষ্ট। তারা যেন ক্লান্ত। নিজের অজান্তে মনের মধ্যে প্রশ্ন উঁকি দেয়, শেষ পর্যন্ত সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের রহস্যজট কি খুলবে না? নাকি আর দশটা মামলার মত এটিও একদিন নেতিয়ে পড়বে। আমরাও হয়ত একদিন তাদেরকে ভুলে যাব।
শুক্রবার গভীর রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার এবং তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। গোয়েন্দাদের ধারণা এ হত্যা পরিকল্পিত, খুনি পূর্ব পরিচিত। দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে লাশের ময়নাতদন্তের পর ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, দুজনের শরীরেই ছুরি ও ধারালো অস্ত্রের এলোপাতাড়ি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। একমাত্র সন্তান মেঘ (৫) এখন নির্বাক। সকালে ঘুম থেকে উঠে মা-বাবার লাশ দেখে সেই প্রথম ফোনে তার নানুকে জানায়।
একসময় গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হত। হাল আমলে সেই সাথে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। আরো ভয়াবহ আতংকের কথা হল, এখন সাংবাদিকরা খুন হচ্ছেন নিজের ঘরেই। দিনের পর দিন এই হত্যাকান্ড বেড়েই চলছে। শুধু আওয়ামীলীগ সরকারের এই তিন বছরের মাথায় দেশে সাংবাদিক খুন হয়েছে ১৪ জন। এর মধ্যে ২০১২ সালের শুরুতেই অর্থাৎ কাল (১১-০২-২০১২) খুন হলেন সাংবাদিক সাগর-রুনী দম্পতি। এছাড়া ২০১১ সালে খুন হয়েছে ৪ জন। গত ২৮ জানুয়ারি ৭৭ নয়াপল্টনের বাসায় খুন হন প্রবীণ সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ (৬০) ও তার স্ত্রী রহিমা খাঁ (৫৫)। ৭ ডিসেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ কুকরাইল এলাকায় গলা কেটে হত্যা করা হয় দৈনিক ভোরের ডাকের গোবিন্দগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ফরিদুল ইসলাম রঞ্জুকে। ৭ এপ্রিল ঢাকার উত্তরা ও চট্টগ্রামর পোর্টকলোনিতে খুন হয়েছেন ২ সাংবাদিক। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, ৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের পোর্টকলোনি এলাকায় দৈনিক আজকের প্রত্যাশা, সাপ্তাহিক সংবাদচিত্র ও আজকের সূর্যোদোয় পত্রিকার সাংবাদিক মাহবুব টুটুলকে হত্যা করা হয়েছে। একই দিন উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কে ১০ নম্বর বাসার বাসিন্দা সাপ্তাহিক বজ্রকন্ঠের সাংবাদিক আলতাফ হোসেনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর ১১ দিন আগে থেকে নিখোঁজ ছিলেন সাংবাদিক আলতাফ।
২০১০ সালে খুন হয়েছেন ৪ জন। তাদের মধ্যে ঐ বছরের ৯ মে গুপ্তহত্যার শিকার হন বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার সিনিয়র ক্যামেরাম্যান শফিকুল ইসলাম টুটুল। যদিও পরবর্তীতে পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছেন। ২০১০ সালের ২৮ এপ্রিল খুন হন বিশিষ্ট সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী। সাপ্তাহিত ২০০০ এর সিলেট প্রতিনিধি ফতেহ ওসমানীকে ঐ বছর ১৮ এপ্রিল কুড়াল ও রামদা দিয়ে কুপিয়ে আহত করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন হন বরিশালের মুলাদী প্রেস কাবের সভাপতি মনির হোসেন রাঢ়ী।
২০০৯ সালে নিহত হয়েছেন ৪ জন। ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকায় এনটিভির ভিডিও এডিটর আতিকুল ইসলাম আতিক, জুলাই মাসে ঢাকার পাক্ষিক মুক্তমনের স্টাফ রিপোর্টার নুরুল ইসলাম ওরফে রানা, আগস্ট মাসে গাজীপুরে ঢাকার সাপ্তাহিক সাপ্রতিক সময় এর নির্বাহী সম্পাদক এমএম আহসান হাবিব বারি, ডিসেম্বরে রূপগঞ্জে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকার সংবাদদাতা ও রূপগঞ্জ প্রেসকাবের সহসভাপতি আবুল হাসান আসিফ খুন হন।
এত গেল সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তালিকা। সরকার এসব হত্যাকান্ডের কঠোর বিচার করবে দূরে থাক বরং সরকার নিজেই সাংবাদিক নির্যাতনে খড়গহস্ত। ’৭৫ এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার যেমন ৪ টি পত্রিকা(২ টি দৈনিক, ১ টি সাপ্তাহিক, ১ টি মাসিক) বাদে বাকী ২২২ টি পত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে সাংবাদিক নির্যাতনে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারও সাংবাদিক নির্যাতনে ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছেন। স্বয়ং সরকার প্রধান টেলিভিশনের টকশোকে ‘টক’ বলে অভিহিত করেন তখন বলতেই হয়, উনার মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব রয়েছে। রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতির ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্রায়ই সাংবাদিকদেরকে সঠিকভাবে সাংবাদিকতা করার ছবক দিয়ে থাকেন।
হাল আমলে সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান এর উপর নির্যাতনের ঘটনা সর্বজনবিদিত। সর্বশেষ তিনটিসহ এ পর্যন্ত ৫২ মানহানির মামলা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। আমারদেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যদিও আদালতের হস্তক্ষেপে তা আবার চালু হয়। ছুঁতো অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে চ্যানেল ওয়ান ও যমুনা টিভি। বাংলাভিশনের ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ সহ অনেক চ্যানেলের টকশো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এ সরকারের আমলেই। আওয়ামীলীগের ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার। ক’দিন আগে এই সংসদ সদস্য টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভিতে কর্মরত অর্পণা সিং নামের এক নারী সাংবাদিককে দায়িত্ব পালনকালে নিজ হাতে প্রহার করে হাত ভেঙ্গে দিয়েছেন।
সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। ক্ষমতাসীনরা দিন দিন এ দর্পণকে অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর করতে করতে প্রায় অন্ধকার করে তুলছেন।
লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
sayd.rahman@yahoo.com |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/SaydSiddique |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
| |
|