মাস ব্যাপী পবিত্র সিয়াম সাধনার পর আনন্দের বারতা নিয়ে উদিত হয়েছে আজ ঈদের চাঁদ। মধ্যপ্রাচ্যে চন্দ্রবর্ষের হিসেব অনুযায়ি আজই পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ঈদ হয়তো কাল অথবা পরশু।
ঈদ মানে খুশী, ঈদ মানে আনন্দ। নতুন জামা, জুতা, শিশু-কিশোরদের কলরব। দল বেঁধে ঈদগাহে যাওয়া, নামায শেষে ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জিবিত হয়ে কোলাকুলি আর ঘরে ঘরে সেমাই ফিরনী জানান দেবে আজ ঈদ।
আমাদের প্রবাসীদের ঈদটা একটু অন্য রকম। সারা মাস ব্যাপী হাঁড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে কোন রকমে সেহরী আর ইফতার খেয়ে রোযা পালন। দেশের বাড়ীতে ইফতার আর সেহরীর জন্য কত আয়োজন, ভালভাবে না খেলে রোযা রাখবে কিভাবে! আর প্রবাসীদের ভাল আয়োজনের বালাই নেই, কোন রকমে একটা তরকারী দিয়ে দু'টো ভাত খেতে পারলেই যেন একটা দিন পার। তারপরও কি আমাদের উচ্ছ্বাসের কোন কমতি আছে। বাড়ীতে ফোন করে কত তদারকি, বৃদ্ধ মা-বাবা ইফতার সেহরীতে কি খেল, তাদের জন্য একটু আলাদা কিছু চাইই, দুধ কলার সাথে একটু ঘি থাকলে বোধহয় উনারা সেহরীটা তৃপ্তি সহকারে খেতে পারবেন। আদরের সন্তানগুলো ঠিকমত খেতে পারছে কিনা, কাকে কখন ইফতারী দেবে, কাকে দাওয়াত দেবে, কার জন্য কখন কি কেনা হচ্ছে ... ইত্যাদি। আর টাকা? ঈদের ৫/৭ দিন আগেই পৌঁছে যাবে; কোন চিন্তা নাই।
ঈদ ঘনিয়ে আসে তবু নিয়োগকর্তা বেতন দেয়না মাস শেষ হয়নি বলে, শত অনুনয় বিনয়ের পরেও তার মন গলেনা। কিন্তু টাকা না হলে যে বৃদ্ধ মা বাবা, ছোট ভাইবোন কিংবা আদরের সন্তানদের নতুন জামা কাপড় দেয়া যাবেনা! ঈদের মেহমানদের জন্যও তো একটা আয়োজন লাগে, ছোট বোনটাও আসবে তার বর নিয়ে। বাধ্য হয়েই কোন পরিচিতজনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিতেই হয়, বন্ধুটি হৃদয়বান হলে টাকার সাথে বাড়তি সহানুভুতিও থাকে নচেত সময়মত টাকা পরিশোধের আগাম সতর্কতা।
টাকা পৌঁছে গেল, সবার জন্য সব আয়োজন সম্পন্ন। বাংলাদেশের ঈদের একদিন আগেই আজ প্রবাসে ঈদ। ঈদের আগের রাত, কেনা কাটা চলবে ভোর রাত পর্যন্ত। ফজরের আগে দোকান বন্ধ করে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফেরা। বাসায় সবার ঈদের নামাযে যাবার তোড় জোড়, কেউ গোসল করছে, কেউ বাসী তরকারীটা গরম করে নিচ্ছে, কেউবা একটু দুধ-চিনি মিশিয়ে গরম করে নিচ্ছে মিস্টি মুখ করার জন্য।
ঈদের দিন গোসল করতে বাথ রুমে ঢুকতেই যেন চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বিগত দিনের ঈদের স্মৃতিগুলো চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসছে যেন। কত আনন্দই না ছিল, ভোরে উঠে ছোটদের নিয়ে গোসলের জন্য পুকুর ঘাটে যাওয়া, ঈদ গাহে যাবার জন্য কত হাঁক ডাক, এর ওর জামাতে একটু সুগন্ধি আতর লাগিয়ে তুলোটা কানে গুঁজে দেওয়া, যায়নামাজ হাতে অবশেষে ঈদ গাহে গমন। আজ অর্থের টানে প্রবাসে একাকী জীবন যাপন, পড়ে আছে শুদু ধু ধু স্মৃতির বালুচর।
হঠাৎ বাথরুমের দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ, আরেকজন হাঁক দিয়ে বলছেন" শাহীন ভাই জলদী করেন, ঈদের নামায কিন্তু সাড়ে ছ'টায়, আমি এখনো গোসল করিনি, নামায মনে হয় আজ পাবোনা"। সময় তো ফুরিয়ে যায় কিন্তু আমার অশ্রু যে ফুরোয়না। সময়ের শাসন মেনে স্মৃতি হাতড়ানো বাদ দিয়ে হুড় মুড় করে বাথরুম থেকে বের হতে হয়। পাঞ্জাবীটা পুরনো তাতে কি, প্রবাসে একটা কিছু হলেই হলো, কেউ তো আর দেখছেনা। আমাদের টাকায় আমার পরিবার পরিজন সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করছে সেটাই তো প্রবাসীদেরা বড় পাওয়া। রঙ চটা পাঞ্জাবীটা গায়ে চাপিয়ে ঈদের নামায পড়ে ফের বাসায়, সারারাত ডিউটি করে চোখটা জ্বলছে ঘুমের জন্য, বাসি পোড়া কিছু একটা খেয়ে ঘুমানোই এখন ঈদের শ্রেষ্ঠ বিনোদন।
কম্বল মুড়ি দিয়ে শুতেই মনে পড়ে মমতাময়ী মায়ের মুখ। একটু ফোন করি, আজ। ঈদের দিনে আম্মাকে তো আর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে পারবোনা, তবুও।
- আম্মা আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন?
- ওয়ালাইকুম সালাম বাবা, আমি ভাল, তুমি কেমন আছো? আজ তো তোমাদের ওখানে ঈদ। নামায পড়েছো? কি খেয়েছো নামায পড়ে এসে?
আম্মা এক নাগাড়ে প্রশ্ন করে যান, আমি কম্বলের নিচে মুখ লুকিয়ে নিশব্দে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদি আর টন টনে গলায় বলি,
- আমি খুব ভাল আছি আম্মা। আপনারা সবাই ভাল আছেন তো? ঈদের কেনা কাটা হয়েছে তো?
- হ্যাঁ সব হয়েছে, তবে টাকা শেষ হয়ে গেছে, জিনিস পত্রের যা দাম এত কম টাকায় কি হয়!
- হ্যাঁ আম্মা, এই তো আর ৮/১০ দিন পরে আরও কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব, আপনারা কোন চিন্তা করবেননা।
কিন্তু মনের পর্দায় ভেসে উঠে পাওনাদারের মুখচ্ছবি, সময় মত বেতনটা না পেলে আগের কর্জটাও পরিশোধ করা যাবেনা, তার উপর আরও কিছু টাকা পাঠানো। যত যাই হোক টাকা তো পাঠাতে হবেই, নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে প্রবাসীরা যে আপন পরিবার কে সুখে রাখার শপথ করে আছে!
কিন্তু প্রবাসীদের সুখের কথা কেউ কি ভাবেন? ভাববার সুযোগ পান? ভাবেন প্রবাসীদের নি:স্বঙ্গ পরিবারের কথা? পিতৃস্নেহ বঞ্চিত প্রবাসীর সন্তানদের কথা, একাকিত্বে অসহায় স্ত্রী'র কথা? না, কেউ ভাবেননা।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অবশেষে ক্লান্তির ঘুম, সূর্য্য গড়িয়ে দুপুর, বিকেলে একটু বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎ, ঝাল মুড়ি, মাংস রুটি খাওয়া। সন্ধ্যা পেরিয়ে আসে রাত, ঈদের আমেজ ফিঁকে হতে থাকে; আবারও উদয়াস্ত খাটা-খাটুনির চিন্তায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়, আবার শুরু কর্মঘন্টা, যার কোন শেষ নেই সীমা নেই।