তোমার সাথে আর বার কথা হয়েছিল আমার! জ্বি হয়েছিল। তোমার নামটা যেন কি? সজিব। সজিবের স্নিগ্ধতা, উড়ো মনে প্রেমের রিগ্ধতা। কোথায়, কি চায়... যদিও হারায়। তবু ছুটে চলে মন। সুন্দর নাম। তার মানে আমি তোমাকে চিনি? হ্যাঁ আপনি আমাকে চিনেন। ঐ দিন আমার আগ্রহ দেখে বললেন না তুমি ভাল করতে পারবে। কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করা যদিও কষ্টকর তবু চালিয়ে যাও।
তুমি তাহলে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ শুরু করেছিলে আমার সাথে? জ্বি আপনি কি সত্যিই ভুলে গেছেন! আপনার মনে নেই আমাকে বলেছিলেন ক্রাইমেতো কাজ করা আরও ঝুঁকিপূর্ণ, কর কর অল্প দিনে স্টাফ হয়ে যাবে।
শোন আমার সাংবাদিকতা জীবনও কন্ট্র্রিবিউটর হিসেবে শুরু হয়েছিল। আমার বয়স তখন তোমার চেয়ে কম। তোমার বয়স কত? ২২ চলছে। আমার বয়স তখন ধর আঠার কি উনিশ। ইন্টারমেডিয়েট পাশ করিনি। ক্রাইমটা আমাকে টানত। আচ্ছা তুমি কিসে পড় যেন? সব দেখি ভুলে গেছেন আপনি, আমি সাংবাদিকতায় অনার্স করছি। খুব ভাল। আমি পড়তাম রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। সাংবাদিকতা করার জন্য টিউশনি করতে পারতাম না। অনেক কষ্টে চলতে হত। তারপরও কাজটা চালিয়ে যাই। নেশা যাকে বলে আরকি। তোমার আগ্রহে ভাটা পড়েনিতো? না এখনও পূর্ণ জোয়ার। মনের নদীতে ধবল পানি আকু পাকু খেলছে। জোয়ার যেহেতু পূর্ণতা পায়নি ভাটার প্রশ্ন পরে।
বাহ! সুন্দর করে কথা বলতো তুমি। শোন আমরা ছিলাম পাঁচ ভাই এক বোন। বোনটা ছিল ভীষণ অসুখী। অন্তত তার জন্য টাকা রোজগার করতে মন চাইত আমার। তখনতো ফোনের যুগ ছিলনা। আমি বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ রাখতাম না। বছরে এক কি দুবার বাড়ি যেতাম।
মা বলতো অনেক দিন পর কাছে পেয়ে সব আদর ঢেলে দিত। আঁচলের কোনে একটা হাত কচলাতে কচলাতে ছোট্ট মেয়েদের মত বলত কি কাজ করস বুঝিনা। সাংবাদিক হওয়ার দরকার নাই বাপ কোন দিন রাস্তায় পইরা মইরা থাহস। ঢাকা গেলে এহনই মারে বুইলা যাস আর বিয়া করলে কি করবি? এসব আদুরে আলাপ ভাল লাগতনা অমার। কেমন যেন নেকামি নেকামি মনে হত।
মাঝে একটা রিপোর্ট দিয়ে পুরো হিট আমি। অফিসে স্থায়ী চাকরি, বেতন সব হয়। বেতন পেয়ে বাড়ি না গিয়ে সোজা আপার বাড়ি যাই। একটা শাড়ি ছাড়া কিচ্ছু কিনিনি। টাকাগুলো আপার হাতে গুজে দেব এই ছিল ইচ্ছা। আপার কবরটা দেখে বুকটা ধরফর করে উঠে। কি শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে! দুনিয়ায় থাকতে কোন দিন শান্তি পায়নি ও। প্রেগনেন্ট ছিল নাকি শুনলাম ... বাঘিনাটা একটু পর এসে হাত ধরে বলল মামা মায় তোমার লাইগ্গা মোয়া রাইখা গেছে। আমার জন্য আপা এত কষ্টের মাঝেও মোয়া বানাত। মোয়া পেলে আমি সব ভুলে যেতাম। একটার পর একটা মোয়া যখন আমি মুখে পুড়তাম আপা চেয়ে চেয়ে দেখত আর হাসত।
জান এখনও যেন আমি নাকে মোয়ার ঘ্রান পাই। গভীর রাতে আপা তুই এখানে, তুই এখানে বলে ঘুম থেকে জেগে উঠি, আমায় জাগিয়ে দিয়ে দুঃখী বোনটা আমার উধাও হয়ে যায়।
দূর কি বলছি এসব। তোমরা কয় ভাই কয় বোন? আমরাও পাঁচ ভাই এক বোন। বল কি তোমার ভাগ্য দেখি আমার মত। তোমার বোনের কি অবস্থা? ও কষ্টে সিস্টে এক রকম জীবন চালায়।
তোমার সাথে আমার পরিচয়টা যেন কিভাবে হয়েছিল? আমি অফিসে এসেছিলাম কাজের খোঁজে। তারপর আপনার সাথে দেখা। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ক্রাইম নিয়ে কাজ করার সাহস আছে? আমি জ্বি বললাম। তারপর আমাকে কাজে লাগিয়ে দিলেন? কি বল তোমাকে কি কোন অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছিলাম। হু, হামজা হত্যা মামলা।
তুমি কি কি খেতে পছন্দ কর? পান্তা ভাত সাথে চিংড়ি বা শুটকি পোড়া, চিংড়ি ভাজিটাও অবশ্য ভাল লাগে। চিংড়িকে আমাদের এলাকায় বলে ইচা মাছ। গ্রামীন পছন্দ তোমার। মজার ব্যাপার কি জান আমার পছন্দও কিন্তু চিংড়ি আর পান্তা। মাংস ভুনাটা ও আমার অনেক ভাল লাগে।
এবার মামলার খবর কি বল? কিছু জানতে পেরেছ? হ্যা। কি? হামজা হত্যাকারী এ সমাজের একজন শিল্পপতি, দানবীর। টাকার জোরে দেশের আইন তার পায়ের তলায়। তাকে জেলে ঢুকায় এমন সাধ্য কারো নেই, রাষ্ট্রযন্ত্র তার কাছে বিকল।
নাও চিংড়ি পানতা খাও। আশ্চর্য হঠাৎ এগুলো এল কোথেকে? আরে খাও। হাটতে হাটতে পান্তা খাওয়ার মজাই আলাদা। আর কিছু জান? জানি এ মামলার তদন্ত যে করতে যায় সে আর ফিরে না, খুন হয়। পত্রিকার পাতায় কোন রিপোর্ট প্রকাশিত হয় না এ মামলা নিয়ে। কেউ রিপোর্ট করতে গিয়ে জীবিত ফিরে আসেন নি। ব্যাপারটা নিয়ে ঘাটা ঘাটি করতে গিয়ে এ পর্যন্ত একজনও বাঁচেনি। গুড, তুমি অনেক টেলেন্ট।
হাটতে হাটতে আমরা কোথায় এসেছি বলতে পার? নাতো! না ফেরার সুরঙ্গে। চা খাও চা। চায়ের কাপের ছায়া আছে মানুষটার ছায়া নেই। সজিব আৎকে উঠে। আমরা এখন কোথায় বলেনতো? আর আপনি কে? আমরা না ফেরার দেশে মি: কন্ট্রিবিউটর, না ফেরার দেশে ... হা ... হা ... হা...। আর আমি, আমি সে দেশের বাসিন্দা ... অশরীরী ...হা ... হা ...। চারপাশে ওরা কারা! আর কিছু বলতে পারে না উদীয়মান সাংবাদিক সজিব। মরা দেহটা সি বীচে ভাসে ... পুলিশ অতিরিক্ত মদ্যপান অবস্থায় সাঁতার কাটতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার বলে চালিয়ে দেয় ...
লেখকঃ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
saroujmahady@gmail.com