ডিসেম্বর ২০১১ সালের শেষ প্রান্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো বলা যায় না। রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। ব্যয় অনেক বেশি। সরকারকে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যয় মেটানোর সম্ভাবনা কম। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান কমে গেছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও কমে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর অর্থও নেই। দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলেছে। মুদ্রাস্ফীতি এর প্রধান কারণ। দুর্নীতিও ক্রমেই বাড়ছে, যা উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করা সম্ভব নয়। স্বল্পমেয়াদে আমাদের চেষ্টা করতে হবে রফতানি বৃদ্ধি করা, রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনার। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ ছোট রাখা (যেখানেই সম্ভব উন্নয়নকাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া), রাজস্ব বৃদ্ধি করা। দারিদ্র্য দূরীকরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা। তবে অন্যান্য ভর্তুকি কমিয়ে আনা। কৃষক যাতে সঠিক দাম পায়, তার জন্য যথাযথ সংগ্রহ নীতি গ্রহণ করা (ধান, গম, পাট, আলুর মতো ক্ষেত্রে)। মধ্যমেয়াদে কী করতে হবে তা আলোচনার জন্য বিশ্ব প্রেক্ষাপটটি আলোচনা করতে চাই। ২০০৮ সাল থেকে মন্দা শুরু হয়েছে এবং ২০১১ সালে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তার প্রধান কারণ হচ্ছে ভারসাম্যহীন বাজেট। পাশ্চাত্যের অনেক দেশই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে তাদের খরচ মেটাচ্ছে। তারা অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচ করছে, যেমন যুদ্ধের খরচ।
এটা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের বেলায় সত্য। যারা আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তারা ধনীদের চাপের কারণে ট্যাক্স বৃদ্ধি করতে পারছে না, বরং তারা সামাজিক প্রোগ্রাম যেমন পেনশন বেনিফিট, স্বাস্থ্য সহায়তা ইত্যাদি কমিয়েছে। এখন ইউরোপে এগুলো আরো কমানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসবের কারণেই দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, গণ-অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে, ‘অকুপাই আন্দোলনের’ জন্ম হয়েছে। এসবের আরেকটি কারণ হচ্ছে- পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণাধীনতা (লেইসেজ ফেয়ারে) এবং মূল্যবোধহীনতা (পজিটিভিজম) নীতি।
যা হোক, এ প্রেক্ষাপট সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতি মধ্যমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য কতকগুলো প্রস্তাব পেশ করছি। মূল কাজ হচ্ছে- বাজেট ভারসাম্যপূর্ণ রূপে ফিরিয়ে আনা। বাজেটে আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। ট্যাক্স আরোপ করেই সরকারি রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে হবে। মধ্যমেয়াদে বৈদেশিক ঋণ পরিহার করতে হবে। পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ঋণ করে সরকার খরচ মেটাতে গিয়েই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপ যদি না পারে, তাহলে আমরা কিভাবে পারব? যতটুকু উন্নয়ন ট্যাক্স থেকে পারা যায় ততটুকুই সরকারি বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের প্রোগ্রামে রাখতে হবে। বাকি উন্নয়ন বেসরকারি খাতে করবে। বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজনমতো নেয়া যাবে, তবে তা আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হতে হবে। এটা করতে গিয়ে যদি রাজস্ব ব্যয় কমাতে হয়, তবে তা কমাতে হবে। এ জন্য মধ্যমেয়াদে কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ভর্তুকি ছাড়া অন্য সব ভর্তুকি তুলে দিতে হবে অথবা সবচেয়ে কম করতে হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস ও জ্বালানি উৎপাদন বা ক্রয়মূল্যের (cost price) কমে বিক্রি করা যাবে না। মূল্য কমে গেলে সাথে সাথে কমাতে হবে। বেড়ে গেলে বাড়াতে হবে। এসব করা কঠিন, তবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। তা না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সঠিক স্থানে ফিরিয়ে আনা যাবে না।
পাশ্চাত্যের বর্তমান সঙ্কটের আরেকটি কারণ- সম্পদের ৯৯ ভাগ বা এর কাছাকাছি মাত্র এক ভাগ লোকের কাছে চলে যাওয়া। এটা হয়েছে পুঁজিবাদের তাত্ত্বিক ত্রুটির জন্য, যা আগে একটু উল্লেখ করেছি। আরেকটি কারণ সুদ, যা সম্পদ কিছু লোকের হাতে চলে যাওয়াকে সাহায্য করে। এ কারণে মধ্যমেয়াদে আমাদেরকেও সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়া রোধের চেষ্টা করতে হবে। সুদের পরিবর্তে অর্থায়ন শরিকানাভিত্তিক করতে হবে; ইসলামি ব্যাংকিং যার উদাহরণ।
[সূত্র : নয়া দিগন্ত-০৪/০১/১২] |