রবিবার, ২৩ মাঘ ১৪১৯; ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১২; রাত ১০:২০ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
উন্নয়নের রাজনীতি: মিশনারী তৎপরতা ও পশ্চাত্যের স্বার্থ সংরক্ষণ (২৫/০৬/২০১১)
উন্নয়নের রাজনীতি: ভাষা-শিক্ষা ও সামাজিক প্রকৌশল (০৫/০৩/২০১১)
উন্নয়নের রাজনীতি: ভাষার মারপ্যাচ, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও আমাদের জাতিসত্ত্বার পরিচয় (০১/০২/২০১০)
উন্নয়নের রাজনীতি, শিক্ষা ও আমাদের করণীয় (০১/১০/২০০৯)
উন্নয়নের রাজনীতি: শিক্ষায় বিষপ্রয়োগের আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও আমাদের করণীয় (০১/১০/২০০৯)
আগের লেখা
270


উন্নয়নের রাজনীতি: মিশনারী তৎপরতা ও পশ্চাত্যের স্বার্থ সংরক্ষণ

তাপস হাওলাদার

[ইংরেজ শাসনামলে খ্রীস্টান মিশনগুলোর প্রচেষ্টায় যে সব মুসলমানকে বিভ্রান্ত করে খ্রীস্টান বানাতো তাদেরকে পুনরায় ইসলাম ধর্মে নিয়ে আসার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন মুন্সী মেহের উল্লাহ। তিনি বিভিন্ন স্থানে খ্রীস্টান পাদ্রীদেরকে মোকাবিলা করতে বহাচে অবতীর্ণ হতেন। পাদ্রীদেরকে বিতর্কে হারিয়ে বিভ্রান্ত লোকজনকে ইসলাম সম্পর্কে অনেক সচেতন করে তুলতেন। আর সেসময় তাঁর জন্য খ্রীস্টান মিশনারীদের ধর্মপ্রচার অনেকটাই বাঁধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বিষয়গুলো আজ সবাই ভুলতে বসেছে। গত ২১ শে জুন ২০১১ ছিল তাঁর ১১১তম মৃত্যু বার্ষিকী। পরিতাপের বিষয়- কোন জাতীয় দৈনিকই তাঁকে নিয়ে কোন প্রবন্ধই ছাপেনি। তাঁর কথা মনে করেই এ লেখাটি তাঁকে উৎসর্গ করছি।]

সাম্প্রতিক পত্রপত্রিকায় এবং অনলাইন ব্লগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার নিয়ে চক্রান্তের নানা নীল নকশাঁর ইতিবৃত্ত নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। তাই উন্নয়নের রাজনীতির অন্তর্নিহিত স্বরূপ সম্পর্কে আলোকপাত করার কিছুটা চেষ্টা এলেখায় থাকবে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গমাইলে ৪টির মতো বিদেশী এনজিও অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে বিদেশী এনজিওগুলো আদতে যা করে যাচ্ছে তা হলো সেবা প্রদানের অন্তরালে তাদের মিশনারী তৎপরতাকে জোরদার করা ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে ধর্মান্তরিত করার নানা প্রচেষ্টা। এবিষয়ে এমডি শহিদুল ইসলামের একটা গবেষণাপত্র আমার নজরে এসেছে যা এপ্রবন্ধটির তথ্যসূত্রে যোগ করা হয়েছে। এটা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। সময় সুযোগ মত এবিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে।

এ উপমহাদেশে পশ্চিম বঙ্গের শ্রীরামপুরে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর মিশনই প্রথম সংগঠিত খ্রীস্টান মিশন। এটা বাংলা ভাষার বিকাশে বিশেষ অবদান রেখেছিল। আসলে ভাষার বিকাশে তাদের এ আত্মনিয়োগের পেছনেও তাদের মিশনারী মনোবৃত্তিই মূলত কাজ করেছিল। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এদেশের গরীব-অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকেই শুধু ধর্মান্তরিত করা সম্ভব, কোন অবস্থাসম্পন্ন বিত্তবানকে ধর্মান্তরিত করা প্রায় অসম্ভব। কেউ কেউ বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ নামে প্রকাশিত হানা ক্যাথেরিন ম্যুলেন্স-এর ধর্মপ্রচারণামূলক বইকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। পাঠক, এ বইটি বিডিনিউজ২৪-এর ওয়েবসাইটের ইবুক সেকশনে পাবেন। পড়ে দেখতে পারেন। তাতেও মিশনারী তৎপরতার প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে জানতে পারবেন। যাই হোক, পরবর্তী সময়ে অন্যান্য খ্রীস্টান মিশন এ উপমহাদেশে খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। আশির দশকে একটা বই পড়েছিলাম যার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশে খ্রীস্টান মিশনারী অপতৎপরতা’। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বইটির কপি এমুহূর্তে আমার কাছে নেই। থাকলে বাংলাদেশে মিশনারী তৎপরতার একটা ঐতিহাসিক পরম্পরা তুলে ধরতে সক্ষম হতাম। তবু ২০০৭ সালে প্রকাশিত পত্রিকার একটি সরেজমিন রিপোর্টিং থেকে উদাহরণ দিলে মিশনারী তৎপরতার বিষয়টা বোঝা অনেকটা সহজ হবে। সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি নিচে উল্লেখ করা হলো যাতে মিশনারী তৎপরতার নানা কৌশল নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করা সহজ হয়।

‘‘নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নে মুসলমান ও হিন্দুদের খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চ নয়, এরকম আরো পাঁচটি সংগঠন শিক্ষা, ঋণ ও আত্মনির্ভরশীল সহায়ক কর্মকান্ডের আড়ালে ধর্মান্তরিত করার কাজ করছে। এলক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বিরাট এলাকাজুড়ে অফিস, উপাসনালয় ও স্কুল। স্কুলগুলোতে কোমলমতি শিশুদের পড়ানো হচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে যিশু খ্রিষ্টের বই। সমিতির সদস্যদের পড়ানো হয় বাইবেল। সিডিতে দেখানো হয় যিশু খ্রিষ্টের জীবনীমূলক চলচ্চিত্র।

জেলা শহর থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের এক-তৃতীয়াংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এই ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী ভাটিয়া পাড়া, দুবাছড়ি, শিশাতলী, লক্ষ্মীচাপ ও সহদেব বড়গাছা গ্রামে কয়েক বছর ধরে ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চ, খ্রিষ্টান লাইফ অব বাংলাদেশ (সিএলবি), ন্যাজারিন মিশন, গসফেল ফর বাংলাদেশ, বাংলাদেশ লথারেন্স চার্চ (বিএলসি) ও সেভেন ডে অ্যাডভেন্টিস্ট সংস্থা মুসলমান ও হিন্দুদের খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার কাজ করলেও এতদিন সেসব কাহিনী সাংবাদিকদের ছিল অজানা। সম্প্রতি ধর্মান্তরিতদের সাথে মুসলমানদের একটি ঘটনায় তা ফাঁস হয়ে যায়। বেরিয়ে আসে ধর্মান্তরিতকরণের কাহিনী।

সরেজমিনে গিয়ে মুসলমান ও হিন্দুদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, যেসব সংস্থা ওই গ্রামগুলোতে কাজ করছে সবার লক্ষ্যই একটা, তা হলো লোকজনকে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করা। টাকা, চাকুরি, টিনের ঘর, রিকশা-ভ্যান, মোবাইল ও ত্রাণসাহায্য দিয়ে সহজ সরল দরিদ্র মানুষকে করানো হচ্ছে ধর্মান্তরিত। ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চ নামে সংস্থাটি প্রথমে ওই গ্রামে আস্তানা গেড়ে কিছু বেকার যুবকদেরকে চাকুরি দিয়ে তাদের দলভুক্ত করে তাদের দ্বারা খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচারণা চালায়। ওই যুবকদের দ্বারা গঠন করা হয় ৪১ জন পুরুষ-মহিলার সমন্বয়ে বেশ কিছু সমিতি। প্রতি শুক্রবার সমিতির সদস্যদের এক জায়গায় একত্রিত করে তাদের ইঞ্জিল শরীফ নামে বাইবেল ‘লুকের লেখা সুখবর’, ‘হযরত ঈসা মসীহ’, ‘মুসলমানরা ও হিন্দুরা ১০০ ভাগ জাহান্নামি আর খ্রিষ্টানরা ১০০ ভাগ জান্নাতি’সহ বিভিন্ন বই। রাতভর তাদের সিডিতে দেখানো হয় যিশু খ্রিষ্টের জীবনীসহ খ্রিষ্টধর্মের বিভিন্ন চলচ্চিত্র। ভাটিয়া পাড়া ‘আগাবে’ সমিতির সদস্য খ্রিষ্টান ধর্মে নবদীক্ষিত তোফাজ্জল হোসেন ও হাফিজা খাতুন জানান, ওই সমিতিতে প্রতি সাপ্তাহে ২ টাকা করে জমা দিতে হয় এবং ১ হাজার টাকা জমা হলে তারা আমাদেরকে ১০ হাজার টাকা দেবে। এই লোভ দেখিয়ে দরিদ্রদের সদস্য করেছে সংস্থা।

সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, যারা খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে তাদের প্রত্যেকের বাড়ি নতুন টিনের দ্বারা নির্মিত। ভাটিয়া পাড়ার দিনমজুর আবুল হোসেন খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পর এখন দামী মোবাইল সেট নিয়ে চলাফেরা করেন। আবুল হোসেনের প্রতিবেশী গোলাম রব্বানী। দুবাছড়ি গ্রামের আব্দুল কাদের জানান, আমার বিএ পাস ভাই আমির ও তার স্ত্রী লিপিকে ১৮ হাজার টাকা বেতনের চাকরি দেয়ার কথা বলে ধর্মান্তরিত করেছে ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চ। এজন্য ৩ মাস ঢাকায় নিয়ে গিয়ে তাদের ট্রেনিংও দিয়েছে তারা। প্রশিক্ষণকালীন ৩ মাসে তারা ২১ হাজার টাকা পায় বলে তিনি জানান। ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চ ও খ্রিষ্টান লাইফ অব বাংলাদেশের (সিএলবি) ইউনিয়ন ইনচার্জ (পিসিপি) নতুন রায় জানান, গত ১২ জুন ৪৫ জন মুসলমান ও ১৩ জুন ৫৬ জন হিন্দুকে শিশাতলী উপাসনালয় নিয়ে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে। চাকুরি বা অর্থের প্রলোভন দেখানোর কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা সমিতির সদস্যদের ইঞ্জিল শরীফ ও খ্রিষ্টান ধর্মের বই পড়িয়ে উদ্বুদ্ধ করি। এরপর তারা স্বেচ্ছায় নিজ ধর্ম ত্যাগ করেন। তিনি জানান, যে দুই দিন মুসলমান ও হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা হয় সেদিন ঢাকার হেড অফিস থেকে ঈখই-এর ডাইরেক্টর সুনীল অধিকারী ও ইভানজেলিক্যাল ফ্রেন্ডস চার্চের ডাইরেক্টর অ্যাভারেল হিরোফ অধিকারী আসেন। তাদের উপস্থিতিতে এ কাজ করানো হয়েছে। এছাড়া পার্বতীপুর মিশন ও হাড়োয়া মিশনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সেভেন ডে অ্যাডভেন্টিস্ট সংস্থাটির স্কুলে গতকাল গিয়ে দেখা গেছে দরজা বন্ধ করে ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া করানো হচ্ছে। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষক জানান, এখানে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানোর পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় জয়পুর হ্যারি পাঁচবিবি মিশনে। এখানে প্লে গ্রুপ থেকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত মোট ৩১ জন ছাত্রছাত্রীর সবার কাছ দেখা গেল ইটারি ডে জারির লেখা ‘আমার বাইবেলের বন্ধুগণ’ বইটি। ছাত্রছাত্রীরা জানালেন তাদের বাধ্যতামূলকভাবে এই বইটি পড়তে হয়। এলাকাবাসী জানান, খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ মিলে। লক্ষ্মীচাপ গ্রামের ডালিম চন্দ্র জানান, তার ছেলে দিলীপকে এই বিদ্যালয়ে ভর্তি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষক গোপাল মোহন্ত বলেছিলেন, তাকে ও তার স্ত্রীকে আগে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যালয়ের অধ্যয়নরত ৩য় শ্রেণীর ছাত্র লিটন ও ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র আশিতোষ জানায়, আমার বাবা-মা খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর আমাদের এই স্কুলে ভর্তির হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

একই গ্রামের ন্যাজারিন মিশনের চাইল্ড ফোকাস কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট বিদ্যালয় গিয়ে দেখা যায় কোমলমতি শিশু-কিশোরদেরকে যিশুর জীবনী সম্পর্কে পড়ানো হচ্ছে। এখানে যারা পড়াশোনা করে তাদের সংস্থা থেকে বই খাতা কলম পোশাক ও প্রতিদিন খাবার দেয়া হয়। জার্মানিভিত্তিক এই সংস্থাটির রয়েছে ওই এলাকায় বিশাল অফিস।

লক্ষ্মীচাপ ইউপি চেয়ারম্যান শ্যামচরণ রায় জানান, প্রতি মাসে ঢাকা ও গোপালগঞ্জ থেকে লোকজন এসে টাকা ও ত্রাণ সরবরাহ করে থাকে। তিনি আরো জানান, বায়োস্কোপ দেখানো কার্যক্রম ও ধর্মপ্রচারসহ বিভিন্ন কাজে বেকার যুবকদের চাকুরি দিয়ে সংস্থাগুলো দরিদ্র ও সরলমনা লোকদের ধর্মান্তরিত করছে। ভাটিয়া পাড়ার গোলাম রব্বানী, কামাল উদ্দীন, লক্ষ্মীচাপ গ্রামের আলীসহ অনেকে জানান, খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করার লক্ষ্যেই সংস্থাগুলো গ্রামে কাজ করছে (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ০২.০৭.২০০৭)।’’

উপরের এ রিপোর্টটি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাদের ধর্মান্তরিত করার কৌশল। তারা বিশেষ করে নিবৃত পল্লীর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে কাজ করে। তারা একই এলাকায় যৌথভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা চিকিৎসা, শিক্ষা ও লোন দেয়ার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তারপর কৌশলে নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকজনদেরকে ধর্মান্তরিত করা শুরু করে।

আশির দশকে দেশে খ্রীস্টান মিশনগুলোর অপতৎপরতা মোকাবেলা করতেই ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর অধীনে ইসলামিক মিশন নামে একটা উইং প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে তাকে অকার্যকর করে দেয়া হয়। ফলে দেশের দূর্গম এলাকায় ও ক্ষুদ্র জাতিগুলো বসবাসকারী এলাকায় খ্রীস্টান মিশনগুলোর মোকবেলায় কোন সংস্থা কাজ না করায় তারা ব্যাপকভাবে সাফল্য লাভ করেছে বিগত বছরগুলোতে। খ্রীস্টান এইড নামক এনজিওটির ওয়েবসাইটে ‘Bangladesh: Targeting tribes’ শিরোনামে রিপোর্টে বলা হয়েছে উপজাতি জনগোষ্ঠীকে কিভাবে খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা যাবে। এখানে বম উপজাতির একজনকে ১৯৭৭ সালে ধর্মান্তরিত করার পর তাকে সিউল থেকে ধর্মতত্ত্ব স্নাতকোত্তর ডিগ্রি করিয়ে এনে কিভাবে বান্দরবনের ১১টি উপজাতিকে ধর্মান্তরিত করার মিশনে নিযুক্ত করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘With help from Christian Aid, Bawm was able to send eight gospel workers into Mru villages. As a result, within a year three churches were planted in these villages. One of the new believers has become a missionary to his own people. Several women have formed a Women’s Christian Association to reach more tribal people groups with the Word of God.’। এসব মিশনারীদের একটা বিশেষ কৌশলের কথাও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘Reaching Tribes By Helping Children’। পাঠকের জন্য পুরো সেকশনটা তুলে দেয়া লোভ সামলাতে পারলাম না।
‘‘BTMB missionaries have found that one of the most effective ways of reaching the tribal people of the Bandarban Hill District is by educating their children. For example, a school was established in a village without one and provides a free education to the children of 30 non-Christian families.

Teacher-missionaries work with children during the day and conduct gospel meetings for adults in the evenings. Through Christian Aid’s help, 10 of these teacher-missionaries are receiving support.

Today in Bangladesh, less than one percent of the population is Christian. But the number of committed native missionaries spreading the gospel throughout the country is increasing. For the past 40 years, churches have grown at twice the rate of the population. Christian Aid has gotten behind the indigenous ministries that are making this growth happen, because of their effectiveness and vision to see their country changed by the power of Christ.

Christian Aid donors have helped mission leader Bawm to send eight gospel workers into Mru villages.

BTMB works with Mru, Tripura, Bawm, Khyang, Tangchangya, Pankhu and Chakma tribes. (Christian Aid Mission, 2011)’’

অবস্থা সত্যি আশঙ্কাজনক নয় কি? রিপোর্টের শেষে নিচের দিকে লেখা আছে, ‘Christian Aid seeks to establish a witness for our Lord Jesus among unreached people groups by assisting highly effective native missionaries who already know the languages and culture and are getting the job done for less cost.’। লক্ষ্যণীয় যে, ‘getting the job done for less cost’ বলতে কি বোঝানো হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করা আর সেটা হলো সহজে দরিদ্র ও সহজ সরল মানুষগুলোকে সেবা আর সহযোগিতার নামে খ্রীস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা। আরো লক্ষ্যণীয় যে, পূর্বে উল্লেখিত নীলফামারীর রিপোর্টের সাথে বান্দরবানের মিশনারীদের নিজেদের রিপোর্টের সাথে কোন বেমিল নেই।

বিএমএস ওয়ার্ল্ড মিশন নামক অন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একটি দলিল থেকে একটা অংশ পাঠকের জন্য তুলে দিলাম।
‘‘The country of Bangladesh has so many problems but we really do see a solution through Jesus. We would encourage you all to keep on praying for the church in Dhaka and the outreach programmes they support, as God is really at work in so many areas of Bangladesh. (BMS World Mission, 2008)’’

এবার বুঝতে চেষ্টা করুন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কেন বাংলাদেশে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের আসল উদ্দেশ্য কি? কেইবা তারা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে এত মাতামাতি করছে? এখানে পূর্বে প্রকাশিত একটি লেখা থেকে অংশ বিশেষ তুলে ধরা হচ্ছে বিষয়টি সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার জন্য।

‘‘আমরা আমাদের দেশে বসবাসকারী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগোষ্ঠীকে উপজাতি হিসেবেই চিহ্নিত করে এসেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতারও অনেক আগ থেকে। হঠাৎ করে আশির দশক থেকে উপজাতিদেরকে খ্রীস্টান মিশনারীরা যখন ধর্মান্তরিত করা শুরু করল, তখন থেকে দেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী পশ্চিমা মিশনারী ও তাদের অনুগ্রহদানকারীদের প্ররোচনায় উপজাতি শব্দটি ব্যবহার না করে আদিবাসী বলা শুরু করে। শব্দের অর্থগত দিক থেকে উপজাতি হলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার পরিচয় বহনকারী আর আদিবাসী মানে ভূমিপুত্র। অর্থাৎ যারা এভূমিতে অনাদি কাল হতে বসবাস করে আসছে। ইতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের উপজাতিগুলো বহিরাগত জনগোষ্ঠী। তাদেরকে ভূমিপুত্র প্রমাণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমল্যান্ড আন্দোলন ও ময়মনসিংহের গারোল্যান্ড আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় আছে বাংলাদেশে সেবার বহিরাবরণে কাজ করে যাওয়া খ্রীস্টান মিশনগুলো। সেটা বুঝতে আমাদের যত দেরী হবে, দেশের ততই সর্বনাশ হবে। আশির দশকের শেষের দিকে- বাংলাদেশে খ্রীস্টান মিশনারীদের অপতৎপরতা- নামক একটা বই পড়েছিলাম। এ মুহূর্তে লেখকের নাম মনে করতে পারছি না। লেখক বইটিতে নানা নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র দিয়ে বাংলাদেশে খ্রীস্টান মিশনারীদের বিভিন্ন অপতৎপরতার কথা বলেছেন। সেখানে তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উপজাতিদেরকে কিভাবে সুকৌশলে খ্রীস্টান বানানো হচ্ছে এবং তাদেরকে দিয়ে ভবিষ্যতে কিভাবে আমাদের দেশের অখন্ডতাকে বিনষ্ট করা হবে, তার একটা তথ্যনির্ভর বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর বর্ণিত সেই ভবিষ্যতের দিকই যে আমরা হেঁটে চলেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান অবস্থা তারই ইঙ্গিতবহ (হাওলাদার, ২০১০)।’’

উপরের এলেখাটা এক বছর আগের লেখা। যাই হোক অবশেষে সরকারের টনক নড়েছে। গত ২৬ শে মে ২০১১ তারিখে জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের অধিবেশনেই প্রথম সরকারেরর পক্ষ থেকে নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারী ইকবাল আহমেদের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর শোনা গেল। অবশেষে মাননীয় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই আদিবাসী শব্দ প্রযোজ্য নয়’। তিনি বলেন, ‘নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত গবেষণায় স্পষ্ট যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী কোন জনগোষ্ঠীই এখানকার মূল আদিবাসী বা ভুমিপুত্র দাবিদার হতে পারে না’ (মানবজমিন ১৬.০৬.২০১১)। তিনি আরো বলেন, ‘এনজিওগুলো কোটি কোটি টাকা পাচ্ছে। বিদেশীদের টাকা খেয়ে তারা তাদের স্বার্থে কাজ করছে। এর পেছনে যে গভীর ষড়যন্ত্র বয়েছে সে সম্পর্ক সতর্ক থেকেই আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি’।

লক্ষ্যনীয় যে, দূর্গম পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতিদের দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে খ্রীস্টান ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নিলেই ব্যাপারটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৪৯টি এনজিও-মিশনারী কাজ করছে। গোটা বোমাং উপজাতিসহ প্রায় ১৭ হাজার উপজাতিকে এরা খ্রীস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে, স্থাপন করেছে ৯৫০টি গির্জা। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯১ সালের মধ্য বাংলাদেশে ধর্মান্তরিত খ্রীস্টানের সংখ্যা ২০,০০০ থেকে ৪০,০০০ এর উন্নীত হয়েছে। খ্রীস্টান মিশনগুলোর লক্ষ্য হলো আগামী ২০ বছরের মধ্য বাংলাদেশের খ্রীস্টান জনগোষ্ঠির সংখ্যা ১২ মিলিয়নে পৌঁছানো। আর এ টার্গেটের পেছনেই কাজ করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংস্থায় এসব ধর্মান্তরিত খ্রীস্টানদেরকে মোটা বেতন চাকুরী দেয়া হয় তাদের চেয়ে যোগ্য বাঙালীদেরকে বঞ্চিত করে। এসব তথ্যউপাত্ত আমাদের কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে? আমরা আশা করছি সরকার পরাশক্তির কাছে নতি স্বীকার না করে দেশের স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ নিবে, বিশেষ করে- পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশ বিদেশী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তদারকী করবে। প্রয়োজন সব এনজিও ও মিশনারী সংস্থাগুলোকে গোয়েন্দা নজরদারীতে নিয়ে আসা। আর এবিষয়ে সরকার দেশপ্রেমিক জনতাকে অবশ্যই সাথে পাবে।


তথ্যসূত্র:
• গফুর, আবদুল। ২০০৭। নীলফামারীতে মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করার লক্ষ্যে ৬ সংস্থা কাজ করছে: শিশুদের পড়ানো হচ্ছে যিশুখ্রিষ্টের বই: মহিলাদের দেখানো হয় সিডি। দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২রা জুলাই, ২০০৭।
• হাওলাদার, তাপস। ২০১০। উন্নয়নের রাজনীতি: ভাষার মারপ্যাচ, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ও আমাদের জাতিসত্ত্বার পরিচয়। সোনার বাংলাদেশ ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত। (http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=1904)
• Christian Aid Mission. 2011. Bangladesh: Targeting the tribes. http://www.christianaid.org/Missionaries/ByRegion/SouthAsia/BangladeshTargetingTribes.aspx Accessed on 23 June, 2011.
• BMS World Mission. 2008. Bangladesh Action Team: Prayer Letter June 2008. Didcot: BMS World Mission.
• Islam, M. S. (?). The Creeping March of Christianity: The Widespread Evangelization in Bangladesh.

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট।
Email: taposh.hawladar@googlemail.com
http://www.sonarbangladesh.com/articles/TaposhHawladar
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
ঢাকা থেকে মুহিব লিখেছেন, ২৭ জুন ২০১১; দুপুর ০৩:০৩
ভয়ানক...............অতি ভয়ানক
60931
রিয়াদ সৌদি আরব থেকে জাহেদ লিখেছেন, ২৯ জুন ২০১১; রাত ১০:৩৪
তাপস হাওলাদার কে ধন্যবাদ জাতিয়তাবাদের পক্ষে কলম দেওয়ার জন্য, কিন্তু আপনার নামটা নিয়ে আমি বিভ্রান্তিতে আছি, আসা করি আমার বিভ্রান্তি দূর করবেন?
61174
অচিনপুর থেকে তাপস হাওলাদার লিখেছেন, ৩০ জুন ২০১১; বিকেল ০৫:২৬
কথায় বলে 'নাম দিয়ে কাম কি?' নামের চেয়ে কর্মের পরিচয়ই মানুষের আসল পরিচয়, তাই নয় কি ভাই জাহেদ? আমি আশা করব আপনি আপনার পরিচিত সবাইকে এই ধারাবাহিক কলামটির লিংক পাঠাবেন যাতে সবাই সচেতন হন এবং নিজ নিজ অবস্থানে থেকে দেশের ও দশের মঙ্গলে কাজ করে যান। আশির্বাদ করছি ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
61227
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy