বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৪৮ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

আজব চিকিৎসা

সুমাইয়া বরকতউল্লাহ

আমার ভাইয়া ক্লাশ টেন-এর ছাত্র। ভীষণ ফাঁকিবাজ।
তার খাওয়া-দাওয়া, খেলাধুলায় কোনো সমস্যা নেই, ক্লান্তিও নেই। তার যত সমস্যা পড়ালেখার সময়। পড়তে বসলে তার সমস্যাগুলো একটা একটা করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।
পেট ব্যথা। মিনিট বিশেক পড়েই সে হাত দুটো পেটে চেপে ধরে ধণুকের মতো বাঁকা হয়ে বসবে।
মাথা ধরা। দুহাতে সমানে মাথার চুল টানবে।
বমি বমি ভাব। একটু পর পর উঠে গিয়ে বেসিনে উপুর হয়ে ওয়াক, ওয়াক, থু করবে।
গা ঝিমঝিম। হাত ঝাড়বে, পা ঝাড়বে। এখান টিপ ওখানে টিপ বলবে।
তাতেও সুবিধে হলো না। মুখ বাঁকা করে লুঙ্গির গিটটা একটু খুলে এমনভাবে বাথরুমে গিয়ে বসবে যে, দেখলে মনে হবে তার পায়খানা বুঝি পড়ে গেল। বাথরুমে আধ ঘণ্টা।

আব্বু অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু রোগ আর ভাল হয় না। ভাইয়াকে নিয়ে আব্বু পড়ে গেলেন খুব চিন্তায়।
আব্বু এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করলেন। ডাক্তার বললেন, আপনার ছেলের এসব লক্ষণ যদি শুধু পড়ার সময় দেখা দেয় তাহলে বুঝবেন এটা ”পড়ারোগ”। মানে, না পড়ার ফন্দি। এ রোগের ওষুধ তো আমি দিতে পারব না। তবে ছেলের লক্ষণ বুঝে আপনিই এর চিকিৎসা করতে পারবেন।’
আব্বু ডাক্তারের কাছ থেকে ফেরার পথে ফার্মাসি থেকে ব্যথানাশক মলম এনে রেখে দিলেন। পড়তে বসলাম। ওমনি ভাইয়ার মাথা আর পেট ব্যথা উঠল। বই বন্ধ করে মুখ বাঁকিয়ে উহ্, আহ্ শুরু করে দিল সে। সাথে সাথে আব্বু মলম নিয়ে এসে বললেন, ‘বাবা তোমার কোন জায়গায় ব্যথা করে একবার খালি আমাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাও।’

ভাইয়া মুখ বাঁকিয়ে পেটে ও কপালে ইশারা করে দেখালেন। আব্বু প্যাকেট খুলে হাতের তালুতে মলম নিয়ে বললেন, বাবা, তুমি লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ো, চিকিৎসা হবে তোমার। ভাইয়া আব্বুর চোখের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে শুয়ে পড়ল। আব্বু মলম হাতে নিয়ে একবার পেটে ও পরে কপালে শুরু করলেন ডলা। এই সেই ডলা না। ডলা খেয়ে ভাইয়া বাঁকা হয়ে বলে, আব্বু, আব্বু আর না, হয়েছে, হয়েছে আমার ব্যথা শেষ। ডলা বন্ধ কর, প্লিজ।‘

কতক্ষণ পরেই ভাইয়া কপাল ভাঁজ করে পেট চেপে ধরে বলে, ‘আব্বু, আমার বাথরুম পেয়েছে, বাথরুমে গেলাম।’ বলেই সে চলে গেল বাথরুমে। ফেরার আর খবর নেই তার। কমসে কম তিরিশ মিনিট।
আব্বু রাগে গজ গজ করে বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, বাথরুমে এতক্ষণ কী করো তুমি?
ভাইয়া ভেতর থেকে জবাব দিল, ‘আরও দেরি হবে আব্বু।‘
আব্বু বললেন, ’বাথরুম করতে এত সময় লাগছে কেন তোমার? হেহ্? তুমি পড়ালেখা করবে কোন সময়? তাড়াতাড়ি বের হয়ে এসো।‘
বাথরুমের ভেতর থেকে কোঁথ দিতে দিতে বলে, ‘আব্বু, পায়খানা ভীষণ কষা, কিলিয়ার হচ্ছে না, এখনো চাপ আছে'।
তারপর যখন সে বেরোলো তখন দেখা দিল আরেক সমস্যা। ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে এসে কোনোমতে বসল। পা ফুলে বারিশ। পা ঝিঁ ঝিঁ করছে। তখন তার পা টিপে দেওয়ার পালা। সীসার মত ভারী তার পা দু'টো আমার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলবে, টিপ, জোরে জোরে টিপ দে, মনে হচ্ছে পা দু’টি ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। তার পা টিপে দিতেই হয়; এছাড়া আমার কোনো উপায় থাকে না।

এসব করে সে কখনোই ক্লাশের পড়া কমপ্লিট করতে পারে না। আব্বু কয়েকদিন তাকে বেশ করে শাঁসালেন কিন্তু তার জটিল রোগগুলো আর ভালো হয় না।
আব্বু অনেক খোঁজ করে ভাইয়ার জন্যে একজন রাগী ম্যাডাম ঠিক করলেন পড়ানোর জন্যে। আমাকেও বললেন ম্যাডামের কাছে পড়তে। ‘খুব স্মার্ট ও বুদ্ধিমান ম্যাডাম। তিনি প্রথম প্রথম কিছুই বলেননি আমাদের। মনে হয় ম্যাডাম আমাদের বুঝতে লাগলেন। ভাইয়াও ম্যাডামকে বুঝতে লাগল মনে মনে।
পড়ার সময় আগের মতো ভাইয়ার নানা সমস্যা দেখা দিতে লাগল। বাথরুমে গিয়ে অনেক সময় নষ্ট করতে লাগল। ম্যাডাম খালি দেখছেন তার কান্ডকারখানা।

কিছুদিন পরের ঘটনা।
ম্যাডাম পড়া ধরতেই ভাইয়ার প্রচন্ড মাথা ও পেট ব্যথা উঠল। ম্যাডাম তড়িঘড়ি পার্স খুলে একটা ট্যাবলেট বের করে বললেন, ‘আমি লক্ষ করছি তোমার ব্যথাটা খুবই খারাপ। সময় বুঝে না, খালি পড়ার সময় উঠে। আমি খুব দামি একটা ব্যথানাশক ট্যাবলেট এনেছি তোমার জন্য। যত বড় ব্যথাই হোক এ বড়ি খাওয়ার সাথে সাথে ব্যথা ভাল হয়ে যাবে।‘ ম্যাডামের কথায় ভাইয়া বড়িটি খেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই ভাইয়া বলে, ‘ম্যাডাম আমার পেট ব্যথাও নেই, মাথা ব্যথাও নেই। একদম ভালো হয়ে গেছি।'
ম্যাডাম বললেন, ‘এ বড়ি খাওয়ার পর আর ব্যথা উঠবে না। তুমি কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ। এখন পড়ো।'

কিন্তু বাথরুম যে আর ছাড়ে না। আগের মতই বাথরুমে গিয়ে ত্রিশ পঁয়ত্রিশ মিনিট পার করে দিল ভাইয়া। আরেক দিন ভাইয়ার বাথরুম পেতেই ম্যাডাম ভাইয়ার হাতে একটা ট্যাবলেট দিয়ে বললেন, ‘এটা পড়ার সময় বাথরুম না পাওয়ার শক্তিশালী ট্যাবলেট। এটা খাওয়ার পর পড়ার টাইমে কখনো বাথরুম পাবে না। এ ট্যাবলেটে কাজ না হলে পেট অপারেশন করাতে হবে আর কি।‘ এ কথা শুনে ভাইয়া চোখ বড় করে ট্যাবলেটটা পানি দিয়ে গডু গডু করে গিলে ফেলল।
পড়ার সময় আর কখনো সমস্যার কথা বলে না, এমনকি বাথরুম পর্যন্ত পায় না ভাইয়ার। একদিন ভাইয়া ম্যাডামকে বলে, ‘ম্যাডাম আমি এখন একদম সুস্থ হয়ে গেছি, ব্যথা-ট্যথা কিচ্ছু নেই।'
এবার মন দিয়ে পড়ো, বললেন ম্যাডাম।
ভাইয়া এখন মন দিয়ে লেখাপড়া করে। তার আর কোন সমস্যাই নেই।
পরে জানতে পারলাম, ম্যাডাম নাকি ভাইয়াকে ভিটামিন ট্যাবলেট খাইয়েছিলেন!
http://www.sonarbangladesh.com/articles/SumaiyaBarkatullah
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
উত্তরা, ঢাকা থেকে সাইফ মাহদী লিখেছেন, ২৭ মার্চ ২০১১; দুপুর ০২:৪৪
আপুটাকে অনেক ধন্যবাদ ভালো গল্প উপহার দেবার জন্য
52156
বারিধারা থেকে জাহিদ ফয়সাল লিখেছেন, ২৭ মার্চ ২০১১; রাত ০৯:৪৯
আপু গল্পটা খুব ভালো হয়েছে। এরকম গল্প আমরা আরো আশা করছি।আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।আপনি নিয়মিত লেখা লেখি করবেন আশা করছি।
52197
রিয়াদ, সৌদি আরব থেকে লোকমান বিন নূর হাশেম লিখেছেন, ২৭ মার্চ ২০১১; রাত ১১:৫১
ভাইয়ার দোষ ত্রুটির তো বিশাদ বর্ননা দিলে এবার ভাইয়া কে প্রশ্ন করলে তোমার দোষ গুলো জানা যেত কিন্তু ভাইয়াকে তো আমরা পাবো না। তাই নিজেরটা মাফ পেয়ে গেলে।
লেখাটি অনেক সুন্দর হয়েছে তাই ধন্যবাদ। নিয়মিত লেখার অনুরোধ রইল।
52211
জেদ্দা, সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ৩০ মার্চ ২০১১; সকাল ১১:৪২
প্রথমে গত লিখাটির জন্য বাসী শুভেচ্ছা। আমি তো সব সময়ই লেট কামার। এবারের লিখাটি ও বেশ সুন্দর হয়েছে। কিন্তু খবরদার ভাইয়াকে নিয়ে বেশী ঘাঁটাবেনা। তাহলে কিন্তু তোমার কপালে দুঃখ আছে। আমার দুষ্ট ভাইয়াটা জানো আমার পিচ্চিদের সামনে আমার ছোট বেলার দুষ্টমি গুলো এখন সব ফাঁস করে দিয়ে কেমন ইজ্জত পাংচার করে দেয় জানো।আমার আসলে সব সময় ছোটদের সাথে অনেক ভাব।আমি সব সময় ওদের দলে। জেদ্দায় এসে ও তোমার মত একঝাঁক পিচ্চিকে গান , স্বরচিত নাটকের তালিম দিয়ে একদম পাকা বানিয়ে ফেলেছিলাম।আগামীর ফুলদের বিকশিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তো আমাদেরই।অনেক দিন ধরে ভাবছিলাম ব্লগে তোমাদের ছোটদের জন্য আলাদা একটা কর্নার তৈরীর কথা মডারেটর ভাইয়াকে বলবো।ওখানে শুধু তোমাদের মত ছোটরা অংশ নেবে।সেটা থাকবে তোমাদের জগত। কেমন হয় বলতো?
52445
রিয়াদ, সৌদি আরব থেকে লোকমান বিন নূর হাশেম লিখেছেন, ৩০ মার্চ ২০১১; সন্ধ্যা ০৭:৪০

জেদ্দা, সৌদি আরব থেকে নূর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন,
জেদ্দায় এসে ও তোমার মত একঝাঁক পিচ্চিকে গান , স্বরচিত নাটকের তালিম দিয়ে একদম পাকা বানিয়ে ফেলেছিলাম।
এত বড় মেয়েটাকে যদি পিচ্ছি বলা হয় তবে পিচ্চিদের কি বলা হবে? যত্তসব...... দেখুন আপনার কথা শুনে ও নিজেই খিলখিল করে হাসছে।
52496
জেদ্দা, সৌদি আরব থেকে নুর আয়েশা সিদ্দিকা লিখেছেন, ৩০ মার্চ ২০১১; রাত ০৯:১০
ভাই লোকমান, আমার পিচ্চিদের দলে ক্লাস ওয়ান হতে ইন্টার মিডিয়েট পর্যন্ত ছাত্রীরা ছিলো। সুমাইয়া তো এর মধ্যেই পড়ে।প্রায় ১২ বছর তো।কারো কারো বিয়ে ওএখন হয়ে গেছে। দেশে গেলে মজা করে ওদের শ্বশুর বাড়িতে বেড়িয়ে আসি।তা ছোট ভাইটি কবে হতে এত হিংসুটে হয়ে গেল সেটাই তো বুঝলাম না। যান আপনাকে ও পিচ্চির দলে ফেলে দিলাম। এবার খুশি তো।
52504
কানাডা থেকে মোহাম্মদ অাবদুল খালেক লিখেছেন, ০২ এপ্রিল ২০১১; রাত ১২:৪৬
এমন আজব অসুখের সময় কবে যে পার হয়ে এলাম তা হিসেবে রাখিনি। তুমি সেই পুরানো হিসেবের খাতাটা খুলে আবার বে-হিসেবি করে দিলে। এখন, নিজ সন্তানদের এমন আজব অসুখের চিকিৎসা করতে হচ্ছে!
এমন আজব কথা বলে আমাদের পুরানো জীবনখাতার ধুলা-বালু পরিস্কার করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সুমাইয়া তোমাকে রঙিন শুভেচ্ছা।
52724
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
লেখক পরিচিতি

নাম: সুমাইয়া বরকতউল্লাহ।
পেশা: ছাত্রী।
জন্ম তারিখ: ২৫ নভেম্বর, ১৯৯৮ খ্রীস্টাব্দ
জেলা: নরসিংদী।
শখ: বই পড়া আর লেখালেখি। আমি ছোটবেলা থেকেই ছড়া আর গল্প লিখছি। আমি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় আর ব্লগে নিয়মিত লিখি। আমার লেখা গল্প ও ছড়া পত্রিকায় ও ব্লগে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে।
গল্প ও ছড়া লিখতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। আমি সময় পেলেই লিখি। আমার পড়ার ক্ষতি হবে মনে করে আব্বু আর আম্মু লেখালেখি করতে নিষেধ করেন। তবুও আমি চুপি চুপি লিখি।
আমি গল্প লিখে পরপর তিনবার জাতিসংঘ-ইউনিসেফ-এর মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ডসহ কয়েকটা পুরস্কার পেয়েছি।

প্রাপ্ত পুরস্কার

১. ঐতিহ্য গোল্লাছুট প্রথম আলো গল্প লেখা প্রতিযোগিতা ২০০৭-এ অন্যতম সেরা গল্পকার পুরস্কার।
২. প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত লেখা প্রতিযোগিতায় (২০০৭) অন্যতম সেরা লেখক পুরস্কার
৩. প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত লেখা প্রতিযোগিতায় (২০০৮) অন্যতম সেরা লেখক পুরস্কার
৪. জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর 'মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড' লাভ ২০০৮ ২য় পুরস্কার।
৫. জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর 'মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড' লাভ ২০০৯ ২য় পুরস্কার।
৬. 'ডানো ভাইটা-কিডস' মাসিক সাতরং'-ব্র্যাক-এর গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন (২০০৯)
৭. 'চিলড্রেন্স ফিল্ম সোসাইটি-বগুড়া' এর গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় ২য় পুরস্কার (২০০৯)
৮. প্রথম আলোর 'বদলের বয়ান'-এ (২০০৯) ২য় পুরস্কার
৯. আন্তর্জাতিক শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র উৎসব ২০১০-এ গল্পলেখা পর্বে 'অন্যতম সেরা গল্পকার' পুরস্কার।
১০. কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০১১। ২য় পুরস্কার।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy