জন্মের পর যদি দুই সহোদরকে রাখা হয় আলাদা আলাদা স্থানে এবং তাদের সাক্ষাতে থাকে বিধিনিষেধ, যদি এক ভাই থাকে মুক্ত আলোয়, আরেক ভাই গহীন গুহার মতো অন্ধকারে তাহলে কেমন লাগবে বলুন তো? ঠিক এমন অবস্থাই যেন এতোদিন ছিল পাটগ্রামের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী ও আমাদের মধ্যে। স্বাধীন দেশের অধিবাসী হয়েও তারা ছিল পরাধীন। রাতের অন্ধকার দূর করতে সেখানে ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না যোগাযোগ করার জন্য মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা, ছিল না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা। এখন তারা এসব পেয়েছে। ৬৪ বছর পর তারা মুক্ত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে মূল ভূ-খন্ডের সঙ্গে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতা- ‘বহুদিন ধরে, বহুক্রোশ ঘুরে’ র মতো ছিল আমার অবস্থা। নিজের জেলায় হওয়া সত্ত্বেও আমি তিনবিঘা করিডোর গিয়েছি অনেকদিন পর। ২০০৮ সালের অক্টোবরে। এরপর আরেকবার গত ডিসেম্বরে। তিন বছর আগের অক্টোবরে যখন সেখানে গিয়েছিলাম, তখন তাদের জীবনাচরণ দেখে অবাক হয়েছি। কীভাবে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের একটা এলাকা বিদ্যুৎ ছাড়া থাকতে পারে! যখন জানলাম, সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কেবল তারা এপাশ-ওপাশ যাওয়া-আসা করতে পারে তখন আরো বিস্মিত হলাম। মনে হলো এটা একটা জেলখানা। আমার তখন মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যা ছয়টার পর যদি এখানকার কেউ খুব অসুস্থ হয়ে যায় তখন তাকে হাসপাতালে নেয়া যাবে না! কোনো গর্ভবতী নারী যদি প্রসব বেদনায় কাতরাতে থাকে তাহলে তাকে হাসপাতালে নেয়া যাবে না, এই গন্ডির বাইরে তাদের কোনো আত্মীয়-স্বজন যদি মারা যায় তবে পরদিন ছাড়া তারা আসতে পারবে না, জরুরী কোনো কাজে তারা বাইরে আসতে পারবে না! ব্যাপারটা অনেক ভাবিয়েছিল আমাকে। বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) জওয়ানদের সাথে কথা বলেছিলাম। যখন তারা শুনলো, আমি ডাক্তারি পড়ছি তখন বললো, ভাই পাশ করার পর এখানে আসেন। এখানকার মানুষের খুব কষ্ট। নামমাত্র একটা হাসপাতাল থাকলেও, সেখানে ডাক্তার নেই, প্রয়োজনীয় ওষুধ-পত্র নেই। কয়েকজন এলাকাবাসীর সাথে কথা বলেছিলাম। তারা বলেছিল তাদের কষ্টের কথা। ওখানে হাইস্কুল ছিল মাত্র ১ টা আর প্রাইমারি স্কুল ছিল বোধ হয় ৪ টা। ছিল না কোনো কলেজ। কৃষিপ্রধান মানুষগুলোর বেশি চিন্তা ছিল তাদের অবরোধের মধ্যে থাকার ব্যাপারটি নিয়ে। তারা আরো জানিয়েছিল, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের কথা। তাদের কারো কারো জীবিকা ছিল- নদী পার হয়ে ভারতীয় গরু পাচার করে নিয়ে আসা। এতে বিএসএফের গুলিতে অনেকে মানুষ জীবন হারায় প্রতিবছর। আমি তাদের কষ্টের কথা শুনে কিছু বলতে পারিনি সেদিন। মনে মনে কামনা করেছিলাম, তাদের এই দশার যেন মুক্তি ঘটে। আমার সেই কামনা এখন পূর্ণ হয়েছে। বর্তমান সরকার তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে তাদের পক্ষ থেকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
গত ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় এসেছিলেন। যদিও ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকছে। সেদিন কৃতজ্ঞ ছিটমহলবাসীরা ছুটে এসেছিল প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে। সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ার লিখেছেন, একজন ছিটমহলবাসী তাঁকে বলেছে যে, একজন দহগ্রামবাসীও আজ ঘরে নেই, সবাই জনসভায় এসেছে। আসবে না কেন? তারা যে তাদের কাঙ্ক্ষিত মুক্তি পেয়েছে। ছিটমহলবাসীর কৃতজ্ঞতাবোধ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
বর্তমান সরকার অনেক ভালো ভালো কাজ করেছে। এর মধ্যে একটি- দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার ছিটমহলবাসীদের জন্য তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা। আমাদের লালমনিরহাটবাসীদের জন্য এটা একটা বড় পাওয়া। ছিটমহলবাসীরা এখন বৈদ্যুতিক সুবিধা, মোবাইল নেটওয়ার্ক সুবিধা, হাসপাতাল সুবিধা ও নতুন ইউপি ভবন পাবে। লালমনিরহাটবাসীর আরো অনেক দাবী পূরণের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। লালমনিরহাট সরকারি কলেজে মাস্টার্স কোর্স চালু হবে, পাটগ্রাম কলেজে অনার্স চালু হবে। এগুলোর প্রত্যেকটিই আনন্দের খবর। এরপর লালমনিরহাটবাসীসহ সারাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষিত তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিও হবে বলে আমরা প্রতীক্ষায় আছি। লালমনিরহাটবাসীর আরো যেসব দাবী আছে, সেগুলোও সরকার পূরণ করবে- এমন প্রত্যাশা করি।
সীমানায় কাটা তারের বেড়া
হাজার বিঘা নিয়ে খুলেছে
ক্ষনস্থায়ী দহগ্রাম, আঙ্গরপোতা,
ফারাক্কা চুক্তি ভঙ্গ করে
পানি করেছে হ্রাস,
টিপায়,তিস্তায় বাধ দিয়ে তারা
শুরু করেছে সন্ত্রাস,
করিডোর নিয়ে
ভেঙ্গে দিয়েছে
ব্রিজ কালভার্ট,
বিডিআর অফিসার
মেরে মোদের
গর্ভ করেছে শেষ,
ফেনসিডিল দিয়ে
তরুন প্রজন্ম
করে দিচ্চে নিঃশেষ,
এই যে মোদের প্রতিবেশী
মোহন দাসের দেশ,
হাসি রানী ঘোষনা করেছে
গজের দূর্গার নির্দেশ,
পড়ুশী হয়ে শত্রু বেশে
করে দিচ্চে সব শেষ,
দামাল ছেলেরা জাগবে কবে
গড়তে আপন দেশ।