বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৩২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

নিয়োগ পদোন্নতিতে মহাজোট সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতিঃ বিপন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা

শাওন ইসলাম

প্রশাসনিক কাজকর্ম সক্রিয় ও গতিশীল রাখার জন্য কর্মীদের কর্মসন্তুষ্টি অত্যাবশ্যকীয়। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতিসহ অন্যান্য প্রণোদনা সমূহ কর্মীর কর্মউদ্দীপনা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। প্রাতিষ্ঠানিক কল্যাণের পাশাপাশি কর্মীদের মৌলিক অধিকারের কথা বিবেচনা করেই ব্যবস্থাপনা মনোবিজ্ঞানে এ বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। কর্মীদের যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের মৌলিক কাজগুলোর মধ্যে একটি। কাজেই সেখানে কোন ব্যত্যয় ঘটলে প্রশাসন যন্ত্র বিকল হতে বাধ্য। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে সে চিত্রটিই ভেসে ওঠে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহ কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটা দলমত নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের কল্যাণ সাধনের জন্য। কিন্তু এটা এখন নীতিবাক্য ছাড়া আর কিছু নয়। প্রশাসনিক যন্ত্রে কোথাও কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে দলীয় মাপকাঠিতেই সব কিছু নির্ধারিত হচ্ছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বিপন্ন হতে বসেছে। দলীয় লেজুড়বৃত্তির এ ভয়াল থাবা থেকে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে দেশের আগামী দিনের কর্ণধার তৈরি হবে সেটিও আজ রক্ষা পাচ্ছে না। দেশের স্বনামধন্য প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১৬৭তম সিন্ডিকেটে অনুমোদিত নিয়োগ ও পদোন্নতিগুলো পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়টি পরিষ্কার হবে। শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, আপগ্রেডেশন ও প্রমোশনে কোন প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির রেকর্ড গড়ছেনে বর্তমান ভিসি সালেহ উদ্দিন। যোগ্যপ্রার্থীদের বাদ দিয়ে অযোগ্য, দলীয় ও আত্মীয়দের নিয়োগ ও পদোন্নতি চুড়ান্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬৭’তম সিন্ডিকেট সভায় সহকারী রেজিস্টার, কলেজ পরিদর্শক, সহকারী লাইব্রেরিয়ান সহ বিভিন্ন পদের নিয়োগে দলীয় ও আত্মীয়তার পরিচয়কে অধিক প্রাধান্য দেয়ায় বরাবরের মতো এবারও উপেক্ষিত হয়েছে যোগ্যতা সম্পন্ন প্রাথীরা। এমনকি নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত সদস্যদের সাথে বিভিন্নভাবে দুব্যর্ববহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সিনিয়রিটি ও নিয়ম লংঘন এবং প্রমোশনের শর্ত পূরণ না করে দলীয় লোকজনকে নিয়োগ-পদোন্নতি দেয়াতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা -কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সূত্র মতে, সহকারী রেজিস্ট্রারের জন্য ০১ টি পদের বিজ্ঞাপন দেয়া হলেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে ৪ জনকে। অভ্যন্তরীণ ১৫জন যোগ্য প্রার্থী, যাদের অনেকেরই শিক্ষাজীবনে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণী রয়েছে, তাদেরকে বাদ দিয়ে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের পিএ শাহীন আহমেদকে দলীয় বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অনেক সিনিয়র এবং যোগ্য প্রার্থী থাকলেও জৈষ্ঠতা লংঘন করে শাহীনকে বিজ্ঞাপিত পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন বিশ্বাস এর আপন সহোদর জাকারিয়া উদ্দিন বিশ্বাসকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অথচ অভ্যন্তরীণ প্রার্থী মোছাঃ সোহেলী তামান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রী এবং মোঃ কাওছার আহমেদ গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রীসহ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সকল শর্তপূরণ করলেও তাদেরকে পদোন্নতি না দিয়ে জৈষ্ঠ্যতা লংঘন করে এইচএসসি ও ডিগ্রীতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত সেবিকা সুলতানার নিয়োগের শর্তপূরণ না হওয়ায় প্রথমে ভাইভা কার্ড দেয়া না হলেও শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। সম্মানিত একজন সদস্য সিন্ডিকেট সভায় এ নিয়োগে আপত্তি জানিয়েছেন। এখানে ঊল্লেখ্য যে, সেবিকা সুলতানা নিয়োগের শর্ত পূরণ না করেই পূর্ববর্তী পদেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। সম্মানিত সিন্ডিকেট সদস্যরা সে সময়েও তাঁর নিয়োগে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটিই প্রথম ব্যক্তি যার প্রত্যেকটি নিয়োগে সিন্ডিকেট সদস্যদের আপত্তি রয়েছে। জানা গেছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাটালগার হিসাবে প্রথম নিয়োগের সময় গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ডিগ্রী নিয়োগের শর্ত থাকলেও সেটা তাঁর ছিল না।

সহকারী কলেজ পরিদর্শক পদের নিয়োগেও বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ১ম শ্রেণী প্রাপ্ত ১২ জন আবেদন করার পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশকৃত ও অনভিজ্ঞ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা তাজিম উদ্দিনকে দেয়া হয়েছে। মাত্র দেড় বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তাজমিকে সহকারী কলেজ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনের আস্থাভাজন না হওয়ায় যুবলীগ নেতা জগদীশ এর ভাগ্নে সহ ৩ জন কে বাদ দিয়ে দুইটিতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত ভিসির পিএ কবির উদ্দিন এবং কর্মচারী থেকে অফিসার হওয়া তৃতীয় শ্রেণী প্রাপ্ত রাজীব সীং কে নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করে প্রশাসনকি কর্মকর্তা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতরের সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়েও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। আর এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র কর্মকর্তা তাজিম উদ্দিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করা এক শিক্ষার্থীর পক্ষে নিয়োগ দানে সহায়তার নামে অবৈধ সুবিধা ও ৫ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ সহ শিক্ষাকালীন সময়ে কলেজের গাছ ও মাছ বিক্রি এবং বিভিন্ন মেলা থেকে চাঁদা নেয়ার অভিযোগ আছে বলে জানা গেছে।

নিয়োগ-পদোন্নতিতে এ সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে কেও যেন আইনি লড়াই-এ যেতে না পারে তাঁর জন্য সিন্ডিকেট সভার পরদিনই সভার কার্যবিবরণী স্বাক্ষর হওয়ার পূর্বেই বিধিবহির্ভুতভাবে তড়িঘড়ি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঈদের ছুটির আগের দিন তাদের নিয়োগ পত্র দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানার চেষ্টা করা হলে শাবি’র রেজিস্টার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নিয়োগ পদোন্নতিতে অনিয়ম ছাড়াও দলীয় মতাদর্শ বিরোধী লোকজনকে বিভিন্নভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। প্রমোশনের সকল শর্তপূরণ করলেও বিভিন্ন অজুহাতে ফাইলটি আটকিয়ে রাখা হয়। মাঝে মাঝে ফাইলটিই খুঁজে পাওয়া যায় না। টেবিলের নিচে কয়েকদিন ফেলে রেখে অবশেষে যখন বের করা হয় তখন হয়ত প্রয়োজনটিই শেষ হয়ে যায়। কাল্পনিকভাবে বিভিন্ন অভিযোগ দায়ের করে তদন্ত কমিটি গঠনের নামে নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। দলীয়করণ এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে, মানসিক প্রশান্তি নিয়ে কাজের কোন সুযোগ নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বললেন, নিয়োগ বা পদোন্নতির সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সিনিয়রিটি লংঘন করে অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হলে যে মানসিক যন্ত্রণা সেটা যদি কেও বুঝত তাহলে এ অন্যায় কাজটি কেউ করতে পারত না। এভাবে মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করা যায় না। গত সরকারের আমলেও দলীয়করণ হয়েছে কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের প্রমোশন বা আপগ্রেডেশনে কোন প্রকার অনিয়ম করা হয় নি, এবং জৈষ্ঠতা লংঘন করা হয় নি। কিন্তু বর্তমান ভিসি সে দৃষ্টান্তও তৈরী করে গেলেন!

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মত দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণের এ থাবা জগদ্দল পাথরের মত জেঁকে বসেছে। শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই অসহ্য মানসিক যন্ত্রনা আর চাপ নিয়ে কোন রকম দিন পার করে যাছে। অনেকের পক্ষে সেটাও করা সম্ভব হচ্ছে না। ছাত্র-ছাত্রীরাও তাদের আক্রশ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। বিনা কারণে হল থেকে বের করে দেয়া হচ্ছে। প্রশাসনের দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় ইতোমধ্যে এক ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কলেজ পড়ুয়াদের টাকার বিনিময়ে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগদানের বিরোধিতা করায় অনেককে শোকজ করা হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদটুকু ও করতে পারছে না। এই যদি হয় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র তাহলে সেখানে লেখাপড়া ও গবেষণার কোন পরিবেশ থাকার কথা নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন মহল মনে করেন দলীয়করণ ও দমনপীড়নের পথ পরিহার না করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হবে। কাজেই বিজ্ঞজনেরা সংশ্লিষ্ট মহলকে এ বিষয়ে এখনি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ প্রদান করেছেন।

লেখকঃ কলাম লেখক ও গবেষক।
email: shaonislam2011@yahoo.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/ShaonIslam
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে শিকদার দস্তগীর লিখেছেন, ১৯ ডিসেম্বর ২০১১; বিকেল ০৪:৩০
আপনার সাথে একমত পোষন করে বলতে চাই, এরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যলয়ের ভর্তি পরীক্ষায়ও একই ভাবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দুর্ণীতি করে বিশাল ভর্তি বাণিজ্য করেছে। ভর্তি প্রার্থীদের অনেক চাপ থাকায় এটি নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবার সময় পাননি। কিন্তু ঘটনা যে ঘটেছে তার প্রমান আছে। শিক্ষামন্ত্রী বরাবর এ বিষয়ে তদন্ত করার জন্য কিছু অভিভাবকদের টিঠি আছে। সেগুলো ফাইলেই তোলা হয়নি বলে জানা গেছে।
74001
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy