বুধবার, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯; ৩০ মে ২০১২; দুপুর ১২:৫৩ (ঢাকা সময়)
ভিশন ২০৩০: উন্নত মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যেক পরিবারের জন্য নিজের পাকা বাড়ী, নিজের গাড়ী এবং প্রতিটি তরুণ-তরুণীর জন্য সম্মানজনক চাকুরী।

পুরনো কলাম

 
আমার বিদেশী বন্ধুরা (৩য় পর্বঃ ইয়াসিন - সুদান) (১৩/১১/২০১১)
আমার বিদেশী বন্ধুরা (২য় পর্বঃ আহমাদ ইয়েমেনী) (১৯/০৩/২০১১)
“বিদেশ আইসা লস্ হয়া গেছে ভাই, তয় একটা জিনিস আমার চোখ খুইলা দিছে” (০৯/১০/২০১০)
মালাক্কা সফরের কিছু কথা এবং আমাদের বিশ্বভ্রমণ (১৮/০৯/২০১০)
প্রথম দেখায় কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট (২২/০৫/২০১০)
ফিলিস্তিনী বন্ধু ফাহাদ এবং ……. Forever Palestine (১৫/০৩/২০১০)
ছোটন ও তার মা (গল্প) (০৬/১১/২০০৯)
আগের লেখা
618


আমার বিদেশী বন্ধুরা (৩য় পর্বঃ ইয়াসিন - সুদান)

তারিক রিদওয়ান

[২০১০-১১ সেশনের শর্ট সেমিস্টারে International Students’ Division (ISD) এর Welcoming Committee তে কাজ করতে গিয়েই ইয়াসিনের সাথে পরিচয়। এই সেমিস্টারের নতুন ছাত্র ছিল সে, বলা যায় আমার জুনিয়র ফ্রেন্ড। Welcoming Committee হচ্ছে ISD এর অধীনে একটি স্টুডেন্ট গ্রুপ। এই গ্রুপের কাজ মূলতঃ সারাবিশ্ব থেকে আগত নতুন ইন্টারন্যাশনাল ছাত্র-ছাত্রীদের এয়ারপোর্ট থেকে ভার্সিটিতে নিয়ে আসা, তাদের রেজিস্ট্রেশানের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা, এবং তাদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা। ইয়াসিন এবং তার পরিবারের এক সদস্যের সাথে পরিচয় এবং পরবর্তীতে বেশ কিছু স্মরণীয় মূহুর্তগুলো শেয়ার করার এই ক্ষুদ্রে প্রচেষ্টা...]

আসরের নামাজের মধ্যে মোবাইল কাঁপা শুরু করলো… মেজাজটা যেমন গরম হয়ে গেলো, খুব খারাপও লাগছিল ইয়াসিনের জন্য। প্রায় আধা ঘণ্টা মেইন গেটে দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াসিনের জন্য অপেক্ষা করা সত্ত্বেও ওর দেখা না পেয়ে যেইনা মাত্র মসজিদে গিয়ে নামাযে দাঁড়ালাম, তখনই এলো ওর কল্‌! রিয়াদ টু কুয়ালালামপুর প্রায় আট ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আবার এক ঘণ্টা KLIA (Kuala Lumpur International Airport) টু IIUM ট্যাক্সি ভ্রমণ করে আসা একজন ক্লান্ত মানুষ আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে অথচ আমি… তখন অবশ্য ইয়াসিনের সাথে পরিচয় ছিলনা আমার, শুধুমাত্র জানি যে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে রিয়াদ থেকে কুয়ালালামপুর আসছে সুদানিজ ছেলে ইয়াসিন, KLIA তে ল্যান্ড করবে দুপুর ৩টায়, আর IIUM পৌঁছুতে বিকাল ৫টার মতো বাজবে। ঘণ্টাখানেক আগে এয়ারপোর্ট থেকে মারুফ মোহাম্মাদ ভাই এসএমএস করে জানালেন ইয়াসিনকে তিনি ইতিমধ্যে “এয়ারপোর্ট লিমুজিন”-এ তুলে দিয়েছেন। এয়ারপোর্ট লিমুজিন হলো KLIA এর বিশেষ ট্যাক্সি সার্ভিস, সবচাইতে নিরাপদ। মালয়েশিয়ার হিংস্র তামিল ট্যাক্সি ড্রাইভারদের থাবা থেকে বাঁচানোর জন্যই মনে হয় KLIA কর্তৃপক্ষের এই মহান উদ্যোগ!

নামায শেষ হতেই মসজিদের অ্যাডমিন বিল্ডিং এর সামনের গেট থেকে বের হতে হতে ফোন দিলাম ইয়াসিনকে, ততক্ষণে প্রায় ৫-৬ মিনিট দেরী হয়ে গিয়েছে। কল রিসিভ করলো ওপাশ থেকে ইয়াসিন...
-আসসালামু আলাইকুম!
-ওয়ালাইকুম আসসালাম...
-হ্যালো!!! ব্রাদার তারিক?
-ইয়েস, ইয়াসিন? হোয়্যার আর য়্যু রাইট নাও??
-আই অ্যাম ইন ফ্রন্ট অফ দ্যা মস্ক গেট...
-ওও...

আমিতো পড়ে গেলাম ভীষণ ধাঁধায়... ইয়াসিন মসজিদের দরজার সামনে, কিন্তু মসজিদের তো বড় ৩টা দরজা, কোন দরজার সামনে সে? নতুন স্টুডেন্টদের নিয়ে এই সমস্যায় সবসময়ই পড়তে হয়। কারণ যে কোন গেটই তাদের কাছে মনে হয় মেইন গেট! গোটা IIUM এর গঠন যে কতোটা বিভ্রান্তিকর এটা যারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট তারাই জানে। এমনও কিছু স্টুডেন্ট দেখেছি আমি যাদের ৩ ঘণ্টা সময় লেগেছিল CAC Main Hall থেকে মহল্লা সিদ্দিকে যেতে! আর IIUM সেন্ট্রাল মস্কের মেইন ৩টা মেইন গেট কোনটা কোন সাইডে এটা বুঝে উঠতেই তো একজন ছাত্রের কমপক্ষে অর্ধমাস লেগে যায়... আর ছোটখাট বাকি ৭টা দরজার কথা আপাতত বাদই দিলাম। এই ৩টা গেটের মধ্যে ২টা গেটের ডিজাইন সম্পূর্ণ একইরকম। শুধু গেট এর ডিজাইন একইরকম হলেও সমস্যা হতোনা, কারণ তখন তো আশেপাশে কোন বিল্ডিং এর ডিজাইন দেখে মনে রাখা যেত... কিন্তু এই ২টা গেট (CELPAD গেট এবং অ্যাডমিন বিল্ডিং গেট) এর চারপাশে যা কিছু আছে, বিল্ডিং, গাছ, সিড়ি, সবকিছু সম্পূর্ণ একইরকম।

আমি তখন বুঝে উঠতে পারছিলামনা ওকে কিভাবে কোন গেটে গিয়ে খুঁজে বের করবো। তখন হঠাৎ করে বামপাশে তাকিয়ে দেখি IRK ডিপার্টমেন্টের ওদিক থেকে কথা বলতে বলতে আসছে এক ছেলে, অঙ্গভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম যে সে আমার সাথেই কথা বলছে! ছোটখাট নাদুশ-নুদুশ গড়নের দেহ, চোখে চশমা এবং দেখে মনে হয় এখনও সে ক্লাস টেনের ছাত্র... অন্যান্য সুদানিজদের মতো ইয়াসিনও দেখলাম হেলেদুলে হাঁটে। সুদানিজদের এই ব্যাপারটা আমার বেশ অদ্ভূত লাগে আর মারাত্মক হাসি পায়। যতজন সুদানিজ দেখলাম আজ পর্যন্ত, বেশিরভাগই কেমন যেন এক অদ্ভূত ভঙ্গিতে হাঁটে... অনেকটা হাঁসের মতো!! পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে আরো স্পষ্ট করে বলি, সুদানিজদের হাঁটার স্টাইল অনেকটা সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটার ইনজামাম-উল-হক এর মতো, হেলেদুলে থপ থপ করে আস্তে আস্তে হাঁটে...হাহাহাহা!!

সামনে আসার পর হ্যান্ডশেক করে কোলাকুলি করলো ইয়াসিন। প্রথমেই দুঃখ প্রকাশ করলাম ওর কল্‌ রিসিভ করতে না পারায়, বললাম যে আমি নামাযে ছিলাম... সেও হাসিমুখে জবাব দিল আমার খোঁজ না পেয়ে সে তার লাগেজগুলো মেইন গেটে রেখে নামাজ পড়তে চলে এসেছিল মসজিদে।
ইয়াসিনের সাথে ওর বাবা “এল মুতাশিম ইদ্রিস” এসেছেন, অন্য সুদানিজদের সাথে কোন পার্থক্য নেই, ঠিকই হাঁসের মতো থপ থপ করে হাঁটেন ইদ্রিস চাচা... হাহাহাহা! ইয়াসিন এবং ইদ্রিস চাচাকে নিয়ে ট্যাক্সি ক্যাবে করে চলে এলাম নতুন ছাত্রদের জন্য নির্ধারিত মহল্লা "সালাহউদ্দিন আল আইয়্যুবি" তে (উল্লেখ্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে “হল” কে “মহল্লা”ডাকা হয়)। এই মহল্লাটি এক্কেবারে "ব্র্যান্ড নিউ" বলা চলে, গতবছর তৈরী করা হয়েছে। আর এর অবস্থানও পাহাড়ের চূড়ায়, হেঁটে আসা যাওয়া করা খুবই কষ্টের, কিন্তু খুবই নিরিবিলি এবং প্রাকৃতিক সৌদর্যের দিক দিয়ে অন্যান্য মহল্লার চেয়ে আরো বেশি সুন্দর। ট্যাক্সি ক্যাব থেকে ওনাদের লাগেজ আলগিয়ে রুমে নিয়ে গেলাম এবং রুমের চাবি বুঝিয়ে দিলাম। এরপর ইদ্রিস চাচাকে বললাম ছাত্রদের সাথে যদি তাদের মা/বাবা হোস্টেলে অবস্থান করতে চান তাহলে দিনপ্রতি ভাড়া হিসেবে ৫০ রিংগিত করে দিতে হবে... শুনে ইদ্রিস চাচা হাসিমুখে এবং আন্তরিকতার সাথেই বললেন, "কোন সমস্যা নেই"। বেহায়ার মতো এভাবে টাকার কথা বলতে আমার খুব খারাপ লাগছিলো, কিন্তু কি করব? আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মই নাকি এটা! অন্যদিকে ইদ্রিস চাচা হাসিমুখে যে উত্তর দিলেন এতে যেন অপরাধবোধ আরো বেড়ে গেল। ছেলেকে নিয়ে কত্তো বড় স্বপ্ন তাঁর, ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে, দেশ-দশের সেবা করবে। ছেলেকে বড় করতে যত খরচই হোক এতে কোন দুঃখ নেই তাঁর... মা-বাবার কাছে সন্তানের জন্য কষ্ট সহ্য করা যেন খুব সহজ একটা কাজ।

এরপর ইদ্রিস চাচা বললেন, "তোমরা সত্যিই নতুন ছাত্রদের জন্য অনেক কিছু করছ, খুব ভালো লাগছে দেখে"... ওনার মুখে এ কথা শুনে বেশ অবাকই হলাম, বুঝলামনা এতো খুশি হওয়ার কারণ কি আছে এখানে? বরং আমার কারণে ওনাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল ১৫ মিনিটের মতো, আবার দিনপ্রতি ৫০ রিংগিত দিতে হচ্ছে এতে তো বরং অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা!! কিন্তু পরে মনে হলো এতো দূরদেশে এসে এইসব ব্যবস্থা ওনারা কল্পনা করেননি, বা এতো দূরদেশে কেউ এভাবে ওনাদের সাহায্য করার চেষ্টা করবেন তাও ভাবেননি, তাই হয়তো এভাবে বলছেন। তবে বুঝতে পারলাম ওনারা যা বলছেন টা হৃদয় থেকেই বলছেন এবং অন্তর থেকে দোয়া করছেন।

সেদিন বিকেলে আবার দেখা ইয়াসিন এবং ইদ্রিস চাচার সাথে। মোটামুটি জোর করেই চাচা আমাকে নিয়ে চললেন HS ক্যান্টিনে, আমার সাথে বিকালের নাস্তা করবেন বলে... আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি ক্যান্টিনের মিশরীয় দোকানে প্রায় ২৪ রিংগিতের খাবার অর্ডার দিলেন, আজিব দুনিয়া! এতো খাবার খাবো কিভাবে, তাও আবার বিকালের নাস্তা এটা...
খাবার নিয়ে আসার পর শুরু হলো গপ্পো, ইয়াসিনরা ৩ ভাই, ভাইদের মধ্যে সে মেঝো। বাবা মুতাশিম চাকুরি করেন রিয়াদে, সেই সুবাদে রিয়াদেই জন্ম, বড় হওয়া, স্কুল-কলেজ জীবন... আর এরপর ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নে দূরদেশে চলে আসা... ছোটভাই রিয়াদের এক স্কুলে ক্লাস টেনের ছাত্র, আর বড়ভাই সুদানের কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, মনে হয় ফাইনাল ইয়ারে আছে। বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো, সুদানের দু'টুকরো হয়ে যাওয়ার গপ্পো, সৌদী আরবে সুদানিজরা কেমন আছে, তারাও কি চাকুরি করে কিনা বাংলাদেশীদের মতো, অন্যান্য প্রবাসিরা কেমন আছে এ নিয়ে গপ্পো... সুদানের দু’ টুকরো হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দেখলাম মুতাশিম চাচা আর ইয়াসিন দু'জনই বেশ তৃপ্ত, শুধু তারাই নন, আমার অন্যান্য সুদানিজ বন্ধুরাও বেশ খুশি। কারণ কি?? তাদের মত, "তারা বেশ ঝামেলা পাকাতো, এখন আলাদা হয়ে ভালই হয়েছে, আমরা আমাদের মতো থাকবো আর ওরা থাকবে ওদের মতো"। কেমন যেন লাগলো বিষয়টা, কারণ সুদানের দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা আমার মোটেও ভালো লাগেনি, বলা যায় আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোকে কাবু করার জন্য আরেকটা ইসরাইলি ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠিত হলো দক্ষিণ সুদান তৈরীর মাধ্যমে। সুদানিজরাও হয়তো বুঝতে পারে এ বিষয়টা, কিন্তু এতোদিন ধরে চলে আসা মুসলিম-খ্রিস্টান দ্বন্দ থেকে রেহাই পেয়েছে বলে হয়তো তারা সুখী, কিন্তু ভবিষ্যতের ভয়াবহ বিপদের কথা কি তাদের মাথায় আসেইনা? কেজানে...

এরপর কথা হলো মুতাশিম চাচার চাকুরি নিয়ে... ইয়াসিনের জন্মের আগে থেকেই তিনি রিয়াদে চাকুরি করছেন। সেই সুবাদে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের অনেক মানুষের সাথেও বেশ ভালো পরিচয় আছে ওনার। তবে কোন বাংলাদেশীর সাথে খোলাখুলি আলাপ নাকি তাঁর এই প্রথম হচ্ছে! মুতাশিম চাচা হলেন তাঁর বাবার বড় ছেলে, তাই দায়িত্বও ছিল অনেক, নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং এরপর ছোট ভাইবোনগুলোকে মানুষ করা, সব নিয়ে বেশ ধকল পার করেছেন তিনি। কিন্তু মুখে তৃপ্তির হাসি, সফলতার হাসি কারণ সব ভাইবোনই আজ প্রতিষ্ঠিত এবং সফল। চিন্তা করে দেখলাম বিশ্বের সব বড়ভাইদের দায়িত্ব কি একইরকম থাকে নাকি? আমি ভেবেছিলাম বড়ভাইদের দায়িত্ব দেশ অনুযায়ী ভিন্ন হয়! হাহাহা... আমার নিজেরও যে একই অবস্থা, পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় ছোট দু'টো ভাই দু'টো ঘাড়ের উপর বসে আছে! তাও আবার দু'টোই এখনও বাচ্চা, একটা ক্লাস ফোর আর আরেকটা ক্লাস ওয়ানে, দুনিয়া কেমনে ঘুরে কোন হুশ নেই তাদের। নিজেদের কাজে ব্যস্ত সর্বদা! এই বয়সটাই তো হলো আনন্দের বয়স, নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকার বয়স। কিন্তু এদিকে যে আমার দু' কাঁধে বসে আছে দু দু'টো বিশাল দায়িত্বের পাহাড়, আমানতের বোঝা, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় এ দু'টো পাহাড় হলো আমার শক্তি, আল্লাহর রহমত! শেষ চিন্তাটাই মনে হয় সত্যি, সত্যিই তাই...

ইদ্রিস চাচা অনুরোধ করলেন ইয়াসিনকে যেন সবসময় দেখে রাখি, পড়ালেখাসহ অন্যান্য সকল ব্যাপারে সাহায্য করি। ইয়াসিনকেও উপদেশ দিলেন, বললেন আমার থেকে সাহায্য নিতে। অবাক হয়ে দেখছিলাম চাচার কাণ্ডকারখানা, বিশ্বের সব মা-বাবাই যেন এক, একটুও পার্থক্য নাই! সন্তানদের জন্য তাদের চিন্তার অন্ত নাই... মা-বাবা জিনিষটা সত্যিই বড় অদ্ভূত। "মা" নিয়ে তো বলার কিছু নেই, আল্লাহর তৈরী সবচাইতে রহস্যময় এক জাতি, সন্তানের জন্য যে কিভাবে এতোকিছু করে, যেন মায়ায় ভরা কলস... আর "বাবা"?? বরং বিষয়টা আমার কাছে "মা"-র চাইতে আরো অনেক বৈচিত্র্যময় মনে হয়। পাঠক হয়তো অবাক হচ্ছেন, এমন মনে হওয়ার কারণটা কি?? ভেবে দেখুন "মা" রা তাদের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে দেন সরাসরি, কোন প্যাঁচ নেই, একদম সরাসরি। সন্তান অন্যায় করলো তো দিবেন ঠাশ্‌ করে একটা মাইর বসিয়ে, আবার কিছুক্ষণ পর সন্তানকে মেরেছেন এই দুঃখে কাঁদবেন; সন্তান যখন তাঁকে ছেড়ে অনেক দূরে, বহু দূরদেশে চলে যাচ্ছে তখনও অঝোর ধারায় অশ্রু ঝড়বে মায়ের চোখ দিয়ে; এরপর যখনই সন্তানের কথা মনে পড়বে, তখনই কেঁদে দিবেন; ছুটির দিনে বাড়িতে যখন সবাই আছে, দুপুরে কিংবা রাতে স্পেশাল খাবার রান্না হচ্ছে পরিবারের সবাই মিলে খাবে কিন্তু সন্তানটি কাছে নেই এ দুখে কাঁদবেন; যে রান্নাটি হচ্ছে সেটা সন্তানের প্রিয় ছিল তাই সে সবসময় মা'র কাছে বায়না করতো এই খাবার খাওয়ার জন্য, তাই এই খাবার রান্না করার সময় কাঁদবেন; সেই খাবার পরিবারের অন্য সবাই খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু সন্তান খেতে পারছেনা এই দুঃখে মা খেতেই পারবেননা, বরং আরো বেশি চোখের পানি ফেলবেন; সন্তান যদি ফোন করে সে সময়ও কেঁদে দিবেন, মাঝে মাঝে এতো বেশি কাঁদবেন যে সন্তানের সাথে কথাই বলতে পারেননা... কিন্তু বাবা?? তাঁর চোখ দিয়ে তো অশ্রু ঝড়েনা, ঝড়াতে পারেনও না, শুধুই নির্বাক দৃষ্টিতে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন সন্তানের দিকে, মনে হয় যেন অবলা প্রাণী কিছু বলতেও পারছেনা সইতেও পারছেনা! বাইরে দিয়ে অশ্রু ঝড়েনা ঠিকই কিন্তু ভিতরে ভিতরে যে কি চরম রক্তক্ষরণ হয় সেটা কেউই বুঝেনা, বুঝতে পারেওনা। মা তাঁর আবেগ তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেন, কিন্তু বাবা করেন খুব ধীরে সুস্থে... সন্তানও তার সমস্ত আবেগ প্রকাশ করে মায়ের সাথেই, বাবার সাথে করেনা, কারণ সন্তানও বুঝতে পারেনা বাকরুদ্ধ বাবার অনুভূতি গুলো... কি নির্মম এক চরিত্র রে বাবা!! আল্লাহ বানাইছে!! আমি যখন বাবা হবো তখন না জানি কিভাবে এসব সহ্য করবো, ভাবতেই গা শিউরে ওঠে :(

রাতে নেটে বসে চিন্তা করছিলাম কতোটা ক্লান্ত ছিল সে? কতো হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে সে এসেছে এদেশে শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে?? গুগল ম্যাপে KLIA টু IIUM আর Microsoft Student Encyclopedia-র ম্যাপে রিয়াদ থেকে কুয়ালালামপুর এর দূরত্বটা দেখলামঃ


রিয়াদ টু কুয়ালালামপুরঃ প্রায় ৩,৯৪০ মাইল
(ছবি-১)

KLIA টু IIUM : ৭৫ কিলোমিটার
(ছবি-২)

অর্থাৎ প্রায় মোট ৪০০০ মাইল পাড়ি দিয়ে সে এসেছে, কিন্তু আমি সাথে সাথেই তাকে রিসিভ করতে পারিনি। শুধু ইয়াসিন নয়, এই ব্যাপারটা আরো কয়েকজন নতুন ছাত্রের ক্ষেত্রে হয়েছে... নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল এ সময়...
যেদিন ইদ্রিস চাচা চলে যাচ্ছিলেন, খুব খারাপ লাগছিল কেন জানি... খারাপ আমার জন্য লাগছিলনা হয়তো, লাগছিলো ইদ্রিস চাচা এবং ইয়াসিনের জন্য। ইয়াসিনের জন্য খারাপ লাগার ব্যাপারটা কেমন?? খুলে বলি... তাকে এই দূরদেশে নিয়ে এসেছেন তার বাবা, এখন তাকে রেখেই চলে যাবেন তিনি আর সে একদম একা হয়ে যাবে। হয়তো মা-বাবার বকুনি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, স্বাধীন হওয়া যাবে, কিন্তু বিষয়টা আদৌ সুখকর হয়, সহজও নয়, মা-বাবার সাথে থেকে শৈশব-কৈশোর পার করা এক কিশোরের কাছে হঠাৎ একাকী দূরে কোথাও চলে যাওয়া বড়ই কষ্টের, যদিও প্রথমে ব্যাপারটা তার কাছে খুব রোমান্টিক মনে হয়! আমারও এমন মনে হয়েছিল, জন্মের পর ১৯ বছর ৪ মাস ১২ দিন কাটালাম মাতৃভূমিতে আম্মু-আব্বুর সাথে, এখন চলে যাচ্ছি দূরদেশে পড়ালেখা করতে যেখানে আমি শুধুই একা, পাশে থাকবেনা কোন আপনজন, থাকব খুবই স্বাধীন... এতো তাড়াতাড়ি যে আম্মু-আব্বু থেকে দূরে চলে যেতে হবে কখনো কল্পনা করিনি, কল্পনার করেননি তাঁরাও... যাওয়ার সময় তাঁদের কান্না এবং দুঃখ দেখে আমার এতোটা দুঃখ হয়নি, বরং বেশ মজায় ছিলাম বিদেশ যাচ্ছি বলে।

এখানে আসার পর ১ম ২/৩ সপ্তাহও বেশ ভাল ছিলাম, আনন্দে ছিলাম, কারণ তখনও বেড়ানোর আমেজে ছিলাম, কিন্তু যখন আস্তে আস্তে সময় পার হতে লাগলো, জীবনের বাস্তবতাগুলো এসে ঠোকর মারতে লাগলো, তখন পাশে কাউকে পাশে না পেয়ে বুঝেছিলাম যে সত্যিই মানুষ কতোটা অসহায় হতে পারে, মা-বাবা সন্তানকে কত সুন্দরভাবে আগলে রাখেন সবকিছু থেকে... এই ব্যাপারগুলোর মধ্যে দিয়েই ইয়াসিনকে যেতে হবে, আর হতে হবে একজন মানুষ...
অন্যদিকে ইদ্রিস চাচার কথা ভেবে খারাপ লাগছিল, ইয়াসিনকে জন্মের পর থেকে নিজ হাতে এতো স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে বড় করা এই মানুষটা, আজ ইয়াসিনকে রেখে যাচ্ছেন দূরের অজানা কোন দেশে, স্বপ্ন একটাই, সন্তান জ্ঞানার্জন করবে, মানুষ হবে আর সেই অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাবে... সন্তানকে এতোদূরে পাঠানো মা-বাবার জন্যও অসম্ভব কষ্টের, যা হয়তো আমি এখন শতভাগ বুঝিনা... একদিন আমার বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক বাংলাদেশী শিক্ষক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “মা-বাবার সাথে কথা হয়? নিয়মিত খোঁজ-খবর নাও তো?? কথা বলো তো??” জবাবে বলেছিলাম, “জ্বি স্যার কথা হয়, তবে প্রতিদিন না, ২/৩ দিন পর পর, মাঝে মধ্যে ব্যস্ততার কারণে ৭/১০ দিনেও কথা হয়না...”, জবাবে স্যার বলেছিলেন, “কথা বলবা নিয়মিত, তাঁদের খোঁজ নিবা, তাঁদের সাথে গল্প করবা, মা-বাবা যে সন্তানকে কতোটা miss করে এটা সন্তানদের পক্ষে কখনোই বুঝা সম্ভব না, সন্তানরা তখনই বুঝে, তারা নিজেরা যখন মা/বাবা হয়। আমি নিজেও বুঝিনি, কিন্তু বাবা হওয়ার পর বুঝতে পারি আমার মা-বাবার অবস্থা, তাই শত ব্যস্ততা থাকলেও তাদেরকে ফোন দেই, কথা বলি”, স্যারের কথাগুলো মনে খুব দাগ কেটেছিলো, মনে থাকবে আজীবন, কিন্তু মা-বাবার অভাগা সন্তান আমি, মাঝে মধ্যে ব্যস্ততায় সত্যিই ভুলে যাই তাদের কথা :’(

ইদ্রিস চাচার অনুভূতি কি তা বুঝার সাধ্য আমার নেই, এবং, সন্তানের প্রতি পৃথিবীর সকল মা-বাবার অনুভূতি-টান-ভালোবাসা কেমন তা শতভাগ বুঝার সাধ্য আপাতত আমার নেই এখন, হয়তো একদিন বুঝবো যদি আল্লাহ তাওফিক দিবেন... ইদ্রিস চাচা যাওয়ার সময় ইয়াসিন পরীক্ষার হলে ছিল, তাই দেখা করতে পারেননি সন্তানের সাথে, এজন্য আগের রাতেই বিদায় নিয়েছিলেন ইয়াসিন থেকে। ভাবলাম ইয়াসিন যেহেতু নেই এখন, চাচাকে টার্মিনাল পুত্রা রেল স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে আসি, ইয়াসিন থাকলে হয়তো সে তাই করতো, বা আমার আব্বু যাওয়ার সময় হয়তো আমি তাই করতাম... টার্মিনাল পুত্রা স্টেশন থেকে KL Central পর্যন্ত এবং এরপর KL Central এ বোর্ডিং করে কোন ট্রেনে করে KLIA যেতে হবে তা আঙ্কেলকে ম্যাপ দেখিয়ে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলাম। বিদায় নেয়ার সময় দেখি চাচার চোখে পানি, প্রচণ্ড খারাপ লাগলো এ দৃশ্য দেখে, নিজের অজান্তেই চোখে পানি এসে গেলো... চাচা বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, জোর করে ৫০ রিংগিতের একটি নোট ধরিয়ে দিলেন, নিতে চাইনি কিন্তু চাচা রাগ করছেন দেখে না নিয়েও পারলামনা... যাওয়ার সময় চাচার বলে যাওয়া লাইনটা যেন আমার এখনও কানে বাজেঃ “আজ থেকে ইয়াসিনের মতো তুমিও আমার আরেক ছেলে বাবা... প্রাণভরে দোয়া করি তোমার জন্য, ভাল থেকো, পড়ালেখা করবে ঠিকমত, যোগাযোগ রেখ...”

Welcoming Committee তে আমাকে Reciption and Welfare বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, সবচাইতে কঠিন যে বিভাগগুলোর পরিচালনা করা, তার মধ্যে এটি একটি... কারণ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে কোন সময় স্টুডেন্ট আসতে পারে, তখন তাকে নিয়ে তার রুমে দিয়ে আসতে হয়, এজন্য ২৪ ঘণ্টাই খোঁজ খবর রাখতে হয় এয়ারপোর্টে যে সব কমিটি মেম্বার আছে তাদের সাথে। কষ্ট হবে ভেবে এই বিভাগ পরিবর্তন করে অন্য কোন বিভাগে যাব কিনা সেই চিন্তা করেছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি। পরে দেখলাম যা হয়েছে ভালই হয়েছে, কারণ এই বিভাগের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নতুন স্টুডেন্ট এবং তার অভিভাবকদের যে দোয়া পাওয়া যায়, তাদের সাথে যে ভাল সম্পর্ক তৈরী হয়, সেটা সত্যিই আল্লাহর খুব বড় একটা উপহার! বিশেষ করে ইদ্রিস চাচার দোয়া এবং তার স্মৃতি আমার আজীবন মনে থাকবে...
এখনও নিয়মিত যোগাযোগ হয় চাচার সাথে, মাঝে মাঝে ইয়াসিনের ফোন বন্ধ পেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেন ইয়াসিনের কোন সমস্যা হলো কিনা, মাঝে মাঝে আবার আমার খোঁজ নিতেই ফোন করেন, চাচা সত্যিই বড় অদ্ভূত ভাল একজন মানুষ... :’)
http://www.sonarbangladesh.com/articles/TariqRidwan
শেয়ার করুনঃ
পাঠকের মন্তব্য:
করোনেশন রোড, মোমেনশাহী থেকে আব্দুল্লাহ তাসনীম লিখেছেন, ১৪ নভেম্বর ২০১১; রাত ১২:২৯
অনুভূতিতে নাড়া দেয়-এমন লেখাটির জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
71633
IIUM, কুয়ালালামপুর থেকে তারিক রিদওয়ান লিখেছেন, ১৪ নভেম্বর ২০১১; দুপুর ০৩:২৩
আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ
71680
UK থেকে abu syed mahajumi লিখেছেন, ১৬ নভেম্বর ২০১১; রাত ০২:৩৬
Excellent writing. Ma'sha'allah!
71769
কিলার জোন থেকে হাফিজ লিখেছেন, ১৬ নভেম্বর ২০১১; দুপুর ০২:১৭
তারিক রেদওয়ান,
তোমার লেখায় প্রাণ আছে, আছে জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তোমার লেখায় পাঠকের সাহিত্য রস আস্বাদনের ক্ষেত্রটাও ব্যাপক। তাই তোমার অপূর্ব লেখনীতে উদ্বেলিত করে তনু মন।
ভালো থেকো।
শুভকামনা রইলো।
71784
ঢাকা থেকে মো. শাহজাহান লিখেছেন, ১৭ নভেম্বর ২০১১; দুপুর ০২:৪১
তারিক, তোমার অভিজ্ঞতার কথা পাঠকালে দু জায়গায় অশ্রু সংবরণ করতে পারিনি। কিলার জোনের হাফিজ সাহেবের মতো করে বলতে হয়, 'তোমার লেখায় প্রাণ আছে, আছে জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তোমার লেখায় পাঠকের সাহিত্যরস আস্বাদনের ক্ষেত্রটাও ব্যাপক। .....' তোমার জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করছি, যেন মানুষের মতো মানুষ হও। দ্বীনের একজন সাচ্চা মুজাহিদ।
71841
ঢাকা থেকে হাবিব লিখেছেন, ২২ নভেম্বর ২০১১; দুপুর ০২:২৫
অত্যন্ত মর্মস্পর্শী লেখা ।
72105
বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:
কীবোর্ড

Bijoy       UniJoy       Phonetic (Help)       English

নাম:

স্থান:

ই-মেইল:
মন্তব্য:
 
 
লেখক পরিচিতি
 
 

 


© Sonar Bangladesh, 2002-2011. E-mail: editor@sonarbangladesh.com. Privacy Policy