বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৫২ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
সাতই নভেম্বর দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ (০৩/১১/২০১১)
ভারত সব কিছু চাপ দিয়ে আদায় করতে চায় (৩০/০৭/২০১১)
আমি মনে করি না শেখ হাসিনা ভারতের হাতের পুতুল (২৫/০৭/২০১১)
বিশ্বপুঁজি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই (১৩/০৭/২০১১)
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ট্রানজিট ও মধ্যবর্তী নির্বাচন (১৮/০৬/২০১১)
সাতই নভেম্বর : আধিপত্যবাদবিরোধী জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অভ্যুদয় (০৭/১১/২০১০)
ট্রানজিট নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার (১৫/০৭/২০০৮)
আগের লেখা
315


সাতই নভেম্বর দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ

তালুকদার মনিরুজ্জামান

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এসেছে সাতই নভেম্বর। আর জিয়া হয়েছেন সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মহানায়ক। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে যখন শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। অল্প সময়ের মধ্যে দেশে শাসক হিসেবে তার ব্যর্থতা ফুটে উঠতে থাকে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা চরম পর্যায়ে আসে। শেখ মুজিব সব শিল্পকারখানা জাতীয়করণ করেন। এসব কারখানার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় অনভিজ্ঞ আওয়ামী লীগ নেতাদের। এদের অনেকে শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল ভারতে পাচার করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক বনে যান। দেশে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এ সময়ের অবস্থা বর্ণনা করে বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স লিফৎসুলজ লিখেন দুর্নীতি কোনো নতুন জিনিস নয়। কিন্তু ঢাকায় যে দুর্নীতি হয়েছিল তার পরিধি ও চরিত্র ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।

আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের পাট ও ধান ভারতে পাচার করতে থাকেন। জেলা ও থানাপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের আওয়ামী লীগ কর্মীদের অধীনস্ত করা হয়। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে এবং খুনখারাবি দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়। শেখ মুজিব পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ব্যর্থতার পরিচয় দেন। ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বন্ধুত্ব গভীর করার চেষ্টা করেন। এভাবে তিনি একটি নতুন রাষ্ট্রকে রুশ-ভারতীয় অক্ষশক্তির অধীনে নিয়ে যান।

শেখ মুজিব তার বিশ্বস্ত লোক দ্বারা গঠিত রক্ষীবাহিনীকে ভারত থেকে অস্ত্র-সমরাস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত করে। এর ফলে শেখ মুজিবুরের সাথে সেনাবাহিনীর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে মেজর জলিল, আ স ম রব ও সিরাজুল আলম খান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে। এ দল অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। কর্তৃত্ববাদী শাসক শেখ মুজিবুর রহমান কোনো বিরোধী দল সহ্য করতে পারতেন না। শেখ মুজিব তখন সর্বাত্মক একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রসারণের দিকে অগ্রসর হন। তিনি তার রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট শাসনতন্ত্রের সংশোধনী বিল আনেন। এই বিল সব দলের বিলুপ্তি সাধন করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করে নতুন দলের নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল। ২০টি সংবাদপত্রের মধ্যে চারটি সংবাদপত্র চালু রাখা হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে বিচার বিভাগের নিয়োগ ও অপসারণ নিজের হাতে তুলে নেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে যান। এসব কারণে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এই সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর চারজন মেজর বিপ্লব ঘটান এবং শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন।

এই অকস্মাৎ ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং তার সমর্থক ন্যাপ (মস্কোপন্থী) হতভম্ব হয়ে যায়। তারা কোনো রকমের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন। তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মৌন সমর্থন নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ২ নভেম্বর ১৯৭৫ প্রতিবিপ্লব ঘটান। তিনি খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে জাস্টিস সায়েমকে প্রেসিডেন্ট পদে বসান। সামরিক বাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়ে যান। ভারতীয় পত্রপত্রিকায় খালেদ মোশাররফের এই অভ্যুত্থানকে মহা উল্লাসে সমর্থন জানানো হয়। কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক খালেদ মোশাররফের মায়ের নেতৃত্বে মিছিল নিয়ে শেখ মুজিবের বাসভবন পর্যন্ত যায়। খালেদ মোশাররফের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের জনগণ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা শঙ্কিত হয়ে ওঠেন। এসব তৎপরতাকে বাংলাদেশ আবার ইন্দো-রুশ অক্ষশক্তির অধীনে চলে যাওয়ার আলামত হিসেবে দেখেন।

৭ নভেম্বর সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। নিহত হন খালেদ মোশাররফ। এ সময় সাধারণ সৈনিকেরা জিয়াউর রহমানকে কাঁধে নিয়ে মিছিল করার দৃশ্য দেখা যায়। সেনাবাহিনীর জওয়ানদের এই কাজে ঢাকা শহরের সর্বশ্রেণীর লোক উল্লাসে ফেটে পড়ে। সৈনিকদের সাথে নিয়ে তারা ঢাকায় মিছিল বের করে স্লোগান দেয়- বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ।
জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন সিপাহি বিদ্রোহের মহানায়ক। এখানে প্রশ্ন ওঠে, সিপাহি-জনতা কেন জিয়াউর রহমানকে তাদের সর্বসম্মত নেতা হিসেবে গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন আদর্শ সৈনিক। সেই পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সৈনিক হিসেবে খেমকারান সেক্টরে অংশ নেন। আইয়ুব খানের পতনের পর এক সাক্ষাৎকারে এই লেখকের কাছে তিনি কাশ্মীর যুদ্ধে বাংলাদেশ ইউনিটের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এই যুদ্ধের সময় থেকে জিয়াউর রহমান বাঙালি সৈনিকদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। একজন আদর্শ সৈনিকের গুণ হলো নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ সর্বোপরি দেশপ্রেম। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার স্ত্রী-পুত্রকে বিপদে রেখে। এই ঘোষণা দিয়ে তিনি চরম দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। এসব কারণে সৈনিকদের মধ্যে এবং দেশের আপামর জনগণের মধ্যে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এ কারণে তিনি হতে পেরেছেন বিপ্লবের মহানায়ক। সিপাহি বিপ্লবের সময় কর্নেল তাহের সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামে একটি গোপন বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। এই বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার স্লোগান হয় সৈনিকেরা ভাই ভাই অফিসারদের রক্ত চাই। তারা ঢাকাসহ বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে ৪০ জন অফিসার হত্যা করে।

আমি শুনেছি মৃত অফিসারদের স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের রক্ষার জন্য জিয়াউর রহমানের কাছে আকুল আবেদন জানান। জিয়াউর রহমান কঠোর হস্তে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার কর্মকাণ্ড দমন করে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। সেনাবাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন। একই সাথে জিয়াউর রহমান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের আটককৃত রাজনীতিকদের মুক্তি দেন। তাই অনেকে বলেন, ৭ নভেম্বর বিপ্লব ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। ৭ নভেম্বর ছিল অবশ্যম্ভাবী।

লেখক : জাতীয় অধ্যাপক
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০৩/১১]১১]
http://www.sonarbangladesh.com/articles/TalukderMoniruzzaman
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
USA থেকে হক-কথা লিখেছেন, ০৪ নভেম্বর ২০১১; রাত ১২:১৫
এমেরিকার গত জাতীয় নির্বাচনের সময় শেষের দিকে যখন বিল ক্লিন্টন নির্বাচনি প্রচারনায় যোগ দেন তখন তিনি একদিন একটি কথা বলেছিলেন। যেহেতু তিনি এমেরিকার সফল প্রেসিডেন্টদের অন্যতম একজন তাই তার কথা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অনেকটা এরকম বলেছিলেন, একজন প্রকৃত রাষ্ট্র নায়কের চারটি গুন থাকা বাঞ্চনীয়ঃ
1. A Clear Vision
2. Plan
3. Instructions
4. Ability to exicute them.

প্রেসিডেন্ট বা রাস্ট্র নায়ক হিসাবে জিয়া ছিলেন উল্যেখিত সকল গুনের অধিকারী। পক্ষান্তরে, মুজিবের ছিল শুধু মাত্র ভিশন। বাঁকি তিনটি গুনের তাঁর প্রকট অভাব ছিল। যার কারণে জাতিকে তিনি সুন্দর স্বপ্ন দেখাতে পেরেছিলেন বটে, রাস্ট্র নায়ক হিসাবে তিনি পুরো পুরি ব্যর্থ হয়েছিলেন।
71182
ইটালি থেকে মিন্টু লিখেছেন, ০৫ নভেম্বর ২০১১; রাত ০২:২৫
বাংলাদেশের ইতিহাস আপনাদের লিখে যাওয়া দরকার , যা আমরা জানিনা ,ধন্য বাদ,
71238
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 
জাতীয় অধ্যাপক ও খ্যাতিমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামানের জন্ম ১৯৩৮ সালের ১ জুলাই সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে। জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে অনার্স এবং তার পরের বছর মাস্টার্স করেন। কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে কানাডা গিয়ে ১৯৬৭ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি লাভ করেন। ওই বছর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হন। ২০০৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। তিনি মিলিটারি উথড্রল ফ্রম পলিটিকস, রেডিক্যাল পলিটিক্স অ্যান্ড দ্য ইমার্জেন্সি অব বাংলাদেশ, দ্য বাংলাদেশ রেভিউলিশন অ্যান্ড ইটস আফটারমাথ, সিকিউরিটি অব স্মল স্টেটসসহ অনেকগুলো বইয়ের লেখক।

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy