|
শাআনামা: কল্পনায় কল্পতরু
সুমন আখন্দ |
|
আমার এক লেখাতো ভাই (পাড়ায় থাকলে যদি পাড়াতো হয়, লেখালেখিতে থাকলে নিশ্চয়ই লেখাতো ভাই হওয়া উচিত) অনুরোধ করল বিলেত থেকে একটি শুভেচ্ছা-সংকলন বেরোবে, আপনার লেখা চাই! না-করার শক্তি আমার এমনিতেই কম, তার উপর এই সিলেটি ছোট ভাইটি নিজ গুনে এমন মায়া লাগিয়েছে যে ওকে না করা রীতিমত অসম্ভব। মনের মাঝে একটা লোভী বানরও লাফালাফি করছিল- আমি কখনও বিদেশে যাইনি, আমার লেখা বিলেতে যাবে- এ আনন্দে আমি লিখতে বসলাম। কিন্তু যাকে নিয়ে লিখব, তাকে আমি কখনও দেখিনি, দৈনিকের সাহিত্য পাতার কল্যাণে দু'একটি লেখার সাথে আমি পরিচিত মাত্র। ছোট ভাইর স্মরণাপন্ন হলাম, সে মুঠোফোন মারফত আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কলড্রপের কারসাজি এবং কথার এলোমেলো প্রবাহে যা বুঝা গেল তা এই ভোতা মগজের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ওর একটা বুদ্ধি অবশ্য মনে ধরল, ফেসবুক! শামীম আজাদ নামে খোঁজ দিলেই বেরিয়ে আসবে। সেখানে নিশ্চয়ই তার সম্পর্কে তথ্য জানা যাবে। বসলাম সবজানা শমসেরনেটে। কিন্তু দেখি শামীম আজাদ নামে যাদের পেলাম সব দেখি ছেলে-ছোকরা অথবা ভদ্রলোক। কোন ভদ্রমহিলাকে খুঁজে পেলাম না। মূর্খ হলে যা হয়, আমিও তাই- আগেই নাম দেখে কনফিউজড ছিলাম, খুঁজে না পেয়ে আরও হলাম। লিখাতো ভাইয়ের কাছে কনফার্ম হলাম, উনি ভদ্রমহিলা তো! সে আমাকে নিশ্চিত করল। কপাল পোড়া হলে যা হয়! নিজেকে বুঝ দিলাম, তাকে ফেসবুকে পেলাম না, কারণ আমি তার বন্ধু নই। মনটাকে শানিয়ে নিলাম,
- ‘এখনই অন্ধ বন্ধ কর না পাখা!’
সিলেটে আসার পর আমি ঘরকুনা হয়ে গেছি এবং বন্ধুসংখ্যা কমতে কমতে তলানীতে, এখানে যে দুই/একজন বন্ধু জুটিয়েছি এরা কেউ সাহিত্যের ধারকাছে ঘেঁষে না, তাই আগেভাগেই জানতাম এদের কাছে পাওয়া যাবে ঘোড়ার ডিম! এরপর ভাবলাম, যাকে নিয়ে লিখব তিনি তো মূলত একজন কবি; তাহলে নিবেদিত কবিতা দিয়ে দায় সারি, লিখে ফেললাম-
‘দেখিনি তারে চিনেছি তবু
লেখায় যেন ঊনকোটি হাত
শামীম আজাদ, শামীম আজাদ!
আসলে তিনি আমাদেরই স্রোত
লিখে করছেন বিশ্বমাৎ!’
- পছন্দ হল না, এসব হাবিজাবি লেখা বিলেতে যাবে; মান-সম্মানের একটা ইজ্জত আছে না! লেখাটা তাই আর এগোল না!
মগজে কি দূর্ভিক্ষ! দূর দূর ভিখ ভিখ! লিটল ম্যাগের দুএকজন কর্মীকে জানতাম, ওদের সহায়তায় এদিক সেদিক ভিক্ষায় নামলাম এবং ‘কারা আর আকারা’ যা পেলাম তা সাজালাম:
‘শ্রীমতি শামীম আজাদের জন্ম একটি ভাল পরিবারে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামবাংলা এবং আধশহরের ভাল ভাল পরিবেশে। পড়াশোনাতেও তিনি ভাল ছিলেন। ছেলেবেলা হতেই উনি দেখতে যেমন ভাল, এবং স্বভাবচরিত্রেও তেমন ভাল। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মত না হতে পারলেও লেখালেখিতে তিনি ভাল করছেন। ইংরেজী ও বাংলা দুভাষাতেই তার দখল ভাল। তার অনেকগুলো ভাল ভাল বই বেরিয়েছে। উপন্যাস, গল্প, কবিতাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি ভালভাবেই বিচরণ করছেন। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশে-বিদেশে কয়েকটি ভাল ভাল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি ভাল সংগঠক, তিনি ভাল আবৃত্তিকারক। তিনি ভাল ভাল খেতে পছন্দ করেন। বিলেতে তার আয়-ইনকামও ভাল!’
- হায় আল্লাহ! লেখার কি ছিরি, এটা কী বিলেতে ছাপা হবার মত লেখা! মাথাটা একেবারে গেছে! যাকে জীবনে দেখিনি, যার সম্পর্কে তেমন শুনিনি, শুধু অল্প অল্প পড়ে কল্পনায় আমি এক কল্পতরুকে আকার দেয়ার চেষ্টা করছি।
একসময় ভাবতাম, হুমায়ুন আজাদের সাথে শামীম আজাদের নামের মিল পাওয়া যায়, এরা কী দুই ভাই-বোন নাকি? পরে জানলাম, আসলে তা নয়, দুইজন দুই জায়গার! আচ্ছা, শামীম আজাদের মত আব্দূল গাফফার চৌধুরীও তো বিলেতে থাকেন এবং বড় বড় কলাম লেখেন। সেই সূত্রে তারা লেখাতো ভাই-বোন! এটা হতে পারে, দুজনেই বিলেতে বসে বাঙালী শট নেন। মিল থাকলেও বেশ পার্থক্যও আছে। আগাচৌ নেন গোলে শট আর শাআ নেন স্ন্যাপ শট!
দূরে বসবাস করলেও শামীম আজাদ আমাদেরই ধারা, আমাদেরই পদ্মার পানি বয়ে গেছে টেমস নদীতে, নদী-জলস্রোত-ফুল-জোছনা ওখানেও কবিতা লেখায়। সুদূর সিলেটে থেকে তার জন্য মনে মনে নবান্নের আগাম আনন্দ নিয়ে একটা কবিতার কেক বানালাম, হেমন্তের হিম হিম স্বাদের এই কেকের উপরে বকুল বিছানো। কারুকার্যময় মোমের মাথায় আলো ছড়াচ্ছে রূপবান কার্তিক।
এই লেখাটা হুমায়ুন আহমেদ লিখলে অন্যরকম মাত্রা পেত। আর সুমন লিখেছে বলে এটার গুরুত্ব ও পুরুত্ব দুটোই কমে গেছে। যাহোক, সুনীলের মত বলতে ইচ্ছে করে-
‘দেখিস, আমরাও একদিন---’
হয়তো আমাদেরও দেখা হবে না কিছু। তাতে কিছু যায়-আসে না!
শামীম আজাদের দীর্ঘলেখায়ু কামনা করছি! যুগ যুগ জীয়ে!!
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। |
| |
| http://www.sonarbangladesh.com/articles/SumonAkhanda |
| |
|
|
|
|
| |
|
|
|
|
| বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন: |
|
|
|
| |
|
| লেখক পরিচিতি |
| |
|
| |
লেখক পরিচিতি
মাদারীপুরের রমজানপুর গ্রামে ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ খৃষ্টাব্দ তারিখে সুমন আখন্দের জন্ম। শৈশব কেটেছে মাদারীপুর, বরিশাল ও ঢাকাতে। ঢাকা কলেজ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতকোত্তরের পরে কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এবং ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় কাজ করেছেন। বিবাহিত এবং এক কণ্যার পিতা সুমন আখন্দ বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
সম্পাদিত ছোটকাগজঃ
চেতনা, সময়কালঃ ১৯৯৭-৯৮
পদচিহ্ন, সময়কালঃ ২০০৩-০৪
প্রকাশিত গ্রন্থাবলীঃ
ছায়াতরু, কাব্যগ্রন্থ, লোকালয় প্রকাশনী, ২০০০ খৃষ্টাব্দ
পাপ পুণ্যের কথা, গল্পগ্রন্থ, শ্রাবণ প্রকাশনী, ২০০৪ খৃষ্টাব্দ
প্রকাশিত সংকলনসমূহঃ
স্বদেশ, ছড়া, বাংলাদেশ কিশোর মেলা, গরমপত্র ১৯৯৭-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ জাহাঙ্গীর হাফিজ)
বাংলাদেশ ১৪১১, কবিতা, অনামিকা প্রকাশনী, নিঝুম ২০০৫-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ নজরুল ইসলাম নঈম)
সমকাল, অণুকাব্যগ্রন্থ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, সবুজ অঙ্গন সাহিত্য সংকলন ২০০৫-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ উজ্জ্বল হোসাইন)
এক বাঁও মেলে না, অণু-উপন্যাস, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, সবুজ অঙ্গন অণু-উপন্যাস সংকলন ২০০৬-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ উজ্জ্বল হোসাইন)
ভুলে যাওয়ার গান/ ২০০৫, ২টি কবিতা, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, নির্বাচিত আঁধারে শতশিখা ২০০৬-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ এস এম জাহাঙ্গীর)
একগামী, কবিতা, বইপত্র, শতাব্দীর শেষ প্রেমের কবিতা ২০০৬-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ আব্দুল বারিক ভূঁইয়া)
মুঠোফোনে মাঝরাত, কবিতা, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, স্বপ্নের পংক্তিমালা ২০০৭-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ জহিরুল আবেদীন জুয়েল)
সেকেন্ড হ্যান্ড লাইফ, কবিতা, মুক্তদেশ, নির্বাচিত প্রেমের কবিতা ২০০৭-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ জাবেদ ইমন)
দেখে যাওরে বালাই হাওরে, কবিতা, শামসুল উলামা [আল্লামা ছাহেব কিবলাহ্ ফুলতলী (র.)- নিবেদিত কাব্য পংক্তিমালা], জুন ২০০৯ -ভুক্ত (সম্পাদনা মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন আহমদ)
ঘুনপোকা/ জীবনভ্রমণ, ২টি কবিতা, সুচয়নী পাবলিশার্স, নানা রঙের দিনগুলি ২০১০-ভুক্ত (সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন) |
|